Inqilab Logo

সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০৯ কার্তিক ১৪২৮, ১৭ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী

রিলে ক্রোপ পদ্ধতিতে সবজি চাষে সুফল

প্রকাশের সময় : ১২ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১২:৩৪ এএম, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৬

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুন্ড থেকে : সবজি ভান্ডার খ্যাত সীতাকুন্ডের কৃষিতে নতুন সংযোজন হলো রিলে ক্রোপ পদ্ধতিতে চাষাবাদ। এই পদ্ধতিতে কৃষকরা জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে দুই গুণ বা তারও বেশি সবজি উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছেন। ফলে অল্প সময়ে এই পদ্ধতিটি কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যা এ উপজেলার কৃষিকে আরো একধাপ এগিয়ে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সীতাকুন্ডে প্রায় ৩০ হাজার একর জমিতে শাক-সবজি ও শস্যের আবাদ হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষকরা মৌসুম ভেদে নানারকম ধান, সবজি, ফলমূল উৎপাদন করে নিজে যেমন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন তেমনি সারাদেশে রপ্তানি করে দেশে খাদ্যের চাহিদা পূরণে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে আসছেন যুগ যুগ ধরে। সবচেয়ে বড় কথা এসব কৃষকরা শুধুমাত্র গতানুগতিক কয়েক প্রকার ধান, সবজি চাষ করেই ক্ষান্ত হন না। কৃষিতে নতুন নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবনেও থাকেন সচেষ্ট। আর তাদের এই চেষ্টা ও উদ্ভাবন দেখে অনেক সময় খোদ কৃষি কর্মকর্তারাও চমকে উঠেন। জানা যায়, ঠিক তেমনিভাবে এ এলাকার কৃষকরা সবজি চাষে এবার নতুন এক পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। পদ্ধতিটি ‘রিলে ক্রোপ’ পদ্ধতি নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে একই সময়ে জমি ও তার উপরের শূন্য স্থানে কয়েক প্রকার শাক-সবজি আবাদ সম্ভব। এতে কম খরচে ফলন ও লাভ কয়েকগুণ হতে পারে। ফলে এই পদ্ধতিটি কৃষক সমাজে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বহু কৃষকের জমিতে রিলে ক্রোপ পদ্ধতিতে সবজি চাষ দেখা গেছে। কৃষকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, এতকাল জমিতে কোন ধরনের শাক-সবজি চাষাবাদের পর সেই ফসল উঠে গেলে পরে মৌসুম ভেদে অন্য ফসল বা সবজি চাষ করা হতো। কিন্তু এখন তারা জমিতে কোন শাক বা সবজি চাষ করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। সেই জমির উপরে মাচা তৈরী করে সেখানেও শাক-সবজির আবাদ করছেন। একই জমি ও তার উপরের শূন্য অংশে মাচা করে যেই চাষাবাদ তাকেই কৃষি বিভাগের ভাষায় রিলে ক্রোপ চাষ বলা হচ্ছে। পরিদর্শনকালে দেখা যায়, বরৈয়াঢালা ইউনিয়নের লালানগর বøকের কলাবাড়িয়া গ্রামের কৃষক মোঃ রেজাউল করিম মাসুদ তার জমিতে রিলে পদ্ধতিতে লাল শাক, লাউ, কাঁচা মরিচ, টমেটো ও বেগুন প্রভৃতি চাষ করেছেন। দেখা গেছে, জমির বিভিন্ন অংশে লাল শাক, মরিচ, বেগুন প্রভৃতি লাগানোর পর চারদিকে খুঁটির উপর মাচা তৈরি করে তাতে লাউ চাষ করেছেন। কৃষক রেজাউল করিম মাসুদ প্রতিবেদককে বলেন, কলাবাড়িয়া বøকের বিভিন্ন স্থানে তার ১২০ শতক জমিতে রিলে ক্রোপস পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয়েছে। এই পদ্ধতিতে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব হয় জানিয়ে তিনি বলেন, একসময় জমিতে কোন একপ্রকার শাক-সবজি চাষ করার পর সেই সবজি উঠে গেলে অন্য কিছু চাষ করতাম। কিন্তু কৃষি কর্মকর্তারা এখন রিলে ক্রোপ পদ্ধতিতে চাষ করার পরামর্শ দিলে তাদের পরামর্শ শুনে আমি এই পদ্ধতিতে চাষ করছি। এতে সুফলও পাচ্ছি। একই সময়ে একই জমিতে কয়েক প্রকার সবজি চাষ হচ্ছে। ফলে শ্রম, খরচ কম হলেও লাভ হচ্ছে বেশি। তার ১২০ শতক জমিতে টমেটো, লাল শাক, লাউ প্রভৃতি চাষাবাদে খরচ পড়েছে ৪৫ হাজার টাকার মত। ফসল তোলা শুরুর পর ইতিমধ্যে ২২ হাজার টাকার শাকও বিক্রি করেছেন তিনি। এই জমি থেকে আরো অন্তত ৫০/৬০ হাজার টাকার শাক ও লাউ বিক্রি হবে বলে আশাবাদী তিনি। এছাড়া টমেটো ও বেগুন বিক্রির উপযুক্ত হয়নি। এসব সবজি বিক্রি করেও লক্ষাধিক টাকা আয় হতে পারে বলে তার ধারণা। যার অর্থ খরচের চেয়ে ৩/৪ গুণ বেশি লাভ হবে তার। একই বøকের পূর্ব লালানগর গ্রামের কৃষক মোঃ কামাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রকম সবজি চাষ করে আসছেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ৬ শতক জমিতে রিলে ক্রোপ পদ্ধতিতে শীতকালীন সবজি লালশাক ও লাউ এর চাষ করেন। সবজি চাষে তার খরচ পড়েছে সব মিলিয়ে মাত্র ৭ হাজার টাকা। তার উৎপাদিত শাক শুরুতে বিক্রি করেছেন ৮ হাজার টাকা। এই দাম থাকলে আরো অন্তত ১৮/২০ হাজার টাকার লাউ বিক্রি হবে। অর্থাৎ ৭ হাজার টাকা খরচ করে তিনি ২৫/২৮ হাজার টাকা আয় করবেন। রিলে ক্রোপ পদ্ধতির চাষাবাদ কৃষিকে আরো একধাপ এগিয়ে নেবে বলে মনে করছেন তারা। এ এলাকার শহিদুল আলম, আব্দুল খালেকসহ অনেকে নতুন এই পদ্ধতিতে লাউ, টমেটো, শাক প্রভৃতি চাষ করছেন। এসব দেখে আগ্রহী হচ্ছে অন্য কৃষকরাও। এসব কাজে তাদের বøকের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোপাল চন্দ্র নাথের কাছ থেকে সার্বিক সহযোগিতা পাচ্ছেন বলে জানান কৃষকরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুন্ড কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোপাল চন্দ্রনাথ বলেন, কলাবাড়িয়া বøকে ১৭৫ হেক্টর জমিতে ৭/৮’শ কৃষক বিভিন্ন প্রকার শীতকালীন সবজির চাষ করেছেন।
তার মধ্যে প্রায় ১৫ হেক্টর জমিতে ৭০ জন কৃষক রিলে ক্রোপ পদ্ধতিতে সবজির চাষ করেছেন। তিনি বলেন, একসময় কৃষি জমিতে এই পদ্ধতির প্রয়োগ ছিলো না। আমরা এই পদ্ধতির কথা কৃষকদের বোঝানোর পর তারা এতে আগ্রহী এবং লাভবান হচ্ছেন। এতেই আমাদের ভালো লাগছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে এখানে সবজিতে তেমন পোকা মাকড়ের আক্রমণ নেই। তবে মাঝে মধ্যে সাদা মাছি দেখা যায়। সাদা মাছি দমনে টিডো অথবা ইমিটাফ ও মাকড় দমনে ভারটিমেক ওষুধ প্রয়োগের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অপরদিকে একই ইউনিয়নের টেরিয়াইল বøকে দায়িত্বরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পিপাষ কান্তি চৌধুরী বলেন, তার বøকেও ৪ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩০ জন কৃষক রিলে ক্রোপ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করেছেন। পদ্ধতিটি কৃষকদের মাঝে দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সবজি

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১
১৮ এপ্রিল, ২০২১

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ