Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

খোকা

| প্রকাশের সময় : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

তাহমিনা কোরাইশী : স্বপ্ন দেখে খোকা ধরফরিয়ে ওঠে বিছানা ছেড়ে। চিৎকার করে মাকে ডাকে। পাশের ঘর থেকে মা ছুটে আসেন। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে- কি বাবা কি হয়েছে? খোকার চোখে মুখে আতঙ্ক। দু’হাত অনবরত ঝারছে আর বিছানার দিকে পিছন দিয়ে মাকে ইশারা করছে- দেখ দেখ বিছানায় পলি মরে পড়ে আছে। আমি ওকে গলা টিপে মেরে ফেলেছি।
মা বিছানার দিকে তাকিয়ে বলে- কোথায়? কেউ তো নেই। আর পলি তো কখন থেকে রান্না ঘরে। তোমার জন্য নাস্তা বানাচ্ছে। দুপুরে ভাত ঘুমে এমন দুঃস্বপ্ন দেখে মানুষ। শান্ত হও বাবা। একটু আরাম করে বস। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো খোকা। সত্যি তো বিছানায় কেউ তো নেই। পলি রান্না ঘরে। বিছানাটা একেবার খালি। শাশুড়ি জোরে জোরে বউ মা বলে ডাকলো। রান্না ঘর থেকে পলি ছুটে এলো। কাঁচুমাচু চেহারায়- কি হয়েছে মা। শাশুড়ি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করছে। শান্ত গলায় বললো খোকা তোমাকে খুঁজছে। বসো মা ওর পাশে একটু বসো। দুঃস্বপ্ন দেখেছে মনে হয়। সতর্ক ভাবেই চেপে যায় ছেলের কথাটা।
মা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ওরা দু’জন পাশাপাশি। মা যদিও ছেলের বউকে বুঝতে দিতে চায় নি কিছুই। কিন্তু পলি গ্রামের নিরীহ গোছের মেয়ে হলে কি হবে। বুদ্ধিসুদ্ধি নয় তো তেমন কম। পলি স্বামীর কাছে জানতে চাইলো- কি হয়েছে? খোকা তার স্ত্রী পলিকে গড়গড় করে স্বপ্নের কথাগুলো বলেই ফেললো। পলি ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। খোকা ওর কাছ ঘেষে পলিকে আদরে ভরিয়ে দিয়ে বললো আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি ভেবে।
পলি বড় বড় চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আড়ষ্ট হয়েই বলে- স্বপ্ন দেখেছেন। এখন আপনার ভালো লাগছে? কোন রকম কাঁচুমাচু করে কথাগুলো শেষ করবার চেষ্টা করলো পলি। চোখে জল এসে যায়। মনে ভয় আরো দ্বিগুণ বাড়তে থাকে। খোকার প্রতি আস্থাহীনতা জন্মে। শাশুড়ির প্রতি ঘৃণা। তিনি কীভাবে এমন কাজটি করলেন গরিব ঘরের মেয়েকে মিথ্যা বলে তার পাগল ছেলের সাথে বিয়ে দিলেন। প্রথম প্রথম পলি কিছুই বুঝতে পারেনি। কেবল ভেবেছে এমন বড় লোকের ঘরে শহুরে জীবন ওর কপালে ছিল? কি জানি কি পুণ্যি করে এসেছিল গত জীবনে এমন সৌভাগ্য জুটেছে ওর কপালে। প্রথম প্রথম বুঝতে পারেনি পলি এবং স্বামীর ব্যবহারও এতোটা খারাপ ছিল না। আস্তে আস্তে আরো প্রকট হচ্ছে। ভেবেছে পলি ওর মত ফাইভ পাশ মেয়েকে তার শিক্ষিত ছেলের বউ করে আনার পেছনে কিছু কারণ তো আছেই। সময়ে সময়ে আরো জেনেছে। কাজের লোকদের কানাকানিতে বুঝেছে অনেক কিছুই। কি না কি অসুখ আছে তার। মাঝে মাঝে বেড়ে যায়। ছোট বেলায় বোঝা যায়নি। যত দিন যাচ্ছে ততই আরো বাড়ছে। ডাক্তার দেখিয়েছে অনেক ওষুধও খাওয়ানো হয়েছে। কেবল ঘুমায় একেবারে নির্জীব নিঃপ্রাণ হয়ে যায় ছেলেটা। কখনও বেশ ভালো থাকে কখনও খারাপ। যে কারণে আগের বিয়েটা টেকেনি। ওই ঘরে খোকার একটি কন্যা সন্তানও আছে। বউ বাচ্চা ছেড়ে যাওয়ার পর ডিপ্রেশন আরো বেড়ে যায়। সব দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের ওপর। মা এমনই একজন যে আমৃত্যু আঁচলে গিট বেঁধে নেয় নিজ সন্তানের মঙ্গলামঙ্গলের বীজ। সবাই ছেড়ে গেলেও সেই আগড় দিয়ে রাখে সন্তানকে।  

অবশ্য শাশুড়ি ভীষণ ভালোবাসে পলিকে। খোকার এতো অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করছে মেয়েটা। ছেলেকে মা বুঝিয়ে দেখেছে বউয়ের কথা। কখনও ভালো বোঝে কখনও না বোঝার মত। সেদিন শাশুড়ি হঠাৎই জানতে পারল পলি মা হতে চলেছে। আনন্দের সীমা নেই মায়ের। পলিকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে কেঁদে শান্ত হলেন শাশুড়ি ছেলের বউ দু’জনই।
পলির প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে হচ্ছিল পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিলো এই ভেবে যে সেও তো একজন দুঃখনিী মা। পলির ভেতরে সন্তান যেমন বড় হতে থাকে তেমনি ওর মনের ভেতরে কষ্টের বোঝাটিও ভারী হতে থাকে। কোথায় যাবো। কি করবো? নদীতে ঝাঁপ দেবো গলায় কলসি বেঁধে? যে দিকেই যাই আমার জন্য যমদূত দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই। পা বাড়ানো জায়গা খুঁজে পায় না পলি। নিজের মনের সাথে রাজ্যের যুদ্ধ। তিমির আঁধারে হাতড়ে মরে পলি। আতঙ্কিত দিন কাটে। রাতেও স্বামীর কাছে ঐ বিছানায় শুতে ভয় পায়। শাশুড়ি মা বোঝেন। মাঝে মাঝে নিজের কাছে নিয়ে ঘুম পাড়ান কখনও খোকা ঘুমিয়ে গেলো বলে যাও বউ মা যাও। আমি তো আছি জেগেই। মা সাহস রাখো ধৈর্য ধর। সব ঠিক হয়ে যাবে।
পলি বোঝে নিজেও মা হতে চলেছে। মায়ের কষ্ট মায়ের অন্তরের জ্বালা। পলি চলতে চলতে নিজের পেটে হাত রাখে মায়াময় একটা আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে রয়। সন্তানের জন্য মায়া জন্মে আরো। তবুও কি এক দুশ্চিন্তায় দুঃর্ভাবনায় দেহ মন অবসাদ হয়ে আস।ে শরীর ভেঙে যায় আতঙ্কে। ঘুম হয় না। খাওয়াও হয় না ঠিক মত। শাশুড়ি যতেœর ত্রুটি করেন না। কি জানি কেনো যেনো মনে হয় অথই পাথার আর তলায় মণি মাণিক্য খোঁজার মত লম্বা পথের যাত্রী সে।
সিজিয়ফেনিয়াতে আক্রান্ত খোকা কবে কখনও আবার ভালো হয়। ভালো হলেও কতদিন ভালো থাকে। মহাবিশ্বের মত মানুষের মস্তিষ্ক কতই না বিচিত্র কোষে কোষে ভরপুর। তার সাথে মনও সায় দেয় সেই সব অদ্ভুত বৈচিত্র্যে। জটিলকে জানতেও যেমন সময় লাগে না। জটিলতা সৃষ্টিতেও সময় লাগে না।
আজ পলিও ওর চিন্তাশক্তির খেই হারিয়ে ফেলে। আবল তাবল ভানায় পেয়ে বসে। সেই দুর্বল শরীরেই জন্ম নেয় ওর সন্তান। শাশুড়ি সেবাযতেœ নিজেকে সুস্থ করে তোলে পলি।
শক্তহাতে হাল ধরতে প্রস্তুতি নেয়। সব কিছুই সৃষ্টিকর্তার হাতে ছেড়ে দেয়। ওর মনে হয় খোকা দেখুক আদর করুক তার নিজের সন্তানকে। পলির বিছানার পাশে এসে বসে খোকা। হাত বাড়িয়ে আদর করে। ওর চোখে চোখ রাখে পলি। যদিও দুচোখ ভাষাহীন পাথর। তবুও বলে পলি- এই যে দেখ তোমার সন্তান। তুমি বাবা হয়েছো। আমি আমি মা। অবাক দৃষ্টিতে একবার পলিকে একবার সন্তানকে দেখে খোকা। হাত-পা-গা ছুঁয়ে আদর করে আর বলে- আমার সন্তান? আমাকে বাবা বলে ডাকবে? সত্যি?
পলির বুকটা ব্যাথায় মোচড় দিয়ে ওঠে। খোকাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে খোকা তার দুচোখেও জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে।
পলি জানে না সে কি বুঝে কাঁদে না কি না বুঝে কাঁদে। বড় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন পাঁজরে বিদ্ধ করে চলে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।