Inqilab Logo

শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯, ০৫ রজব ১৪৪৪ হিজিরী

ইসলামের দৃষ্টিতে আনুগত্যের গুরুত্ব ও সীমারেখা

মুফতী পিয়ার মাহমুদ | প্রকাশের সময় : ১০ নভেম্বর, ২০২২, ১২:০০ এএম

আনুগত্য অর্থ মান্য করা, মেনে চলা, আদেশ ও নিষেধ পালন করা, কোনো কর্তৃপক্ষের ফরমান-ফরমায়েশ অনুযায়ী কাজ করা। কুরআন-হাদীসের ভাষায় যাকে ‘ইতাআত’ বলে। আরবীতে ইতাআতের বিপরীত শব্দ মাছিয়াত। যার অর্থ নাফরমানী করা, হুকুম অমান্য করা। প্রকৃত আনুগত্য হলো আল্লাহর ও তদীয় রাসূলের যাবতীয় হুকুম আহকাম মেনে চলা। আর ইসলামের দৃষ্টিতে আনুগত্য তাকেই বলা যাবে, যেটা হবে মনের ষোলআনা ভক্তি শ্রদ্ধা সহকারে, পূর্ণ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা সহকারে, স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণা সহকারে। কোনো প্রকারের কৃত্রিমতা বা দ্বিধা-দ্বনদ্ব, সংকোচ-সংশয়ের কোনো ছাপ বা পরশ থাকতে পারবে না। ইসলাম ও আনুগত্য অর্থের দিক দিয়ে এক ও অভিন্ন। শাব্দিক অর্থের আলোকে ইসলামের অন্তর্নিহিত দাবি অনুধাবন করলে দেখা যাবে যে, এখানে আনুগত্যই মূল কথা। সুতরাং আমরা বলতে পারি, ইসলামই আনুগত্য অথবা আনুগত্যই ইসলাম। যেখানে, আনুগত্য নেই সেখানে ইসলাম নেই। যেখানে ইসলাম নেই, সেখানে আনুগত্য নেই।

আনুগত্যের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা : ইসলামে মানবের জীবন ও সমাজ ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হল আনুগত্য। নিরঙ্কুশ আনুগত্য ছাড়া পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কোথাও শান্তি-শৃঙ্খলা আসেনা। সর্বত্রই দেখা দেয় সীমাহীন অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা। অস্থির হয়ে উঠে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব। তাই ইসলামে ইতাআত বা আনুগত্যের গুরুত্ব যারপর নাই। আনুগত্যের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম। [সূরা নিসা: ৫৯] এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে প্রকৃত অর্থে আল্লাহর আনুগত্য করলো এবং যে ব্যক্তি আমার নাফরমানি করলো সে প্রকৃত অর্থে আল্লাহর নাফরমানি করলো। যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করলো সে প্রকৃত অর্থে আমার আনুগত্য করলো এবং যে ব্যক্তি আমীরের নাফরমানি করলো সে প্রকৃত অর্থে আমার নাফরমানি করলো। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস:৭৪৩৪) উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এর আনুগত্যের সাথে সাথে উলুল আমরের আনুগত্যকে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। উলুল আমর বলতে সেই সব ব্যক্তিকেই বুঝায়, যারা মুসলিম সমাজের পরিচালক। আলেম-উলামা, ন্যায়সঙ্গত শাসক, বিচারপতি এবং সর্দার-মাতব্বরসহ নেতা-সেনাপতি সকলেই উলুল আমরের মধ্যে গণ্য।

আনুগত্যের সীমারেখা : ইসলাম আনুগত্যের সীমাহীন গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তার সীমারেখাও টেনে দিযেছে মজবুতভাবে। এ সংক্রান্ত কয়েকটি নীতিমালা উল্লেখ করা হলো-

১. নেতার আদেশ ততক্ষণ মানা যাবে যতক্ষণ তিনি শরীআতের সীমার ভিতরে থাকেন আমীর বা নেতার আদেশ ততক্ষণ মানা যাবে যতক্ষণ তিনি শরীআতের সীমার ভিতরে থাকেন। সীমা অতিক্রম না করেন। তার আদেশ-নিষেধ হয় কুরআন-সুন্নাহ মুতাবিক। শরীআতের সীমা লঙ্ঘন হলে বা তার আদেশ-নিষেধ কুরআন-সুন্নাহ সম্মত না হলে তা মানার কোনো সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- নিজের নেতৃবৃন্দের কথা শোনা ও মেনে চলা মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য, তা তার পছন্দ হোক বা না হোক, যে পর্যন্ত না তাকে গোনাহ ও নাফরমানির হুকুম দেয়া হয়। আর যখন তাকে নাফরমানির হুকুম দেয়া হয়, তখন তার সে হুকুম শোনা ও আনুগত্য করার অবকাশ নেই। (বুখারী, হাদীস:৭১৪৪; মুসলিম, হাদীস:১৮৪৯) আরেক বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- আল্লাহর নাফরমানি করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ১০৯৫, ৩৮৮৯] অন্য আরেক বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তাঁর আদেশ মান্য করা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৯৫৫) হাদীসগুলোর ভাষ্য এক ও অভিন্ন। কেবল বৈধ ও শরীআহ সম্মত ক্ষেত্রেই আমীর বা নেতার ইতাআত বা আনুগত্য করা যাবে। অবৈধ ও কুরআন-সুন্নাহর খেলাফ কোনো ক্ষেত্রে আমীর বা নেতার আদেশ-নিষেধ মানা যাবে না। নেতৃত্ব পাওয়ার পর কোনো নেতা যদি দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়, তবে তার আনুগত্য পরিহার করতে হবে। কারণ মানুষের আনুগত্য চিরন্তন নয়।

২.আনুগত্যের প্রশ্নে ইসলাম প্রাধান্য দিয়েচ্ছে ‘দ্বীনদারি, যোগ্যতা ও ন্যায়ানুগতাকে, চেহারা বা বংশকে নয় : এ ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূণ বিবেচ্য বিষয় হলো আনুগত্যের প্রশ্নে ইসলাম ব্যক্তি বা বংশকে প্রধান্য দেয়নি। প্রাধান্য দিয়েছে ‘দ্বীনদারি, যোগ্যতা ও ন্যায়ানুগতাকে। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছিলেন ‘যদি তোমাদের নেতা হিসেবে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ দাসকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং সে আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের নেতৃত্ব দেয়, তবে তার কথা শোনো এবং আনুগত্য করো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৩৮) আরেক হাদীসে আছে-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি কোনো হাবসী ক্রীতদাসকেও তোমাদের নেতা বানিয়ে দেয়া হয় যার মাথা কিসমিসের মত, তা হলেও তোমরা তার আনুগত্য কর। (বুখারী, হাদীস:৬৯৩) কাজেই আমীর/নেতার চেহারা, বংশ ইত্যাদি যেমনই হোক না কেন তিনি যদি যোগ্য হোন এবং যথাযথ পন্থায় নিয়োগ পান, তাহলে তাঁকে মানতেই হবে। অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই।

৩.অন্ধ অনুকরণ নিষিদ্ধ : বিবেক-বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে কোনো কিছুর অন্ধ অনুকরণ ইসলামে অনুমোদিত নয়। যারা সত্যের বিপরীতে অন্ধ অনুকরণের অংশ হিসেবে পূর্বপুরুষের কুসংস্কার, কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত মতবাদ ও বিশ্বাস আকড়ে ধরে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে তাদের নিন্দা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- যখন তাদের বলা হয়, এসো আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রাসুলের দিকে। তারা বলে, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যার ওপর পেয়েছি তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা কিছু না জানে এবং সুপথপ্রাপ্ত না হয়, তারপরও তারা তাদের অনুসরণ করবে? (সুরা মায়িদা, আয়াত : ১০৪) অর্থাৎ পূর্বপুরুষরা ভুলের মধ্যে থাকলেও কী তারা তাদের অনুসরণ করবে? তাদের তো উচিত সুপথের অনুসারী ও সত্যসন্ধানী হওয়া। পূর্বপুরুষদের ভ্রান্তিগুলোর অনুসরণ পরিহার করা। (চলবে)

লিখক: ইমাম ও খতীব, মসজিদুল আমান, গাঙ্গিনারপাড়, ময়মনসিংহ, মুহাদ্দিস মাদরাসা সাওতুল হেরা সদর মোমেনশাহী

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম

২৭ জানুয়ারি, ২০২৩

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ