Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ‘রাহেলা’র স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলেনি

| প্রকাশের সময় : ২০ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

সৈয়দ শামীম সিরাজী : মুক্তিযুদ্ধের সাহসিক বীরঙ্গনা মাতা রাহেলা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়েও  স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি। বরং লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সয়ে, ধিক্কার শুনে এখনও পথ চলতে হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও দুঃখের সাথে বলেন, আমাকে দেখলে মানুষ মুখ ঘুরাইয়া নেয়, এসব মেয়ে মানুষকে দেখতে ইচ্ছা করে না। এসব কথা শুনে ৪৫ বছর ধরে আঘাত পেতে পেতে, খাটতে খাটতে জীবন শেষ হয়ে গেলেও দেখার কেউ নেই।’ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিতা নারী সিরাজগঞ্জের সয়াধানগড়া গ্রামের নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সাহসিক রাহেলা বেগম এভাবেই তার বঞ্চনার কথা বলছিলেন।
রাহেলা জানান, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার পর সরকার আমাকে দেশের জাতীয় বীর (মুক্তিযোদ্ধা) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশেষণ জড়িয়ে দিয়েছেন, জয়ললিতা, মুক্তিযুদ্ধের সাহসিক, বীরঙ্গনা মাতা।  এজন্য আমি গর্বিত এবং সরকার তথা বঙ্গবন্ধু কন্য শেখ হাসিনার কাছে চির কৃতজ্ঞ। হারানো দিনের নানা বঞ্চনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তার করুণ কাহিনী  বর্ণনা করেন- বিয়ের পর দেড় বছরের মাথায় শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। তখন আমার বয়স ২২ বছর। হঠাৎ এক সকালে বাবা এসে বললেন, এখানে থাকা নিরাপদ নয়, চল পালাই। তারপর বাবা আমাদের নিয়ে এলেন রায়গঞ্জ উপজেলার ঘুড়কা গ্রামে। আর সেখানেই নেমে আসে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর অবর্ণনীয় নির্যাতন। তিনি বলেন- ওই বাড়িতে তিনিসহ আরো চার নারী একটি ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। সে ঘরে ঢুকে তাদের ওপর চালায়  পৈশাচিক নির্যাতন। এসময় স্বামীর সামনেই রাহেলার ওপর চলে এ নির্যাতন।
এ ঘটনার পর রাহেলার স্বামী মোহাম্মদ আকবর হোসেন নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পরে গভীর রাতে তার বাবা এসে উদ্ধার করে তাকে নিয়ে যান ফুফুর বাড়ি। দেশ স্বাধীন হওয়ার এক মাস পর বাড়ি ফিরে এলে স্বামী আকবর আলী তাকে আর মেনে নেননি। নিরুপায় হয়ে আশ্রয় নেন বঙ্গবন্ধুর নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরদিন পুনর্বাসন কেন্দ্রের কেয়াটেকার বললেন, যতদ্রুত সম্ভব পুনর্বাসন কেন্দ্র ছেড়ে পালাও, ওরা তোমাদের মেরে ফেলবে। সেখানকার সবাই যার যার ঠিকানায় চলে যান। রাহেলাও বাপের বাড়ি চলে আসেন। এর প্রায় দেড় বছর পর রাহেলার শ্বশুর বাড়ি, বাপের বাড়ির লোকজন ও স্থানীয়দের সহায়তায় স্বামীর ঘরে ফিরে যান রাহেলা।
২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চে তার ওপর একাত্তরের নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে বর্ণনা করায় তার জীবনে নেমে আসে আরেক দুর্যোগ। একথা শুনে রাহেলার মেয়ে এক সন্তানের জননী চম্পাকে তার স্বামী তালাক দেন। চম্পার ঠাঁই এখন বীরাঙ্গনা মায়ের অভাবের সংসারে। তালাকপ্রাপ্তা মেয়েকে নিয়ে রাস্তার ধারে পিঠা বিক্রি ও সুতাকলে কাজ করে সংসার চলে তার। অশ্রুসিক্ত রাহেলা বেগম আরো বলেন, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। তবে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাইনি। ইতিমধ্যে স্বামী মারা গেছেন। দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ে নিয়ে তার সংসার। থাকেন সিরাজগঞ্জের সয়াধানগড়া বাসস্ট্যান্ডের পাশে পুকুরপাড়ের বস্তিতে। তাও সরকার অধিগ্রহণ করেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অধিগ্রহণের চিঠিও দেয়া হয়েছে।
যেকোনো সময় উচ্ছেদ হতে পারেন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা রাহেলা। তাই সরকারের কাছে ঠাঁই করে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সিরাজগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার গাজী শফিকুল ইসলাম শফি বলেন, স্বাধীনতার ৪৫ বছর অপেক্ষার পর চলতি বছরে সিরাজগঞ্জে বেঁচে থাকা (বীরাঙ্গনা) প্রথমে ১৩ জনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে বাকি ৫ বীরাঙ্গনাকেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা রাহেলাসহ তারা সরকারের সকল সুবিধা পাবেন বলে  তিনি জানান। এ আশ্বাস বুকে লালন ও ধারণ করে তা বাস্তবায়নের দিকে তাকিয়ে আছেন অসহায় নিপীড়িত-নির্যাতিত এবং সুবিধাবঞ্চিত মুক্তিযুদ্ধ সাহসিক রাহেলা। তার এ আশা কি আদৌও পূরণ হবে?



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।