Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই

| প্রকাশের সময় : ২১ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ডা. মাও. লোকমান হেকিম : উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে গত ৯ ডিসেম্বর ২০১৬ বিশ্বব্যাপী পালিত হল দুর্নীতি প্রতিরোধ দিবস। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (টঘউচ) ও জাতিসংঘের ড্রাগ ও ক্রাইম দফতর (টঘঙউঈ) যৌথভাবে ঘোষণা করছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুবিচার, গণতন্ত্র, সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নকে সুনিশ্চিত করতে দুর্নীতিকে রুখতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে। জাতিসংঘের হিসাব মতে, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী এক ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলার শুধু ঘুষ লেনদেন হয় এবং ৬ ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলার চুরি হয়ে যায়; যা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের ৬ শতাংশ। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির হিসাব মতে যে পরিমাণ অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে হারিয়ে যায় তা উন্নয়ন সাহায্যের প্রায় দশগুণ। তাই বিশ্বের প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দুর্নীতি হচ্ছে ভয়াবহ এক অপরাধ যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ।  
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে দুর্নীতি একটি প্রকট সমস্যা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যতোই বলা হয় দুর্নীতি কিন্তু কমে না। ধীরে ধীরে দুর্নীতি বাড়ে। গণতন্ত্রের মধ্যেও দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘিœত। দুর্নীতি, লুটপাট, কারচুপি এইসব শব্দের সঙ্গে সকলেই কমবেশি পরিচিত। বিশেষ করে সরকারি কাজে দুর্নীতি-লুটপাটের ঘটনা ঘটছে অহরহ। প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে সীমাহীন দুর্নীতি কিন্তু প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই। প্রতি বছর সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপচয়ের ঘটনা ধরা পড়ে। অথচ চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা কোনো শাস্তি পায় না।
বছরের পর বছর এই ধারা চলতে থাকায় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি বেড়েই চলেছে। ফলে একদিকে অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ, অপরদিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণ না হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন জরিপে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লুটপাট হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গত ৯ ডিসেম্বর ২০১৬ শুক্রবার দেশে পালিত হলো দুর্নীতিবিরোধী দিবস। সত্যি বলতে কি, এমন কোনো সরকারি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে দুর্নীতি হয় না। সরকারি অফিস আদালতে একদিকে সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে, অপরদিকে সরকারিভাবে বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লুটপাট হচ্ছে, অপচয় হচ্ছে। সরকারি অফিসে ঘোষণা দিয়ে কোনো কাজ করানো যায় না। রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকল্প গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুমোদন ও বাস্তবায়ন পর্যন্ত স্তরে স্তরে ঘুষ দিতে হয়, অনিয়ম হয়।
এই লুটপাটের ঘটনা অনেক সময় প্রকাশ্যেই ঘটে থাকে। এটা দেখার কেউ নেই। মানে, যে বা যাদের ওপর এটা তদারকির দায়িত্ব রয়েছে, তারাই এই অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত। আমাদের দেশে ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করে দিয়েছেন। দেশের  সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রমেই ঘটছে দুর্নীতির বিস্তার। দেশের আদালত অঙ্গনও এ প্রক্রিয়ার বাইরে নয়। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা কোনো শাস্তি পায় না।
তাছাড়া দুর্নীতির কারণে দ্রুত বাড়ছে কালো টাকার দৌরাত্ম্য। বাড়ছে ধনী-গরিবের ব্যবধান। প্রতি মাসে দুর্নীতির কারণে দেশে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে কোটি কোটি কাটা। দুর্নীতির কারণে ইতোপূর্বে দাতা সংস্থা স্থগিত করেছে অনেক প্রকল্প। এক জরিপের তথ্য হচ্ছে-১৯৭৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৩৮ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সরকার ব্যয় করছে দুই লাখ কোটি টাকা। অথচ এই অর্থের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লুটপাট হয়েছে। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। গণমাধ্যম এককভাবে সোচ্চার হলে চলবে না। লক্ষ করা যায়, অনেক সময় গণমাধ্যমের কর্মীরা সত্যকে উদঘাটন করতে গিয়ে সম্মানহানির সম্মুখীন হয়েছেন। জনগণ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। প্রধান কারণ হচ্ছে জনগণ এমন দুর্নীতির ফলে রাষ্ট্র কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অথবা দেশের জাতীয় চরিত্রের ভিত্তিমূলে দুর্নীতির পরিণতি কতটা ভয়াবহ তা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারছে না। তাই প্রয়োজন দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দুর্নীতি নির্মূলে যেসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে তাতে সরকারের পাশে সহযোগিতা করছে সর্বস্তরের জনগণ। গণসচেতনতা বৃদ্ধিই হচ্ছে দুর্নীতির প্রবণতাকে প্রতিরোধ এবং নির্মূল করার প্রধান হাতিয়ার। দুর্নীতির যে শৃঙ্খল রাজনীতি এবং আমলাতন্ত্রকে আবদ্ধ করে আছে, জনগণকে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। জনগণের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরই পারে দুর্নীতিকে নির্মূল করতে। শুধু দুর্নীতি প্রতিরোধ দিবস পালন করলে হবে না, অর্থবহ করতে হবে প্রতিশ্রুতি এবং প্রত্যয়কে জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে।
সুতরাং আমরা যারা পরকালীন মুক্তি পেতে চাই, তারা কেউ যেন দুর্নীতি না করি। দুর্নীতির টাকা দিয়ে নরকে যেতে চাই না। আমরা ইচ্ছা করলে দেশকে শান্তিময় করে গড়ে নিতে পারি। আবার এক ধরনের নরকেও পরিণত করা যায়। আসুন, আমাদের দেশকে নরকে পরিণত না করে এবং দুর্নীতি ও কুকর্ম না করে সব ক্ষেত্রে সংস্কার করি।
ষ লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।