Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

ভূতের আছর

| প্রকাশের সময় : ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

জ সী ম   আ ল   ফা হি ম : শনিবার দুপুরবেলা। ক্লাস সেরে শিক্ষকগণ রুমে এসে কেবল বসেছেন। গ্রীষ্মকাল। প্রচ- গরম পড়েছে। এমন সময় স্কুল দফতরি হযরত আলী হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো, ভূ-ভূ-ভূত!
আর কিছু সে বলতে পারলো না। তার মুখ দিয়ে ফেনা ঝরতে লাগলো। পরক্ষণেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। স্কুলের আয়া ছমিরন বিবি গ্লাস ভরে জল নিয়ে এলেন। হযরত আলীর চোখেমুখে জল ছিটিয়ে তার জ্ঞান ফিরানো হলো। চেতনা ফিরে পেয়ে সে বড় বড় চোখ করে সকলের দিকে অবিরাম তাকাতে লাগলো। তার চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ।
হযরত আলীর কা- দেখে হেড মাস্টার সুবহান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, বিষয় কী রে? কী হয়েছে তোর? এমন করলি কেন তুই?
হেড স্যারের প্রশ্নের জবাবে আলী বলতে লাগলো, ভূত স্যার! আমি নিজের চোখে দেখেছি স্যার। জরুরি কর্ম সারতে বাথরুমে ঢুকেছিলাম। দরজা খুলতেই দেখি ধবধবে সাদা শাড়ি পরা এক কুঁজো বুড়ি। বুড়িটি আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ভেংচি কাটলো। এমন ভেংচি আমি জীবনে দেখিনি স্যার। আমার ধারণা এটা কুঁজো বুড়ি নয় স্যার। সাক্ষাৎ ভূত-পেত্মি।
হযরত আলীর বিবরণ শুনে হেড স্যার বিষয়টি সরেজমিন দেখে আসার জন্য দুজন শিক্ষককে পাঠালেন। শিক্ষকগণ এসে দেখলেন, কোথাও কিছু নেই। পরে তারা হেড স্যারকে গিয়ে রিপোর্ট করলেনÑকাউকে পাওয়া যায়নি স্যার। এটা আলীর ফাজলামো ছাড়া আর কিছু নয় স্যার। ভূত-প্রেত কেন কাউকেই আমরা দেখতে পাইনি।
শিক্ষক দুজনের কথা শুনে হেড স্যার কেমন যেন ভাবনায় পড়ে গেলেন। বললেন, ঠিক আছে। আপনারা এখন আসুন।
তার কয়েকদিন পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। এবার দেখলেন, স্কুলের একজন ম্যাডাম। ম্যাডামের নাম শরীফা বেগম। শরীফা ম্যাডাম খুব প্রাণবন্ত খোশ মেজাজের মানুষ। ভূত-প্রেতে তার কোনো বিশ্বাস নেই। হযরত আলীর বিষয়টি নিয়ে তিনি খুব মজা করেছেন। হাসাহাসি করেছেন। তিনি মনে করেন জগতে ভূত বলতে কোনো কিছু নেই। ওসব মানুষের অলীক কল্পনা।
সেই শরীফা ম্যাডাম সেদিন দেখলেন কীÑসাদা পোষাকধারী একজন মহিলা তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। মহিলার সাথে দুটো ছোট বাচ্চাও আছে। বাচ্চাগুলোরও পরনে মহিলার মতোই সাদা পোশাক। মহিলাটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক লম্বা। অনেক মোটা। মহিলাটি শরীফা ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য এক হাসি দিলেন। সেই হাসি দেখে শরীফা ম্যাডাম সহসা ফিট হয়ে গেলেন।
পরে অন্য ম্যাডামগণ জল ছিটিয়ে তার চেতনা ফিরালেন। চেতনা ফিরে পাওয়ার পর শরীফা ম্যাডামের বিবরণ শুনে হেড স্যারসহ স্কুলের শিক্ষকগণ কেমন যেন ভরকে গেলেন। সেদিন আলীর বিষয়টা তারা খুব একটা আমলে নেননি। আলী স্বভাবে এমনিতেই একটু বাকপটু। তার সব কথা ঠিক নয়। অনেক সময় সে তিলকে তাল করে কথা বলে। কিন্তু শরীফা ম্যাডামের বিষয়টা ভিন্ন। তার কথায় একটি গুরুত্ব আছে। কী করা যায় এখন? ভাবতে লাগলেন হেড স্যার।
পরের সপ্তাহে ঠিক দুপুরবেলা ঘটলো আরেকটি ঘটনা। সেদিন ছিল মঙ্গলবার। ইতোপূর্বে স্কুলে যে কয়টি ঘটনা ঘটেছে, শনি-মঙ্গলবারেই ঘটেছে। তাই শনি-মঙ্গলবার এলে স্কুলের স্যারগণ নিতান্ত ভয়ে ভয়ে থাকেন। সদা তটস্থ থাকেন। কোথায় কখন কী ঘটে যায়! এমন ত্রাহি ত্রাহি একটা ভাব থাকে সবার মনে।
মঙ্গলবার দুপুরে স্কুলের তিনজন ছেলেমেয়ে হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে পড়লো। এদের দুজন মেয়ে। আর একজন ছেলে। মেয়েদের একজন নবম শ্রেণির ছাত্রী। অন্যজন পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। আর ছেলেটি পড়ে দশম শ্রেণিতে। আক্রান্ত হওয়ার পর তিনজনই ফিট হয়ে গেল। পরে জল ছিটিয়ে তাদের জ্ঞান ফিরানো হলো। চেতনা ফিরে পাবার পর তিনজনই কেমন যেন টলতে শুরু করলো। ঠিকমতো তারা তাকাতে পারতো না। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতো না। তারা এলোমেলো কথাবার্তা বলতে শুরু করলো। উচ্চস্বরে তারা হাসতো। আকাশ ফাটানো তাদের সেই হাসি।
ছাত্রছাত্রীর এই অবস্থায় হেড স্যার দারুণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পরে তিনি অভিভাবকদের স্কুলে ডেকে আনলেন। অভিভাবকদের হাতে তাদের সোপর্দ করলেন।
বাড়ি এসেও আক্রান্ত তিনজন অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করলো। অভিভাবকগণ সাধ্যমতো তাদের ডাক্তার কবিরাজ দেখালেন। ডাক্তার সাহেব রোগী দেখে হতাশা ব্যক্ত করলেন। ঘোষণা দিলেন, এদের মাথায় গ-গোল দেখা দিয়েছে। উন্নত চিকিৎসা লাগবে। ভালো চিকিৎসা করাতে এদের বিদেশে নিয়ে যেতে হবে।
আর কবিরাজ মশাই রোগী দেখেই ঘোষণা দিলেন, সাংঘাতিক ভূতের আছর। ঝাড়ফুঁক লাগবে। ঝাড়ফুঁক দিয়ে নাকি তিনি ভূত ছাড়াতে পারবেন। নিরুপায় অভিভাবকগণ শেষে কবিরাজের উপরই ভরসা করতে লাগলেন।
এই ঘটনার পর হেড স্যার সপ্তাহখানেকের জন্য স্কুল বন্ধ ঘোষণা করলেন। এরই মধ্যে আক্রান্ত তিনজন কবিরাজের ঝাড়ফুঁকের গুণেই হোক, আর এমনি এমনি হোক; সুস্থ হয়ে ওঠল।
স্কুল খোলার প্রথম দিন দুপুরবেলা আক্রান্ত হলো আরও সাত সাতজন ছেলেমেয়ে। আক্রান্ত ছেলেমেয়েরা আগের ছেলেমেয়ের মতোই এলোমেলো কথাবার্তা বলতে লাগলো। হাঁটতে গিয়ে হাঁটতে পারতো না। কেমন যেন টলতো। ফার্মের মুরগির মতো ঝিমাতো। তারা অন্যান্য সুস্থ ছেলেমেয়েদের সাথে হাতাহাতি মারামারি করতো। কখনও বা গলা ফাটিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতো। তখন তাদের কণ্ঠ শুনলে মনে হতো, ওরা যেন কয়েকজন নয়। হাজার হাজার ছেলেমেয়ে সমবেত কণ্ঠে চিল্লাপাল্লা করছে।
বিষয়টি নিয়ে হেড স্যার মহা চিন্তায় পড়ে গেলেন। এই খবর বেশি দিন আর চাপা থাকলো না। একজনের মুখ থেকে অন্যজনের মুখে, একজনের কান থেকে অন্যজনের কানে; এভাবে একদিন পুরু এলাকায় চাউর হয়ে গেল। পরে লোকজন মজা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে দলবেঁধে এই স্কুলে আসতে শুরু করলো। পরিস্থিতি একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে, স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষে দর্শনার্থী সামলানো দায় হয়ে পড়লো।
স্কুলে লোক সমাগম যত বাড়তে লাগলো ছাত্রছাত্রী আক্রান্ত হওয়াও ততই বাড়তে লাগলো। প্রতিদিনই আটজন দশজন করে তারা আক্রান্ত হতে লাগলো। শেষের দিকে ব্যাপারটা এমন হলো যে, বেঞ্চে বসে ক্লাস করছে ছাত্রছাত্রী। হঠাৎ দেখা গেল, হাইবেঞ্চ থেকে একজন দুজন করে ছাত্রছাত্রী আপনাআপনি ঢলে পড়ছে। পরে তাদের নিয়ে শ্রেণিকক্ষে হইচই শুরু হয়ে যেতো।
এদিকে “বিদ্যালয়ে ভূতের আছর” শিরোনামে প্রতিদিনই কোনো না কোনো পত্রপত্রিকায় খবর আসতে লাগলো। দুয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলও ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রচার করলো। কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান হলো না।
এই যখন অবস্থাÑহেড স্যার একদিন একজন সাধককে নিয়ে স্কুলে হাজির হলেন। সাধকের নাম ইয়াছিন মোল্লা। তিনি নাকি ভূত-প্রেত সাধক। অনেক তন্ত্রমন্ত্র জানেন তিনি। ভূত-প্রেত নিয়ে নিয়মিত সাধনা করেন। ইয়াছিন মোল্লা প্রথমে মন্ত্র দিয়ে স্কুল ঘরটি বেঁধে ফেললেন। স্কুলের দরজায় মাটির পাত্রে কী সব মন্ত্র লিখে ঝুলিয়ে দিলেন।
ইয়াছিন মোল্লার মন্ত্র বলে হোক আর এমনি এমনি হোক, স্কুলটিতে ভূতের উৎপাত একদিন থেমে গেল। ছাত্রছাত্রী নিবিঘেœ স্কুলে আসা-যাওয়া শুরু করলো। এরপর থেকে স্কুলে কাউকে ভূত-প্রেতে আছর করেছে এমনটি কোনোদিন আর শোনা যায়নি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।