Inqilab Logo

ঢাকা, রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৮ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

দূষিত পানির রমরমা বাণিজ্য

| প্রকাশের সময় : ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

রাজধানীতে প্রতিদিন দূষিত জারজাত পানি বিক্রি হয় ১৫ কোটি লিটার : বিএসটিআই’র অনুমোদিত কারখানা দেড় শতাধিক : অবৈধ হাজার হাজার
নূরুল ইসলাম : পানি নিয়ে চলছে জমজমাট অবৈধ বাণিজ্য। রাজধানীতে ‘বিশুদ্ধ’র নামে বিক্রি হচ্ছে অপরিশোধিত ও দূষিত পানি। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই)-এর অনুমোদন ছাড়াই ভেজাল ও নকল কারখানায় অবাধে তৈরী হচ্ছে ‘বিশুদ্ধ’ নামের ড্রিংকিং ওয়াটার। বোতল ও জারে ভর্তি করে এসব ভেজাল ও নিম্নমানের দূষিত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে হোটেল, দোকান, অফিস-আদালতে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার একাধিক সিন্ডিকেট এই দূষিত পানি বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ পানি পান করে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। দীর্ঘদিন এক নাগাড়ে পান করায় অনেকেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।  
বিএসটিআই-এর তথ্য মতে, রাজধানীতে প্রতিদিন নানা ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানি বিক্রি হয় প্রায় পাঁচ কোটি লিটার। জারজাত মিনারেল ওয়াটার বিক্রি হয় ১৫ কোটি লিটার।  জারজাত পানির বেশিরভাগই নকল। রাজধানীর কয়েক কোটি মানুষ এ পানির ক্রেতা। নিরাপদ ভেবে মানুষ এসব জারজাত পানি কিনে পান করলেও প্রকৃতপক্ষে ঘটছে উল্টোটা। বিশুদ্ধ না হওয়ায় এই পান পানি করে বেশিরভাগ মানুষই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, পানি বাজারজাত করার জন্য রাজধানীতে দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আছে। অথচ রাজধানীতে জারজাত পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আছে কয়েক হাজার। বিএসটিআই-এর একজন কর্মকর্তা জানান, মিনারেল ওয়াটার উৎপাদন ও বাজারজাতের আগে নিজস্ব ল্যাবরেটরী, সুরক্ষিত সেপটিক ট্যাংক, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কেমিস্ট, শ্রমিকদের সুস্থতা, নিয়মিত টেস্টিং রিপোর্ট দেয়াসহ বিএসটিআই-এর ১৯টি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত দেয়া হয়। কিন্তু একবার অনুমোদন পেলে কেউই আর সেসব শর্ত মানে না। অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিএসটিআই-এর এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন। সে কারণে তারা আর নিবন্ধিত কারখানাগুলো পরিদর্শন ও বাজারজাতকৃত পানির নমুনা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা  করতে যান না। আবার নকল কারখানাগুলোর বিরুদ্ধেও বিএসটিআই নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে না একই কারণে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি যুগ যুগ ধরে জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে চলছে। ভুক্তভোগীরা মনে করেন, বিএসটিআই’র অভিযান অব্যাহত থাকলে পানিসহ সকল নকল পণ্যের দাপট কমবে। জানতে চাইলে বিএসটিআইয়ের একজন সহকারী পরিচালক জনবল সঙ্কটের কথা তুলে ধরে বলেন, বিএসটিআই-এর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, বিএসটিআই’র অভিযানের কারণেই কিন্তু ভেজাল ও নকলের তৎপরতা আগের চেয়ে অনেকটাই কমেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীজুড়েই এখন নকল পানির কারখানা। এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে নকল পানির কারখানা। আগে বিভিন্ন এলাকার অলি-গলিতে অনেকটা আড়ালে নকল পানির কারখানা চোখে পড়তো। এখন সবই ওপেন সিক্রেট। নকল জেনেও মানুষ যেমন এসব পানি কিনেই খাচ্ছে। জেনেশুনেও কেউ বাধা দেওয়ার সাহস করছে না। দিনের পর দিন চলছে এসব কারখানা। রাজধানীর কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, ডেমরা, ওয়ারী, ধানম-ি, কলাবাগান, সবুজবাগ, খিলগাঁও, সবুজবাগ, কোতয়ালী, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, বাড্ডা থানা এলাকায় খোঁজ নিয়ে কয়েকশ’ নকল পানির কারখানার তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানা এলাকায় রয়েছে শতাধিক কারখানা। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীর দনিয়া ও কদমতলীর পাটেরবাগে রয়েছে অর্ধশত কারখানা। দনিয়া বর্ণমালা স্কুলের পেছনে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানির ব্যবসা করছে একজন। তৃষ্ণা নামে ওই কোম্পানীর মালিক সরকারদলীয় সমর্থক বলে তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলে না। জানতে চাইলে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ওয়াসার মিটার রিডার সবই জানে। তিনিও নিয়মিত মাসোহারা পান বলে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ কিছুই জানতে পারে না। উত্তর দনিয়া, দনিয়া বাজার, পাটেরবাগ, কুদারবাজার, রসূলপুর, জিয়া সরণী, মেরাজনগর, রায়েরবাগ, কুতুবখালী, মীরহাজিরবাগ, দোলাইরপাড়, ডেমরা স্টাফ রোড, শ্যামপুর বৌবাজার, রাণীমহলসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ’ নকল পানির কারখানায় প্রতিদিন হাজার হাজার জার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, প্রতিটি কারখানার সাথে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের লেনদেন থাকে বলে পুলিশের চোখের সামনেই এসব পানি সরবরাহ করা হলেও পুলিশ কিছু বলে না।  
পুরান ঢাকার সদরঘাটে ওয়াসার পানি জারে ঢুকিয়ে প্রকাশ্যেই বিক্রি করা হয়। সদরঘাটের লঞ্চযাত্রীদের কাছে শুধু জারের পানি নয়, নকল বোতলজাত মিনারেল ওয়াটারও বিক্রি করা হচ্ছে প্রতিদিন। সূত্র জানায়, ব্যবহার করা প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সেই বোতলে ওয়াসার অপরিশোধিত পানি ঢুকিয়ে সেগুলো মিনারেল ওয়াটার বলে বিক্রি করছে। এসব পানি পান করে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কিন্তু দেখার যেনো কেউ নেই। ওয়ারীর গোপীবাগের মিতালী স্কুলের পাশেই রয়েছে একটি নকল কারখানা। স্থানীয় ছাত্রলীগের এক প্রভাবশালী নেতা ওই কারখানার মালিক বলে পুলিশও কিছু বলে না বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। মতিঝিলসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দোকান ও অফিসে এই পানি সরবরাহ করা হয়। বিএসটিআই সূত্র জানায়, গত এক বছরে রাজধানীতে দুই শতাধিক নকল কারখানাকে জরিমানা করেছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বহু কারখানা। কিন্তু তারপরেও নকল পানির ব্যবসা বন্ধ হয়নি। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, মানুষের শরীরে পানি দ্বারা সহজেই কোনো রোগ সংক্রমিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে দূষিত পানি পান করে মানুষ সহজেই টাইফয়েড, ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিসসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি শিশুদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে। বেসরকারি হিসাব মতে, প্রতিদিন গড়ে পাঁচ শতাধিক রোগী মহাখালী  আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি) হাসপাতালে ভর্তি হয়। এদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই ডায়রিয়া বা কলেরার রোগী। আবার ভর্তি হওয়া রোগীদের ৪০ শতাংশই শিশু। ডায়রিয়া বা কলেরা পানিবাহিত রোগ।
এদিকে, নকল পানি ব্যবসায়ীদের  দৌরাত্ম্যের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে ঢাকা ওয়াসার শত কোটি টাকার ‘শান্তি মিনারেল ড্রিংকিং ওয়াটার’ প্রকল্প। ওয়াসার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে এই প্রকল্পকে লাভজনক করতে পারতো। রহস্যজনক কারণে তাই শত কোটি টাকা ভেস্তে যেতে বসেছে। এই প্রকল্পকে লাভজনক করার জন্য নকল পানি কারখানাগুলো বন্ধ করা জরুরী বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।



 

Show all comments
  • আফজাল ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, ৯:১২ এএম says : 0
    এদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হোক।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দূষিত পানির

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ