Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮, ০৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

ভুমিকম্পের আশঙ্কা এবং আমাদের প্রস্তুতি

প্রকাশের সময় : ২০ জানুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১২:১৭ এএম, ২০ জানুয়ারি, ২০১৬

শিশির রঞ্জন দাস বাবু : ভোর ৫টা ৭ মিনিট। ৪ জানুয়ারি ২০১৬। কেঁপে উঠলো সারা বাংলাদেশ। ভ‚মিকম্পের রিখটার স্কেলে ৬.৮ তীব্রতা দেখা যায়। ঢাকা শহরের দালানগুলো কেঁপে-উঠলো। ঢাকা শহরের অধিবাসীরা প্রায় সকলে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ভারতের মনিপুরে। আতঙ্কে কয়েক জনের মৃত্যু এবং বিভিন্ন স্থানে আহত হন অনেকেই। ঢাকা থেকে ৩৫২ কিলোমিটার দূরে এই উৎপত্তিস্থল ছিল। ভারতের পূর্বাঞ্চল রাজ্য মনিপুরেও হতাহত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের জাতিসংঘের বিশ্বের যে ২০টি বড় শহরের উপর জরিপ চালায় তাতে দেখা গেছে ঢাকাই সবচেয়ে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা নগর। উত্তর পূর্ব ভারতের ভূমিকম্পে যে কোনো মুহূর্তে ঢাকা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকা ঢাকাকে বসবাসের অনুপযোগী বিশ্বের দ্বিতীয় শহর হিসেবেও চিহ্নিত করেছে। গোটা বাংলাদেশ-ই নানা প্রাকৃতিক বিপর্যের ঝুঁকির মুখে। তার মধ্যে প্রায় দেড় কোটি অধিবাসীর ঢাকা মহানগর গণমৃত্যুর কিনারে দাঁড়িয়ে আছে বললে বেশি বলা হয় না।
২০১০ সালের ১০ সেপ্টম্বর রাতে যে ভূমিকম্প ঢাকা মহানগরসহ বাংলাদেশের দক্ষিণের অনেক এলাকায় অনুভ‚ত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া তথ্যে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৮ এবং এর কেন্দ্রছিল ঢাকার ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে মতলবে। বাংলাদেশের ১৮টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের মাত্রা কেন্দ্র ও গভীরতা নির্ণয় করা হয়েছে। বলা হয়েছে ভূপৃষ্ঠের প্রায় নয় কিলোমিটার গভীরে এর উৎপত্তিস্থল। আমাদের জানামতে নয় কিলোমিটার গভীরে পলিমাটি থাকার কথা। ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়ার জন্য যে ধরনের ফল্ট বা চ্যুতি থাকার কথা তা থাকলেও থাকার কথা আরও গভীরে। সে বছর বিশ্বে বড় দুটি ভূমিকম্প হয়Ñপ্রথমে হাইতি ও পরে চিলিতে। বিশ্বে নিকট-অতীতের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হয় চিলিতে ১৯৬০ সালে। চাঁদপুরের যে এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে। সেটি থেকেও বড় কোন ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারে। ২০১১ সালের মার্চে জাপানে আঘাত হানা ৮-৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়। ভূমিকম্পটি ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ। এ ভূমিকম্পের প্রভাবে দেখা দেয় সুনামিতে প্রায় ১০ মিটার উঁচু জলোচ্ছ¡াসে ভেসে যায় জাপান। ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। প্রকৃতির এই ভয়ঙ্কর খেলায় জাপানে হাজার হাজার ভবন ভেঙ্গে পড়েছিল। ২১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার বসতির ধ্বংস হয়ে যায়।
গোটা-জাপান ডুবে যায় অন্ধকারে। ভূমিকম্প ও সুনামির আঘাতে জাপানের ফুকুশিমা পরমাণু বিদ্যুতকেন্দ্রে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে তেজস্ক্রিয়াতার মাত্রা ২০ ভাগ বেড়ে যায়। প্রকৃতির প্রলয় নাচন জাপান নামের দেশটিকে লÐভÐ করে দিয়ে মানুষের অসহায়ত্মকেই প্রকট করে তুলে। রাস্তাঘাটÑস্থাপনা ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটেছে। দুই প্লেটের ঘর্ষণজনিত কারণেই এই বিপর্যয়। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে দুটি প্লেটের মধ্যে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা চলছিল। প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটটা ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল ইউরোপীয় প্লেটের নিচে। ইউরোপীয় প্লেট তাতে বাধা দিচ্ছিল। ফলে সমুদ্রের তলদেশে দুই অংশের তৈরি হচ্ছিল শক্তি। এক সময় সেই শক্তি এতটাই জমেগেল যে, তাকে আর ধরে রাখা গেল না। সমুদ্রের তলদেশে সেই সঞ্চিত শক্তি একসঙ্গে নির্গত হলো। যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটকে এক ধাক্কায় ঢুকিয়ে দিল ইউরোপীয় প্লেটের তলায়। সমুদ্রের তলদেশে বাড়ল ফাটল। সৃষ্টি হলো রিখটার স্কেলে ৮.৯ তীব্রতার প্রচÐ ভূমিকম্প। সমুদ্র তলদেশে নির্গত বিপুল পরিমাণ শক্তি সমুদ্রের পানিকে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে নিচ থেকে উপরে তুলে আনলো। তীব্রগতিতে বিপুল শক্তি নিয়ে সেই পানি অছড়ে পড়ল জাপানের উপক‚লে। এটাই সুনামি। সমুদ্র দানব সুনামি নামের উৎপত্তি জাপানেই। সুনাম অর্থ বন্দর নামি অর্থাৎ ঢেউ। যদিও তার ধ্বংসকাÐ বন্দর ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের উপকূলে দুই দফায় ৮.৬-৮.১ মাত্রায় ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, ভারতসহ ২৮টি দেশে-সুনামি সতকর্তা জারি করা হয়। তষনও ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল ঢাকাসহ সারাদেশ। এর মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩.৮। গত মাসে ৫ দফা ভূমিকম্প অনুভ‚ত হয়েছে। ২৫ এপ্রিল ২০১৫ নেপালে ভূমিকম্প হয়, তখনও এর তীব্রতা ঢাকা শহরে অনুভূত হয়েছে। এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৭শ’ কিলোমিটার দূরে। নেপালের ভূমিকম্পে ১০ হাজারের বেশি লোক মারা যায়। বহু স্থাপনা বিধ্বস্ত হয়। চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয় দেশটিতে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ঘিরে সংগঠিত ১৯টি ভূমিকম্পের রেকর্ড করা হয়েছে। যার মধ্যে দুটি ছাড়া সব কয়টিই রিখটার স্কেলে ৪ থেকে ৫.৪ মাত্রার। অন্য দুটি ৪ মাত্রার নিচে। এ ১৯টির মধ্যে চারটিরই উৎপত্তিস্থল দেশের অভ্যন্তরে। বাকিগুলোর উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায়। এগুলোর সবই বাংলাদেশ ভারত অঞ্চলে বড় কোন ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বহন করে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। চাঁদপুর তিনটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি স্থল হওয়ায় ঢাকার জন্য তা বেশি বিপজ্জনক। সর্বশেষ ৭ দশমিক ৪ মাত্রার বড় ভূমিকম্প অনুভ‚ত হয় ১৮১৮ সালে। এটি শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প নামে পরিচিত। সিলেট অঞ্চলের রশিদপুর পাহাড়ি অঞ্চল সংযুক্ত ফাটল রেখা এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল।
বাংলাদেশের বড় ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হলো শ্রীমঙ্গল, মধুপুর ও বগুড়ার ভূগর্ভের ফল্ট-সিস্টেম বা চ্যুতি। তবে মারাত্মক ভূমিকম্প হলে তা আসবে ভারত-ভুটান ও নেপাল থেকে। যেখানে ৯ অথবা ৯ দশমিক ৫ মাত্রায় ভূমিকম্প হলে ঢাকায় তা ৭ অথবা ৮ মাত্রার কম্পন হিসেবে অনুভ‚ত হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক জরিপে দেখা গেছে ঢাকার ৫৩ শতাংশ ভবন দুর্বল অবকাঠামোর ওপর স্থাপিত। ৪১ শতাংশের ভর কেন্দ্র নড়বড়ে। ৩৪ শতাংশের খাম ও কলাম দুর্বল। সরকারের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি ঢাকার সাড়ে তিন লাখ ভবনের দুই লাখই ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ বলে বলা হচ্ছে। বাংলাদেশে নগরের জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি ও নগরায়ন হচ্ছে দ্রæতগতিতে ঢাকায় ২০১৬ সালে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ প্রায়। ১৯৯৩ সালে আমাদের দেশে বিল্ডিং কোড প্রণীত হয়েছে। কিন্তু কোড মেনে ভবন তৈরি করার প্রবণতা সীমিত। সরকারি পর্যায়েরও যথেষ্ট তদারকি নেই। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ বিশ্বের যে বিশটি বড় শহরের ওপর জরিপ চালায়। তাতে দেখা গেছে ঢাকাই সবচেয়ে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা নগরী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ছিল বড় ধরনের দুর্যোগের আগে একটি সতর্কবার্তা। ভারতের আসাম, মনিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুনাচল, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খÐ, পশ্চিমবঙ্গসহ ১১টি রাজ্য ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ঢাকায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ১০ শতাংশ ভবন ধসে পড়বে। ফলে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। দেশে ৭ থেকে সাড়ে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে অন্তত ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন গত ভূমিকম্পে যে কম্পন অনুভূত হলো এতে ভূকম্পনের জন্য দায়ী চ্যুতিশক্তির খুবই সামান্য শক্তি বের হয়েছে। এ অঞ্চলে স্থানচ্যুতির পুরো শক্তি ভেতর থেকে বের হয়নি। যা আরো বড় ধরনের ভূমিকম্পের হওয়ায় আশঙ্কা তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ভূমিকম্প নিয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি খুবই দুর্বল। তাদের মতে বাংলাদেশে ভূমিকম্প হলে ক্ষতিগ্রস্ত ৭০ হাজার ভবনের ধ্বংসস্ত‚প সরানোর মতো প্রশিক্ষিত জনবল নেই। ২০০৫ সালে সেনাবাহিনীর এজন্য ৪শ’ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনার সুপারিশ করা হয়েছিল। তা কাটছাট করে ১২০ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায়। কাজেই এখানে ভূমিকম্প হবেই। তাই ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন হওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ন বন্ধ করা, ভূমিকম্প পরবর্তী-জরুরি উদ্ধার ও অনুসন্ধান প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। সরকারকে সব উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টিকে যুক্ত করতে হবে। সময় বদলে যাচ্ছে। জীবন বাঁচাতে এখনই বড় আকারের উদ্যোগ হাতে নিতে হবে। সম্প্রতি ভূমিকম্পে এ ব্যাপারে আমাদের সজাগ না করলে এ আশঙ্কা দিন দিন বাড়বে। তাই এখনই নগরদুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও সমন্বিত এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী গতিশীল করা সময়ের দাবি। এ জনদাবি পূরণে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সজাগ দৃষ্টি দিবেÑএটাই জাতির প্রত্যাশা।
ষ লেখক : কলামিস্ট ও সদস্য, বাংলা একাডেমি



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ