Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইফতেখার আহমেদ টিপু : বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা অভিবাসীদের জন্য দুর্দিন ডেকে এনেছে। দুনিয়ার অনেক দেশ নিজেদের নাগরিকদের রুটি-রুজির স্বার্থে অভিবাসীদের দরজা বন্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
গত এক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার যে কালো স্রোত বইছে অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের আশীর্বাদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার কুফল খুব একটা অনুভূত হয়নি। দেরিতে হলেও মন্দার কালো স্রোত বাংলাদেশের জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের অভিবাসী আয়ের বড় অংশ আসে তেল উৎপাদনকারী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। তেলের দামে ধস নামায় এসব দেশের অর্থনীতি মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। যার পরিণতিতে সংকুচিত হয়ে পড়ছে অভিবাসীদের কাজের ক্ষেত্র। আগের চেয়ে কম বেতনেও তারা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে চলতি বছর গত বছরের চেয়ে ১ লাখ ৩৩ হাজার বেশি লোক বিদেশের শ্রমবাজারে কাজ পেলেও অভিবাসী আয় কমে গেছে উদ্বেগজনকভাবে। অভিবাসীদের আয় হ্রাস পেলেও তাদের বিদেশে যাওয়ার খরচ কমেনি। এ ক্ষেত্রে সরকার ঘোষিত ফি আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। এ মুহূর্তে বিশ্বের ১৬১টি দেশে বাংলাদেশের এক কোটি মানুষ কর্মরত। অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত পেতে সাহায্য করছে তেমন জাতীয় অগ্রগতির সোপান নির্মাণেও তারা রেখেছেন অনবদ্য ভূমিকা। বিদেশে বাংলাদেশ থেকে অদক্ষ কর্মী হিসেবে যারা গেছেন তাদের এক বড় অংশ দক্ষ শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন নিজেদের যোগ্যতা বলে। বিদেশ থেকে অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অনেকে দেশে ফিরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের মুখ দেখাতে সক্ষম হয়েছেন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবি রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা গেছে, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চতুর্থ মাস অক্টোবরে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ ২৭১ কোটি ২৮ লাখ (২ দশমিক ৭১ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে, যা গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে ১৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি। এটা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৩ শতাংশ বেশি। পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন বলছেন, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকায় রপ্তানি আয় বাড়ছে।
আগামী মাসগুলোতেও এ ‘ধারা’ অব্যাহত থাকার প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, বছর শেষে গত অর্থবছরের মতো চলতি বছরেও রপ্তানি আয়ে ১০ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হবে। তবে বিশ্ববাজারে আমাদের তৈরি পোশাকের দাম কমে যাওয়ায় তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বেশি পণ্য রপ্তানি করে কম আয় হচ্ছে।
গত জুলাইয়ে গুলশানে জঙ্গি হামলার পর ক্রেতাদের মধ্যে যে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল তা কেটে গেছে বলেও মনে করছেন অর্থনীতির গবেষক জায়েদ বখত। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে আর কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেনি। সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বায়ারদের মধ্যে যে শঙ্কা ছিল সেটা কেটে গেছে। রাজনীতিতেও স্থিতিশীলতা রয়েছে। এ সব কিছুরই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে রপ্তানি আয়ে।
ইপিবির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বাংলাদেশ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে এক হাজার ৭৯ কোটি ১৬ লাখ ডলার (১০ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে। এরমধ্যে ৮২ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে।
এই চার মাসে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে, ৪৫৩ কোটি ৫১ লাখ (৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন) ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে উভেন পোশাক। এই খাত থেকে আয় হয়েছে ৪২৮ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। এখানে প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। মূলত তৈরি পোশাকের উপর ভর করেই জুলাই-অক্টোবর সময়ে রপ্তানি আয়ে সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে নিট পোশাকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় ২ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়লেও উভেন পোশাকে ১৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৩ কোটি (১০ দশমিক ১৩ বিলিয়ন) ডলার।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বলেন, বাংলাদেশ যতো কম দামে ভালো মানের পোশাক রপ্তানি করে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ তা পারে না। সে কারণে যতো বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন আমাদের রপ্তানি আয় বাড়বেই। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ তিন হাজার ৪২৫ কোটি ৭২ লাখ (৩৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন) ডলার আয় করে, যা ছিল আগের অর্থবছরে চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য ধরা হয় ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
অন্যান্য খাতের আয় তৈরি পোশাকের মতো চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে, ১৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এই খাত থেকে মোট আয় হয়েছে ৩৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। জুতা রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ২০ শতাংশ। তবে ফিনিশড লেদার রপ্তানি কমেছে দশমিক ৩২ শতাংশ।
হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। এই অর্থ আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। জুলাই-অগাস্ট সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে ২৯ কোটি ৬২ লাখ ডলার আয় হয়েছে। এই অংক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি। এই চার মাসে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। তবে কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে। হোম টেক্সটাইল রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
পরিশেষে বলছি, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি অন্ধকারের মধ্যে আশার আলো হিসেবে বিরাজ করছে। এ ক্ষেত্রে সাফল্য পেতে হলে প্রশিক্ষিত কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর দিকে নজর দিতে হবে। এটি সম্ভব হলে কমসংখ্যক লোক পাঠিয়েও বেশি রেমিট্যান্স অর্জন সম্ভব হবে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স আয়ের পুরোটা যাতে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আসে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। হুন্ডি বা অন্য মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠানোর যে প্রবণতা অভিবাসীদের মধ্যে রয়েছে তা নিরুৎসাহিত করতে নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ।
ষ লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক নবরাজ



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।