Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।
শিরোনাম

নির্বাচন কমিশন নিয়ে বছরজুড়ে ছিল আলোচনা-সমালোচনা

| প্রকাশের সময় : ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

হাবিবুর রহমান : কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ২০১৬ সালের প্রায় পুরো সময়টাতেই নানা কারণে আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে ছিল। সমালোচনার ঝড় শুরু হয় দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে হওয়া স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে। কারণ দলীয় প্রতীকে হওয়া এই নির্বাচনের বিধি সংশোধনে  কোনো রাজনৈতিক দলের মতামত নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। তবে বছর শেষে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন করে পেছনের সমালোচনা অনেকটাই আড়াল করে প্রশংসা কুড়িয়েছে ইসি। তবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে যে স্বস্তি ও শান্তি এসেছিল, তা মøান করে দিয়েছে জেলা পরিষদ নির্বাচন। দেশের প্রথম জেলা পরিষদ নির্বাচনটি নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের চেয়েও ঢের বেশি উৎসাহ-উদ্দীপণা ও জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বাইরে কোনো দলের অংশগ্রহণ না থাকায় তা হলো না। ফলে এটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচনে পরিণত হয়েছে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হতে চলা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে শেষ ভোট হয়ে গেল ২৮ ডিসেম্বর বুধবার দেশের ৬১ জেলা পরিষদে। বিএনপিসহ বিরোধী সমমনা সব দলের বাইরে শুধু আওয়ামী লীগ মনোনীত ও বিদ্রোহীদের মধ্যে এ ভোটেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি জোটের বর্জনের মধ্য দিয়ে দশম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এর আগে-পরে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ মিলিয়ে ডজনখানেক নির্বাচন হয়েছে তাদের অধীনে। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আমরা অনেকগুলো নির্বাচন করেছি। কিছু কিছু স্থানে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি কিছু স্থানে গুটিকয়েক পকেট আছে, যার কারণে সেই স্থানে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে একটু সমস্যাসঙ্কুল হয়ে যায়। আমি আশা করব, ভবিষ্যতে সবাই সচেতন হবেন। সবাই সচেতন হলেই সামনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব।
কাজী রকিব বলেন, নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং দুষ্কৃতকারীদের কঠোর হাতে মোকাবেলা করতে হয়। দুষ্কৃতকারী ইজ অ্যা দুষ্কৃতকারী। সে কোনো দলের সদস্য হতে পারে না। সব রাজনৈতিক দল আমাদের বলেছেÑ দুষ্কৃতকারীরা আমাদের কেউ না, সর্ট দেম আউট। আমরাও তাদের সর্ট দেম আউট করে দেবো। সিইসি কাজী রকিব নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার কৃতিত্ব দিয়েছেন প্রার্থী ও সমর্থকদের। এ নজরে দেখে নিই ২০১৬ সালে কমিশনের কর্মকা-গুলো দেখেনি জনগণ। নানা  আলাচনা-সমালোচনায় ছিল বর্তমান নির্বাচন কমিশন।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন
দেশে চার হাজার ৫৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। দলীয় প্রতীকে ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত হওয়া স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলেও এবার প্রথম দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এতে শুধু চেয়ারম্যান পদে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ভোট হয়েছে। আর নতুন এ সংযোজনের সঙ্গে যুক্ত হয় সহিংসতা ও কারচুপির নতুন রেকর্ড, যা নির্বাচন কমিশনকে সমালোচনার মুখে ফেলে। ভোটে ১৮টি দল অংশ নিলেও মূল লড়াই হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। ছয় ধাপে চার হাজারের মতো ইউপিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় সবগুলো ইউপিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকলেও ৬০০ এর মতো  ইউপিতে প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি।  চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ছয় ধাপে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। ইসির ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ২২ মার্চ ৭৩৯টি, দ্বিতীয় ধাপে ৩১ মার্চ ৭১০টি, তৃতীয় ধাপে ২৩ এপ্রিল ৭১১টি, চতুর্থ ধাপে ৭ মে ৭২৮টি, পঞ্চম ধাপে ২৮ মে ৭১৪টি এবং ষষ্ঠ ধাপে ৪ জুন ৬৬০টি ইউপিতে ভোট গ্রহণের কথা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে সেখান থেকে বেশকিছু বাদ দিতে হয়। যেগুলোতে পরবর্তিতে নির্বাচন  অনুষ্ঠিত হয়।
আর দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত এ ভোটেকেন্দ্র দখল, সহিংসতা ও কারচুপির ঘটনা ঘটে। যা নিয়ে সব মহলই ইসির সমালোচনা করে। সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে  অনেকেই। ভোটগ্রহণে অনিয়ম ও সহিংসতার কারণে ৩৪৬টি কেন্দ্রের ভোট বন্ধ হয়েছিল। তফসিল ঘোষণার পর থেকে শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ পর্যন্ত এ নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয় ১০৫ জন, (সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন)। আহত হয় কয়েক হাজার। যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। ইউপি নির্বাচনের ইতিহাসে ১৯৮৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সবচেয়ে খারাপ বলে আখ্যায়িত করা হতো। ওই নির্বাচনের সব ধরনের নেতিবাচক রেকর্ড ভঙ্গ করেছেন বর্তমান ইসি। সে সময় এক দিনে সারা দেশে নির্বাচন করায় সহিংসতা বেশি হয়েছিল। তখন মারা গিয়ে ছিলেন ৮০ জন ও আহত হয়েছিলেন পাঁচ হাজারের বেশি।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী নির্বাচনের নিহতের পাশাপাশি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ারও  রেকর্ড গড়েছে। এবারের নির্বাচনে ২২০ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৮৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির ওই নির্বাচনে ১০০ জন চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য এ বছর কয়েকটি পৌরসভায়ও ভোটগ্রহণ করে ইসি। সেগুলো নিয়েও মুটামুটি আলোচনায় ছিল কমিশন।
ভোট দিয়েছে মৃত ব্যক্তিরাও
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার ঘটনায় হতবাক হয়েছে খোদ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যা নিয়ে কমিশনকে সমালোচনায় পড়তে হয়েছে। চলতি বছর ৭ মে চতুর্থ ধাপের ইউপি ভোটে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় অবিশ্বাস্য-উদ্ভট এই ঘটনা ঘটেছে। মাঠপর্যায় থেকে ইসিতে পাঠানো ফলাফল বিশ্লেষণ করে এর সত্যতাও মিলেছে। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে, ভোট প্রদানের তালিকায় মৃত ব্যক্তির নামও রয়েছে, এমন ব্যক্তিরাও ভোট দিয়েছে।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চরআড়ালিয়া ইউপির ৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে দু’টিতে শতভাগ ভোট, একটিতে ৯৯ দশমিক ৯০, আরেকটি কেন্দ্রে ৯৭ দশমিক ৭২ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর প্রতিকার চেয়ে ও ফলাফল বাতিলের দাবি জানিয়ে ওই ইউপির পরাজিত প্রার্থী  মো: হাসানুজ্জামান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের বরাবর লিখিত আবেদন করলে তদন্ত করে পরে সেই ফলাফল বাতিল করে কমিশন।
সংসদের দুই আসনে উপ-নির্বাচন
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট- ধোবাউড়া) ও ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনে উপ-নির্বাচন করে ইসি। গত ১৮ জুলাই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। গত ১১ মে ময়মনসিংহ-১ আসনের সরকার দলীয় এমপি ও সাবেক সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন মৃত্যুবরণ করায় এবং গত ২ মে ময়মনসিংহ-৩ আসনের সরকার দলীয় এমপি ডা. মজিবুর রহমান ফকির মৃত্যুবরণ করায় আসন দু’টি শূন্য হয়।
নির্বাচনী প্রশিক্ষণে সিইসির অসন্তোষ
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) কাজে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। ইসির সাবেক সচিব মো: সিরাজুল ইসলামকে লেখা ইউও (আন অফিসিয়াল) নোটে সিইসি বলেন, ইটিআইয়ের প্রশিক্ষণের বর্তমান মান সন্তোষজনক নয়। প্রশিক্ষণের পরিমাণ ও গুণগত উভয় ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে যা দ্রুত সময়ের মধ্যে উন্নত করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের কী কী বিষয়ে বর্তমানে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং আরো কী কী বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন তার বিশদ বর্ণনা করে একটি কার্যপত্র প্রস্তুত করা হোক। পাঠ্যক্রম এবং প্রশিক্ষকদের সক্ষমতা উন্নয়ন, অন্যান্য প্রশিক্ষণ সংস্থার সাথে যোগাযোগ এবং প্রদত্ত প্রশিক্ষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি  এর সম্ভাবনার বিষয়েও কার্যপত্রে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।
আম মার্কা নিয়ে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্ব
২০০৮ সালের ১৩ নভেম্বর ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টি-এনপিপির আম প্রতীক নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয়। নিবন্ধনকালে দলটির চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু ও মহাসচিব অ্যাডভোকেট ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। ২০১৪ সালের ১৬ আগস্ট চেয়ারম্যান নিলু বহিষ্কার করেন মহাসচিব ফরহাদকে; ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেন মুক্তিযোদ্ধা  মো: আব্দুল হাই ম-লকে। পরে ১৮ জুলাই চেয়ারম্যান নিলুর সভাপতিত্বে এনপিপি  প্রেসিডিয়াম সভা করে। নতুন কমিটি নিয়ে ওই বছরের ২২ অক্টোবর জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে অনুমোদন করে ইসিতে তালিকা পাঠান নিলু।
অন্য দিকে গত বছরের ১৪ অক্টোবর তৎকালীন মহাসচিব ফরহাদ নিজেকে চেয়ারম্যান ও  মো: মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাকে মহাসচিব করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। এ সময় শওকত হোসেন নিলুকে বহিষ্কার সংক্রান্ত কাগজপত্রসহ নতুন কমিটি ইসিতে তালিকা পাঠায়। সেই সঙ্গে ২০১৪ সালের ১৯ জুলাই এনপিপির এ অংশের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কার্যকর কমিটির সভার কার্যবিবরণী যুক্ত করে দলীয় প্রতীক ‘আম’ দাবি করে ফরহাদ। দুই দলের দাবির প্রেক্ষিতে শুনানির করে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপির নির্বাচনী প্রতীক আম  শেখ শওকত হোসেন নিলুর পক্ষকে দেয়ার সিদ্ধান্ত  দেয় কমিশন।
জাসদের মশাল নিয়ে সমস্যা
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ)  মশাল প্রতীক দলটি দুই পক্ষ কমিশনের ধারস্থ হয়। গত ১২ মার্চ সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে শিরীন আখতারকে সাধারণ সম্পাদক করা নিয়ে দুই ভাগ হয় জাসদ। হাসানুল হক ইনু ও শিরীনের কমিটির পাশাপাশি পাল্টা কমিটি গঠন করেন মইনুদ্দিন খান বাদল, শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধান এবং তাদের অনুসারীরা। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে ১৩ এপ্রিল ইনু-শিরীন নেতৃত্বাধীন জাসদকে মূলধারা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২৮ এপ্রিল তাদের মশাল প্রতীক দেয় নির্বাচন কমিশন।
বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর ভোটাধিকার প্রয়োগ
২০১৬ সালের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো ছয় দশক পর বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের  ভোটাধিকার প্রয়োগ। ৩১ অক্টোবর ২২টি ছিটমহলবাসী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। গত বছর বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নানা বঞ্চনার অবসান হয় ছিটবাসীদের। বাংলাদেশের ৫১টির বিনিময়ে ভূখ-ের মধ্যে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের বাসিন্দা পায় বাংলাদেশের  নাগরিকত্ব। এর আগে ১০ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ অংশে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকার কাজ শুরুহয়। ১৭ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তদের ছবি  তোলা, ১ আগস্ট ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তদের খসড়া ও ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। এ বছর সেখানে সাড়ে ১০ হাজারের মতো ছিটবাসী  ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হন।
ইভিএম  তৈরির উদ্যোগ
এ বছর নিজস্ব উদ্যোগে নতুন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) তৈরির উদ্যোগ নিয়ে কমিশন। আর এ জন্য ১৯ সদস্যের  টেকনিক্যাল কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। ইসির প্রস্তাবিত নতুন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এর কারিগরি ও ব্যবহারিক দিক, নির্বাচনে ব্যবহারের উপযোগিতা, সুবিধা-অসুবিধা ইত্যাদি পর্যালোচনার জন্য  টেকনিক্যাল কমিটি’ গঠন করা হয়। টেকনিক্যাল কমিটিতে একজন উপদেষ্টা, একজন আহ্বায়ক, একজনকে সদস্য সচিব করে বাকিদেরকে সদস্য করা হয়েছে। বুয়েটের সহযোগিতায় ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আংশিক ভোটের মাধ্যমে ইভিএম চালু হয়। পাঁচ বছরের মাথায় সেগুলোর কয়েকটি বিকল হয়ে পড়ে। ইভিএমে  দেশীয় ব্যাটারি’ ব্যবহার নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে দ্বন্দ্ব শুরু হয় বুয়েটের সঙ্গে। বুয়েট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ওই ব্যাটারি ব্যবহারের কারণেই ইভিএমগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না।
স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম
অবশেষে নাগরকিদের হাতে উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্টকার্ড) তুলে দেয়া মধ্য দিয়ে স্মার্টকার্ড যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের ২ অক্টোবর স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৩ অক্টোবর থেকে আইরিশের প্রতিচ্ছবি এবং দশ আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে ঢাকা এবং কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত সিটমহলে  স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে ইসি। বর্তমানে ঢাকা সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে এটি বিতরণের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশের সকল নাগরিকের হাতে এটি তুলে  দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদি এ সময়ের মধ্যে সকল নাগরিকের হাতে স্মার্টকার্ড তুলে দিতে পারবে কিনা সে বিষয়ে অনেক ইসি কর্মকর্তার মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকের হাতে এতোদিন লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ছিল। তবে সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীরা ভোটার হয়েই স্মার্টকার্ড পেয়েছেন।
ইসিতে নতুন সচিব
৫ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের বিসিএস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর মুহাম্মদ আবদুল্লাহকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অপর দিকে ইসি সচিব মো: সিরাজুল ইসলামকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। ।
লতিফ সিদ্দিকীর আসনে উপ-নির্বাচন হয়নি এ বছরও
হজ ও তাবলীগ জামাত নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ বহিস্কার হওয়ার পাশাপাশি সংসদ সদস্য পদ হারান। ফলে আইন অনুযায়ী টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতি) আসন শূন্য হলে ওই আসনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। সেখানে গত বছরের ১০ নভেম্বর ভোট গ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ আসনের উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেন লতিফ সিদ্দিকীর ভাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। কিন্তু যাচাই বাছাইয়ে ঋণখেলাপির অভিযোগে কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরে কাদের সিদ্দিকী ইসিতে আপিল করে। শুনানি শেষে ইসি রিটার্নিং কর্মকর্তার রায় বহায় রেখে তার আবেদন খারিজ করে দেন। পরে কাদের সিদ্দিকী উচ্চ আদালতে গেলে আদালত প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু ইসি ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে আদালত নির্বাচনে স্থগিতাদেশ দেন। যার ফলে গত বছর আর এ আসনে নির্বাচন করতে পারে নি ইসি। সেই জটিলতায় এ বছর সেখানে নির্বাচন করতে পারল না সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।
আদালত অবমাননার অভিযোগ নিঃশর্ত ক্ষমা চান সিইসি কাজী রকিব
নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়া সিইসি কাজী রকিব কমিশন নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গত ৩১ মার্চ চাঁদপুরের হাইমচরের চর ভৈরবী ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৭ এপ্রিল  নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এক প্রার্থী জাহিদুল ইসলাম পুনরায় ভোট চেয়ে ইসিতে আবেদন করেন। ওই আবেদনে নির্বাচন চলাকালে ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভোট গ্রহণে অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়। জবাবে ২৩ এপ্রিল ইসির পক্ষ থেকে এক চিঠিতে জাহিদুলকে জানানো হয়,  গেজেট হওয়ার পর ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে। কিন্তু জাহিদুল পুনরায় আরো কিছু কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ২২ মে ইসিতে ফের আবেদন করেন। এ আবেদনের জবাব না  পেয়ে জাহিদুল ১৫ জুন তার আবেদনের নিষ্পত্তির নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন।  হাইকোর্ট রুল জারি করে ৩০ দিনের মধ্যে জাহিদুলের আবেদন নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ  দেন। এর কিছুদিন পরে জাহিদুল হাইকোর্টে আরো একটি আবেদন করে। যাতে বলা হয়, আদালতের নির্দেশ মতে, ইসি ৩০ দিনের মধ্যে তার আবেদন নিষ্পত্তি করেনি। এ আবেদনের পর ৭ আগস্ট হাইকোর্ট প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে রুল জারি করেন।
দলীয় প্রতীকে প্রথম সিটি নির্বাচনের ভোট
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে স্থানীয় সরকারের সিটিতে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ভোট হয়। আর এই সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে কমিশন প্রথমবারের মতো সর্ব মহলের প্রসংশা পায়। এ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ইসির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এটিকে ইসির বড় সফলতা ভাবছেন বিভিন্ন মহল। এ নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রাথী আইভী রহমান বিজয় লাভ করে আর বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হন।
বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ছাড়াই জেলা পরিষদ নির্বাচন
বিএনপি ও জাতীয় পাটিসহ বিভিন্ন রাজনীতিক দল ছাড়াই গত ২০ নভেম্বর তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১ জেলায় জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। গত বুধবার ২৮ ডিসেম্বর সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয়ে ছিল। এ নির্বাচনে জেলা প্রশাসকরা রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার ও জেলা নির্বাচন অফিসাররা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কোথাও কোথাও উপজেলা নির্বাচন অফিসারকেও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা করা হয়। প্রতিটি জেলায় স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের ভোটেই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচিত হয়। প্রতিটি জেলায় ১৫ জন সাধারণ ও পাঁচজন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য থাকবেন। এ হিসেবে স্থানীয় সরকারের চার ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ হাজারের উপরে  ভোটার ছিলেন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকের মূল্যায়ন
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ ইনকিলাবকে বলেন, এই কমিশন পাঁচ বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছিল। এ কমিশনের  মেয়াদে তার অনেকগুলো নির্বাচন উপহার দিনেছেন। যেগুলোর মোটাদাগে বেশির ভাগ সবার কাছে এক্সেপ্টেবল হয়েছে। তাদের মেয়াদের শুরুতে এবং শেষে। মাঝখানে কিছু তাদেরকে আয়োজন করতে হয়েছিল একটা এক্সট্রা অর্ডিনারি সারকন্সট্রাকশনের মাধ্যমে যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নির্বাচন কমিশন

১৬ নভেম্বর, ২০১৬

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ