Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

ইংরেজি নববর্ষ ভাবনা

| প্রকাশের সময় : ১ জানুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম : বাংলাদেশে তিনটি সন প্রচলিত রয়েছে। হিজরি, বাংলা এবং ইংরেজি এই তিনটে সনের নববর্ষ আসে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। হিজরি নববর্ষ আসে জিলহজ মাসের সূর্য অস্ত গেলে ১ মহররমের চাঁদ উদয়ের মাধ্যমে, বাংলা নববর্ষ সূচিত হয় পহেলা বৈশাখের সূর্য উদিত হবার মধ্য দিয়ে আজ ইংরেজি নববর্ষ সূচিত হয় ৩১ ডিসেম্বর রাত বারোটায় প্রচ- শীতের চাদর মুড়ি দিয়ে। হিজরি নববর্ষ ও বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের মানুষকে যেমন ব্যাপক জানান দিয়ে আসে তেমন জানান দিয়ে আসে না ইংরেজি নববর্ষ। ২০১৬ কে বিদায় দিয়ে ২০১৭ ইংরেজি সন শুরু হয়েছে। ২০১৬ বিদায় নিয়েছে অনেক ঘটনার সাক্ষ্য রেখে। মুসলিম বিদ্বেষী সা¤্রাজ্যবাদী চক্র ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি চালিয়ে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে ছিন্ন করতে বিশেষভাবে তৎপর ছিলেন। মুসলিম দুনিয়ায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে যেন তাদের আনন্দ। সৌদি আরবকে উস্কানি দিয়ে ইয়েমেনের উপর বিমান হামলা তার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। সিরিয়ায় অস্থিরতা ও নিধন যজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। মুসলিমবিদ্বেষী ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বানিয়ে তারা আনন্দ উৎসব পালন করছে অথচ হিলারি ক্লিনটন ৩০ লক্ষ ভোট পেয়েও পরাজিত হয়েছেন। এ যেন দিনেদুপুরে ডাকাতি। মুসলিমবিদ্বেষী মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের উপর অমানুষিক জুলুম চালাচ্ছে। তাদের জোর করে বহিষ্কার করছে, এমন সব ঘটনায় ভরপুর ছিল ২০১৬।
ইংরেজি সনের মাসগুলোর অধিকাংশই দেবতার নামে। শুধুমাত্র স¤্রাট জুলিয়াস সীজারের নামকরণ করা হয় জুলাই মাসকে এবং স¤্রাট অগাস্টাসের নামে হয় ৩১ অগাস্ট মাস। রোমান রণদেবতা মার্স-এর নামে হয় মার্চ মাস। বাংলা সন প্রবর্তন করেন স¤্রাট আকবর। সুলতানী আমল কি মোগল আমলে রাষ্ট্রীয় কাজ-কর্ম, আদান-প্রদান ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে হিজরি সনই প্রচলিত ছিল। অবশ্য স¤্রাট আকবরের সময় ঋতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তায় হিজরি সনকে সৌর গণনায় এনে একটি রাজস্ব বা ফসলি সনের প্রবর্তন করা হয়।
স¤্রাট আকবরের নির্দেশে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে আমীর ফতেহ্উল্লাহ সিরাজী স¤্রাট আকবরের মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বছর ৯৬৩ হিজরি মোতাবিক ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের নির্দিষ্ট তারিখ থেকে হিসাব করে হিজরি সনকে সৌর গণনায় এনে যে সনটি উদ্ভাবন করেন সেটাই আমাদের দেশে বাংলা সন নামে পরিচিত হয়। হিজরি সনের বছরের হিসাব ঠিক রেখেই এর মাসগুলো নেয়া হয় শকাব্দ থেকে। বৈশাখ মাসকে স্থির করা হয় বছরের প্রথম মাস।
১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের পর থেকেই স¤্রাট আকবরের ফরমানবলে রাজত্বের রাজস্ব আদায়ের সন হিসেবে তা প্রচলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে হিজরি সনের সৌরকরণ পঞ্জিকাটি ব্যাপকভাবে গৃহীত ও সমাদৃত হয় যা একান্তভাবে বাংলার মানুষের নিজস্ব সন হিসেবে স্থান করে নিতে সমর্থ হয়। আর এখানে ইংরেজি সন এলো সেই ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পরাধীনতার শেকল পরিয়ে। একটা জিনিস লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে কিন্তু এখন পর্যন্ত ইংরেজি সনের গ্রহণযোগ্যতা তেমন একটা নেই। আবার শহর জীবনে বাংলা সনের ব্যবহার নেই বললেই চলে। অবশ্য শহুরে জীবন কি গ্রামীণ জীবনে হিজরি সনের প্রচলন সমানভাবে বর্তমান। বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও সংহতির অন্যতম অবলম্বন এই হিজরি সন। আর এই হিজরি সন থেকে উৎসারিত বাংলা সন আমাদের জাতীয় জীবনে নিজস্বতার বৈভব এনে দিয়েছে।
মানুষ আদিকাল থেকেই কোনো না কোনোভাবে দিন-ক্ষণ, মাস-বছরের হিসাব রাখতে প্রয়াসী হয়েছে চাঁদ দেখে, নক্ষত্র দেখে, সূর্য দেখে, রাত-দিনের আগমন-নির্গমন অবলোকন করে, ঋতু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করে। সাধারণ কোনো বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিন গণনা, মাস গণনা, বছর গণনার রীতি কালক্রমে চালু হয়েছে। তিথি, নক্ষত্র বিশ্লেষণ করার রীতিও আবিষ্কার হয়েছে, উদ্ভাবিত হয়েছে রাশিচক্র। চাঁদের হিসাব অনুযায়ী যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা চান্দ্র সন নামে পরিচিত লাভ করে। এই চান্দ্র সনে বছর হয় মোটামুটি ৩৫৪ দিনে আর সূর্যের হিসাবে যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা সৌর সন নামে পরিচিত হয়। সৌর সনের বছর হয় মোটামুটি ৩৬৫ দিনে। আমাদের দেশে ইংরেজি তথা গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার যে ব্রিটিশ বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানী আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করে আমাদের উপর গোলামীর জোয়াল চাপিয়ে দেয়, সেই ব্রিটিশ এই ক্যালেন্ডার তাদের দেশ গ্রেট ব্রিটেনে চালু করে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে। তারা যেখানেই তাদের উপনিবেশ স্থাপন করেছে সেখানেই তারা তাদের পোশাক-আশাক, শিক্ষা-দীক্ষা, প্রশাসনিক কাঠামো, সংস্কৃতি যেমন চাপিয়ে দিয়েছে, তেমনি তাদের ক্যালেন্ডারটিও দিয়েছে, তারা প্রভু সেজে বসেছে আর নেটিভদের বানিয়েছে মোস্ট অবিডিয়েন্ট সারভেন্ট। এর থেকে কি আমরা নিজেদের উদ্ধার করতে পারব না? বল বীর/বল উন্নত মম শির/শির নিহারি আমারি নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির- এই বীরত্বব্যঞ্জক উচ্চারণ কি শুধু আমাদের জাতীয় কবির কবিতায় আবৃত্তির জন্য অনুরণিত হতে থাকবে, নাকি আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ঝংকৃত হবে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখতে পারি না?
লেখক : মুফাসসিরে কোরআন, গবেষক, সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।