Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯, ০৫ চৈত্র ১৪২৫, ১১ রজব ১৪৪০ হিজরী।

শ্রমবাজারে অশনি সঙ্কেত

প্রকাশের সময় : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:৩২ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

শামসুল ইসলাম : স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশসহ অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি থেকে অভিবাসী কর্মী নেয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে মালয়েশিয়া সরকার। মালয়েশিয়া সরকারের ঘোষণা এমন সময়ে এলো যখন বাংলাদেশ থেকে অনলাইনের মাধ্যমে নতুন করে কর্মী নেয়ার ব্যাপারে জিটুজি প্লাস সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার অভিবাসী কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত ঘোষণা করায় বাংলাদেশী কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের মাঝে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। দেশটিতে অবৈধ অভিবাসী কর্মীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। শিগগিরই মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন পুলিশ অভিযান চালিয়ে অবৈধ অভিবাসী কর্মীদের আটক করে নিজ নিজ দেশে পাঠাবে। গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় পূর্ব মালয়েশিয়ার কোতাকিনাবালু মোয়ারা তুয়াং আর্মি ক্যাম্পে সেনা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক শেষে মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতো শ্রী ড. আহমদ জাহিদ হামিদী অভিবাসী কর্মী নেয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫ লাখ কর্মী নেয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় মালয়েশিয়ায় একশ্রেণীর তামিল ও স্থানীয়দের মধ্যে হৈচৈ শুরু হয়। মালয়েশিয়া থেকে একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।  
বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ কর্মী নেয়ার বিষয়ে জিটুজি প্লাস সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাত্র এক দিনের মাথায় এ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা দিলেন মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতো শ্রী ড. আহমদ জাহিদ হামিদি। দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা ‘বার্নামা’ এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার সারওয়ার্ক-এর কোতাকিনাবারুতে দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে বৈঠক শেষে মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শিল্প মালিকদের স্থানীয় কর্মীদের নিয়োগ দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। আর অবৈধ বিদেশি কর্মীদের আটক করা হবে এবং নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি আশা করেন, মালয়েশিয়া বিশেষত দেশটির তরুণরা সরকারের সিদ্ধান্তে সাড়া দেবেন এবং বিদেশিদের কাছে থাকা কাজগুলোতে নিজেরা অংশ নিয়ে দেশের অর্থনীতির বৃদ্ধিতে অবদান রাখবেন। এদিকে বৃহস্পতিবার ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী দাতো শ্রী রিচার্ড রায়ত জায়েম পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ার সমঝোতা স্মারকে সই করেন। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির লক্ষ্যে উভয় দেশের মধ্যে জিটুজি প্লাস চুক্তি স্বাক্ষরের এক দিন পরেই মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত ঘোষণা করায় ‘বাচ্চা জন্মের আগেই হত্যার’ শামিল বলে উল্লেখ করেছেন বায়রার সভাপতি মোঃ আবুল বাসার। বায়রার সভাপতি আবুল বাসার গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের চুক্তির এক দিন পরেই নিয়োগের বিষয়টি স্থগিত করা খারাপ দিক। যদিও বিষয়টি মালয়েশিয়ার আভ্যন্তরীণ বিষয়। বায়রা সভাপতি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে অশনি সংকেত ছাড়া কিছুই নয়। তিনি বলেন, জিটুজি প্লাস চুক্তির মধ্য দিয়ে বিদেশ গমনেচ্ছুদের মাঝে একটা আশার আলো দেখা দিয়েছিল। বায়রা সভাপতি বলেন, মালয়েশিয়ায় স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী যাওয়া শুরু হলে দেশের বেকার সমস্যা দূর হতো এবং রেমিটেন্সের গতি বাড়ত।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের মার্চ মাস থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। সরকারি সর্বোচ্চ কূটনৈতিক উদ্যোগের পর ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে মালয়েশিয়ায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় শুধু প্লানটেশন খাতে জিটুজি প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে উভয় দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। জিটুজি প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে সারাদেশে থেকে দু’দফায় প্রায় ২২ লাখ কর্মীর নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্ত জিটুজি প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে গত ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯ হাজার ৮৯২ জন কর্মী জিটুজি প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়া গেছে। ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনের বিএমইটি’র মালয়েশিয়া সেল  পূর্ব মালয়েশিয়ার সারওয়ার্ক অঞ্চলের প্লানটেশন খাতে কর্মী নিয়োগের জন্য ৫ হাজার কর্মীর চাহিদাপত্র প্রেরণ করলেও মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে অদ্যাবধি কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ইতিপূর্বে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মালয়েশিয়ার সারওয়ার্ক অঞ্চলের জন্য ১২ হাজার কর্মী নিয়োগের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। মালয়েশিয়ার সারওয়ার্ক অঞ্চলের প্লানটেশন খাতে এসব কর্মী প্রেরণের কথা ছিল। জিটুজি’র  আওতায় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে সারওয়ার্ক অঞ্চলে প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার কর্মী যাওয়া শুরু হবে বলে কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের তৎকালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, ২০০৭ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ২ লাখ ৭৩ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। ২০০৮ সালে ১ লাখ ৩১ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় গিয়েছিল। ইতিপূর্বে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রত্যেক কর্মী আড়াই লাখ থেকে তিল লাখ টাকা ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় যেত। ওই সময়ে অনেক কর্মী মালয়েশিয়ায় কাজ না পেয়ে রাস্তায় রাস্তায় অনাহারে-অনিদ্রায় দিন কাটিয়েছিল। তবে পরে তাদের অনেকেই দেশে ফিরে এজেন্সির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলাও দায়ের করেছিল। আবার অনেকেই সেদেশে কর্মসংস্থান লাভ করে এখন ভালো অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী নিয়োগ বন্ধ থাকায় মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু শত শত কর্মী দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে সাগরপথে যাত্রা করে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। মালয়েশিয়ায় চাকরি নামের সোনার হরিণ ধরার জন্য সাগরপথে যাত্রা করে দালাল চক্রের হাতে অমানুষিক নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে বহু পরিবারের সন্তান পথে বসেছে। ২০১৪ সনে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় উদ্দেশ্যে যাত্রা করে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার গভীর জঙ্গলে অনেকেরই গণকবরে স্থান হয়েছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ইতিপূর্বে মালয়েশিয়ায় গিয়ে জিটুজি’র পাশাপাশি বি-টু-বি (বিজনেসম্যান টু-বিজনেসম্যান) প্রক্রিয়ায় কর্মী প্রেরণের জন্য মালয়েশিয়া সরকারের সাথে চূড়ান্ত সমঝোতা করে আসেন। গত ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় উভয় দেশের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ‘বিটুবি’র পরিবর্তে ‘জিটুজি’ সংস্কার করে ‘জিটুজি প্লাস’ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় আটকে যায় ‘জিটুজি প্লাস’ প্রক্রিয়া। অবশেষে ৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত ‘জিটুজি প্লাস’ চুক্তির খসড়ায় অনুমোদন দেয়া হয়।  
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাসিক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ২০ লাখ শ্রমিককে বৈধতা দেয়ার ঘোষণা দেন। অবৈধ কর্মীদের বৈধতা দেয়ার ঘোষণা দেয়ায় মালয়েশিয়ায় প্রবাসী অবৈধ বাংলাদেশী কর্মীদের মাঝে আশার আলো দেখা দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে জাহিদ হামিদি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় এ মুহূর্তে ২০ লাখ অনিবন্ধিত বিদেশি শ্রমিক রয়েছেন। বেশিরভাগ মালিকই চান এসকল শ্রমিক মালয়েশিয়ায় কাজ করুক। ফলে বিষয়টি আমলে নিয়ে আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করছি। এখন মালিকরা এজেন্ট ছাড়াই নিজেদের শ্রমিকদের অনলাইনের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে পারবেন।’ তিনি বলেন, ‘দালালদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নতুন এই অনলাইন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। আগে দালালরা শ্রমিকদের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যেত। এর ফলে নিবন্ধিত শ্রমিকের সংখ্যা না বাড়ায় সরকার কর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জিটুজি প্লাস চুক্তির এক দিন পরেই অভিবাসী কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত ঘোষণা করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরস্থ ভেস্ট মাকেটিং এসডিএনবিএইচডি-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুহুল আমিন। গতকাল রাতে কুয়ালালামপুর থেকে টেলিফোনে প্রবাসী ব্যবসায়ী রুহুল আমিন ইনকিলাবকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ কর্মী নিয়োগ শুরু হবে Ñ এ খবরের পর মালয়েশিয়ায় একশ্রেণীর তামিল ও স্থানীয় ব্যক্তিরা হৈচৈ শুরু করেছে। এ জন্য উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতো শ্রী আহমদ জাহিদ হামিদী বাংলাদেশসহ বিদেশী কর্মী আমদানীর সিদ্ধান্ত স্থগিত ঘোষণা করেছেন। তিনি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন। মালয়েশিয়ার সারওয়ার্ক থেকে প্রবাসী ব্যবসায়ী জাইদী গতকাল টেলিফোনে জানান, উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতো শ্রী আহমদ জাহিদ হামিদী পূর্ব মালয়েশিয়ার আর্মি ক্যাম্পে সেনা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক শেষে বাংলাদেশসহ বিদেশী কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছেন। মালয়েশিয়ায় অবৈধ কর্মীদের বৈধতা দেয়া এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ও অবৈধদের নিজ নিজ দেশে পাঠানোর পরেই দেশটি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করবে। তিনি সম্ভাবনাময় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর জন্য সরকারের ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।



 

Show all comments
  • Tamanna ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:৫২ পিএম says : 0
    ai bapare sorker er bises vabe nojor dea uchit
    Total Reply(0) Reply
  • তুষার ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:৫২ পিএম says : 0
    এর জন্য দায়ি কে ??????????????????????
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ