Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

ঝুঁকি বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে

| প্রকাশের সময় : ৪ জানুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম


৮ বছরে ডুবেছে ছোট বড় ২০টি কার্গো জাহাজ
রফিকুল ইসলাম সেলিম : একের পর এক জাহাজ ও নৌযান ডুবির ফলে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে ঝুঁকি বাড়ছে। গত বছর বন্দর চ্যানেলের আশপাশে ১২টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে চারটি দুর্ঘটনায় ডুবেছে বেশ কয়েকটি ছোট জাহাজ।
বাকি ৮টি সংঘর্ষের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ১৬টি জাহাজ। বন্দর চ্যানেলের আশপাশে ও বহির্নোঙরে গত ৮ বছরে ডুবেছে লাইটারেজ, ট্যাংকারসহ ছোট বড় ২০টি জাহাজ- যার বেশিরভাগ এখনও উদ্ধার হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের মূল চ্যানেলে জাহাজ না ডুবলেও ডুবে থাকা জাহাজগুলো কর্ণফুলী নদীর নাব্যতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে। ডুবে থাকা জাহাজের সাথে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
কোন নৌযান ডুবলে বন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষকে নোটিশ দেয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মালিকপক্ষ নিমজ্জিত জাহাজটি উদ্ধার না করলে তা পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। বন্দর চ্যানেলে ডুবে থাকা জাহাজ বন্দর কর্তৃপক্ষ উদ্ধার করে। কিন্তু চ্যানেলের বাইরে ডুবে থাকা জাহাজ নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ খুব একটা আগ্রহ দেখায় না।
এসব দুর্ঘটনায় গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। দুর্ঘটনা রোধে কমিটি দায়ীদের শনাক্ত এবং কারণ খুঁজে দুর্ঘটনা রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে দফায় দফায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব সুপারিশ আমলে নেওয়া হয় না। ফলে দুর্ঘটনাও কমছে না।
অতিরিক্ত গতি, চালকদের ওভারটেক করার মনোভাব, অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই, দক্ষ লোকবল সঙ্কটের কারণে জাহাজ দুর্ঘটনা ঘটছে। বেশির ভাগ জাহাজে প্রশিক্ষিত নাবিক না থাকার কারণেই মূলত নৌ-দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া নাবিকদের নেভিগেশন ও সেইফটি বিষয়ে ধারণা না থাকাও দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত আট বছরে কর্ণফুলীর মোহনা, বহির্নোঙর ও চ্যানেলে ২৫টি ছোট বড় লাইটারেজ জাহাজ ডুবে গেছে। এগুলোর বেশিরভাগই ডুবে রয়েছে চ্যানেলসহ সন্নিহিত এলাকায়। গত বছরের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের রিভার মুরিং (আরএম) এলাকায় এমটি শবনম-৪ এর সঙ্গে এমটি রাশেদ এন্টারপ্রাইজ জাহাজের সংঘর্ষ হয়।
ওই ঘটনায় নৌ-বাণিজ্য দফতরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার শেখ জালাল উদ্দিন গাজিকে আহ্বায়ক এবং নাবিক ও প্রবাসী শ্রমিক কল্যাণ পরিদফতরের পরিচালক জসিম উদ্দিন পাটোয়ারিকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। একই বছরের ৭ মার্চ বহির্নোঙ্গরে দুটি জাহাজের মাঝখানে পড়ে খান এন্ড সন্স-১ নামে একটি লাইটারেজ জাহাজ ডুবে যায়। ঠিক এক মাস পরে ৭ এপ্রিল কর্ণফুলী নদীর ১৫ নম্বর ঘাট এলাকায় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে জাহাজে পানি ঢুকে এমভি আল বখতিয়ার-১ নামে আরেকটি জাহাজ ডুবে যায়।
২১ মে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে এমভি বাংলার শিখার সঙ্গে এমভি গাগাসান জোহার নামে আরেকটি জাহাজের সংঘর্ষ হয়। ১৭ জুন ইন্দোনেশিয়ার পতাকাবাহী এমভি মেরাতুস মিদান-৫ জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বের হওয়ার সময় এমভি আল আবরার, এমভি হিযবুল ওহাব, এমভি আল ইনসান, এমভি বর্ষণ-৩, এসএস ডেলপিনাসকে আঘাত করে। একই মাসের ৩০ জুন এমটি পারটেক্স-৩ এর সঙ্গে ওটি বেঙ্গল স্পিড-১ এর সংঘর্ষ হয়।
ওটি টিআর শাহ আমানতের সঙ্গে এমভি সাইফুর রহমানের সংঘর্ষ হয় ৭ জুলাই। দুইদিন পর ৯ জুলাই সংঘর্ষ হয় এমটি আরজুর সঙ্গে এমটি মার্কেন্টাইল-১৯ এর। ১১ নভেম্বর সংঘর্ষ হয় এমভি সামিরের সঙ্গে এমভি গাজির। ১৪ ডিসেম্বর একই দিনে ডুবে যায় এমভি ল্যাবস-১ ও এমভি মজনু।
২০০৮ সালের ২০ আগস্ট ৬০০ টন সিমেন্ট নিয়ে ‘এমভি হ্যাংজাউ’ জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যায় শ্রীলংকার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি ভাদুলি ভ্যালি’। এর পরের দিন একইভাবে ৬০০ টন সার নিয়ে বন্দরের বহির্নোঙরে ডুবে যায় লাইটার জাহাজ ‘এমভি হাবিবুর রহমান’।
একই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ডুবে যায় সার বোঝাই লাইটারেজ জাহাজ ‘এমভি বেঙ্গল ব্রিজ’। ২০০৯ সালের ২৩ জানুয়ারি নিমজ্জিত জাহাজের ধাক্কায় ৯০০ টন গম নিয়ে ‘এমভি প্রিন্স অব মধুর খোলা-২’ এবং ২১ এপ্রিল ‘এমভি সেভেন সার্কেল-২’ জাহাজ ডুবে যায়। ওই বছরের ৭ মে চ্যানেলের মাঝামাঝি জায়গায় ডুবে যায় সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী ‘এমভি টিটু-৯’ নামের আরেকটি জাহাজ। ১১ জুলাই বন্দরের জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে জিপসাম বহনকারী জাহাজ ‘এমভি মডার্ন’ ডুবে যায়।
এমভি সেন্টি ভ্যালিয়েন্ট জাহাজ থেকে এমভি খান সন্স-১ নামের একটি লাইটার জাহাজে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল জিপসাম স্থানান্তর করা হচ্ছিল। এ সময় কাছাকাছি থাকা এমভি গ্রেট সিনারি নামের আরেকটি বড় জাহাজ এসে ধাক্কা দেয় লাইটার জাহাজটিকে। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুবে যায় সেটি।
১৪ ডিসেম্বর একদিনেই মাত্র ঘণ্টা কয়েকের ব্যবধানে ডুবে যায় চারটি জাহাজ। এরমধ্যে দুটি সন্দ্বীপের অদূরে বঙ্গোপসাগরের ভাসানচর এলাকায়, একটি কর্ণফুলী নদীর মোহনায় এবং অন্যটি পতেঙ্গো সৈকতের কাছে ডুবে যায়। কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছে ১ ও ৩ নম্বর বয়ার মাঝখানে ডুবে যাওয়া জাহাজটি বন্দর চ্যানেলে ডুবলে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। চ্যানেলের সন্নিকটে এই ঘটনা ঘটলেও ভাগ্যক্রমে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায় চট্টগ্রাম বন্দর।
বন্দর সূত্র জানায়, শক্তিশালী ক্রেন না থাকায় তাৎক্ষণিক উদ্ধার কাজ চালানো যায় না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিমুক্ত রাখা যাচ্ছে না বন্দর চ্যানেল ও বহির্নোঙ্গর। বন্দর চ্যানেলে বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা ঘটলে অচল হয়ে যেতে পারে চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ চট্টগ্রাম বন্দরকে গতিশীল রাখতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ