Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬, ১৪ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

বিপজ্জনক হানিফ ফ্লাইওভার

| প্রকাশের সময় : ৮ জানুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারটি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার কারণে এটি এখন মরণ ফাঁদে হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ফ্লাইওভারটিতে কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে এবং মানুষ হতাহত হচ্ছে। গত দুই বছরে এর বিভিন্ন পয়েন্টে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১০ জন মারা গেছে। আহত হয়েছে আরও বেশ কয়েকজন। গত শুক্রবারও দুটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। সকালে ফ্লাইওভারের সায়েদাবাদ প্রান্তে বাস থেকে নেমে অন্য পাশে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয় এক তরুণী। তাকে একটি মোটরসাইকেল ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। আর নিমতলী পয়েন্টে একটি মাইক্রোবাস দুমড়ে-মুচড়ে দেয় একটি প্রাইভেট কারকে। এতে কয়েকজন আহত হয়। ফ্লাইওভারে এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ এর উপর অবৈধভাবে বাস স্টপেজ তৈরি করা। পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিমতলী থেকে যাত্রাবাড়ির কতুবখালি পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটির দুই পাশে অবৈধভাবে ১০-১২টি বাস স্টপেজ রয়েছে। এসব বাস স্টপেজে যাত্রীরা বাস থেকে নামার সময় এবং রাস্তা পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। ফ্লাইওভারে এ ধরনের অনাচার এবং দুর্ঘটনা ঘটে চললেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বিষয়টি দৃষ্টিতে আনলে করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ তাদের কাজ নয় বলে এড়িয়ে যান।
রাজধানী থেকে নির্বিঘেœ প্রবেশ ও নির্গমন মসৃণ করার জন্য হানিফ ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করা হয়েছে। স্বল্প সময়ে পার হয়ে যাওয়ার জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। দুঃখের বিষয়, যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে, তা এখন পদে পদে ব্যাহত হচ্ছে। এটি একটি বিশেষায়িত ব্যবস্থা হলেও সাধারণ সড়কের মতো যেমন খুশি তেমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর উপর কোনো ধরনের যানবাহন থামার সুযোগ নেই। থামলেই অবধারিতভাবে দুর্ঘটনা ঘটবে। দেখা যাচ্ছে, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বাস চালকরা উপর্যুপরি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। মানুষও হতাহত হচ্ছে। এ নিয়ে বহু লেখালেখি করা হলেও সিটি করপোরেশনের কোনো টনক নড়েনি। সংশ্লিষ্টরা চরম উদাসীনতা দেখিয়ে চলেছে এবং ফ্লাইওভারটিকে বিপজ্জনক করে তুলছে। ফ্লাইওভারটি করা হয়েছে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায়। এক্ষেত্রে প্রকল্পের নকশায় কোনো ধরনের পরিবর্তন ও পরিমার্জন করতে চাইলে তা পার্টনারশিপের অনুমতিতে করতে হবে। এতে অপরিকল্পিতভাবে নকশা পরিবর্তন ও স্থাপনা তৈরি করা যাবে না। এটা সুস্পষ্টভাবে এগ্রিমেন্টে উল্লেখ রয়েছে। এর জন্য সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব বেশি। অথচ দেখা যাচ্ছে, ফ্লাইওভারের উপরে ১০-১২টি স্থানে বাস-বে বা স্টপেজ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ফাত্রীদের ফ্লাইওভারে উঠা-নামার জন্য অন্তত ৫টি স্থানে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। ফ্লাইওভারের র‌্যাম্পগুলোর সংযোগস্থলে স্থাপিত এসব সিঁড়ি দিয়ে যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়েই উঠা-নামা করছে। এছাড়া ফ্লাইওভারের প্রবেশমুখেও বাস থামিয়ে যানজট সৃষ্টির মাধ্যমে প্রবেশ পথে ব্যাঘাত ঘটানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আগে লোকাল ও ফিটনেসবিহীন বাস ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে চলাচল করলেও ফ্লাইওভারে বাস স্টপেজ সৃষ্টি করায় এগুলো এখন উপর দিয়ে চলাচল করছে। অর্থাৎ যে লক্ষ্যে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে, তা পুরোপুরি ব্যাহত করা হচ্ছে। নিচের সড়কের সমস্যা উপরে ফ্লাইওভারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নিচের সড়কের নিত্যকার দৃশ্য এখন ফ্লাইওভারে দেখা যাচ্ছে। বাস থামছে, যাত্রীরা উঠা-নামা করছে, দৌড়ে রাস্তা পার হচ্ছে এবং দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। তাহলে এই ফ্লাইওভার নির্মাণ করে কী লাভ হলো? ফ্লাইওভারে যদি বাস স্টপেজ রাখার প্রয়োজনীয়তা থাকত, তাহলে তা নকশায় থাকা উচিত ছিল। ২০০৬ সালে যখন এর নকশা তৈরি করা হয়েছিল, তখন বাস-বে রাখার কথা বলা হয়েছিল। তখন তা করা হয়নি। করা হলে হয়তো, প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটত না। তা না করার ফলে এখন যা হচ্ছে তা হলো, নকশাবহির্ভূতভাবে বাস স্টপেজ সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনা যে ঘটবে, তা অবধারিত এবং ঘটছেও। ফ্লাইওভারে এমন অনিয়ম আর কোথাও আছে কিনা, আমাদের জানা নেই। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এই অনিয়ম দেখেও না দেখার ভান করছে সিটি করপোরেশন। এর ফলে যে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে এবং আহত-নিহত হচ্ছে, এ নিয়ে কোনো ধরনের অনুশোচনা প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। দায়িত্বশীল একটি প্রতিষ্ঠান এমন অনুভূতিহীন কী করে হতে পারে, তা আমাদের বোধে আসছে না।
বিশ্বের সর্বত্রই ফ্লাইওভার মানেই হচ্ছে, দ্রুতগতিতে পথ অতিক্রম করা। এখানে থামাথামির কোনো সুযোগ নেই। সাধারণত ফ্লাইওভার একমুখী ও মসৃণ হওয়ায় যানবাহনও দ্রুতগতিতে পার হয়। এর সামনে কোনো বাধা পড়লে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটা অবধারিত। রানিং ফ্লাইওভারে কোনো ধরনের স্টপেজ করা ঝুঁকিপূর্ণ। দুই লেনের ফ্লাইওভারে এই স্টপেজ করা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যখনই একটি গাড়ি থেমে থাকবে, তখন দ্রুত গতির গাড়ির জন্য তা বাধা সৃষ্টি করবেই। দুর্ঘটনাও ঘটবে। সবচেয়ে বড় কথা, ফ্লাইওভারে বাস স্টপেজ করা মূল নকশায় তো নে-ই, তা করারও কোনো সুযোগ নেই। যা করা হয়েছে পুরোটাই নকশাবহির্ভূত এবং অবৈধ। আমরা মনে করি, অবিলম্বে এসব বাস স্টপেজ বন্ধে ফ্লাইওভার কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বাস স্টপেজ এবং এতে উঠার জন্য যেসব সিঁড়ি করা হয়েছে, তা অপসারণ করতে হবে। ফ্লাইওভারের নকশার সাথে সঙ্গতিহীন বাস স্টপেজের সাথে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের অনিয়মের কারণে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটবে ও প্রণহানি হবে, তা কোনোভাবেই বরাদশতযোগ্য নয়। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, হানিফ ফ্লাইওভারের সাথে যারাই সম্পর্কিত তাদের এ ব্যাপারে সিরিয়াস হতে হবে। এটিকে কোনোভাবেই মরণফাঁদে পরিণত করা যাবে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন