Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

আসহাবে কাহফের গুহায় মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.)

| প্রকাশের সময় : ২০ জানুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

কে এস সিদ্দিকী : ‘আসহাবে কাহফ’-এর ঘটনার পূর্ণ বিবরণ কোরআনুল করিমে রয়েছে। একই সাথে আসহাবে ‘রাকীম’- এর কথাও বলা হয়েছে। আসহাবে রাকীম সম্পর্কে কোরআনের তফসিরকারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে ওহাব ইবনে মোনাবে (রহ.)-এর একটি বর্ণনার উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাকে নোমান ইবনে বশীর আনসারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রাকীম সম্পর্কে বলতে শুনেছি যে তিনি বলেছেন : তিন ব্যক্তি তাদের গৃহবাসীদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে বের হয়ে যায়। পথে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়, তারা বৃষ্টি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটি গুহায় প্রবেশ করে। তীব্র বারিপাতের ফলে পাহাড় হতে একটি বিরাট খ- পতিত হলে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে তাদের বের হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
ভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.), আমাদেরকে পূর্ববর্তী উম্মতগণের বিস্ময়কর ঘটনাবলির কোনো একটি আজব ঘটনা বর্ণনা করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন : প্রাচীন যুগে তিন ব্যক্তি সফরকালে কোথাও যাচ্ছিল। যখন রাত হয়ে যায়, একটি গুহায় তারা অবস্থান করে। রাতের কিছু অংশ আতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর পাহাড় হতে একখানা পাথর গড়িয়ে পড়ে এবং গুহার মুখ বন্ধ হয়ে তাদের বের হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনাটি গুহার কাহিনী নামে বিশ্বস্ত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যার বিবরণ নি¤œরূপ :
গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লোকগুলো খুবই বিচলিত হয়ে পড়ে এবং পরস্পর বলাবলি করতে থাকে যে, এ অবস্থা থেকে মুক্তিলাভ করা কঠিন ব্যাপার, বড় জোরে এবং শক্তিবলে আমরা এত বড় পাথর হঠাতে পারব না, তবে একটি উপায় অবলম্বন করলে এ অবস্থা থেকে মুক্তি সম্ভব এবং তা হচ্ছে এই যে, আমরা নিজেদের ভালো কাজগুলোর কথা উল্লেখ করে সেগুলোর ওসিলায় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি এবং তাঁর সাহায্য কামনা করি।
তাদের একজন বলল: আমার পিতা-মাতা জীবিত ছিল, আমার জাগতিক মাল-সম্পদের মধ্যে কয়েকটি বকরি ছিল। আমি তাদেরকে এসব বকরির দুধ পান করাতাম। আমি প্রতিদিন জঙ্গল হতে কাঠ সংগ্রহ করে কাঠের বোঝা বাজারে নিয়ে বিক্রি করতাম এবং তার মূল্য দিয়ে পিতামাতার জন্য খাবার কিনে আনতাম। এক রাতে আমি বিলম্বে ঘরে পৌঁছি এবং বকরিগুলোর দুধ দোহন করে তাতে খাবার মিশিয়ে পাত্রভর্তি করে তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য নিয়ে যাই, ততক্ষণে তারা আমার অপেক্ষা করে ঘুমিয়ে পড়েন। আমি তাদের জাগ্রত করা এবং কষ্ট দেওয়া উচিত মনে করলাম না এবং খাবারের পাত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এ অবস্থায় ভোর হয়ে যায়। এমন কি আমারও খাওয়া হলো না। পিতা-মাতা জাগ্রত হওয়ার পর প্রথমে আমি তাদের খাওয়ালাম এবং পরে আমি খেলাম। এতটুকু বলার পর লোকটি আরজ করল : ‘হে পরওয়ারদেগার! আমার এ কাজটি যদি তোমার দরবারে কবুল হয় এবং মর্যাদারযোগ্য হয়, তাহলে পাথরখানা গুহা হতে সরিয়ে দাও।’ এ নিবেদনের পরপরই পাথরখানা নড়ে উঠল এবং গুহা হতে সামান্য সরে গেল।
অতঃপর দ্বিতীয় ব্যক্তি তার কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে বলল : ‘আমার চাচার একটি কন্যা ছিল। তার অপূর্ব সৌন্দর্য ও রূপগুণে আমি আসক্ত হয়ে পড়ি। আমি কয়েকবার তাকে আমার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করি, কিন্তু সে অসম্মতি জানায়। একবার আমি তার নিকট একশ কুড়ি দিনার প্রেরণ করি আমার ইচ্ছা পূরণের জন্য। সে আমার কাছে আসে। আমি যখন তার নিকটবর্তী হই। তখন আমার অন্তরে খোদার ভয় জাগ্রত হয় এবং আমি তার সাথে সম্পর্ক-যোগাযোগ ছিন্ন করি এবং তাকে যেসব দিনার প্রদান করেছিলাম, সেগুলোও ফেরত চাই এবং ফেরত পাই। লোকটি আল্লাহর দরবারে আরজ করে : ‘হে পরওয়ারদেগার! আমার এ কাজ তোমার দরবারে কবুল ও পছন্দ হলে তুমি ওই পাথরখানা গুহা হতে হটিয়ে দাও।’ তৎক্ষণাৎ পাথর নড়ে ওঠে এবং পূর্ব থেকে অধিক ফাটল দেখা দেয়, কিন্তু এত বেশি নয় যাতে বের হওয়া যায়।
অতঃপর তৃতীয় ব্যক্তি বলল, আমার কাছ থেকে মজদুরগণ নিজ নিজ মজদুরি উসুল করে নেয়। এরপর একজন মজদুর বিনা কারণে হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়। আমি তার প্রাপ্য অর্থ দ্বারা একটি বকরি ক্রয় করি। দ্বিতীয় বছর বকরির সংখ্যা দুই হয়ে যায়। তৃতীয় বছর এ সংখ্যা চার হয়ে যায়। চতুর্থ বছর সাত-আট হয়ে যায়। এভাবে প্রতিবছরই বকরির সংখ্যা বাড়তে থাকে। কয়েক বছর পর এগুলো বিরাট সম্পদে পরিণত হয়ে যায় এবং সেই মজদুরও উপস্থিত হয়ে পড়ে। সে বলে যে, আমি এক বছর তোমার মজদুর ছিলাম, আমাকে সে সময়কার পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে, যা আমার প্রয়োজন। আমি তাকে বললাম এ সমস্ত বকরি ও মাল সম্পদের তুমিই মালিক, এগুলো তুমি নিয়ে যাও এবং যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার কর। মজদুর বলল, আমার সাথে মশকরা কর না এবং আমার মজদুরি আমাকে প্রদান কর। আমি বললাম, আমি তোমার সাথে কোনোই মশকরা করছি না, বরং সত্য কথা বলছি যে, তুমিই এসকল সম্পদের প্রকৃত মালিকÑ এ কথা বলেই আমি তার সামনে সকল সম্পদ উপস্থিত করি এবং সে এগুলো নিয়ে চলে যায়। এ ঘটনা শুনিয়ে সে আরজ করে : পরওয়ারদেগার! আমার এ কাজ যদি তোমার নিকট কবুল হয় এবং তুমি তা পছন্দ কর তাহলে এ পাথরকে তুমি গুহার মুখ হতে এমনভাবে সরিয়ে দাও যাতে আমরা বের হতে পারি। রাসূলুল্লাহ বলেন, তৎক্ষণাৎ ওই পাথর সেখান হতে অর্থাৎ গুহা হতে আলাদা হয়ে যায় এবং ওই তিনজনই বের হয়ে নিজ নিজ গৃহের পথ ধরে।
ঘটনার বর্ণনাকারী হজরত নোমান ইবনে বশীর (রা.) বলেন যে, এ হাদিসটি বর্ণনা করার সময় আমার এমন মনে হচ্ছিল যেন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জবান মোবারক হতে বাক্যগুলো শুনছিলাম।
‘হাদিসুল গাড়’ বা গুহার কাহিনীকে আসহাবে কাহফের কাহিনীর সাথে কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে এবং দুটি ঘটনাই আলাদা এবং স্বতন্ত্র কিন্তু কোরআনে আসহাবে কাহফের বিস্তারিত বিবরণ থাকলেও আসহাবে রাকীমের বিবরণ নেই। তবে হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ‘রাকীম’ সম্পর্কে বিভিন্ন তফসিরে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা স্থান পেয়েছে, যা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়।
রাকীম সম্পর্কে কিছু কথা বলে রাখা দরকার। স্থানটির অবস্থান কোথায় তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাকীম আম্মান ও ইলা এর মধ্যবর্তী ফিলিস্তিনের নিকট একটি উপত্যকার নাম এবং স্থানই হচ্ছে আসহাবে কাহফের সমাধিস্থল (যেখানে তারা শায়িত)। কাবুল আহবার বলেন যে, রাকীম হচ্ছে আসহাবে কাহফের শহরের নাম। হজরত সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন যে, রাকীম অর্থ মরকুম অর্থাৎ লিখিত সেই ফলকের নাম, যাতে আসহাবের কাহফের নামগুলো খোদাই করে সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রাকীম একই জামাতের দুটি উপাধি। গুহায় অবস্থানের কারণে আসহাবে কাহফ বলা হয় এবং যেহেতু তাদের নাম পরিচিতি একটি ফলকে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এ জন্য তাদের আসহাবে রাকিম বলা হয়েছে। বোখারি শরিফে হাদিসুল গাড় শিরোনামে তিন ব্যক্তির বিবরণ প্রদত্ত হয়েছে, যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ‘কাসামুল কোরআন’ তৃতীয় খ-ে মওলানা হিফজুর রহমান ‘আসহাবুল কাহফে ওয়ার রাকীব’ শিরোনাম দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বহু মূল্যবান তথ্য বিবরণ এতে রয়েছে। তার সুদীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বোখারির হাদিসুল গাড় প্রসঙ্গে লিখিছেন :
“আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রাকীম দুটি আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব এবং আসহাবে রাকীম সে সকল লোক হাদিসুল গাড়ে যাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে তিনি (ইমাম বোখারী) হাদিসুল গাড়কে আসহাবুর রাকিম এর ব্যাখ্যায় নকল করেছেন।” (পৃ. ২৬৭)।
আসহাবে কাহফ এবং আসহাবে রাকীম এক ও অভিন্ন ব্যক্তিত্ব নাকি ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্ব এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। উল্লিখিত বর্ণনায় আসহাবে রাকীম সম্পর্কে আমরা ‘হাদিসুল গাড়’ রাকিম গুহাবাসীদের কাহিনী তুলে ধরেছি  মাত্র।
মরহুম হজরত মাওলানা এম এ মান্নান আম্মান সফরকালে ১৯৮১ সালে যখন জানতে পারেন যে, আসহাবে কাহফের গুহা জর্দানে অবস্থিত তখন তাঁর কৌতূহল ও তীব্র আগ্রহ জন্মে তা প্রদর্শন করার। কেননা, কোরআনুল করিমে ঘটনাটির বিবরণ থাকায় এবং আসহাবে রাকীমের কাহিনী তিনি বোখারি শরীফ পাঠদানের সময় হাদিসুল গাড় সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.) তার সফর সঙ্গীদেরকে নিয়ে আসহাবে কাহফের কথিত গুহা প্রত্যক্ষ করতে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তিনি বললেন যে, এ বিস্ময়কর ঘটনার স্থান সম্পর্কেও তীব্র বিরোধ দেখা যায়। সুতরাং তা যদি জর্দানেই অবস্থিত হয়ে থাকে, আমাদের এ সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। এটি আমাদের গবেষণা করারও বিষয় বটে।
(চলবে)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ