Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৭, ১৬ বৈশাখ , ১৪২৪, ২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী।

আত্মরক্ষার্থে কারাতে

| প্রকাশের সময় : ২৮ জানুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মো: আলতাফ হোসেন : একজন ভালো ক্রীড়াবিদ হতে হলে চাই কঠোর অনুশীলন। অনুশীলন হলো কারাতের দক্ষতা অর্জনের মূলচাবিকাঠি। এই খেলার জন্য খেলোয়াড়দের যথেষ্ট পরিমাণে শারীরিক শক্তি অর্জন করতে হয়। এই খেলা শুধুমাত্র আত্মরক্ষামূলক নয়,এই খেলার লক্ষ্য হলো  প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করাসহ পাল্টা প্রতিঘাত করে শত্রুতে কাহিল করা। উইলিয়াম ব্লেইক বলেন, “ঞযব ঃরমবৎ ড়ভ ৎিধঃয ধৎব রিংবং ঃযধহ ঃযব যড়ৎংবং ড়ভ রহংঃৎঁপঃরড়হ” বাঘের শক্তির চেয়ে ঘোড়ার কৌশল বেশি প্রয়োজন।
১৬০৯ সালে জাপানে আইন করা হয়, ‘অস্ত্র ছোড়া, কেংনো শেখো’ পরবর্তীতে এই কেংনো খেলা সারা বিশ্বে কারাতে হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। কারাতে খেলার উৎপত্তি দেশ নিয়ে যথেষ্ট  মতভেদ রয়েছে। অনেক দেশই নিজেদের কারাতে খেলার জন্মদাতা দেশ হিসেবে দাবি করে। তবে কারাতের উৎপত্তি হয় সম্ভবত: চীন ও জাপানে। তারাই আধুনিক বিশ্বে কারাতে খেলাকে একটি জনপ্রিয় খেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া ছাড়াও ব্যাপক প্রচারও প্রসার ছড়িয়ে দেয়।
এই খেলায় খেলোয়াড়রা কোনো রকম অস্ত্র ব্যবহার করেন না। অর্থাৎ প্রতিযোগীকে খালি হাতে লড়তে হয়। খালি হাতে শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য কারাতে মানুষকে রক্ষা করে। এই খেলাকে সহজে আয়ত্তে আনা যায়। অন্যান্য খেলা থেকে কারাতে প্রতিযোগিতায় আহত হবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। খেলোয়াড়ের শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হলো এক একটি অস্ত্র। এই কারণে শরীরকে কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে তৈরি করতে হয়। ইস্পাত কঠিন শরীর কারাতের জন্য খুবই জরুরি।
প-িতদের ধারণায় ও কিনাওয়ারে সপ্তদশ শতাব্দীতে কারাতের প্রচলন ছিল। সামজতান্ত্রিক আমলে ওইদেশের লোকেরা রাজা বা জমিদারের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তারা কোনো রকম অস্ত্র ব্যবহার করতে পারতেন না। ফলে তাদের বিনা অস্ত্রে আত্মরক্ষা করতে হতো। এ কারণে তাদের বিভিন্ন কৌশল আয়ত্তে আনতে হয়েছিল। এর ফলে তারা বিনা অস্ত্রে আত্মরক্ষার এক নতুন কৌশল রপ্ত করে।
কারাতে শিক্ষা একজন খেলোয়াড়কে অতি পটু করে তুলতে পারে বলেই খেলোয়াড়দের মধ্যে গড়ে ওঠে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। আর আত্মবিশ্বাসই হলো সাফল্য অর্জনের রহস্য। কারাতে অনুশীলন এত কঠিন যে অনেক সময় জীবন সংশয়ের প্রশ্ন দেখা দেয়। আধুনিককালে ক্রীড়া গবেষকরা কারাতেকে অনেকখানি সংশোধন করে ফেলেছেন। আর আজ সারা বিশ্বজুড়ে  কারাতের জয় জয়কার। বিশেষ করে আত্মরক্ষার কথা ভেবে সবাই এর প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন। শুধু তাই নয় শারীরিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে এর কোনো জুড়ি নেই।  এ খেলাকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য এর বর্বর অংশকে বাদ দেয়া হয়েছে। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে প্রতিযোগী প্রতিপক্ষকে খুব জোরে বা মারাত্মকভাবে আঘাত করতে পারবে না। পারফেক্ট ব্লো বা সঠিক মার এবং কিলিং ব্লো মারাত্মক মার প্রতিযোগীর গায়ে স্পর্শ করলেই চলে।
স্পর্শ করলেই প্রতিযোগী পুরো পয়েন্ট পেয়ে যাবে। তিন পয়েন্ট হলেই এক রাউন্ড শেষ হবে। যে প্রতিযোগী আগে ওই পয়েন্ট জিতবে তিনি সে রাউন্ডে জয়ী হবেন। মার ঠিক না হলেও প্রতিদ্বন্দ্বীকে স্পর্শ করা যায়। তাতে অর্ধেক পয়েন্ট পাওয়া যায়। শরীরের যে অংশ দিয়ে প্রতিযোগী আঘাত করবেন তা হলো-
১। মাথার তালুতে মুষ্টি দ্বারা। ২। গলার দু’পাশের আঙ্গুল ডগা দিয়ে। ৩। চোখের কোনে আঙ্গুল দিয়ে। ৪। কানে-হাতের চেটোর বিপরীত অংশ দিয়ে। ৫। নাকে সরাসরি আঘাত করা উচিত নয়, রক্ত ঝরতে পারে। ফলে নাকের দু’পাশে মুষ্টি দ্বারা আঘাত করা যেতে পারে। ৬। মুখের দু’পাশে মুষ্টি প্রয়োগ করা যেতে পারে। ৭। কণ্ঠনালীর নিচের গর্তে-আঙ্গুলের চাপ দিয়ে, তবে তা সাংঘাতিক হবে না। ৮। কাঁধের নিচের অংশ-আঙ্গুলকে ছুরির মতে ফলা করে। ৯। পাঁজরার ঠিক মধ্যস্থল আঙ্গুলের ডগা দিয়ে। ১০। কনুইয়ের জোড়ায় করতল মুষ্টি করলে আঙ্গুলের যে গাটগুলো ফুলে ওঠে তা দিয়ে। ১১। নাভির পাশে আঙ্গুলের ডগা দিয়ে। ১২। হাঁটুর উপুরের অংশে মুষ্টি দিয়ে। ১৩। কোমড়ের দু’পাশে কামল স্থানে কহরভ-যধহফ ব্যবহার করা ভাল। ১৪। হাঁটুর নিচের অংশে হাড়ের ওপর আঘাত হানবে পা দিয়ে অর্থাৎ সজোরে লাথি মেরে। ১৫। হাত বা পায়ের আঙ্গুল উল্টো দিকে মুড়ে ধরতে হবে।
খেলোয়াড়রা শরীরের প্রতিটি অঙ্গ অস্ত্রের মতো ব্যবহার করবে। হাত, পা, আঙ্গুল, চেটো আঙ্গুলের ডগা চোটোর দু’পাশ তাই শক্ত করে নিতে হবে। এর জন্য গরম পানি, বালির বস্তায় ঘুষি দড়ি জড়ানো কাঠের ওপর ঘা মেরে বা ঘুষি মরে এগুলো শক্ত করে নিতে হয়ে। হাতের চেটোর পাশকে লড়াইতে তলোয়ারের কোপের মতো ব্যবহার করবে। এই মারকে বলা হয় চপ। কারাতে লড়াইয়ে চপ হলো সেরা মার।
কারাতে যারা শিখবেন তাদেরকে ক্রোধ দমনের ক্ষমতা থাকতে হবে। ক্রোধ যে কোনো মুহূর্তে বিপদ ডেকে আনতে পারে ভয়ানক কিছু ঘটাতে। ‘ঐব যিড় রং ধহমৎু রহ ফবভবঃবফ’ কারণ যে রেগে যায় সে হেরে যায়। তাছাড়া এ বিদ্যা মানব কল্যাণের জন্য, নিপীড়নের জন্য নয়। কথাটা মনে রাখতে হবে। এ বিদ্যার দৈহিক শক্তি, কৌশলের সাথে থাকা চাই উপস্থিত বুদ্ধি। যা বেশি করে উপকারে আসে। খেলা হিসেবে কারাতে দশর্কদের কাছে আকর্ষণীয় বটে। আর একজন খেলোয়াড়ের কাছে কারাতে হচ্ছে শারীরিক ফিটনেসের রক্ষাকবজ।
কারাতে শিখতে বা প্রতিযোগিতায় শরীরকে নমনীয় রাখতে হয়। অর্থাৎ লড়াইয়ের সময় শরীরকে যে কোনো দিকে বাঁকানো যায়। এজন্য রীতিমত ব্যয়াম করা দরকার। খালি হাতে আত্মরক্ষার কৌশল সবার আগে আয়ত্তে করতে হয়। তারপর আক্রমণ করার অনুশীলন। কব্জির প্রান্ত, পুরো বাহুর তলা বা নিচেকার অংশ দিয়েই প্রতিহত করার কাজ করতে হয়। প্রতিহত করাকে বলা হয় ব্লকিং। ব্লকিং পদ্ধতি আট রকমের অনুশীলনে করা হয়। তার মধ্যে ডোডকি, খাসিডাসি, ছোটকি, জুডকি নয়াসিং যা আচমকা নামে পরিচিত। আক্রমণ প্রতিহত করার পর জানতে হয় প্রতি আক্রমণ করার পদ্ধতি। আক্রমণের প্রধান অস্ত্র হলো পা। এর জন্য কারাতে ম্যানকে বহুধরনের লাথিমারার অভ্যাস করতে হয়। যেমন ফ্রন্ট কিক, ব্যাককিক, হোয়াইকিক, সাউডকিক, হাঁটু ভেঙে আঘাত করা এবং নোকিক অর্থাৎ দু’হাতের তালু মাটিতে রেখে ঠিক পেছনে প্রতিপক্ষকে তলপেটে লাথি মারা।
আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলো হাত। এর জন্য কারাতে ম্যানকে বহু ধরনের ঘুষি মারার অভ্যাস করতে হয়। যেমন সোডন সথি অর্থাৎ সিঙ্গেল পাঞ্চ, দোসখি অর্থাৎ ডবলপাঞ্চ, লাজুইক অর্থাৎ চপ উরুনকী সাইমনসখি, জুনজুন সখি ইত্যাদি। এই দুই পদ্ধতির একজন কারাতে ম্যানকে শিখতে হয়, একই সাথে আক্রমণ প্রতিহত ও পাল্টা আক্রাম পদ্ধতি। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘কমরাইনিং ডিফেন্স উইথ কাউন্টার অ্যাটাক’।
এ ছাড়াও বিভিন্ন কলাকৌশলের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে  হয় কারাতে খেলা। কারাতে শিক্ষা একা শেখা সম্ভব নয় এর জন্য সহযোগী প্রয়োজন। কারণ আকিডু অনুশীলন করতে সহযোগী প্রয়োজন। আকিডু আত্মরক্ষার সুনিপুণ কৌশল।
প্রাথমিক পর্যায়ে অনুশীলন ধীর গতিতে করা শ্রেয়। পরে মারগুলো আয়ত্ত হলে দ্রুতলয়ে অনুশীলন করা দরকার। তারপর পর্যায়ক্রমে কুকু আয়ত্ত করতে হয়। যেমন তাইকুকু, নাইকুকু, তুমকুকু, লেকুক, নাকুকু, চকুকু, কন্যাই কুকু, চেকুকু, ছেকেকু, ছেহাফুফু ইত্যাদি।
কারাতের ভেতর মোট সাতটি বেল্ট রয়েছে যা প্রশিক্ষণার্থী তার অনুশীলন, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে অর্জন করে নেয়।
এ খেলায় কালো বেল্ট হলো সর্বোচ্চ সম্মানসূচক বেল্ট। দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণ, আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য এবং নিয়মিত অনুশীলেনর মাধ্যমে একজন কারাতেম্যান তার উজ্জ্বল ও দীপ্তময় ভবিষ্যতকে আরো গতিশীল করতে পারে। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য রক্ষায় ও নৈতিকতা অর্জনের ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে কারাতে।
লেখক : সাবেক ক্রীড়াবিদ ও কারাতে কোচ

আগামী শনিবার থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রকাশিত হবে ‘কারাতে’ শিক্ষার উপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।