Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

অরক্ষিত রেলক্রসিং

| প্রকাশের সময় : ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ইফতেখার আহমেদ টিপু : গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৮ জানুয়ারি রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে একটি প্রাইভেটকার। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছেন এর আরোহী একই পরিবারের চার সদস্যসহ পাঁচজন। রুবাইদা নুসরাত রিভা নামে এক শিশুর সেদিন ছিল প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন। মা, চাচি ও চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার সময় কালিয়াকৈর উপজেলার গোয়ালবাথান গ্রামে অরক্ষিত রেলক্রসিং পার হতে গিয়ে এ দুর্ঘটনার শিকার হয়।
কলকাতাগামী ট্রেন মৈত্রী এক্সপ্রেস ধাক্কা দিলে প্রাইভেটকারটি ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে গিয়ে প্রায় ১ কিলোমিটার সামনে চলে যায়। সেখানে ভোঙ্গামারী ব্রিজে ট্রেনটি উঠলে ব্রিজের ফাঁক গলে প্রাইভেটকারের চূর্ণবিচূর্ণ অংশসহ পাঁচজনের ছিন্নভিন্ন দেহ নিচে পড়ে যায়। দুর্ঘটনায় ট্রেনের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পড়লে রাজধানীর সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ৫ ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন থাকে। রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। রেলক্রসিংগুলোর একাংশে ট্রেন অতিক্রম করার সময় সড়ক পারাপার বন্ধের ব্যবস্থা থাকলেও বেশিরভাগ রেলক্রসিংই অরক্ষিত। যানবাহন চালকদের অসতর্কতায় এসব অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ঘটছে হতাহতের ঘটনাও।
কালিয়াকৈরের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা তারই একটি অংশ। সংশ্লিষ্ট রেলক্রসিংয়ে গত বছর এক বাবা ও মেয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান। ধারেকাছের এলাকার বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে এ রেলক্রসিং পার হতে হয়। রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান থাকলে এ ধরনের দুর্ঘটনা যে এড়ানো যেত তা সহজেই অনুমেয়। আমরা আশা করব রেলক্রসিংয়ের দুর্ঘটনা রোধে রেলওয়ের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি রেলক্রসিং পারাপারে যানবাহন চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে এমনটিও প্রত্যাশিত।
দেশে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ছে। রেলের দিকে সরকার দৃষ্টি দিয়েছে। ভবিষ্যতে রেলপথও বাড়বে। রেলপথের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। এমনিতে রেলপথের একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সাধারণের প্রবেশ আইনত দ-নীয়। কিন্তু এই আইন বাংলাদেশের মতো দেশে মেনে চলা হয় কি? সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে লেভেলক্রসিং। দেশের দুই হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথে প্রায় দুই হাজার ৫৪১টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। এর বেশিরভাগে কোনো গেট নেই। কোনো সংকেতবাতি দূরের কথা, নেই যান নিয়ন্ত্রণের কোনো কর্মী। নিয়ম অনুযায়ী কোনো রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নিয়ে যেতে হলে গেট নির্মাণ, কর্মী নিয়োগসহ আনুষঙ্গিক সব স্থাপনা নির্মাণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থার। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কর্মীর বেতনসহ ১০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ রেলওয়েকে দিলে তবেই সেখানে গেট নির্মাণের অনুমতি মেলে ও কর্মী নিয়োগ হয়। এ জটিলতা এড়াতে অধিকাংশ স্থানেই রেললাইনের ওপর অননুমোদিতভাবে গড়ে ওঠে লেভেলক্রসিং।
বাংলাদেশে অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ের জন্য দুর্ঘটনার সংখ্যা দিনদিনই বাড়ছে। ব্যাপারটি অনেকটা নৈমিত্যিক ঘটনাতেও পরিণত হয়েছে। দেশে রেলেক্রসিংগুলো অনেকটা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, সারাদেশে রেলওয়ে নেটওয়ার্কে মোট ২ হাজার ৫৪১টি লেভেলক্রসিং আছে। এরমধ্যে অনুমোদিত ক্রসিংয়ের সংখ্যা মাত্র ৭৮০টি। বাকি ১ হাজার ৭৬১টিই অনুমোদনহীন। আবার ৭৮০টি অনুমোদিত ক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ২৪২টিতে রক্ষী বা গেটকিপার রয়েছে। হিসেব অনুযায়ী ২ হাজার ২৯৯টি ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিং। এসব ক্রসিংয়েই প্রায়শ’ দুর্ঘটনা ঘটছে। শুধু রাজধানী ও এর আশপাশ এলাকায় ৩৫ কিলোমিটার রেলপথে ৫৮টি লেভেল ক্রসিংয়ের ২৩টিরই কোন অনুমোদন নেই। রেল পুলিশের তথ্যমতে রেলপথে গত ৫ বছরে আড়াই শতাধিক ব্যক্তি ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে। এর বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে রেলক্রসিংয়ে। বাস্তব অবস্থা হচ্ছে শুধু রেল ক্রসিং নয় বরং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে রেল লাইনও। বিভিন্নস্থানে রেললাইনের দু’পাশে গড়ে ওঠেছে অবৈধ মার্কেট। হাটবাজার, বড় বড় বস্তি। এছাড়াও অস্থায়ী ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট তো রয়েছেই। অস্বীকার করার উপায় নেই, রেলের সম্পত্তি অনেকাংশেই বেদখল হয়ে গেছে প্রভাবশালীদের খপ্পরে পড়ে। মাঝেমাঝে উদ্ধারের খবর বেরুলেও তা মূলত সাময়িক।
রেললাইনের ওপর দিয়ে মূলত সিটি করপোরেশন, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথের রাস্তা গেছে। এসব সংস্থার সঙ্গে রেল কর্তৃপক্ষের সামান্য সমন্বয় করা গেলে দুর্ঘটনা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। যেখানে যেখানে লাইন আছে, ব্যয়সাপেক্ষ হলেও সেখানে উড়াল সড়ক তৈরি করা যেতে পারে। তাতে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে যাবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে রেল কর্তৃপক্ষ আপাতত সেখানে রেলগেট নির্মাণ করে কর্মী নিয়োগ দিতে পারে। এতেও দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব। সর্বোপরি এসব লেভেলক্রসিং ব্যবহারকারীদেরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে। রেলওয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ভেতর দিয়ে লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।
ষ লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক নবরাজ



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।