Inqilab Logo

রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৫ মুহাররম ১৪৪৪
শিরোনাম

ইসলামী ইবাদতের চতুর্থ রোকন : হজ

সত্যালোকের সন্ধানে

| প্রকাশের সময় : ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম


এ, কে, এম, ফজলুর রহমান মুন্শী

আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে মানুষের ওপর বাইতুল্লাহর হজ করা ফরজ। (সূরা আলে ইমরান : রুকু-১০) ইসলামী ইবাদতের চতুর্থ রোকন হচ্ছে হজ। আর এটাই হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর মানুষের প্রাথমিক ও আদি তরিকা।
হজের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা এবং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ধর্মীয় আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে কোনও পবিত্র স্থান ভ্রমণ করা। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে হজ হচ্ছে আরব দেশের মক্কা শহর গমন করে হযরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক নির্মিত মসজিদ ‘খানায়ে কাবার’ চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা এবং মক্কার বিভিন্ন পবিত্র স্থানসমূহে হাজির হয়ে আদব এবং কর্মানুষ্ঠান প্রতিপালন করা।
মানবিক সভ্যতার প্রাথমিক ইতিহাস পাঠকারীদের অবশ্যই জানা আছে যে, মানব সমাজের প্রাথমিক আকার আয়তন খান্দান ও বংশভিত্তিক ছিল। এরপর অগ্রসর হয়ে তা কতিপয় তাঁবু ও ঝুপড়িসদৃশ আবাদি এলাকায় পরিণত হয়। এর বহু পরে তা নগরকেন্দ্রিক সভ্যতায় উন্নীত হয়। এরপর বহু উন্নতি সাধিত হলে একটি কাওম বা জাতি এবং একটি রাষ্ট্র বা দেশের রূপ পরিগ্রহ করে। আর এই নগর সভ্যতাই মানুষ বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে।
মক্কা হচ্ছে মানবিক উন্নতি ও অগ্রগতির যাবতীয় পর্যায় ও শ্রেণি বিন্যাসের এক বিন্যস্ত ইতিহাস। সে স্থানটি হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জমানায় একটি সুনির্দিষ্ট খান্দানের ধর্ম প্রচারের প্রাণকেন্দ্র ছিল। তারপর হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর জমানায় তা কতিপয় তাঁবু এবং ঝুপড়ির সমন্বয়ে একটি ক্ষুদ্র জনবসতিরূপে গড়ে ওঠে। এরপর ক্রমশ তা                        আরবের ধর্মীয় শহরের স্থান দখল করে নেয়। আর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়ত লাভের পর এটা ইসলামী দুনিয়ার ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত হয়।
দুনিয়ায় প্রাথমিক আবাদি প্রতিষ্ঠারকালে এই দস্তুর ছিল যে, প্রত্যেক আবাদির সুনির্দিষ্ট এলাকায় দুটি মর্যাদাপূর্ণ মহল বানানো হতো। এর একটি ছিল সে এলাকার বাদশাহের মহল বা দুর্গ এবং অপরটি ছিল সে এলাকার কাহিনীকার বা ধর্মগুরু এবং উপাসকদের জন্য। সামগ্রিকভাবে প্রতিটি আবাদি কোনো না কোনো নক্ষত্র বা দেবতার প্রতি অনুরক্ত ছিল এবং তারা সে দেবতার অথবা নক্ষত্রের আশ্রয়ে থাকার জন্য উদগ্রীব থাকত। তারা সেই আশ্রয়দাতা নক্ষত্র বা দেবতার পূজা-অর্চনাও করত। এই পূজার ম-প বা আরাধনার জন্য উন্মুক্ত জায়গাটি শান্তির নিবাস বলে চিহ্নিত হতো। তাদের নজর-নিয়াজের যাবতীয় অর্থ-কড়ি এবং উৎপাদিত পণ্যসম্ভার সেখানেই জমা করা হতো। আর যতই এই আবাদির বাদশাহী ও সা¤্রাজ্য বর্ধিত ও বিস্তৃত হতো ঠিক ততই সেই দেবতার সা¤্রাজ্য অথবা পূজা-অর্চনার সীমানা বিস্তৃত হতে বিস্তৃততর হয়ে উঠত।
(তৌরাত গ্রন্থে ও বাবুল কালিদানের পুরাতন কাব্যগ্রন্থে এবং ইতিহাস ও পুরাতাত্ত্বিক গ্রন্থাবলীতে এসবের বর্ণনা পাওয়া যায়; তাছাড়া আরদুল কোরআন গ্রন্থেও এ সকল বিষয়ের সম্যক বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।)
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পৈতৃক নিবাস ছিল ইরাকে। তৎকালে সেখানে কালিদানী সম্প্রদায়ের বসতি ও সা¤্রাজ্য ছিল। এই সা¤্রাজ্য জুড়ে নক্ষত্রের পূজা-অর্চনা প্রচলিত ছিল। হযরত ইব্রাহিম (আ.) নুবওত লাভ করার পর এই  দুনিয়ার বুকে সর্বপ্রথম নক্ষত্র পূজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং এক আল্লাহর উপাসনার প্রতি আহ্বান জানান। ফলে তাঁর বংশধর ও গোত্রের লোকেরা এর জন্য তার প্রতি অকথ্য নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাতে থাকে। পরিশেষে তাঁকে স্বদেশ পরিত্যাগ করে সিরিয়া, মিসর ও আরবে হিজরত করতে হয়। এ সকল স্থানে হযরত আদম (আ.)-এর পুত্র সামের বংশধরগণ বসবাস করত। কালক্রমে তারা বিভিন্ন নামে এসকল স্থানে নিজেদের সা¤্রাজ্যও গড়ে তুলেছিল।
পুরাতত্ত্ব, বংশানুক্রমিক ধারা, ভাষা এবং অন্যান্য ইতিহাসের নমুনা হতে এ কথা সুস্পষ্ট জানা যায় যে, আরব ভূমি ছিল সামের বংশধরদের আদি আবাস ভূমি। এখান হতে বের হয়েই তারা ইয়েমেন এবং ফিলিস্তিনে পৌঁছেছিল। মিসরে এই বংশের লোকেরা ‘হিকসুস’ বা বেদুঈন শাসক নামে রাজ্য শাসন করত। (আরদুল কোরআনে এর বিশদ বিবরণ রয়েছে।)
হযরত ইব্রাহিম (আ.) অত্র এলাকার বিভিন্ন জনপথ ও শহর পরিভ্রমণ করে আরব ও সিরিয়া গমন করেন এবং মৃত সমুদ্রের সন্নিকটে জর্ডানে স্বীয় ভ্রাতুষ্পুত্র হযরত লূত (আ.)-কে আবাদ করেন। আর স্বীয় তনয় ইসহাক (আ.)- কে কেনান বা ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের নির্দেশ দেন। আর অপর ছেলে মাদায়ুনকে ও অন্যান্যকে হিজাজের দিকে লোহিত সাগরের উপকূলে সেই স্থানে বসবাস করান যা আজও মাদায়েন নামে পরিচিত। এরও আগে অগ্রসর হয়ে তিনি স্বীয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে ফারান উপত্যকায় বসতি নির্মাণের আদেশ প্রদান করেন। বস্তুত এ সকল স্থান ছিল এমন রাজপথতুল্য যেখানে মিসর ও সিরিয়া হতে হিজাজ ও ইয়েমেন এবং হিজাজ ও ইয়েমেন হতে সিরিয়া গমনাগমনকারী ব্যবসায়ী, সওদাগর এবং কাফেলার লোকদের যাতায়াত স্থল! লোকজন এসব এলাকা দিয়েই সর্বদা যাতায়াত করত।
এই বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে নিজের সন্তান-সন্ততি ও বংশধরদের বসতি স্থাপনের পেছনে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দুটি উদ্দেশ্য নিহিত ছিল। প্রথমত, ব্যবসায়ী কাফেলার গমনাগমনের ফলে তাদের প্রয়োজনী দ্রব্যসামগ্রী লাভে যেন অসুবিধা না হয় এবং একই সাথে তারা যেন সহজে ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর খালেস তাওহীদের শিক্ষা প্রচারের জন্য এ সকল স্থান ছিল উত্তম কেন্দ্র। তাছাড়া ইরাক এবং সিরিয়ার অত্যাচারী ও নিষ্ঠুর গোত্রগুলোর সীমানার বাইরে অবস্থান করে নক্ষত্র পূজারী ও মূর্তিপূজারীদের খপ্পর হতে নিজেদেরকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে এবং এরই ফাঁকে সত্য ধর্মের প্রচার ও প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
বাইতুল্লাহ : হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দস্তুর ছিল যে, যেখানেই তিনি রূহানিয়াত বা আধ্যাত্মিকতার জ্যোতি অবলোকন করতেন, সেখানেই আল্লাহর নামে একটি পাথর খাড়া করে আল্লাহর ঘর এবং কোরবানির স্থান নির্মাণ করতেন। সুতরাং তৌরাত কিতাবের পয়দায়েশ পর্বে তার তিনটি কোরবানির স্থান বা আল্লাহর ঘর নির্মাণের ঘটনা বিবৃত আছে।
‘তারপর আল্লাহপাক আব্রাহামকে দর্শন দান করে বললেন : এই মুলুকেই আমি তোমার বংশধরকে পরিবর্ধিত করব।  এবং সেখানে তিনি আল্লাহর জন্য যা তাঁর নিকট প্রকাশ পেয়েছিল একটি কোরবানগাহ নির্মাণ করলেন এবং সেখানে হতে রওয়ানা হয়ে বাইতে ঈল (বাইতুল্লাহ)-এর পূর্বপ্রান্তে একটি পাহাড়ের সন্নিকটে নিজের আস্তানা কায়েম করলেন। ‘বাইতে ঈল’ ছিল এর পশ্চিমে এবং আঈ ছিল এর পূর্বে। সেখানে তিনি আল্লাহর জন্য একটি কোরবানগাহ নির্মাণ করলেন এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করলেন।’ (১২-৭,৮)
এরপর তৌরিতে উল্লেখ করা হয়েছে : এবং তিনি (ইব্রাহিম) ভ্রমণ করতে করতে দক্ষিণ দিক হতে ‘বাইতে ঈল’-এর ওই স্থান পর্যন্ত পৌঁছলেন... যেখানে তিনি প্রথমে একটি কোরবানগাহ নির্মাণ করলেন এবং সেখানে ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নাম স্মরণ করলেন।’ (১৩-১৪)
তারপর তিনি অপর একটি স্থানে পৌঁছলেন, সেখানে আল্লাহর অহী এবং বরকতময় পয়গাম লাভ করলেন এবং তাঁকে নির্দেশ করা হলো : “ উঠ! এবং এই অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ভ্রমণ কর, এই অঞ্চলটি আমি তোমাকে দান করব। তাই ইব্রাহিম (আ.) স্বীয় আস্তানা গুটিয়ে নিলেন এবং ধূলি-ধূসর অঞ্চলের দিকে গমন করলেন এবং সেখানে একটি কোরবানগাহ নির্মাণ করলেন।” (১৩-১৭-১৮)
এই শ্রেণির কোরবানগাহ এবং আল্লাহর ঘর হযরত ইসহাক (আ.), হযরত ইয়াকুব (আ.) এবং হযরত মূসা (আ.)-ও নির্মাণ করেছিলেন। তারপর হযরত দাউদ (আ.) ও হযরত সুলাইমান (আ.) বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ করেছিলেন যা বনী ইসরাঈলের কা’বা এবং কিবলা হিসেবে বরিত হয়।
হযরত ইসহাক (আ.)-এর ঘটনায় বলা হয়েছে যে, যেখানে তাঁর ওপর অহী এবং অঙ্গীকারের বেশারত নাজিল হয়েছিল “সেখানে তিনি কোরবানগাহ তৈরি করেছিলেন এবং সেখানে ইসহাক (আ.)-এর চাকরগণ একটি কূপ খনন করেছিল ।” (পয়দায়েশ : ২৬-২৫)
হযরত ইয়াকুব যেখানে সত্য স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে স্থান সম্পর্কে বলা হয়েছে, “এবং ইয়াকুব (আ.) প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করলেন। তারপর সে পাথরটিকে খাড়া করলেন যার ওপর তিনি হেলান দিয়ে বসেছিলেন এবং এর ওপর তৈল ঢেলে দিলেন এবং সেই স্থানটির নাম ‘বাইতে ঈল’ রাখলেন এবং বললেন : আর এই পাথরটি যা আমি দেয়ালরূপে খাড়া করেছি, তা হবে আল্লাহর ঘর। আর আমাকে প্রদত্ত দ্রব্যসামগ্রী হতে এক-দশমাংশ তোমাকে (আল্লাহকে) দান করব। (২৮-১৮-২২)
হযরত মূসা (আ.)-কে হুকুম করা হয়েছিল আর যদি তুমি আমার জন্য পাথরের কোরবানগাহ নির্মাণ কর তাহলে মসৃণ পাথর দ্বারা তা নির্মাণ করো না। কেননা এতে তুমি যদি অলংকার সংযোজন কর, তাহলে তাকে অপবিত্র করে দেবে। আর তুমি আমার কোরবানগাহে সিঁড়ি দ্বারা আরোহণ করো না, যাতে তোমার বস্ত্রহীনতা এতে প্রকাশ না পায়।” (নির্গমন : ২০-২৫-২৬)
হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক “একটি পাহাড়ি উপত্যকায় একটি কোরবানগাহ ও বনী ইসরাঈলের বারটি গোত্রের জন্য বারটি দেয়াল নির্মাণ করলেন।... এবং শান্তিপূর্ণ কোরবানির পশু গরুগুলো আল্লাহর নামে জবেহ করলেন। এগুলোর অর্ধেক রক্ত তিনি বিভিন্ন পাত্রে রাখলেন এবং বাকি অর্ধেক কোরবানগাহে ছিটিয়ে দিলেন।” (নির্গমন : ২৪-৪-৬)
উপরোল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলোতে এই শ্রেণির নির্মাণশৈলী অথবা স্থানগুলোর নাম (মাজবাহ বা কোরবানগাহ) বলে দেয়া হয়েছে এবং এর দ্বারা বাইতে ঈল বা বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘরের অস্তিত্ব প্রতিপন্ন হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর বংশধরদের মাঝে এ জাতীয় কোরবানগাহ বা বাইতুল্লাহ নির্মাণের প্রচলন ছিল। যা মক্কা মুয়াজ্জমার কা’বা এবং মসজিদে হারাম ও মসজিদে ইব্রাহিম (আ.) নামে আজোও কায়েম আছে। এ সম্পর্কে ইসলামের দাবী হচ্ছে এই যে, দুনিয়ার বুকে এটাই হচ্ছে সর্বপ্রথম নির্মিত আল্লাহর ঘর।
হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর কোরবানি এবং শর্তাবলী : কোরআনুল কারীমের বিবরণ অনুসারে জানা যায় যে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) আপন একমাত্র প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর তৌরাতের বর্ণনা অনুসারে জানা যায়, যাকে কোরবানি করার হুকুম হয়েছিল তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আ.)। আর এ কথাও সেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তৌরাতের মর্ম অনুসারে কোরবানির মর্ম হলো : নির্দিষ্ট বস্তু বা প্রাণীকে আল্লাহর ইবাদতগাহের খেদমতের জন্য উৎসর্গ করা। তারা উৎসর্গীকৃত বস্তু বা প্রাণীর গায়ে হাত রাখত এবং সেই প্রাণীকে উৎসর্গকৃত সন্তানের পরিবর্তে জবেহ করত। আর যে সকল ব্যক্তিকে আল্লাহর ইবাদতগাহের খেদমতের নামে উৎসর্গ করা হতো তারা কোরবানির দিনে নিজেদের মাথার চুল কাটত না। যখন কোরবানির দিন পুরা হয়ে যেত, তখন নিজেদের মাথা মুড়িয়ে ফেলত। যে বস্তু বা প্রাণী কোরবানির জন্য নির্ধারিত করত বা উপস্থাপন করত, সেগুলো প্রথমে কোরবানগাহে ঘুরানো হতো। তারপর সেগুলোকে কোরবানি করা হতো বা জ্বালিয়ে দেয়া হতো।
কোরবানি : মিল্লাতে ইব্রাহিমের বিশেষত্ব : তৌরাত এবং আল কোরআনের আলোকে জানা যায় যে, মিল্লাতে ইব্রাহিমির আসল বুনিয়াদ ছিল কোরবানি। আর এই  কোরবানীই ছিল হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পয়গাম্বারী ও রূহানী জিন্দেগীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই পরীক্ষা ও আজমায়েশ উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে তিনি এবং তাঁর সন্তান-সন্ততি সকল প্রকার নিয়ামত এবং বরকত সমূহের দ্বারা সৌভাগ্যম-িত হয়ে উঠেছিল। তৌরাত কিতাবের আগমনকা-ে বলা হয়েছে যে, “আল্লাহ বলেন, এ জন্যই তুমি এমন কাজ সম্পাদন করেছ এবং নিজের একমাত্র ছেলের কথাও ভুলে গিয়ে কোরবানি করতে কুণ্ঠাবোধ করনি। আমি নিজে এই শপথ করেছি যে, যখনই আমি বরকত দেব, তখনই তোমাকেও বরকত প্রদান করব এবং বংশধারাকে বিস্তৃত করে আকাশের তারকাপুঞ্জের মতো কিংবা সমুদ্র উপকূলের বালির মতো বর্ধিত করে দেব এবং বংশধরগণ শত্রুর দ্বারপ্রাপ্ত পর্যন্ত অধিকার করবে। আর তোমার বংশের দ্বারা পৃথিবীর সমুদয় সম্প্রদায় বরকত হাসিল করবে। তা এ জন্য যে, তুমি আমার কথা পালন করেছে।” (পয়দায়েশ : ২২-১৬-১৭-১৮)
কোরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে : “এবং যখন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে তাঁর প্রতিপালক কতিপয় বাক্য দ্বারা পরীক্ষা করলেন, আর তিনি তা পূর্ণ করলেন, তখন আল্লাহপাক তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি তোমাকে মানুষের জন্য ইমাম নির্ধারণ করব।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-১৫)
অপর এক আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে : “ আমি ইব্রাহিম (আ.)-কে পৃথিবীতে মনোনীত করেছিলাম এবং পরকালেও সে পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত। যখন তাঁর প্রতিপালক বললেন, নিজেকে সমর্পণ কর, তখন সে বললো, আমি বিশ্ব প্রতিপালকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করলাম।” (সূরা বাকরাহ : রুকু-১৬) অন্যত্র ঘোষণা করা হয়েছে : “হে ইব্রাহিম (আ.)! তুমি নিজের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ এবং অবশ্যই আমি পুণ্যবানদেরকে উত্তম বিনিময় প্রদান করি।” (সূরা সাফফাত : রুকু-৩)
আর এই বরকত ছিল এটাই যা মুসলমানগণ দৈনিক পাঁচবার আল্লাহর সামনে স্মরণ করে থাকেন। “হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সা.)-এর শারীরিক ও রূহানী বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করুন, যেভাবে আপনি ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করে ছিলেন।”
কিন্তু এই কোরবানি আসলে কি ছিল? এটা শুধুমাত্র রক্ত এবং গোশতের কোরবানি ছিল না। বরং তা ছিল স্বীয় প্রিয়তম বস্তুকে আল্লাহর সামনে উৎসর্গ করা এবং রূহ ও অন্তর উৎসর্গ করা। এ ছিল আল্লাহর আনুগত্য, উবুদিয়াত এবং পরিপূর্ণ দৃশ্য। এ ছিল উৎসর্গ ও সন্তুষ্টির, ধৈর্য ও শোকরগুজারির পরীক্ষা। যার পরিপূর্ণ করা ছাড়া দুনিয়ার নেতৃত্ব এবং আখেরাতের পুণ্যময় শুভ ফল লাভ করা যায় না। এ কোরবানি শুধু কেবল পিতার একমাত্র প্রিয় সন্তানের রক্তে পৃথিবীকে রঞ্জিত করা ছিল না; বরং আল্লাহর সামনে নিজের যাবতীয় কামনা-বাসনা, আশা-আকাক্সক্ষা, চিত্ত তাড়না ও উদগ্র চাহিদার কোরবানি এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের সকল প্রকার ইচ্ছা ও মর্জিকে বিলীন করে দেয়া। বস্তুত : বাহ্যিক পশু কোরবানি সেই অভ্যন্তরীণ রূপরেখার জাগতিক ছায়া এবং সেই প্রকৃত সত্য সূর্যের যথার্থ রূপক প্রতিচ্ছবি মাত্র।
ইসলাম মানেই কোরবানি : ইসলাম শব্দের অর্থ হচ্ছে নিজেকে কাহারো কাছে সমর্পণ করা এবং আনুগত্য ও বন্দেগীর জন্য মস্তক অবনত করা। আর এই বিশেষত্ব ও হাকীকতটি হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং ইসমাঈল (আ.)- এর ত্যাগ, উৎসর্গ ও কোরবানির দ্বারা বিকশিত হয়েছে। আর এ কারণেই সেই পিতা-পুত্রের আনুগত্য ও আত্মোৎসর্গের অনুপ্রেরণাকে সহীফায়ে মুহাম্মাদী আল কোরআনে ‘ইসলাম’ শব্দ দ্বারা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : “যখন ইব্রাহিম এবং ইসমাঈল নিজেদেরকে সমর্পণ করলেন এবং ইব্রাহিম স্বীয় পুত্রকে উপুড় করে মাটিতে শুইয়ে দিলেন।” (সূরা সাফফাত : রুকু-৩)
অপর এক আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে : ‘একমাত্র নির্বোধ ছাড়া কেউ ইব্রাহিম (আ.)-এর মিল্লাতকে অপছন্দ করবে না। আমি তাকে পৃথিবীতে মকবুল ও গ্রহণীয় করেছিলাম এবং ইব্রাহীম আখেরাতেও পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এবং যখন তার প্রতিপালক বললেন, “আত্মসমর্পণ কর।” সে উত্তর করল, “বিশ্ব প্রতিপালকের সামনে আমি নিজেকে সমর্পণ করলাম।” (সূরা  বাকারাহ : রুকু-২৬)  মোটকথা, এই আনুগত্য ও আত্মসমর্পণই হচ্ছে মিল্লাতে ইব্রাহিমির হাকীকতÑ ইসলাম। তিনি নিজেকে আল্লাহর  হাতে সঁপে দিয়েছিলেন এবং তারই সকাশে স্বীয় মস্তক অবনত করেছিলেন। আর এটাই হচ্ছে ইসলামের হাকীকত। আর এটাই হচ্ছে ইব্রাহিম মিল্লাত। আর এই আমানতের বোঝা বহন করার জন্যই হযরত ইব্রাহিম (আ.) বার বার প্রার্থনা  করতেন, যেন তার বংশধরদের মাঝে প্রত্যেক যুগে এই দায়িত্ব পালনকারী সত্তার আবির্ভাব হয় এবং পরিশেষে সেই বিশ্বাসী সত্তারও আবির্ভাব হয়, যিনি এই আমানতকে গ্রহণ করে সারা বিশ্বের জন্য তা ওয়াকফ করে দেবেন। আল কোরআনে তার এই প্রার্থনাকে এভাবে বিবৃত করা হয়েছে : “হে আল্লাহ! আমাদের উভয়কে তোমার অনুগত করে নাও এবং আমাদের বংশকে একটি মুসলমান জামাত কর এবং আমাদেরকে হজের বিধানসমূহ শিক্ষা দাও এবং আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও, অবশ্যই তুমি ক্ষমা ও অনুকম্পাশীল। হে আমাদের প্রতিপালক! এদের মাঝে  এমন একজন রাসূল প্রেরণ কর যিনি তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনাবেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পাক পবিত্র করবেন। অবশ্যই তুমি বিজয়ী ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-১৫)
এই প্রার্থনায় বর্ণিত রাসূল ছিলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)। এখানে পার্থিব কিতাব ছিল কোরআন, আর হেকমত ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বক্ষস্থলে রক্ষিত জ্ঞান ও কর্ম প্রবাহের ভা-ার। আর মানাসেক ছিল হজের আহকাম  ও আরকান।
এই কোরবানি কোথায় হয়েছিল : হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্বীয়  প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কোথায় কোরবানি করেছিলেন? এ সম্পর্কে তৌরাতে উল্লেখ আছে যে, সে স্থানটির নাম ছিল  ‘মূরাহ’ বা ‘মূরিয়া’। কোনো কোনো তর্জমাকারী এই শব্দটির অর্থ করেছেন, উঁচু সমতল স্থান বা পাহাড়ি উপত্যকা। কিন্তু সূক্ষ্মদর্শী তর্জমাকারীগণ সে শব্দটির কোনো অর্থ ব্যবহার করেননি বরং তার আসল নামটি বহাল রেখেছেন। বর্তমানে আমাদের সামনে তৌরাতের সেই আরবি অনুবাদটি রয়েছে, যা ইব্রানী, ফিলদানী এবং ইউনানী ভাষা হতে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনূদিত হয়ে ছাপা হয়েছে। এই অনুবাদে স্থানটির নাম লেখা আছে ‘মুরিয়্যা’ বলে। আর এর ফার্সি তর্জমায় বাইবেল সোসাইটির পক্ষ হতে অনূদিত গ্রন্থে ১৮৮৫ সালে যা লন্ডনে ছাপা হয়েছে এবং এতে সে স্থানটির নাম মুরিয়া লেখা আছে। আসলে স্থানটির নাম হচ্ছে মারওয়া। যা মক্কার বাইতুল্লাহ শরিফের সংলগ্ন একটি একটি পাহাড়ের নাম। ফার্সি অনুবাদে বলা হয়েছে, “আল্লাহপাক ইব্রাহিম (আ.)-কে পরীক্ষা করার মানসে বললেন, হে ইব্রাহীম! প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, হে আল্লাহ! বান্দাহ হাজির। আল্লাহ বললেন, তোমার একমাত্র প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র ইসহাককে হাত ধরে চিহ্নিত পাহাড়ের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে কোরবানি কর। তাই পরদিন প্রত্যুষে ইব্রাহিম (আ.) স্বীয় গাধার ওপর আরোহণ করে এবং দুজন চাকর ও প্রিয় পুত্র ইসহাককে নিয়ে ভগ্নহৃদয়ে রওনা হলেন।” (পয়দায়েশ : ২২)
উদ্ধৃতাংশের ‘ইসহাক’ নামটি হচ্ছে ইহুদিদের বানানো কথা ও সংযোজন। কেননা মূল তৌরাতে ইসহাক নামটি ছিল না। বরং এর স্থলে ‘ইসমাঈল’ নামটি লিখিত ছিল।
মুসলমান গবেষকগণ অকাট্য দলিল-প্রমাণসহ ইহুদিদের এই নাম পরিবর্তন ও সংযোজনকে তুলে ধরেছেন। সীরাতুন নবী গ্রন্থের প্রথম খ-ে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট  বক্তব্য রয়েছে। তাছাড়া প্রখ্যাত গবেষক মাওলানা  হামিদ উদ্দীন সাহেব “আর রায়ুস সহীস ফী মান হুয়াজ জবীহ” নামক গ্রন্থে প্রমাণাদিসহ ইহুদিদের এই পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়টি প্রমাণ করেছেন এবং নামটি যে ইসহাকের পরিবর্তে  ইসমাঈল ছিল তা প্রতিপন্ন করেছেন। তাই এ ব্যাপারে বিশদ  আর কোনো আলোচনা প্রয়োজন পড়ে না।
মোট কথা, মহান আল্লাহপাক হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে  কোরবানি করার যে স্থানটির কথা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সে স্থানটি ছিল মারওয়া। এই স্থানটি হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নিবাস হতে কয়েক দিনের পথ দূরত্বে অবস্থিত ছিল। (চলবে)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন