Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

শিক্ষা জাতীয়করণ ও বাস্তবতা

| প্রকাশের সময় : ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আলী এরশাদ হোসেন আজাদ : শিক্ষা জাতীয়করণ একটি সর্বসম্মত গণদাবি। অথচ সরকারি পদক্ষেপ প্রতি উপজেলায় একটি করে স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ। ফলে গাজীপুর জেলায় ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত শহিদ তাজউদ্দীন আহমদের স্মৃতিবিজড়িত, প্রধানমন্ত্রীর সদয় সম্মতিপ্রাপ্ত ও জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পুণ্যস্পর্শে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকৃত শিক্ষাদ্যুতিতে সমুজ্জ্বল কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ বাদ গেল। ময়মনসিংহে পুলিশি অভিযানে ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ এবং ছফর আলী নামের এক পথচারী প্রাণহানির কলঙ্ক ঘটলো। তবুও কি ঐ কলেজ জাতীয়করণ হয়েছে? উপজেলা সদরে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রাচীন ভৈরবের হাজী আসমত কলেজ জাতীয়করণও দুর্ভাগ্যের গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে শুধু ‘উপজেলা সদর’ শব্দটি সরকারি ঘোষণায় না থাকার কারণে।
অনেক অনেক অসংগতিতে ভরপুর খ-িত জাতীয়করণের চলমান প্রক্রিয়ার মস্ত মহড়ার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই সারাদেশে মানববন্ধন, হরতাল, সড়ক অবরোধের কর্মসূচিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আমজনতা সোচ্চার হয়েছে। আবার নির্বাচন ছাড়া এমপি, আইএসএসবি ছাড়া মিলিটারি অফিসার, এমবিবিএস ছাড়া ডাক্তার যেমন অসম্ভব তেমনি বিসিএস ছাড়া ক্যাডারভুক্তির বিরোধিতা হাইকোর্টের মামলায় গড়িয়েছে। আত্মীকরণ বিধিমালার অসংগতিও অনেক শিক্ষকের জীবন-যৌবনের সব অর্জনকে উপহাস করছে। অথচ সরকার নির্ধারিত যোগ্যতায় বেসরকারি কলেজে এমপিওভুক্ত যারা অভিন্ন সিলেবাসে পাঠদান করলেন তাদের লালিত স্বপ্ন যখন আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে তখন তাদেরকেই অপমান?
আশির দশকে এক ঘোষণায় মহকুমা সদরের কলেজ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের সূচনায় যেসব জেলা সদরে সরকারি মহিলা কলেজ ছিল না সেখানে এক ঘোষণায় সব মহিলা কলেজ জাতীয়করণ হয়। সম্প্রতি ১৬টি সরকারি কমার্স ইনস্টিটিউটকে এক ঘোষণায় সাধারণ কলেজ করা হয়। কাজেই ‘এক ঘোষণা’য় উপজেলা সদরের সব কলেজ জাতীয়করণ, আত্মীকরণ বিধিমালা সংশোধন ও ক্যাডার বিষয়ক দ্বন্দ্ব অবসানে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় বাস্তবায়ন দ্রুততর করবে বলে আশা করি।
২৬ অক্টোবর-২০১৬ মাউশির ‘বেসরকারি কলেজসমূহ জাতীয়করণ সংক্রান্ত’ অফিস আদেশে: ১. অর্থ মন্ত্রণালয়ের ৫ সেপ্টেম্বর ’১৬, ২. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৬ অক্টোবর ’১৬ পত্রসূত্রে পরিদর্শনকৃত কলেজসমূহের তথ্য প্রেরণের জন্য সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পরিচালকবৃন্দকে অনুরোধ করা হয়েছে। মাউশি প্রদত্ত ছকে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে তা হলো: ১ প্রতিষ্ঠানের নাম, উপজেলা ও জেলার নাম ২. প্রতিষ্ঠার সন ৩. ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৪. নিজস্ব জমির পরিমাণ ৫. ভবনের নাম ও আয়তন ৬. এমপিওভুক্ত কি না ৬. এমপিওভুক্ত জনবল ও আর্থিক সংশ্লেষ ৭. নন এমপিওভুক্ত জনবল ও আর্থিক সংশ্লেষ ৮. প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি আছে কিনা ৯. সংশ্লিষ্ট উপজেলায় আর সরকারি কলেজ আছে কিনা ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, অনেক প্রতিষ্ঠিত কলেজও জাতীয়করণের তালিকাভুক্ত হয়নি অথচ ঐ কলেজগুলো তালিকাভুক্ত কলেজের চেয়ে মাউশির মানদ-ে জাতীয়করণের জন্য যোগ্যতর। সার্বিক পর্যালোচনায় বলতে হয়, কেবল পরিদর্শনকৃত কলেজসমূহের তথ্যের ভিত্তিতে নয় বরং মাউশির মানদ-ে যোগ্যতম কলেজটি জাতীয়করণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট উপজেলার সব কলেজের তথ্য বিবেচনায় আনা ন্যায় সংগত ও বিশেষ প্রয়োজনীয়।
প্রবল জনশ্রুতি বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে, ২০১৯-এর মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হবে। কিন্তু এমন আকাক্সক্ষার প্রণিধানযোগ্য ভিত্তি কোথায়? অন্যদিকে শিক্ষকের জীবনমানের উন্নতি ছাড়া শিক্ষার উন্নয়ন অসম্ভব। এজন্যই সর্বসম্মত জাতীয় গণদাবিÑ ‘শিক্ষা জাতীয়করণ’। কোনো কোনো আমলা, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ অনেকের বিশ্লেষণেই পাওয়া যায়Ñ ‘শিক্ষা জাতীয়করণে’র জন্য অর্থের চেয়ে নীতি ও সুস্পষ্ট ঘোষণাই বেশি জরুরি। কেননা, শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সবার সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নযোগ্য একটি চলমান প্রক্রিয়া হতে পারে। যথা, ১ম পর্যায়ে: উপজেলা সদরের একটি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা। ২য় পর্যায়ে: প্রত্যেক ইউনিয়নে জ্যেষ্ঠতা ক্রমানুসারে একটি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা। ৩য় পর্যায়ে: ১৯৭২ থেকে ২০০০-এর মধ্যের সব প্রতিষ্ঠান। ৪র্থ পর্যায়ে: সমগ্র শিক্ষাখাত জাতীয়করণ।
বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের দেশে মানুষ গড়ার কারিগরদের নিয়ে কারো যেন টেনশন নেই! বিশেষত এমপিওভুক্ত সবার যেন দ্রুত পরিবর্তনশীল চলমান বাস্তবতার সঙ্গে ছন্দপতন ঘটছে প্রতিনিয়ত। এমপিওভুক্তগণ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ও উৎসব ভাতা পান না। তারা পদোন্নতি, স্বেচ্ছাঅবসর, বদলি সুবিধাসহ অসংখ্য বঞ্চনার শিকার। এমপিওভুক্তগণ পাননি বৈশাখী ভাতা ও বার্ষিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সুবিধা! নতুন বেতনস্কেলে সরকারিগণ ৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা পেয়েছেন অনেক আগেই। কিন্তু এমপিওভুক্তগণের ৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অনিশ্চয়তায় অন্ধকারেই রয়েছে। এমপিওভুক্ত কেউই পদমর্যাদা অনুযায়ী বাড়িভাড়া পান না। চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা যা নিতান্তই অপ্রতুল। একটি ‘জাতীয়লজ্জা’ বেসরকারি শিক্ষকবৃন্দই সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র পেশাজীবী যারা সিকিভাগ (২৫ শতাংশ) উৎসবভাতা পান।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমবেত হওয়া সব পেশাজীবীরই মৌলিক অধিকার কিন্তু টিকে থাকা ও নিজেকে মেলে ধরবার সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষ গড়ার কারিগরদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত  গ্লানিকর। অভিন্ন সিলেবাসে পাঠদানকারী শিক্ষকদের প্রায় ১০০ শতাংশ বেসরকারি! এমন পটভূমিতে শিক্ষকসমাজের অন্যতম চাওয়া: এমপিওভুক্তগণের জন্য বৈশাখী ভাতা ও বার্ষিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সুবিধা নিশ্চিত করা। বিচ্ছিন্ন ও খ-িতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পরিবর্তে স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে সামগ্রিক জাতীয়করণ। পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ অথবা জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। তথাকথিত ‘শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো’র কল্পনা বাদ দিয়ে যা আছে, যেমন আছে তাকে অব্যাহত রেখে ক্রমশ তার মানোন্নয়ন, ভিত্তি সুদৃঢ়করণ বেশি জরুরি। কেননা, ‘ঢেলে সাজানো’র কথা বলে শুধু ঢালা হয় সাজানো হয় না!
য় লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।