Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

সমকালীন রাজনীতি ও নেকড়ের গল্প

| প্রকাশের সময় : ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

কালাম ফয়েজী : আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা দ্রুত নেতাশূন্য হয়ে পড়ছি। লোকজন যথাযথ নেতৃত্ব দেয়ার বদলে বাণিজ্যিক সুবিধা নেয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। সাহসী নেতৃত্ব গড়ে তোলার যে উদার-উন্নত পরিবেশ সেটা দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমরা আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য বিদেশনির্ভর হয়ে পড়ছি। বিষয়টি একটা স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অশনি সংকেত।
রাজনীতি চর্চার খোলা পথগুলো ধীরে ধীরে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং বুনিয়াদি লোকজন রাজনীতির ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। যারা বংশ পরম্পরায় সমাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তারা নানান উচ্ছৃঙ্খলতা ও অসম্মানজনক পরিস্থিতি দেখে পিছিয়ে যাচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সে স্থান দখল করছে অসাধু-অশিক্ষিত ও অপরিচ্ছন্ন লোকজন। ফলে রাজনীতির যে মূল্যবোধ ও মর্যাদা তা নষ্ট হয়ে পড়ছে। তাতে উচ্চমার্গীয় লোকজন ঘরে ফিরে যাচ্ছেন এবং তাদের বংশধররা কুৎসিত দর্শন সমাজব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এমন কি কেউ কেউ তাদের সন্তানদের দেশে রাখা এবং দেশের স্বার্থে কাজে লাগানোর বদলে বাইরের উন্নত দেশে পাঠিয়ে দেয়াকেই নিরাপদ ভাবছেন।
সকলে জানেন, সঙ্গীত-সাহিত্য-শিল্পকলা চর্চার জন্য অনুকূল পরিবেশ লাগে। যেখানে মাছের বাজার আর চালের আড়ত, সেখানে বসে সাহিত্য চর্চা হয় না। ঠিক তেমনি রাজনীতি চর্চার জন্যও পরিবেশ লাগে। আমরা সামরিক শাসনের নিন্দা করি। কারণ সামরিকতন্ত্রে জনগণের ভোটাধিকার, বাক-স্বাধীনতা, অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকারও খর্ব হয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা বা একনায়কতান্ত্রিক পরিবেশে কি গণতন্ত্রের বিকাশ হয়? মোটেই না।
আমরা সবাই জানি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় কবি। তাদের বক্তব্যে পরাধীনতার কথা আছে এবং বিদেশি শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার বক্তব্য আছে। কিন্তু গণতন্ত্রের কথা নেই। নেই এ জন্য, বৃটিশ ভারতে তখন পর্যন্ত গণতন্ত্র চর্চা ও ভোটাধিকার প্রয়োগের দিন আসেনি। ভোট দান আর গণতন্ত্রের কথা এসেছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। মুশকিল হলো স্বদেশী শাসনের যুগেও গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে হিন্দু-মুসলমানের দ্বিধা-বিভক্তির ফলে। ভাবখানা এমন ছিল, অমুক ধর্মের লোকেরা দেশ শাসন করলে গণতন্ত্র কায়েম হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে, অন্য ধর্মের লোকেরা শাসনাধিকার পেলেও সেটাকে গণতন্ত্র বলা যাবে না। ফলে সে বিভক্তির পথ ধরে ভারতবর্ষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। দুই ভাগ না হয়ে যদি আরব বিশ্বের মতো একসাথে আরও কয়েকটা ভাগ হতো, তাহলে আর সমস্যা থাকত না। থাকলেও তা এমন প্রকট আকার ধারণ করত না।
পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সুবিধা ছিল এই, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এ অংশটি হাজার মাইল দূরে বিধায় চাপ প্রয়োগ এবং দাবি আদায়ে সুবিধা হলো। ভাষার দাবি, গণতন্ত্রের দাবি, সমঅধিকারের দাবি ইত্যাকার দাবি আদায়ের আন্দোলনগুলো অবশেষে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয় এবং সশস্ত্র যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করল। যার অনিবার্য পরিণাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা। অথচ এটি পাকিস্তানের অংশ না হয়ে যদি ভারতের অংশ হতো তাহলে স্বাধীনতার জন্য নিশ্চিত অনন্তকাল ধরে অতলান্ত রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়ার প্রয়োজন হতো। যেমন প্রয়োজন হচ্ছে কাশ্মীরিদের,  প্রয়োজন হচ্ছে নাগাল্যান্ডবাসী, অসমীয় ও মনিপুরীদের।
এখন এমন একটা সময় এসেছে যখন কেউ গভীর মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে চায় না, আন্তরিকতা সহকারে কাজ করতে চায় না, সাধনায় লিপ্ত হয়ে বড় অর্জন চায় না, কষ্ট করে শিখতে চায় না বা নিবিড়ভাবে চর্চা করে না। প্রতিযোগিতা হচ্ছে কাকে মেরে কে খাবে এবং কার আগে কে কাম্যবস্তু হাসিল করবে। কিন্তু মুশকিল হলোÑ সাধনার অর্জন আর শর্টকাট অর্জন যে কখনো সমান না এটাও কেউ বুঝতে চায় না।
আমাদের লোকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা, চাই সে শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত, তার ভিতরকার অস্থিরতার অন্ত নেই। কী কৃষক, কী ব্যবসায়ী, কী দোকানদার, কী রাজনীতিক, কী ছাত্র, কী অভিভাবক, কী অভিনেতা-অভিনেত্রী সকলে দ্রুত পরিচিত ও সম্মান পাবার জন্য ব্যাকুল। একটা ছবি এঁকে, একটা কবিতা লেখে খ্যাতির চূড়া স্পর্শ করতে চায়। মিছিলে একদিন এসে দলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে চায়। এটা কি এত সহজ! বুঝতে হবে সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুর নিজস্বতা আছে। সেই নিজস্বতাকে ভেঙে আপনার প্রয়োজনে কাজে লাগানোর জন্য তার পেছনে মেহনত করতে হবে। যেমন আপনি গাছ দিয়ে ফার্নিচার বানাতে চান। গাছ দিয়ে আপনার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ফার্নিচার। সেই গাছ থেকে ফার্নিচার বের করে আনা কি একদিন বা এক সপ্তাহে সম্ভব? যদি আপনি সময় নিয়ে কাজ করেন এবং বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা নেন আপনি অবশ্যই উৎকৃষ্টমানের ফার্নিচার পাবেন। শর্ত হলো আপনাকে কসরত করতে হবে এবং ধৈর্য রাখতে হবে।
আপনার হয়তো একখ- জমি আছে। জমি আপনার বলেই সে জমি আপনার কথা শুনবে না। শোনাতে সময় লাগবে। আপনি জমির কাছে গিয়ে যদি বলেনÑ এই জমি, এখন থেকে তুমি আগাছা জন্ম দিতে পারবে না। আমি যা বলব তা-ই ফলাতে হবে। জমি কি আপনার কথা শুনবে? শুনবে না। শোনার একটা নিয়ম আছে। আপনাকে প্রথমে সে নিয়মের দ্বারস্থ হতে হবে। সময় নিয়ে জমিতে চাষ দিতে হবে। আগাছা সম্পূর্ণ পরিষ্কার করতে হবে। তারপর আপনি যে ফসল ফলাতে চান তার বীজ ফেলতে হবে। সেটা যব হোক বা ভুট্টা, ধান হোক বা পাট। যে বীজ ফেলবেন সে ফসলই ক্ষেতে উৎপন্ন হবে। কিন্তু শর্ত হচ্ছে জমিকে আপনার বাগে আনতে হবে। তার পেছনে কসরত করতে হবে। আপনার উপযোগী করে আপনি যদি তাকে ব্যবহার করতে না পারেন তার মধ্যে আপনার অদক্ষতাই প্রমাণিত হবে।
একইভাবে নতুন ঘোড়া, নতুন গরু, নতুন গাড়ি মালিকের কথা সহসা মানতে চাইবে না। তাই বলে পিটিয়ে ছাল তুললে আপনার কর্তৃত্ব প্রতিফলিত হবে না। আপনি যদি এসবকে চিরদিনের জন্য আপনার করে পেতে চান তবে এর পেছনে একটু সময়, একটু ভালোবাসা দিতে হবে। তা না হলে প্রয়োজনের সময় এদের আপনি আপনার মতো করে পাবেন না।
বাদশা সোলাইমানের সিংহাসন তার লোক লস্কর নিয়ে হাওয়ায় উড়ত বলে আমরা জানি। একবার স্থানান্তরে যাবার সময় সিংহাসন বারবার কাত হয়ে যাচ্ছিল। তিনি সিংহাসনকে বললেনÑ তখত, ঠিক হও। তখত বলল, “সোলাইমান, আগে আপনি ঠিক হন, তাহলে আপনি আমাকে ঠিক পাবেন।” অবশ্য এ কথার অন্য আধ্যাত্মিক অর্থও আছে। মোটা অর্থ হলোÑ আপনি যে গাড়ি চালান সেটাও বিকল হতে পারে। সেটাও মাঝপথে থেমে যেতে পারে। গাড়ি বিকল হলে তার ওপর আদেশ জারি করে বা পিটিয়ে ঠিক করা যাবে? মোটেই না। ঠিক করার জন্য মেরামতকারীর সাহায্য নিতে হবে।
আপনি যে জনতাকে নিয়ে রাজনীতি করেন। যে অনুগত কর্মীরা নিত্য আপনার পক্ষে স্লোগান দেয়, নেতা হিসেবে মান্য করে, আপনি তাদের দুশমন ভাবতে পারেন না। যদি কখনো তারা দুশমনিতে লিপ্ত হয়, নির্দেশ অমান্য করে তাহলে বুঝবেন সেটা হয়তো আপনারই ভুল। আপনি দৈনিক যে পিয়ানো বা গিটারে সুর তোলেন, সে অবোধ যন্ত্রেও যদি সুর না ওঠে বুঝতে হবে, সেটা গিটার বা পিয়ানোর দোষ না। দোষ আপনার নিজের।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুজন মানুষের নাম চিরভাস্মর হয়ে থাকবে তাদের বীরত্ব বুদ্ধিমত্তা ও অবদানের জন্য। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের যে মূল্য স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের সে মূল্য। তারা হয়তো কবি নন, কিন্তু নিশ্চিত জানবেন তারা কবিতার বিষয়বস্তু। তারা অনাগত কবিদের কবিতা রচনার অবাধ ক্ষেত্র রচনা করে গেছেন। জাতির স্বকীয় পরিচিত ও সমৃদ্ধি বিনির্মাণে তাদের যে আকাশছোঁয়া অবদান তার তুলনা মেলা ভার।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, দুজনের দুই রাজনৈতিক দর্শন অনুসারে চলমান যে দুটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল তা তাদেরই অবদানের অংশ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পদ্মা-যুমনার মতো দুটি ধারায় বহমান। যেমন দুই ধারায় চলছে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীত। আমার চোখে এখন পর্যন্ত এমন শিল্পী দেখিনি, যিনি একাধারে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীতে পারদর্শী। দুই মস্ত কবির রচিত গানগুলো যদিও সঙ্গীত, তাই বলে দুই সুরকে একত্র করে গাওয়া এত সহজ না। যেমন সহজ না দুই নদীকে একত্রে প্রবাহিত করার ব্যর্থ চেষ্টা করা।
যদি এমন হয়, রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পীগোষ্ঠী আর নজরুল সঙ্গীত শিল্পীগোষ্ঠী দুই দলে দলাদলি শুরু হলো। একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করল। একদল কবি নজরুলকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, আর রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজদের পক্ষের শক্তি ভাবতে বা বলতে শুরু করল তাহলে কেমন হবে? একদল মঞ্চে উঠল, তাদের দলকে ঝাঁটাপেটা করে দেশ ছাড়ার কথা বলল বা এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকল। তাহলে ভদ্রলোকরা একে কীভাবে নেবে? কীভাবে এর বিচার করবে? নাকি দলাদলির জন্য সাধারণরা দুই দলেরই নিন্দা করবে।
একই অবস্থা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও প্রযোজ্য। এখানে অতি শক্তিশালী ও জনপ্রিয়তম দুজন নেতার আদর্শে দুটি রাজনৈতিক ধারা প্রবাহমান। দুই দলের কোটি কোটি সমর্থক। দুই দলেরই দীর্ঘদিন রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে। সকলেই দেশের উন্নতির জন্য বেশুমার কাজ করেছেন। কাজ করতে গিয়ে বেশুমার ভুলেরও জন্ম দিয়েছেন। তার মধ্যে শুরু হলো এক দলকে আরেক দল দ্বারা খাটো করার প্রবণতা। শুধু দলকে খাটো করেই তারা ক্ষান্ত হননি, যে নেতাদের আদর্শে দল গঠিত সেই নেতাদের নিয়েও যাচ্ছেতাই মন্তব্য শুরু করলেন। একদল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবিদার, আরেক দলকে তারা রাজাকার বানানোর জন্য মরিয়া। অন্য দলও কিন্তু বসে নেই। তারা তাদের প্রতিপক্ষ দলকে ভারতের আজ্ঞাবাহী, গণতন্ত্র হত্যাকারী, লুটেরা, খুনি, জনবিচ্ছিন্নÑ এমনি নানান বিশেষণে বিশেষায়িত করে চলেছে।
যদি দোষারোপের প্রক্রিয়াটা শালীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত সেটা নিয়ে কেউ কথা বলত না। রাজনীতি-সাহিত্য নিয়ে সমালোচনা হয়, থাকবেÑ এটা খুব স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হলো কাপড় তুলে গালি দেয়া, কুকুর লেলিয়ে দেয়া, পাকা ধানে মই দেয়া, পাতের ভাত কেড়ে নেয়া এবং অকারণে নির্যাতন করা। এসব দেখে ভদ্রলোকরা হাসবে, না কাঁদবে দিশা পায় না। দিশামিশা না পেয়ে ইজ্জত বাঁচানোর স্বার্থে তারা যোজন যোজন দূরে সরে যাচ্ছে। তারা ওই অন্ধকূপে বা অশালীন অন্ধকার জগতে নিজেরাও যেতে চায় না, নিজেদের উত্তর পুরুষদেরও যেতে দিতে চায় না। বিষয়টার সুযোগ নিচ্ছে হায়েনা বা নেকড়ের মতো ওঁতপেতে থাকা সুযোগসন্ধানী আঁতেল-তাঁবেদার গোষ্ঠী।
বলছিলামÑ বর্তমান অসুন্দর অমঙ্গলজনক রাজনীতির কথা। জগতের যত ফ্যাসিবাদী শাসক সবাই দোর্দ- প্রতাপের পর একটা সময় ফেরাউন বা কংসের মতোই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কিন্তু মাঝপথে ক্ষতি হয় দেশের ও দেশের জনগণের। ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হয় দেশের নিরীহ জনতা। এর মধ্যে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যাদের এগিয়ে আসার কথা তারাও পিছিয়ে যায় ইজ্জত ও জীবনের ভয়ে। তখন সুযোগ নেয় মোড়ল আর নেকড়েরা।
দীর্ঘকাল ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের দেশে নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া চালু ছিল। পরাধীন বাংলাদেশে নিয়মিত ডাকসু, চাকসু, রাকসু নির্বাচনসহ কলেজ সংসদ নির্বাচন হয়েছে সুষ্ঠুভাবে। কে কোন দলের প্রার্থী বা কোন দল থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হলো, তার চেয়ে কর্তৃপক্ষ লক্ষ্য রাখতেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা সুষ্ঠু হচ্ছে কিনা এবং ভোটাররা সুন্দরভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে কিনা তার ওপর। সেই পরাধীন বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। প্রশ্ন উঠল ১৯৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচন নিয়ে। আজকের নেতৃস্থানীয় সকলে সাক্ষী আছেন কীভাবে ভোটপ্রয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, কী জঘন্য প্রক্রিয়ায় ভোটবাক্স ছিনতাই হয়। ১৯৭৫ এর পর জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের শাসনামল তথা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ডাকসুসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কলেজ-ইউনিভার্সিটিগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। নির্বাচন বন্ধ হয়ে গেল তথাকথিত সংসদীয় গণতান্ত্রি¿ক ধারা প্রবর্তিত হওয়ার পর। সেই যে নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ হলো, সে অচলাবস্থা এখনো অব্যাহত আছে।
আমার ভয় হচ্ছে এ রুদ্ধধারা চলতে থাকলে আগামী দিনে দেশ পরিচালনার জন্য ত্যাগী ও তেজী, সাহসী রাজনীতিক নয়, আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে অনুগত সামরিক-বেসামরিক আমলাদের দিকে। যদি তা-ই হয় তাহলে বর্তমানে যে অগণতান্ত্রি¿ক ধারায় দেশ শাসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এতে দেশ ও দেশের অগ্রগতি রসাতলে যাবে বৈ কি! কারণ, সকলে জানেন- অনুগত লোকদের দিয়ে আর যা হোক দেশ পরিচলনার মতো বৃহৎ কর্ম চলতে পারে না। দেশ পরিচালনার জন্য সাহসী নেতা দরকার। যদি কাক্সিক্ষত সেই নেতার জন্ম না হয়, ওপেন রাজনীতি চর্চা করা না যায়, তবে প্রয়োজনের সময় নেতা আমরা কোথায় পাব?
যারা বর্তমানে ক্ষমতায় আছেন, তারা যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকাকেই রাজনীতির অংশ বলে ভাবছেন। এ অপরাজনীতিকে কেউ কেউ স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গেও তুলনা করছেন। কারণ এতে রাজনীতিকরা রাজনীতিবিমুখ হচ্ছেন, সাধারণরা জীবন-জীবিকা বিষয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আসল কথা হচ্ছে, দেশের মানুষ যা-ই ভাবুক অথবা দেশ গোল্লায় যাক ক্ষমতা ধরে রাখাই হয়তো ওই দলের একমাত্র লক্ষ্য। মনে রাখতে হবে সেটা রাজনীতিও নয়, আর তার মধ্যে কল্যাণও নেই। তারা একসময় প্রয়োজনের স্বার্থে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম দিয়েছিলেন এবং একে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের সাথে তুলনা করেছিলেন। দুধ-কলা দিয়ে তাদের লালন করে তাদের মুখ দিয়ে কত না কুৎসিত কথা বলিয়েছেন। আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের জুতাপেটা করে উচ্ছেদ করতেও দ্বিধা করেননি। এ নাটক যারা দক্ষতার সাথে মঞ্চস্থ করিয়েছেন তারা প্রয়োজনের তাগিদে কী না করতে পারেন, কিন্তু একজন ভালো নেতার জন্ম দিতে পেরেছেন কি?
লোকে বলে, আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় স্বার্থ রক্ষা আর ক্ষমতার জন্য পারে না এমন কোনো কাজ নেই। তারা যা-ই পারুক সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমার ভয়, অতিরিক্ত পারতে গিয়ে তারা যদি ঘরের মানুষকে শত্রু বানিয়ে ফেলেন, তাদের অবিরাম শায়েস্তা করতে থাকেন, অসুর শক্তির সমর্থনে বাইরের মতলববাজ লোকদের ডেকে আনতে থাকেন, তার পরিণতি কিন্তু‘ ইরাক, সিরিয়া বা আফগানিস্তানের চেয়ে ভালো হবে না বৈকি!
 লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।