Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ২৭ চৈত্র ১৪২৬, ১৫ শাবান ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

শিশুই যেখানে শিশুর রক্ষক

প্রকাশের সময় : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মিজান মাহমুদ, সাতক্ষীরা থেকে ফিরে : বাঁচতে হলে শিখতে হবে - এই ধরনের স্লোগান বেশ প্রাসঙ্গিক সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চল বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডোমর গ্রামে। যেখানে পাঁচ বছর বয়সেই জীবিকার তাগিদে হাতে হাতুড়ি তুলে নিয়েছে শিশু সাকিম হোসেন। দক্ষিণের এই জেলার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দর বনের কোলঘেঁঘা এ এলাকায় সাকিমের মতো অনেক শিশুকেই বিদ্যালয়ে পা রাখার আগেই নামতে হয় জীবনযুদ্ধে, মুখোমুখি হতে হয় কঠিন-কঠোর বাস্তবতার। এসব শিশুর কারও বাবাকে বাঘে খেয়েছে। কারওবা বাবা জলদস্যুদের নির্মম নির্যাতনে নিহত হয়েছেন। পিতাহারা শিশুদের বেশিরভাগই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সুন্দরবনের নদী-জঙ্গলে জীবন সংগ্রামে নামতে বাধ্য হয়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এসব শিশুকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে ইউনিসেফের আর্থিক সহায়তায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় চাইল্ড সেনসেটিভ প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ (সিএসপিবি) নামক একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ৪২ শিশুকে শিক্ষাসহ সব ধরনের আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে বুড়িগোয়ালিনী ও শ্যামনগর ইউনিয়নের ১২ শিশু রয়েছে। প্রকল্পের আওতাভুক্ত শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসাসহ অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতি ছয় মাস অন্তর দেয়া হচ্ছে ১৮ হাজার টাকা। কথা হয় সিএসপিবি প্রকল্পের আওতাভুক্ত বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডোমর গ্রামের শিশু সাকিমের সঙ্গে।
বুড়িগোয়ালিনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র সাকিম জানায়, ৪ বছর বয়সে সে তার বাবাকে হারায়। সুন্দরবনে কাঁকড়া ও বাগদার পোনা আহরণ করে তার বাবা শফিকুল গাজী জীবিকা নির্বাহ করতেন। একদিন বনে গিয়ে তিনি আর ফিরে আসেননি। মুক্তিপণের দাবিতে দস্যুরা প্রথমে তার বাবাকে অপহরণ করে। হতদরিদ্র সাকিমের পরিবারের পক্ষে সে দাবি পূরণ করতে না পারায় দস্যুদের নির্মম নির্যাতনে মৃত্যু হয় তার বাবার। এরপর মা সাকিমকে নিয়ে চলে যান ভারতে। কিছুদিন পর মার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। শুরু হয় সাকিমের জীবনের নতুন সংগ্রাম। জীবিকার তাগিদে ছোট্ট সাকিম হাতে তুলে নেয় হাতুড়ি। সারা দিন ইট ভাঙার উপার্জনে জুটত তার খাবার। এভাবে কেটে যায় আরও বেশ কিছুদিন। বছরখানেক পর পরিচিত একজনের সহায়তায় দেশে ফিরে সাকিম। এরপর সাকিমকে যুক্ত করা হয় সিএসপিবি প্রকল্পের আওতায়।
এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত একই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী মিনারা বেগম সাথী জানায়, সুন্দরবনে কাঁকড়া শিকার করতে গিয়ে বাঘের শিকারে পরিণত হন তার বাবা মনিরুল গাজী। সাকিম, মিনারার মতো প্রকল্পের আওতাভুক্ত অন্য শিশুদের বাবাও জলদস্যু অথবা বাঘের হাতে প্রাণ দিয়েছেন অথবা নিখোঁজ রয়েছেন বছরের পর বছর। তাদের পরিবারগুলো শিকার হচ্ছেন দারুণ অসহায়ত্বের।
ইউনিসেফের খুলনা বিভাগের প্রোগ্রাম অফিসার (প্লানিং অ্যান্ড মনিটরিং) মোঃ আমান উল্লাহ বলেন, ৭ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা এ প্রকল্পের আওতায় আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকে। এ প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার মূল শর্ত হচ্ছে, বিদ্যালয়ে শিশুর নিয়মিত উপস্থিতি, বাল্যবিয়ে এবং শিশুশ্রম থেকে সুরক্ষা প্রদান। নির্বাচিত শিশুকে মাসিক ২ হাজার টাকা করে ১৮ মাসের মোট ৩৬ হাজার টাকা ১২ হাজার টাকার তিন কিস্তিতে প্রদান করা হয়। এ বিষয়টি তদারকি করার জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে সমাজকর্মী রয়েছেন। তিনি জানান, এ প্রকল্পে শিশু বাছাই প্রক্রিয়াতেও যথেষ্ট স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়।
প্রথমে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মাধ্যমে প্রকল্পের শর্তমতো শিশুর তালিকা তৈরি করা হয়। সে তালিকা ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেয়া হয়। চেয়ারম্যান তালিকাটি যাচাই-বাছাই করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফের যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। প্রকল্পটির মেয়াদ এ বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন সমাজকর্মী ইদ্রিস আলী জানান, সিএসপিবির আওতাভুক্ত শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বছরে দুইবার বিদ্যালয় থেকে প্রত্যয়নপত্র নেয়া হয়। তাছাড়া এসব শিশুর বাড়ি বাড়ি গিয়েও লেখাপড়ার বিষয়টি তদারকি করা হয়। এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম বলেন, সিএসপিবি শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম ২০টি টঘউঅঋ ভুক্ত জেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলের প্রায় অর্ধশত বঞ্চিত শিশু বিদ্যালয়মুখী হয়েছে। প্রকল্পটি শিশু নির্যাতন, অবহেলা, শোষণ ও পাচার বিলোপ সাধনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
দেশে শিশু হত্যা নির্যাতন, অবহেলা, শোষণ ও পাচার যখন আজকের দিনে প্রায় নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে,তখন সাতক্ষীরার উপকূলে দেখা যায় একেবারে ভিন্ন চিত্র। সেখানে শিশুরাই শিশুদের সুরক্ষার ব্যাবস্থা গ্রহণ করছে এটি খুবই প্রশংসার দাবি রাখে। শিশুদের উদ্যোগে গড়ে উঠছে শিশু সুরক্ষা ক্লাব, হচ্ছে বৃন্দ অলোচনা, রেডিও লিচেনার প্রোগরাম ও উঠুন বৈঠক। সরকার, ইউনিসেফ ও স্থানীয় সচেতন অভিভাবকরা তাদের সহায়তা দিচ্ছেন। বলা যায়, এদের সময়োপযোগী তৎপরতা, শিশু কন্যাদের শুভবুদ্ধি ও দুঃসহসী সিদ্ধান্ত এ ক্ষেত্রে ভীষণ কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। এ ধরনের দুটি সাম্প্রতিক ঘটনার শিকার দুই কন্যা সাহসীকাই জানালো তাদের সুরক্ষার সেই ঘটনা।
নিজের হার না মানা প্রচেষ্ট, রূপান্তর কর্মীদের অনুপ্রেরণা আর প্রশাসনের সহযোগিতায় শিশু বিয়ের বলি থেকে নিজেকে রক্ষা করে শারমীন। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের টেংরাখালী গ্রামের অতি সাধারণ এক শিশু সে। তার বাবার নাম মোঃ আনিচুর রহমান মোল্লা, মাতা দোলেনা বেগম। দুই ভাই বোনের মধ্যে সে ছোট। এ বছর স্থানীয় ভেটখালী এ করিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে সে। তার এলাকায় শিশুদের জন্য কাজ করা রূপান্তর এর মাধ্যমে স্থানীয় কিশোর-কিশোরী ক্লাবে যুক্ত সে। শিশু বিবাহ, শিশু নির্যাতন, শিশু শ্রম ইত্যাদি বিষয়ে ইতিমধ্যে বেশ ধারণা অর্জন করেছে আগেই। গ্রামের আর ১০টা মেয়ের মতো সামনে চলার বাসনা তার। কিন্তু কে জানতো তার অতি সাধারণ বাসনা এলোমেলো করে ফেলবে অনাকাক্সিক্ষত এক ঝড়। সুন্দর জীবনের আগামীর পথে তাকে হোচট খেতে হবে।
ওদিকে, রূপান্তর জনসম্পৃক্ততায় সামাজিক রীতি ও আচরণ পরিবর্তন প্রকল্প-এর আওতায় কিশোর-কিশোরী ক্লাবে নেতৃত্ব দেয় শারমীন। শিশু বিবাহ, শিশু নির্যাতন, শিশু শ্রম ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন করে মানুষদের। সেই সচেতন কিশোরী শারমীনকেই মুখোমুখি হতে হয় শিশু বিয়ের খড়গের নিচে। এলাকার এক প্রভাবশালীর ছেলের সাথে গত ৩১.১২.১৫ তারিখে তার বিয়ের দিন পাকা হয়। শুরু থেকেই বাবা-মাকে বুঝাবার চেষ্টা করে সে। কিন্তু ফল হয়না কিছুই। এবার ক্লাবের বন্ধুদের সাথে পরামর্শ, তাতেও কোনো কূল-কিনারা হয় না। অবশেষে রূপান্তর কর্মীদের সাথে আলাপ করে এবং উপজেলা প্রশাসনের সামনে হাজির হয় সে। লিখিত অভিযোগ আনে বিয়ের সাথে যুক্ত সকলের বিরুদ্ধে। শিশু বিয়ে প্রতিরোধে আপোসহীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সায়েদ মোঃ মনজুর আলম ঘটনাটিকে অতি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ছেলে, ছেলের বাবা, মেয়ের বাবা, মা ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ সকলকে তলব করে উদ্ভূত ঘটনার সুন্দর সুরাহা করেন। এমনকি শারমীনের নিরাপত্তাসহ লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির আশ্বাস দেন। মুচলেকা ও এক হাজার টাকা নগদ জরিমানা আদায় হয়। অবশেষে শিশু বিয়ের খড়গ থেকে রক্ষা পায় শিশু শারমীন। সে এখন ফিরে গেছে বিদ্যালয়ের আঙিনায়। সে লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হয়ে বাবা-মাকে সাহায্য করতে চায় সে।
রূপান্তর কর্মীদের চেষ্টায় আর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে শিশু বিয়ের শিকার থেকে রক্ষা পাওয়া আরেক শিশু ফেরদৌসী। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের হরিনগর গ্রামের শিশু সে। তার বাবার নাম মোঃ শফিকুল গাইন, মাতা মৃত রওশনারা বেগম। গ্রামের মেয়ের মতই বাসনা তার। কিন্তু মাত্র ৫ম শ্রেণিতে পড়াকালে তার অতি সাধারণ ইচ্ছা এলোমেলো হয়ে যায়। সুন্দর আগামীর পথে আসে প্রবল বাধা। এই বয়সে ঠিক করা হয় তার বিয়ের দিন তারিখ। স্থানীয় এসজিও রূপান্তর ও জনসম্পৃক্ততায় সামাজিক রীতি ও আচরণ পরিবর্তন প্রকল্প-এর আওতায় শিশু বিবাহ, শিশু শ্রম, শিশু নির্যাতনসহ ১১টি বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে ওই এলাকায় হোম ভিজিট, দলীয় আলোচনা, উঠান বৈঠক নিয়মিতভাবে চালিয়ে যেতে থাকে। গঠন করা হয় কিশোর-কিশোরী দল। তারাও কাজ করে এই কু-প্রথার বিরুদ্ধে। গত ৬.৮.১৫ তারিখে কিশোর মাহমুদুল হাসান জানতে পারে এই বিয়ে নামক পুতুল খেলার কথা। দ্রুত যোগাযোগ করে রূপান্তর কর্মী এলাকার কৃষ্ণ দাশ ম-ল ও শরিফুল ইসলাম-এর সাথে। এ ব্যাপার তার কু-প্রথা এবং এর ক্ষতিকর দিক আলোচনা করে কিন্তু ফলাফল হয় শূন্য। হাল ছাড়ে না, তারা কথা বলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোড়লের সাথে। তিনি অভিভাবকদের পরিষদে ডেকে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে তাদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করে ঘটনার একটা সুরাহা করেন। শিশু বিয়ের খড়গ থেকে রক্ষা পায় শিশু ফেরদৌসী।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ