Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

ইলমে দীনের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

| প্রকাশের সময় : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান : অধুনা বিশ্বে কেউ কুরআন বিশারদ বা মুফাসসির, কেউ শায়খুল হাদীস, কেউ দেশবরেণ্য মুফতী, আরবি ভাষাবিদ আবার কেউ ইংরেজি ভাষায় প-িত, কেউ কেউ আছেন মসনবীর ভাষা ফার্সীতে অনন্য প্রতিভার অধিকারী আবার কাউকে দেখা যায় ইকবালের উর্দু সাহিত্যের গবেষক আবার এমন কেউ আছেন ইবনে আরাবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির আল ফাতুহাতুল মাক্কীয়া, গাউসুল আজম আব্দুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির সিররুল আছরার, শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ফুয়ুজুল হারামাইন ও হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার আন্তর্জাতিক মানের ওস্তাদ। কিন্তু সবাইকে এক সাথে সব বিষয়ের মুহাক্কিক আলিম হিসাবে আখ্যা দেওয়া সম্ভব না হলেও মাওলানা এম এ মান্নান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন এ ধরনের হাজারো বিষয়ের জ্ঞানভা-ার। যারা তাকে দেখেছেন, তার বক্তব্য শুনেছেন, খোৎবা শুনে আপ্লুত হয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে তার সোহবতের সুযোগ পেয়েছেন তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হবেন মাওলানা এম এ মান্নান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি একটি নাম নয়, একজন ব্যক্তি নন, একটি প্রতিষ্ঠান নন, তিনি ছিলেন ইলমে দীনের একটি চলন্ত ও জীবন্ত লাইব্রেরি। ইলমের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার এ ইলম পুথিগত নয়, শুধুমাত্র ক্লাসের পড়া নয় এ ইলম লওহে মাহফুজ থেকে নুরের চ্যানেল হয়ে জাবালে নুরের স্পর্শে নুর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নেগাহে করমে তার নানা জিন্দা ওলী হযরত আব্দুল মজীদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং তার পিতা কুতুব পর্যায়ের ওলী হযরত শাহ ইয়াছীন রাহমাতুল্লাহি আলাইহির খাস ফয়েজ এবং মুজাদ্দেদে জামান হযরত আবু বকর ফুরফুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বিশেষ ফয়েজপ্রাপ্ত ইলম। যা কলম দিয়ে, কাগজ দিয়ে বা গতানুগতিক ওস্তাদের কাছে শিক্ষা করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই তো বিশ্ব কবি, মুসলিম জাগরণের কবি, আধ্যাত্মিক কবি ড. আল্লামা ইকবাল বলেছিলেন “না স্কুলুউঁছে না কালেজুউঁছে না কিতাবুউঁ কি ওরাকুউঁছে - ইনসান বনতা হ্যায় বুযুর্গুউঁকি এক নজরছে” অর্থাৎ স্কুল, কলেজ বা কিতাবের পাতায় নয় বুযুর্গদের একনজরে মানুষ মানুষ হয়।  যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন - ওটা আল্লাহরই অনুগ্রহ তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। (সুরা মায়েদা - ৫৫)
১৯৮৪ সাল আমতলী জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে দেশবরেণ্য আলেমগণ উপস্থিত। সন্ধ্যা সাতটায় আমি হুজুরের সাথে দেখা করতে গেলাম। দেখা মাত্রই তিনি বললেন, ‘ভাতিজা আমার সামনে বোখারী শরীফের এবারত পড়তে পারবে?’ বললাম, হযরত আপনার ভাতিজা তাইতো পারব। বড় হুজুর হযরত আব্দুস সালাম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, তুমি কি জান না আমার বাবা মাহবুব ঢাকা আলিয়া মাদরাসা হোস্টেলে ঘণ্টারপর ঘণ্টা বোখারী শরীফের দরস দেয়? বললাম, বড়হুজুর কেবলা, হযরত মাওলানা আব্দুল মান্নান হুজুর যে ইলমের জাহাজ তার পড়া আর আমার পড়া কিন্তু সমান নয়। এরপরেই তিনি শুরু করলেন বোখারী শরীফের তরজমাতুল বাব বা হেডলাইনের ব্যাখ্যা। চল্লিশজন প্রিন্সিপাল উপস্থিত, তার তকরীর শুনে পাবনা আলিয়ার প্রিন্সিপাল হযরত আল্লামা ছদরুদ্দীন হুজুর বলে উঠলেন, হযরত এই পর্যন্ত কমপক্ষে চল্লিশটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ আমি পড়েছি কিন্তু আজকে যা শুনলাম সবই নতুন ও বাস্তব। আপনি কার কাছে শিখেছেন? কোন কিতাবে এসব পেয়েছেন? জবাবে বললেন, ‘প্রিন্সিপাল ছদরুদ্দীন! আপনি তো একটি পুকুরে ডুবুরী হয়ে ওই পুকুরের মাছ শিকার করেছেন আর আব্দুল মান্নান তার নানা ও বাবার সাথে সাগর পাড়ি দিয়েছে। ইলমে লাদুন্নী ছাড়া প্রকৃত ইলম হয় না।’ এরপর আবার বললেন, ভাতিজা কুরআনের আয়াত ও সুরাগুলোর তারকীব বা বাক্যবিন্যাস জানা আছে? বললাম, হযরত আপনার দোয়া থাকলে তারকীব করতে পারব কিন্তু আপনার মত নয়। তিনি বললেন, আব্দুল মান্নান ৬৬৬৬ আয়াতের এই ত্রিশ পারা কুরআনের এক তরকীবে এক বাক্যে মিলিয়ে দিতে পারবে। প্রিন্সিপাল হুজুররা চাতক পাখিরমত তাকিয়ে ছিলেন। আর হযরত একেরপর এক সুরার তারকীব শুরু করলেন। তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, হযরত ইলমে বালাগাত বা অলংকার শাস্ত্রের দিকগুলো যদি বলতেন। শুরু করলেন ইলমে বালাগাতের খুঁটিনাটি বিষয়ের প্রয়োগ যা সত্যিই ছিল বিস্ময়কর।
১৯৮৬ সাল ঝরঝর বৃষ্টি পড়ছে। দেখা করতে গেলাম তার সামনে পঞ্চাশের উপর আলেম উপস্থিত। আমাকে দেখেই বললেন, মাহবুব ইলমে মারেফতের কিছু পড়েছ? বললাম, হযরত মারেফত কি পড়ে পাওয়া যায়? এর জন্য তো নিসবত বা বায়াত গ্রহণ করে সোহবাত বা সাহচর্য এবং খিদমত ও মুহাব্বতের মাধ্যমে মুজাহাদা করতে হয়। আমার কথা শুনে আমাকে ডেকে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, বাবা আমার মনের কথা বলেছ। এরপর শুরু করলেন কারা ওলী, কে আবদাল, কারা আখইয়ার, কুতুব কারা, কুতুবুল আকতাবের বৈশিষ্ট্য কি, গাউসের পাওয়ার কি, আব্দুল কাদের জীলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কে গাউসুল আজম কেন বলা হয়। ওলামায়ে কেরামগণ বিস্ময়ের সাথে তার আলোচনা শুনছিলেন। তিনি যে দিন আলোচনা করছিলেন তার পূর্বেই ইলমে মারেফতের শতাধিক কিতাব আমার পড়া ছিল কিন্তু হযরত মাওলানা এম এ মান্নান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যে বক্তব্য পেশ করলেন তার বেশিরভাগই কিতাবে পাওয়া যায়নি। এ ইলম ছিল তার ফারাসাত বা দিব্যদৃষ্টি ও রূহানী ইলম। যা আল্লাহ তায়ালা আরেফদের কালবে ঢেলে দেন। তাই তো ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন “বেশি বেশি রাওয়ায়েত জানার নাম ইলম নয়, নিশ্চিতভাবে ইলম এমন এক নুর যা কালবে ঢেলে দেয়া হয়।” এই আধ্যাত্মিক জ্ঞান, শরীয়তের প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক যুগোপযোগী জ্ঞান অর্জন করেই সত্যিকারে ওয়ারিসে নবী হিসেবে দ্বীনের নেতৃত্ব দিয়েছেন যারা হযরত মাওলানা এম এ মান্নান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাদেরই একজন। এককথায় বলাযায় মাওলানা এম এ মান্নান রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে নিয়ে শত খ-ে গ্রন্থ রচনা করা যাবে, বহু পিএইচডি দেয়া যাবে কিন্তু ইলমের আকাশের এই নক্ষত্রের বয়ান শেষ হবার নয়। সমগ্র বিশ্বের আলেম সমাজ জাতীয় ও আন্তার্জাতিক নেতৃত্বের জন্য সমকালীন বিশ্বের যে কয়জন মনীষীকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে মাওলানা এম এ মান্নান তার একজন। তাই আজ প্রয়োজন তার মহান জীবনী পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা।  
লেখক : অধ্যক্ষ, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদরাসা



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।