Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মানুষের জীবন কি এতই তুচ্ছ?

| প্রকাশের সময় : ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ইফতেখার আহমেদ টিপু : সড়কপথে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। মহাসড়কে ডিভাইডার তৈরি হয়েছে। শ্লথগতির যানবাহন নিষিদ্ধ করেও দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটছে চালকদের কারণে। বেপরোয়া গতির যানবাহন ও অদক্ষ চালকের কারণেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। অনেক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে আসে না।
অভিযোগ আছে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ চালকের কোনো বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। আবার বৈধ লাইসেন্সধারী চালকদের ৩১ শতাংশ কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেননি। দেশের বেশির ভাগ গাড়িচালকের যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশিক্ষিত না হয়েও স্বশিক্ষিত চালকদের বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে শিক্ষাগত যোগ্যতার। গাড়ি চালানোর মতো পেশায় দক্ষতার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতাও থাকতে হয়। মহাসড়কে যেসব চালক আন্তঃজেলা বাস বা ট্রাক চালান, তাদের শারীরিক সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ। একজন চালক দীর্ঘপথ গাড়ি চালিয়ে আসার পর আবার ট্রিপ ধরে চলে যান। বিশ্রামের কোনো সুযোগ থাকে না। এভাবে টানা গাড়ি চালাতে গিয়ে শরীরে ক্লান্তি ভর করারই কথা। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে দুর্ঘটনা ঘটেছে এ কারণেই। চালক বাস চালাচ্ছিলেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। যাত্রীরা তাকে বিশ্রাম নিতে বললেও তিনি তা শোনেননি। বাসটি দুর্ঘটনায় পড়েছে। ছয়টি দরিদ্র পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। বাসের চালক ও তার সহকারী পলাতক। হয়তো একদিন সাক্ষীর অভাবে মামলাটিও চাপা পড়ে যাবে। বাসটি আবার চলতে শুরু করবে মহাসড়কে। এই চালকই হয়তো বাসটি চালাবেন।
সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি। সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ যানবাহনই চলাচলের অযোগ্য। অদক্ষ চালক, চলাচল অনুপযোগী গাড়ি, নজরদারিতে ট্রাফিক পুলিশের গাফিলতি বা অসাধুতার কারণেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। যানবাহন ও যাত্রী বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। নিয়ন্ত্রণে জোরদার কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। আইনের দুর্বলতা ও মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। সেই সঙ্গে আছে দেশি প্রযুক্তিতে  তৈরি শ্লথগতির বাহন।
প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বাড়ছে মৃত্যুর ঘটনা। আবার কোনো ঘটনা এমন যে, দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গোটা পরিবারও শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিংবা মারা যাচ্ছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি। ফলে এর ভয়াবহতা বিচার করে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প থাকতে পারে না।
এটা লক্ষণীয় যে, একেকটি ঘটনার পরে বলা হয় বাসের চালক ও হেলপার পলাতক কিংবা তাদের  গ্রেপ্তারে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। অথচ দুর্ঘটনা আবারো ঘটে। তবে কি ঘাতক চালক আর গাড়ির চাকার প্রবল গতির কাছে মানুষের জীবন এত তুচ্ছ? আমরা মনে করি, মৃত্যু মানুষের স্বাভাবিক নিয়তি হলেও দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার দায় সংশ্লিষ্টদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সাধারণত ফুটপাথ দখল, ওভারটেকিং, ওভারস্পিড ও ওভারলোড, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি, গাড়ির ত্রুটি, যাত্রীদের অসতর্কতা, ট্রাফিক আইন না মানা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জেব্রা ক্রসিং না থাকা এবং জেব্রা ক্রসিং গাড়িচালক কর্তৃক না মানা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার করা, মহাসড়কে স্বল্পগতি ও দ্রুতগতির যান একই সঙ্গে চলাচল, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো এবং মহাসড়ক ক্রসিংয়ে ফিডার রোডের যানবাহন উঠে যাওয়াই দায়ী। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ যানবাহনের মধ্যে ফিটনেসবিহীন যানবাহন রয়েছে ৩ লাখের বেশি। প্রায় ৪০ শতাংশ চালকের  বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। এরও একটা বড় অংশ দেয়া হয়েছে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া, শ্রমিক ইউনিয়নের দেয়া তালিকা ধরে। প্রায় আট লাখ যানবাহনের কোন প্রশিক্ষিত চালক নেই। এসব অসঙ্গতি রেখে নিরাপদ সড়কের প্রত্যাশা দুরূহ। আবার বৈধ লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে এমন চালকদের ৩১ শতাংশ কোন অনুমোদিত ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেনি। ফলে চালকদের সিংহভাগই ট্রাফিক আইন ভাল জানে না। সড়ক দুর্ঘটনার এটাও একটা কারণ। দেশের সড়ক-মহাসড়কে যেসব যানবাহন চলছে, তার অধিকাংশই চলাচলের অযোগ্য। ফিটনেসবিহীন এসব গাড়িও দুর্ঘটনার কারণ হয়। অন্যদিকে মহাসড়কের কোথাও কোথাও অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলে রাস্তার পাশের জায়গা সঙ্কুচিত করে ফেলা হয়েছে। প্রায় সব দুর্ঘটনার পর বলা হয়, বাসের চালক ও হেলপার পলাতক কিংবা তাদের গ্রেফতারে পুলিশী তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। অথচ দুর্ঘটনা আবারও ঘটে। তার মানে ঘাতক চালক আর গাড়ির চাকার গতির কাছে মানুষের জীবন যেন তুচ্ছ! চালক যদি দক্ষ না হয় তবে দুর্ঘটনা রোধ হওয়া সম্ভব কিভাবে? পাশাপাশি প্রশিক্ষিত চালক নিশ্চিত না হলে দুর্ঘটনাও কমবে না।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে প্রশিক্ষিত চালক নিশ্চিত করার পাশাপাশি চলাচলের অনুপযুক্ত যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
য় লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক নবরাজ



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।