Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

আপনিও হতে পারেন নাম্বার ক্লোনিংয়ের শিকার

| প্রকাশের সময় : ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আল ফাতাহ মামুন : পিলে চমকানোর মতো খবর হলোÑ আপনার হাতে যে মোবাইল ফোনটি আছে সেটি ইচ্ছে মতো ব্যবহার করতে পারবে যে কেউই। ভাবছেন আপনার প্রিয় সেলফোনটি চব্বিশ ঘণ্টাই আপনার সংরক্ষণেই থাকে। আর হয়তো শক্তিশালী ‘লক’ তো আছেই। প্রয়োজন হলে ফোনের নিরাপত্তা আরো জোরদার করবেন। কিন্তু কোনোভাবেই অন্য কাউকে ব্যবহার তো দূরের কথা ছুঁতেও দেবেন না আপনার ফোনটি। এই যদি হয় আপনার ভাবনা, তবে জেনে রাখুন! ছোট্ট কোনো অসাবধানতার জন্য নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ফোনটিও হতে পারে ‘ক্লোনে’র শিকার। যে পদ্ধতিতে আপনার ফোনটি অনায়সেই ব্যবহার করতে পারবে অন্য কেউ। আর এর জন্য আপনার মোবাইলটি ধরা-ছোঁয়া কিংবা দেখারও প্রয়োজন হবে না ‘ক্লোন সন্ত্রাসীর’। এবার নিশ্চয় আঁতকে ওঠেছেন। চলুন জেনে নিই ‘ক্লোন’ সম্পর্কে কিছু কথা।
উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘ক্লোন’ হলো কোনো জীব বা কোষ বা বৃহৎ জৈব অণুর হুবহু নকল তৈরি করা। ১৯৯৬ সালে স্কটল্যান্ডের গবেষক ড. আয়ান উইলমুট প্রথমে একটি ভেড়ার ক্লোনিং করেন। এরপর গরুসহ আরো কিছু জীবের ক্লোনও তৈরি করেন কোষ গবেষকরা। মানুষের ক্লোন তৈরি করার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞান যদি এতে সফল হয় তবে ঘটনা দাঁড়াবে এরকমÑ আপনার আমার মতোই হুবহু আরেকজন মানুষের দেখা মিলবে এই পৃথিবীতে। অর্থাৎ বিজ্ঞান আমাদের ফটোকপি বানাবে। এতে প্রধান বিপত্তি ঘটবে কোনটি আসল আর কোনটি ফটোকপি তা নির্ণয় করা মুশকিল হবে।
ফিরে যাই সিম ক্লোনিংয়ের কথায়। সিম ক্লোনিংও ঠিক সেরকমই। আপনার সিমের মতোই হুবহু আরেকটি সিম তৈরি হবে আর আপনার সিমটি অকার্যক হয়ে যাবে। একেই বলে সিম ক্লোনিং। ‘সিম ক্লোনিং’ পরিচিত হতে না হতেই আলোচনায় ওঠে এসেছে ‘নাম্বার ক্লোনিং’য়ের বিষয়টি। সিম ক্লোনিংয়ের চেয়েও বেশি ভয়াবহ নাম্বার ক্লোনিং। এর মানে হলো আপনার নাম্বারের মতোই হুবহু আরেকটি নাম্বার বানানো হবে। অর্থাৎ একই নাম্বার আপনিও চালাবেন, আরেকজনও চালাবে। আপনি রিচার্জ করবেন আর আরেকজনও খরচ করবে। ‘পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া’র বাস্তবিক প্রয়োগই হচ্ছে নাম্বার ক্লোনিং। বিষয়টি এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতো। সমস্যা হলো আপনার নাম্বার দিয়েই চালানো হবে শত ধরনের অপরাধ। জঙ্গি কার্যক্রমসহ অপরের প্রাণনাশের হুমকির দায়ও এসে পড়তে পারে আপনার ঘাড়ে। কারণ নাম্বারটি যে আপনার নামেই রেজিস্ট্রেশন করা। থানা-পুলিশের প্রাথমিক ধকলও পোহাতে হবে আপনাকেই। সেজেগুজে বের হয়েছেন কোনো অনুষ্ঠানে যাবেন। সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও আছে। অথবা অফিসে যাচ্ছেন। জরুরি মিটিং আছে। এমন সময় পুলিশ এসে বললÑ থানায় চলুন। আপনার নামে ওয়ারেন্ট আছে। ভাবুন তো কী ঝামেলাটাই না হবে তখন!
আমাদের দেশে বর্তমান মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা ৯ কোটি ৩০ লাখ। মোবাইল ফোনের গ্রাহক দিনদিন বাড়ার পাশাপাশি সচেতনতার অভাবে বাড়ছে ঝুঁকিও। এ প্রসঙ্গে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে এখনো সিম ও নাম্বার ক্লোনিং এতটা বিস্তার করতে পারেনি। তবে হাই-প্রোফাইল অপরাধীরা ক্লোনিং পদ্ধতিতে তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের শেষ দিকে র‌্যাব ও গোয়ান্দারা মিলে সিম ক্লোনিং করছে এমন একটি চক্রকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। নাম্বার ক্লোনিংয়ের বিষয়ে
আমাদের দেশের জনগণ সচেতন না থাকায় বিষয়টির ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পারছি না আমরা। নিজের নাম্বারটি আরেকজন ব্যবহার করছে বা সিমটি হঠাৎ অকার্যকর হয়ে গেছে- এমন পরিস্থিতিতে থানা এবং সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করা জরুরি। কিন্তু তা না করে আমরা আরেকটি নতুন সিম কিনে ব্যবহার করতে থাকি। ক্লোনিংয়ের শিকারদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতাই বেশি। আজ থেকে দু বছর আগে আমার নিজের একটি রবি সিম একই সঙ্গে অন্য একজন ব্যবহার করতে থাকে। পরবর্তীতে আমি বোকামি করে সিমটি বদলে ফেলি। এ লেখাটি লিখতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, আসলে আমি ক্লোনিংয়ের শিকার হয়েছিলাম। বাংলাদেশে আমি একা বোকা নই। আমার মতো আরও অনেকেই এমন আছেন। আমরা ক্লোনিংয়ের শিকার হয়ে অভিযোগ না করাতেই অপারেটরগুলো বলছে, আমাদের দেশে ক্লোনিং নেই। তবে ক্লোনিং চক্র গ্রেফতার হওয়ায় টনক নড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অপারেটরদের। এখন যদি সাধারণ জনগণের টনক নড়ে তবেই সম্ভব হবে ক্লোনিংয়ের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া।
কীভাবে নাম্বার ক্লোন হয়? এর থেকে বাঁচার উপায় কী- এসব জানার আগে ক্লোনিংয়ের আরেকটি ভয়াবহ দিক জেনে নিই। সিম ও নাম্বার ক্লোনিংয়ের পাশাপাশি মেমরী এবং মোবাইলে থাকা অন্যসব তথ্যও খুব সহজেই চুরি হতে পারে। এক্ষেত্রে জরুরি এবং গোপনীয় সব বার্তাই যে আর গোপন থাকবে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এবার জানা যাক, ক্লোন হয় কীভাবে। ক্লোনের শিকার হওয়া কিংবা কোনো নাম্বার ক্লোন করা খুবই সহজ একটি কাজ। অনেকটা নিজের অজান্তেই গ্রাহক আটকা পড়েন ক্লোনের ফাঁদে। ক্লোন হয় দুই পদ্ধতিতে। সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো যেকোন নাম্বার থেকে আপনার ফোনে মিসড কল আসবে। মিসড কল ব্যাক করলেন তো ফাঁসলেন। তাই অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা মিসড কল কখনোই ব্যাক করবেন না। অনেকে আবার মজা করার উদ্দেশ্যে অথবা ভিন্ন কোনো কারণে পরিচিতদের নাম্বারও ক্লোন করে। সেক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে আপনাকে। ক্লোনের দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো- আপনি যখন মিসড কল ব্যাক করবেন না তখন আপনাকে সরাসরি কল করবে ওই ব্যক্তি। বলবে, আমি অমুক কাস্টমার কেয়ার থেকে বলছি। আপনার নেটওয়ার্ক ঠিক আছে কিনা যাছাই করতে হবে। অথবা এই অফার পেতে, এত মিনিট ফ্রি পেতে এত ডায়াল করুন। তাদের কথা মতো সংখ্যা চাপলেন তো গেলেন।
ক্লোন থেকে বাঁচার জন্য উপরের দুটি কাজ থেকেই বিরত থাকতে হবে। অপরিচিত কোনো নাম্বার থেকে আসা মিসড কল ব্যাক করা যাবে না। আর কেউ ফোন করে কোনো সংখ্যা চাপতে বললে তাও ফলো করা চলবে না। অতীতে কেউ যদি এমনটি করে থাকেন অথবা কখনো যদি ভুল করে এমনটি হয়ে যায় তাহলে কী করবেন? চলুন জানা যাক- প্রথমে নিশ্চিত হোন আপনার নাম্বারটি ক্লোন হয়েছে কিনা। নাম্বার ক্লোন হলে অস্বাভাবিকভাবে আপনার ব্যালেন্স কমে যেতে থাকবে। তাই নিয়মিত ব্যালেন্স চেক করুন। অস্বাভাবিক কিছু দেখলেই কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করুন। তারা যদি বলে, আপনার ব্যালেন্স থেকে অহেতুক কোনো টাকা কাটা হচ্ছে না, বরং কল বা এসএমএসের ওপর ভিত্তি করেই টাকা কাটছে তবে ধরে নিবেন আপনার নাম্বারটি ক্লোন হয়েছে। নাম্বার ক্লোন হলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব কাস্টমার কেয়ার এবং নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করে ক্লোনের বিষয়টি নিশ্চিত করুন। তাহলে যে কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা থেকে মুক্ত থাকবেন আপনি। আর নাম্বারটি সচল রাখবেন না পরিবর্তন করতে হবে তাও বলে দেবে অপারেটর কোম্পানি এবং আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ।
লেখক : শিক্ষার্থী, ডিপ্লোমা ইন অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
E-mail : alfatahmamun@gmail.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।