Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ২০ জানুয়ারি ২০২১, ০৬ মাঘ ১৪২৭, ০৬ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

বিদেশে বসে ঢাকায় চাঁদাবাজি

প্রকাশের সময় : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

নূরুল ইসলাম : বিদেশে বসেই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা রাজধানীতে টেলিফোনে চাঁদাবাজি করছে। পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কয়েকজন ছাড়াও এ তালিকায় নতুন নতুন সন্ত্রাসীর নাম যুক্ত হয়েছে। এরা চাঁদাবাজির টাকায় বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ভারত, আমেরিকা, দুবাই, ইটালী, সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছে। টেলিফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মোটা অংকের চাঁদা দাবির ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশের কাছে অভিযোগ আসছে। কিন্তু এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না পুলিশ। এ কারণে ভুক্তভোগিদের দিন কাটছে অনেকটাই আতঙ্কে।
সূত্র জানায়, বিদেশে অবস্থানরত ঢাকার অপরাধজগতের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আবার নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশে অবস্থানরত সহযোগীদের মাধ্যমে তারা উদিয়মান ব্যবসায়ী, বাড়িওয়ালা, বিদেশ ফেরত, ডিশ ব্যবসায়ী, জমি জমার মালিকসহ স্বচ্ছল ও বিত্তবানদের টার্গেট করে টেলিফোনে চাঁদা দাবি করছে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে তারা প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। ভুক্তভোগিদের অনেকেই ভয়ে এ বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না। রাজধানীর পল্লবী এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, ইদানিং মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতের চাঁদাবাজি কমলেও নতুন নতুন নামে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতে অবস্থানরত মহসীন নামে এক সন্ত্রাসীর নাম অনেকেরই জানা। গত বছর থেকে মহসীনের চাঁদাবাজি বেড়ে যায় আশংকাজনক হারে। চাঁদা না দেয়ায় পল্লবী এলাকার এক ডিশ ব্যবসায়ীকে কয়েক মাস আগে গুলি করে মহসীনের সহযোগীরা। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। এ ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতারও করেছিল। মিরপুর এলাকার একজন ভুক্তভোগি ব্যবসায়ী জানান, তিনি নিজেও মহসীনের একটি ফোন রিসিভ করেছিলেন। ওই ফোনে মহসীন তার কাছে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ১০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে এক লাখ করে চাঁদা দাবি করে। অবশ্য নানা কৌশলে তিনি চাঁদা না দিয়েই বেঁচে গেছেন। তবে আতঙ্ক এখনও পিছু ছাড়েনি। ওই ব্যবসায়ী বলেন, মহসীন ফোন করে ভারতের নম্বর দিয়ে। মহসীন ছাড়াও গাজী সুমনের নামে মিরপুর এলাকায় চাঁদাবাজি চলে।
সূত্র জানায়, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে প্রতিমাসে দেশে মোটা অঙ্কের চাঁদা ওঠে। সেই টাকা হুন্ডিসহ নানা মাধ্যমে তাদের কাছে যাচ্ছে। এই টাকাতেই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিলাসী জীবনযাপন করছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশের হুলিয়া মাথায় নিয়েই দাগি সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ বিদেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক বনে গেছেন। সেখানে নিরাপদে থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকার অপরাধ জগৎ। এদের সাথে দেশে কারারুদ্ধ শীর্ষ কয়েকজন সন্ত্রাসীরও যোগাযোগ আছে। কারাগারে থেকেও শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম, যোসেফ, আরমান, কিলার আব্বাস, ইমন, পিচ্চি হেলাল, টিটন, ফ্রিডম সোহেল, খোরশেদ আলম ওরফে রাশু, কামাল পাশা ওরফে পাশা সহযোগীদের মাধ্যমে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে। চাঁদাবাজির টাকায় এরাও কারাগারে বিলাসী জীবনযাপন করছে। মিরপুর ছাড়াও টেলিফোনে চাঁদাবাজির শিকার পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। ডাকাত শহীদের সহযোগী পরিচয় দিয়ে এবং আরসিনগেট, গেন্ডারিয়া এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী কচির নামে চাঁদাদাবির ঘটনা ঘটছে। গেন্ডারিয়া এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি তার পৈত্রিক জমিটি একটি হাউজিং কোম্পানীকে দিয়েছেন বহুতল এ্যাপার্টমেন্ট করার জন্য। নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর পরই কচির নামে টেলিফোনে চাঁদা দাবি করে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। ওই ব্যবসায়ী বলেন, পুলিশকে জানালে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে এ আশংকায় আমি গোপনে তাদের সাথে সমজোতার চেষ্টা করি। পরে ২০ লাখের জায়গায় ৫ লাখ দিয়ে আপাতত জীবন রক্ষা করেছি। ওই ব্যবসায়ী জানান, কচি বাহিনীর ভয়ে এখানকার অনেকেই মুখ খোলার সাহস করে না। পুরান ঢাকার ওয়ারী, লক্ষ্মীবাজার, তাঁতীবাজার, ধোলাইখাল, সূত্রাপুর, বংশালসহ আশপাশের এলাকার মানুষের আতঙ্ক ডাকাত শহীদের সহযোগীরা। ডাকাত শহীদের সহযোগী দাবি করে ভারতের নম্বর থেকে চাঁদা দাবির ইদানিং বেড়ে গেছে বলে জানান কয়েকজন ব্যবসায়ী। চাঁদা কালেকশনের জন্য ডাকাত শহীদের স্টাইলেই বয়সে তরুণ ও নবীনদের ব্যবহার করা হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন অতিরিক্ত উপকমিশনার বলেন, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের টেলিফোনে চাঁদাবাজির কিছু কিছু অভিযোগ ইদানীং পাওয়া যাচ্ছে। প্রাপ্ত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তিনি বলেন, প্রতারকচক্রও অনেক সময় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে টেলিফোনে চাঁদাদাবি করে থাকে।
২০০১ সালে সরকার ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে ২৩ জনকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। পুরস্কার ঘোষণার আগেই তালিতাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর কেউ কেউ গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে যায় ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এদের একটি বড় অংশই ভারতের কলকাতায় আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে টেলিফোনে শুরু করে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি।
২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম ত্রিমতি সুব্রত বাইনও ভারতে পারিয়ে যায়। ২০০৮ সালের ১১ অক্টোবর কলকাতা পুলিশের হাতে প্রথম গ্রেফতার হয় এই শীর্ষ সন্ত্রাসী। পরে কলকাতা থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে নেপালে পালায়। ২০০৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সুব্রত বাইন নেপালে গ্রেফতার হয়। ২০১২ সালের ৮ নভেম্বর সুব্রত বাইন ১২ সহযোগীসহ নেপালের কারাগার থেকে সুড়ঙ্গ কেটে পালায়। ২৭ নভেম্বর কলকাতা পুলিশের হাতে আবার গ্রেফতার হয়। এরপর থেকে তাকে দেশে ফেরাতে ভারতের সঙ্গে একাধিকবার বাংলাদেশ চিঠি চালাচালি করে। কিন্তু তাকে দেশে ফেরত আনা যায়নি।
২০১২ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতা পুুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ। এরপর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দফায় দফায় নথিপত্র পাঠানো হয় ভারত সরকারের কাছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাকে দেশে ফেরত আনা যায়নি। এ ছাড়া ২০০৭ সালে কলকাতায় গ্রেফতার হয় পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম তানভীরুল ইসলাম জয়। তাকেও দেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। জয় এখনো কলকাতার কারাগারেই বন্দি। এ ছাড়া দেশে ফেরত আনা যায়নি ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতকেও। গত বছর আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদও ভারতে গ্রেফতার হয়েছে।
সূত্র জানায়, ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে বর্তমানে ভারতে আছে সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ, তানভীরুল ইসলাম জয়, হারিছ আহমেদ, জব্বার মুন্না ও ইমাম হোসেন। জিসান আছে দুবাইয়ে। দুবাইয়ে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী হোটেল ব্যবসা খুলেছে। সুইজারল্যান্ডেও কয়েকজন একই ব্যবসা খুলেছে। পুরস্কার ঘোষিত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী আমিন রসুল সাগর আমেরিকায় অবস্থান করছে। ঢাকার আশকোনায় তার রয়েছে ৫ তলা বাড়ি। শামীম আহমেদ কানাডায় আছে কয়েক বছর ধরে। প্রকাশ কুমার বিশ্বাস ও জাফর আহমেদ অবস্থান করছে কলকাতায়। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে জামিনে মুক্তির পর শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ কুমার বর্তমানে বিদেশে পলাতক। কোনো কোনো সূত্রের খবর সে ইউরোপে আছে। আবার কেউ কেউ দাবি করেন ভারতেই আছে বিকাশ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ইদানিং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম করে একটি ভুঁয়া ‘হ্যালো পার্টি’ চাঁদা দাবি করছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। এজন্যই ভুক্তভোগিদের উচিত পুলিশকে বিষয়টি জানানো। তিনি বলেন, আমার জানা মতে বেশিরভাগ মানুষই এসব ঘটনা পুলিশকে জানায় না। তবে কেউ অভিযোগ করলে আমরা তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। সেক্ষেত্রে অভিযোগকারীর নাম ঠিকানা অবশ্যই গোপন রাখা হয় যাতে তার কোনো সমস্যা না হয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 



 

Show all comments
  • hossain ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ৪:২০ এএম says : 0
    Bikash live in paris now
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিদেশে বসে ঢাকায় চাঁদাবাজি

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ