Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌
শিরোনাম

আত্মরক্ষায় কারাতে

| প্রকাশের সময় : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মোঃ আলতাফ হোসেন : কারাতে প্রসঙ্গে দু’টো প্রশ্ন উঠতে পারে। আমাদের পরিচিত জুড়ো ও কুংফুর সঙ্গে কারাতের কি পার্থক্য? কুংফু হলো চৈনিক মার্শাল আর্ট বা মল্লযুদ্ধ যার উদ্ভব খ্রিস্টীয় ৫ শতকে চিনের জেন উপাসনালয় শাওলিন টেম্পলে। মনে থাকার কথা। চিনের শাওলিন টেম্পলের আদি প্রতিষ্ঠাতা ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু বোধি ধর্ম। তাঁর প্রশিক্ষিত মার্শাল আর্টই কালের পরিক্রমায় কুংফু’র রূপ নিয়েছে। শাওলিন টেম্পল ছবির পোস্টার কারাতে আর কুংফুর উপর হংকং ভিত্তিক প্রচুর অ্যাকশন মুভি হয়েছে। আর জুডো হলো হালের জাপানি মল্লযুদ্ধ। এর ইতিহাস অপেক্ষাকৃত নবীন। ১৮৮২ সালে ডক্টর কানো জিগোরো এই কমব্যাট ক্রীড়াটি উদ্ভাবন করেন। জুডো অর্থ ‘জেনটেল ওয়ে’ আর ‘কারাতে শব্দাটি জাপানি, এর অর্থ খালি হাত। কারাতে হলো খালি হাতে এক ধরণের মার্শাল আর্ট বা মল্লযুদ্ধ যে মল্লযুদ্ধের উদ্ভোবের পেছনে একজন ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুর প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। বিংশতাব্দীর মাঝামাঝি কারাতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর বিচিত্র কলাকৌলের কারণেই অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভাবলে অবাক লাগে কারাতের মূলে একজন ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু বোধি ধর্ম তাঁর প্রদর্শিত পথেই তো রাইইউকিউ কিছু রাজ্যের ওকিনাওয়া দ্বীপের স্থানীয় মুষ্টিযুদ্ধের আমূল পরিবর্তিত ঘটেছিল। এদিকে ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পর ওকিনাওয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হয়। ওখানকার অফিসারদের মধ্যে কারাতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কাজেই কারাতে পৌঁছে যায় ইউরোপ, আমেরিকায়।

ষাট ও সত্তর দশকে ওরিয়েন্টার মার্শাল আর্ট হিসেবে কারাতে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠতে থাকে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কারাতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং অভিনব বৈশিষ্ট্যের কারণেই অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মাজরিরাও এই খেলায় অংশ নেয়। মনে থাকার কথা ওকিনাওয়া দ্বীপটি ছিল রাইইউকিড রাজ্যে। দীর্ঘকাল রাইইউকিউ রাজ্যটি স্বাধীন ছিল। ১৯ শতকে রাইইউকিউ রাজ্যটি জাপানের অঙ্গিভূত হয়ে যায়। কুড়ি শতকে রাইইউকিউ রাজ্যের সঙ্গে জাপানের সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তি হয়। এই প্রথম কারাতে এলো জাপানে। ওকিনাওয়ায় কারাতে গুরুদের জাপান সরকার জাপানে আমন্ত্রণ জানিয়ে কারাতে শেখার ব্যবস্থা করে। ১৯২৪ সালের পর থেকে জাপানি বিশ্ববিদ্যালয়ে কারাতে ক্লাব গড়ে ওঠে। তখন থেকেই কারাতে তে জাপানি স্টাইল এর ছোঁয়া লাগে। কারাতের উদ্ভব সম্পর্কে চীন ও জাপানে একটি উপকথা রয়েছে বৌদ্ধধর্মে। বৌদ্ধধর্মে প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ। তো খ্রিস্টীয় ৫০০ শতকে বোধিধর্ম যখন বোদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে হিমালয় অতিক্রম করে ভারত থেকে চিন গেলেও সেসময় শ্বাপদ সঙ্কুল যাত্রাপথে বন্যপ্রাণী ও দস্যুতস্করের হাতে থেকে রক্ষার জন্য আত্মরক্ষার যে কৌশল অবলম্বন করেন পরবর্তীকালে সে পদ্ধতিই চীন ও জাপানে খালি হাতে আত্মরক্ষা বা কারাতে হয়ে ওঠে।
প্রত্যেক মানুষের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি আত্মরক্ষার কৌশল জানা থাকা ভালো। এর মাধ্যমে কিশোর, কিশোরী, যুবকেরা অনেক অপ্রতিকর ঘটনা এড়াতে পারেন। কারাতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মরক্ষার কৌশলটি পুরোপুরি রপ্ত করা যায়। দেশের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ইভটিজিংসহ নানা উপদ্রব রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে স্কুল ও কলেজের মেয়েরা কারাতে প্রশিক্ষণ নিলে আত্মবিশ্বাসের সাথে চলাফেরা করতে পারবে। কারাতে আক্রমণ প্রতিরোধ কৌশল সম্বলিত একজাতীয় এশিয় খেলা। এ খেলায় হাত ও পায়ের ব্যবহারেই মুখ্য। প্রিয় পাঠক ‘আত্মরক্ষায় কারাতে’ ধরাবাহিক প্রতিবেদনে আজকের পর্বে থাকছে ‘লাজুইক’।

লাজুইক...
কথায় বলে ‘শরীর ফিট তো আপনি হিট” আর তাই শরীরটাকে ফিট রাখার জন্য দরকার খেলাধুলার। আর এ খেলাধুলার মাধ্যমেই একজন মানুষ সুস্থ্যভাবে দীর্ঘদিন বেঁচে থেকে তার কর্ম জীবন শাণিত করতে সক্ষম হয়। তাই যে কোনো খেলাধুলার পূর্বে কিছুক্ষণ ওয়ার্ম আপ এর প্রয়োজন। যেহেতু কারাতে প্রশিক্ষণ হাত ও পায়ের কাজটাই এখানে মুখ্য। তাই প্রথমে আমরা হাতের ও পায়ের ব্যায়ামগুলো কিছুক্ষণ করে নিলে ভালো হয়। মনে রাখতে হবে ব্যায়াম করার সময়ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। কারণ অনিয়ন্ত্রিত ব্যায়াম করলে সেটা শরীরের জন্য মোটেও কল্যাণকর নয় বরং অকল্যাণকর। ব্যায়ামের পর যখন শরীরটা প্র্যাক্টিজের উপযোগী হবে তখন গুরু করা যাবে কারাতে প্রশিক্ষণের মূল কার্যক্রম। আমরা গত সপ্তাহে দোসখী সম্পর্কে জেনে ছিলাম এবং এর কার্যকারিতা ও প্রয়োগের ব্যবহার শিখেছিলাম। আজ আমরা শিখছি লাজুইক। ঠিক আগের মতোই প্রথমে দু’পা ভি পজিশনে সোজা হয়ে দাঁড়াবে এবং দুই হাত মুষ্টিবৌদ্ধ অবস্থায় দু’পায়ের পাশে থাকবে। তারপর ছালাম বো ও কিবাডাসীর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ শুরু হবে। প্রশিক্ষণার্থী কিবাডাসী থাকা অবস্থায় দু’হাতে যখন কোমড়ে থাকবে তারপর প্রথমে কোমড়ে থাকা ডান হাত সোজা বুক বরাবর অর্থাৎ মাঝখানে চপ মারবে। চপ অর্থাৎ লাজুইক মারার সময় মনে রাখতে হবে হাতের পাঁচটি আঙ্গুলাই যেনো সমানভাবে একটি আঙ্গুলের সাথে আরেকটি আঙ্গুল লাগালাগি অবস্থায় থাকে। বৃদ্ধাঙ্গুলটি ঠিক শাহাদত আঙ্গুলটির সাথে লাগালাগি অবস্থায় থাকবে। লাজুইক মারার সময় মনে রাখতে হবে গলার ভেতর থেকে হোইস শব্দের মাধ্যমে শিক্ষার্থী তার প্রতিটি লেসন গুরুত্ব সহকারে করবে। লাজুইক মারার পর ডান হাত ঠিক কোমড়ের পাশে চলে আসবে মুষ্টিবদ্ধ ভাবে এর পর বাম হাতে লাজুইক মারলে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধভাবে কোমড়ে থাকবে। পর্যায়ক্রমে ডান হাতে লাজুইক মারলে বাম হাত কোমড়ে থাকবে আবার বাম হাতে লাজুইক মারলে ডান হাত কোমড়ে থাকবে। এভাবে প্রতিদিন ওয়ার্ম আপের পর শিক্ষার্থীরা তাঁর প্রতিটি লেসন রপ্ত করে নেবে
এ ভাবে প্রতিদিন ১০/২০ বা এর অধিক লাজুইক প্র্যাক্টিজ করা যেতে পারে। যেহেতু লাজুইকটা হাতের কাজ তাই এ লেসন -এর মাধ্যমে একজন প্রশিক্ষণার্থীর আঙ্গুল ও হাতের প্রতিটি অংশের জোর বৃদ্ধি পাবে। সে সাথে বৃদ্ধি পাবে বাহুর শক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত তার লাজুইকি সঠিক না হবে। প্রশিক্ষক ততক্ষণ তার পরবর্তী লেসন দেবে না। কারণ একজন ভালো প্রশিক্ষণার্থী হতে হলে তাঁকে কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমেই রপ্ত করে নিতে হবে প্রতিটি লেসন। কারাতে খেলার জন্য চাই আত্মবিশ্বাস ও কঠোর সাধনা। নিষ্ঠার সাথে যদি কেউ এভাবে প্রতিটি লেসন করায়ত্ব করে নেয় কালক্রমে সে একজন দক্ষ ও কৌশলী কারাতে ম্যান হতে পারবে। এভাবেই ধীরে ধীরে একজন প্রশিক্ষণার্থী সোডন সখী, দোসখী ও লাজুইকের শেখার পর পরবর্তী লেসন পর্যায়ক্রমে ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেকে এক সময় যোগ্য মার্শাল আর্ট এক্সপার্ট করে সমাজে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে। প্রশিক্ষণার্থীকে মনে রাখতে হবে যেহেতু কারাতে প্রশিক্ষণ দীর্ঘ মেয়াদী সেই হেতু প্রতিটি বেল্ট অর্জন করার ক্ষেত্রেই তাকে কঠোর সাধানার মাধ্যমে অর্জন করে নিতে হবে প্রতিটি বেল্ট। অর্থাৎ হুয়াইট বেল্ট থেকে বøাক বেল্ট। আর বøাক বেল্ট হলো কারাতের ভেতর সর্বোচ্চ সম্মান সূচক বেল্ট। (চলবে)
লেখক ঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ, কারাতে কোচ ও চেয়ারম্যান মানিকগঞ্জ গ্রীণ ক্লাব



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।