Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কিছু কথা

| প্রকাশের সময় : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক
বাংলা ভাষায় ন্যূনতম কথা শেখার জন্য কাউকে পরিশ্রম করতে হয় না। জন্মদানকারী মা বা স্তন্যদানকারী মা, স্নেহ দানকারী পিতা, খেলার সাথী অন্যান্য শিশু, খেলার সাথী বয়স্ক দাদা-দাদী, নানা-নানী এদের সান্নিধ্যে থাকতে থাকতেই একজন শিশু বাংলার শব্দগুলো একটু একটু করে রপ্ত করে। অর্থাৎ মায়ের মুখ থেকে প্রথম আওয়াজটা শুনে বলেই মনে হয়, ভাষাটির নাম মাতৃভাষা। কিন্তু মনের কথাটি সাধারণভাবে সাধারণ একজন মানুষের নিকট সাধারণ প্রয়োজনে প্রকাশ করতে যতটুকু ভাষা শেখা প্রয়োজন, ততটুকু ভাষা বেশিরভাগ শিশু-কিশোরই শিখে ফেলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়। অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের জন্য, অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভাবের আদান-প্রদানের জন্য, অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় লেখার জন্য, অতিরিক্ত ভাষা-জ্ঞানের প্রয়োজন। সেইজন্যই লেখাপড়া প্রয়োজন এবং লেখাপড়ার অংশ হচ্ছে মাতৃভাষার উপর পারদর্শিতা অর্জন করা।
এবার আমরা মহানবী (সা.) ও পবিত্র কোরআনের প্রসঙ্গে আসি। মহানবী (সা.) এর বয়স যখন চল্লিশ বছর হয়েছিল, ঐরকম একটি দিনে, মক্কা নগরীর অদূরে হেরা পর্বতের গুহায়, সম্মানিত ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) মহানবী (সা.) এর সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন: পড়ুন। পবিত্র কোরআনের ৯৬ নম্বর সূরা, সূরা আলাক দ্রষ্টব্য। আমি প্রথম পাঁচটি আয়াতের বাংলা অনুবাদ এখানে উদ্বৃত করছি। অনুবাদ সূত্র: কুরআন রিসার্চ ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশ করা ‘আল কুরআন: যুগের জ্ঞানের আলোকে অনুবাদ’। ঐ অনুবাদের প্রথম প্রকাশ: পৃষ্ঠা ৭৩২ দ্রষ্টব্য। আয়াত নম্বর ১-৫। “পড়ো (অধ্যয়ন কর) তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ‘আলাক’ (ঝুলে থাকা সদৃশ বস্তু) থেকে। (ভ্রƒণ প্রাথমিক পর্যায়ে জরায়ুর দেওয়ালে ঝুলে থাকে)। পড় (অধ্যয়ন করো), আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের সাহায্যে। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে (এমন বিষয়সমূহ) যা সে জানতো না।” পবিত্র কোরআনের এই কথাগুলো থেকে উপসংহারে আসতে পারি যে, লেখার আগে পড়া জানতে হবে এবং লেখার জন্য কলম লাগে। আরও উপসংহারে আসতে পারি যে, পড়তে হবে আল্লাহর নামে। অতি সাধারণ ভাষায় উসংহারটিকে এরকমও বলা যায় যে, পড়া এবং অতঃপর লিখতে জানা একটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে মৌলিক মানবাধিকার নামে অন্তত পাঁচটি শব্দ উল্লেখ করা হয় যথা: অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান। কিন্তু আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে মহান আল্লাহ এটি আমাদের জন্য দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। বিভিন্ন ভাষা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য। এবং পৃথিবীর মানুষ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে বিভক্ত; এটিও আল্লাহরই ইচ্ছা। অর্থাৎ প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি আলাদা ভাষার প্রয়োজনীয়তা বাস্তবতাভিত্তিক।
আমার জন্ম গ্রামে; এবং গ্রামের ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ি। তৃতীয় শ্রেণি থেকে আমার লেখাপড়া শুরু হয় চট্টগ্রাম বন্দরের সন্নিকটে অবস্থিত, চট্টগ্রাম বন্দর উত্তর আবাসিক এলাকার ভিতরে সাত নম্বর সড়কে অবস্থিত: চট্টগ্রাম বন্দর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ক্লাস সিক্স, সেভেন এবং অষ্টম শ্রেণির পাঁচ মাস পড়ি চট্টগ্রাম বন্দর হাই স্কুলে। চট্টগ্রাম বন্দর উত্তর আবাসিক এলাকায় অনেক পরিবার ছিল যাদেরকে সাধারণ ভাষায় বিহারী বলা হতো। ১৯৪৭-এর আগে-পরে, পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্রের স্বাধীনতার আগে-পরে, তৎকালীন ভারতের এবং বর্তমান ভারতের বিহার নামক রাজ্যের বহুসংখ্যক মুসলমান অধিবাসী নিজেদের জন্মস্থান বিহার ত্যাগ করে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসে। তাদের পক্ষ থেকে সেটি ছিল অনেক বড় একটি আত্মত্যাগ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তাদের একটি বৃহৎ সংখ্যকের কর্ম সংস্থান হয়েছিল তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান পোর্ট এন্ড রেলওয়েতে। পাঠকের জন্য নামের রহস্যটি অনাবৃত করে দেই। ১৯৬২ সালের শেষ পর্যন্ত, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রেল বিভাগ এবং চট্টগ্রাম বন্দর একই পরিচানা পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হতো কারণ, বন্দর এবং রেলওয়ের মধ্যে সম্পর্কটি ছিল অবিচ্ছেদ্য। সেহেতু যেটাকে আমি চট্টগ্রাম বন্দর উত্তর আবাসিক এলাকা বলে অভিহিত করলাম, সেটিতে আসলেই রেলওয়ের এবং বন্দরের অনেক কর্মকর্তা কর্মচারী পরিবার বসবাস করতেন। কিন্তু দুঃখজনক এবং আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বিহারী পরিবারের সন্তানেরা বাংলা শেখার জন্য কদাচিৎ কোনো চেষ্টা করতেন। চট্টগ্রাম বন্দরে ও রেলওয়েতে, বিহার থেকে আগত উর্দুভাষী বহুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োজিত ছিলেন। বন্দরে যখন দরকার তখন বাঙালিরা বিহারীদের সঙ্গে উর্দুতে কথা বলতে হতো। আমাদের হাই স্কুলে দোতলায় ছিল উর্দু মিডিয়াম এবং এক তলায় ছিল বাংলা মিডিয়াম। উভয় মিডিয়ামের সমকালীন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ মেলামেশা ইত্যাদি অতি স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কিন্তু আলাপের ভাষা ছিল উর্দু। ঐদিনের শিশু ও কিশোর বাঙালিদের মনের ব্যাথার অন্যতম কারণ ছিল জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উর্দু ভাষার আধিপত্য।
উর্দু ভাষার আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কোনোমতেই নতুন ছিল না। ১৯৪৮ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল। সেই আধিপত্যের বিরুদ্ধে সেই আমলের তরুণ বাঙালি ছাত্ররা, অছাত্র তরুণগণ, সাবেক ছাত্রগণ, সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিগণ বেশিরভাগই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। ঐ প্রতিবাদের বিবরণ আজকের কলামে আমি দেব না; কারণ আমি তার জন্য যথাযথ উপযুক্ত ব্যক্তি নই। আজকের ইনকিলাবে অন্যান্য কলামে বা বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চাশটি বাংলা দৈনিক পত্রিকার যে কোনোটির আজকের ইস্যুতে, ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে অবশ্যই লেখা পাবেন। পাঠক সেখান থেকে পড়তে পারেন। তবে আমি আমার এই সংক্ষিপ্ত কলামে দুই-তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে চাই।
ভাষা নদীর পানির মতো বহমান। বিদেশি বা ভিন্ন ভাষার শব্দ মাতৃভাষায় আসাটা স্বাভাবিক। এটি কবিতার মাধ্যমে আসে, প্রবন্ধের মাধ্যমে আসে, ভাষণের মাধ্যমে আসে এবং বইয়ের মাধ্যমে আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেডিও টকশো বা মধ্যরাতের অনুষ্ঠানগুলো, বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচারিত নাটকগুলো ভিন্ন ভাষার ভিন্ন শব্দাবলী আমদানীর অন্যতম একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে বিপদ কতটুকু বা সুবিধা কতটুকু সেটা অবশ্যই পর্যালোচনাযোগ্য বিষয়। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ইংরেজি প্রবাদ বাক্য ‘মাইট ইজ রাইট’-এর মতো ভাষার ক্ষেত্রেও শক্তিশালী ভাষা দুর্বলের উপর আগ্রাসন করে। আপাতত পৃথিবীতে শক্তিশালী ভাষা বলতে অফিসিয়ালী বলা যাবে সাতটি যেগুলো জাতিসংঘে স্বীকৃত। তবে ভাষায় কথা বলে এমন জনসংখ্যার আঙ্গিকে দশটি বা বারোটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়। এমন ভাষাও আছে যেগুলো মাতৃভাষা হিসেবে অতি ক্ষুদ্র জনসংখ্যার জন্য প্রযোজ্য কিন্তু আনুষ্ঠানিক প্রয়োজনের কারণে ব্যাপক হয়ে গিয়েছে। যে বিষয়টি এখানে আমি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই সেটি হলো, শোভনীয় শ্লীল শব্দগুলোকে আমাদের ভাষায় নিতে কোনো আপত্তি দেখি না কিন্তু অশোভনীয় অশ্লীল শব্দগুলোকে নিতে আপত্তি দেখি। সাম্প্রতিককালে ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষা থেকে বহু অপ্রয়োজনীয় শব্দ বাংলা কথপোকথনের মধ্যে চলে আসছে যেগুলো পরিহারযোগ্য।
ভাষা শেখার অন্যতম মাধ্যম শুনে শুনে। রেডিও এবং টেলিভিশনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে উপরের একটি অনুচ্ছেদে দুটি লাইন লিখেছি। একই ইংরেজি ভাষা, কিন্তু উচ্চারণের আঙ্গিকে প্রচুর পার্থক্য আছে আমেরিকান ইংরেজিতে এবং বৃটিশ ইংরেজিতে। আমেরিকায় লেখাপড়া করতে যাওয়ার আগে ছাত্ররা আমেরিকার টিভি শোনে বেশি। বৃটেনে লেখাপড়া করতে যাওয়ার আগে বৃটিশ টেলিভিশনগুলো শোনে বেশি। লেখাপড়া করতে যাক বা না যাক, গুরুতর প্রয়োজন হোক বা না হোক, বাংলাদেশের মানুষ প্রচুর এবং ব্যাপক পরিমাণে হিন্দি ভাষার টেলিভিশন অনুষ্ঠান শুনছে বা দেখছে। ফলশ্রুতিতে হিন্দি ভাষার প্রভাব বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের কানে, মনে, মননে, মগজে এবং প্রবণতায় বিস্তৃত হচ্ছে। হিন্দি ভাষা এবং উর্দু ভাষার মধ্যে কিছু কিছু মিল আছে। হিন্দি ভাষা এবং বাংলা ভাষার মধ্যেও কিছু কিছু মিল আছে। ভারতের বর্তমান জাতীয় সঙ্গীত, মুদ্রিত আঙ্গিকে বাংলা এবং হিন্দিতে একই কবির লেখা একই কবিতা বা গান; শুধু উচ্চারণে তফাত আছে। আমি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই যে, হিন্দি শক্তিশালী ভাষা নিঃসন্দেহে। কারণ, ভারত নামক বিশাল রাজ্যের একশো কোটির বেশি মানুষের একটি স্বাধীন দেশের অন্যতম সরকারি বা রাষ্ট্রীয় ভাষা হিন্দি। ঐ তুলনায় পশ্চিম বঙ্গ এবং বাংলাদেশ মিলিয়ে বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক কম না হলেও কিছুটা কম। সময় এসেছে নিজেদেরকে হিন্দি ভাষার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার। ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষার মিশ্রিত জগাখিচুরি ভাষার নাম হিন্দি যোগ ইংলিশ সমান সমান হিংলিশ। তামিল এবং ইংরেজি ভাষার মিশ্রিত জগাখিচুরি ভাষার নাম তামিল যোগ ইংলিশ সমান সমান তাংলিশ। বাংলা এবং ইংরেজি ভাষার মিশ্রিত জগাখিচুড়ি ভাষার নাম বাংলিশ। হিন্দি এবং বাংলা ভাষার মিশ্রিত জগাখিচুড়ি ভাষার নাম হিনবা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ যেমন বাংলার আগ্রাসন থেকে নিজেদেরকে যথাসম্ভব বাঁচাতে চাচ্ছে; অনুরূপ বাঙালির ভাষা বাংলাকেও হিন্দির আগ্রাসন থেকে, ইংরেজির আগ্রাসন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা সময়ের দাবি।
ভাষাকে সমৃদ্ধশালী করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে অনুবাদ শিল্প বা অনুবাদ কর্ম। এই প্রসঙ্গে বেশিরভাগ পাঠকই মনে করতে পারেন যে, আমি বোধহয় সাহিত্য সামগ্রীর অনুবাদের কথাই বোধহয় বলছি। না। আমি প্রথাগত সাহিত্যের বাইরেও যেই সাহিত্য বিরাজমান সেটার অনুবাদের কথা বলছি। দর্শন শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বহু বই অনুবাদ করা হয়েছে, কিন্তু আরও করা যেতে পারে। যেই বিষয়টিতে অনুবাদ সবচেয়ে কম করা হয়েছে বলে অনুভব করি, সেটি হলো আইন বিষয়ক বা বিচার কার্য পরিচালনা বিষয়ক বা রায় প্রদান বিষয়ক। তাই এই বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। মনে করুন লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলে প্রায় ষাট বছর আগে, বাংলাদেশের বৃহত্তর ঢাকার ভাউয়াল রাজাদের রাজবংশ নিয়ে যে রায় দেওয়া হয়েছিল, সেটার অনুবাদ করা যেতে পারে। কনস্টিটিউশনাল ল বা সাংবিধানিক আইন প্রসঙ্গে রচিত গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি বইগুলো অনুবাদ করা যেতে পারে। বহু ব্যক্তি বহু জায়গাতেই বলেন, আমাদের উচ্চ আদালতে রায়গুলো বাংলায় দেওয়া উচিত। বলা সহজ করা কঠিন। আইনের ছাত্র অবস্থায়, সম্মানিত বিচারপতি মহোদয়গণ যেই পুস্তকগুলো পড়েছিলেন সেগুলো ছিল ইংরেজিতে। সম্মানিত বিচারপতি মহোদয়গণ যে সকল বিখ্যাত উচ্চ আদালতের রায়, দেশি হোক বিদেশি হোক, তাদের রায়ে উদ্বৃত করেন বা রেফারেন্স দেন, সেগুলো ইংরেজিতে। এটিও সত্য ইংরেজি ভাষায় অনেকগুলো আইনের শব্দ আছে যেগুলো মৌলিকভাবে ল্যাটিন ভাষা থেকে আসা। ইংরেজগণ তথা ইংরেজি ভাষায় আইন অভ্যাসকারীগণ বা আইনজীবীগণ, দুইশো চারশো বা পাঁচশ বছর আগে, ঐ ল্যাটিন শব্দগুলোকে অনুবাদ না করেই ইংরেজি ভাষায় আইনের সাহিত্যে একীভূত বা আত্মস্থ করে ফেলেছিলেন। ঐ শব্দগুলো অনুবাদ করলে দ্যোতনা এবং চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল এবং এখনও আছে। আমার এই কথাগুলো আইন বিষয় সাহিত্য বা পাঠ্যপুস্তক বা রেফারেন্স পুস্তক বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
যে কোনো অনুবাদ যখন প্রথমবার করা হয়, সেটি স্বাগতম হয়; কিন্তু সেটিকে উন্নতির অবকাশ থেকেই যায়। যেমন ধরুন বিশ্ববিখ্যাত সুফী সাধক ও কবি মওলানা জালাল উদ্দিন রুমী রচিত ফার্সি সাহিত্যের মহাকাব্য, ধর্মীয় মূল্যবোধের মহাকাব্য ‘মসনবি শরীফ’, পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় যেমন অনুবাদ করা হয়েছে তেমন একই ভাষায় একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক অনুবাদ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ প্রসঙ্গেও একই কথা প্রযোজ্য। জানামতে বাংলা ভাষায় পূর্ণাঙ্গ পবিত্র কোরআনের প্রথম অনবাদ করেছিলেন গিরিশচন্দ্র সেন, যাঁকে তৎকালীন ইসলামী জ্ঞানী সমাজ সম্মান ও আদর করে উপাধী দিয়ে পরিচিত করেছিলেন, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন হিসেবে। ঐ অনুবাদের সঙ্গে পরবর্তীতে করা অনেকগুলো অনুবাদের শব্দগত তারতম্য অবশ্যই লক্ষ্যণীয়। উদারহণ দিচ্ছি: মাওলানা আব্দুল মান্নান কর্তৃক করা কোরআনের অনুবাদ যার নাম “কানজুল ঈমান”; ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক করা কোরআনের অনুবাদ যার নাম “আল-কুরআনুল করিম: পবিত্র কুরআনের অনুবাদ”; মোস্তফা জামান আব্বাসী কর্তৃক করা অনুবাদ যার নাম “স্পষ্ট জ্যোতি: আল কুরআন সমসাময়িক অনুবাদ”; সাবেক সচিব মোহাম্মদ আসাফ্ উদ্দৌলাহ্ কর্তৃক করা অনুবাদ যার নাম “আল কোরআন”; লন্ডনে অবস্থিত আল কুরআন একাডেমীর হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ কর্তৃক করা অনুবাদ যার নাম “কোরআন শরীফ: সহজ সরল বাংলা অনুবাদ” ইত্যাদির ভাষা দ্রষ্টব্য। ঢাকা মহানগরের মগবাজার রেলগেটের পঞ্চাশ মিটার দক্ষিণে প্রধান সড়কের উপর হাসপাতাল বিল্ডিংয়ের নবম তলায় অবস্থিত কুরআন রিসার্চ একাডেমীর প্রকাশনার কথা এই প্রবন্ধের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদেই উল্লেখ করেছি। পবিত্রতম ছয়টি সত্য হাদিস সংকলন (সিয়া-সিত্তাহ) এর অনুবাদের ক্ষেত্রেও এইরূপ কথা প্রযোজ্য।
আমি যেহেতু একজন সাবেক সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, সামরিক বাহিনীতে বাংলা ভাষার প্রচলনের প্রশংসনীয় অগ্রগতি প্রসঙ্গে একটি দুইটি বাক্য অবশ্যই বলবো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসারদের জন্য সার্বজনীন ভাষা ছিল ইংরেজি যদিও অনানুষ্ঠানিকভাবে উর্দু ও পাঞ্জাবীর দাপট বিদ্যমান ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার ব্যতিত অন্যান্য পদবির সকল সৈনিকের জন্য আনুষ্ঠানিক ভাষা ছিল উর্দু। অফিসারদের জন্য প্রশিক্ষণমূলক সকল পুস্তক বা পুস্তিকা হতো ইংরেজিতে এবং সৈনিকদের জন্য হতো উর্দুতে। স্বাধীন বাংলাদেশে, দেড় বছরের মাথাতেই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করেছিলেন যেন অনানুষ্ঠানিক পর্যায়েও বা ভুলক্রমেও বা অভ্যাসরতভাবেও কোনোমতেই উর্দু চর্চা করা না হয় এবং বাংলা প্রবর্তন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের অন্যতম একটি অংশ ছিল: ইংরেজি বা উর্দুতে বকাবকি বা গালিগালাজও করা যাবে না। আন্তর্জাতিকতার কারণে, অফিসারদের প্রশিক্ষণের জন্য এখনও প্রায় শতকরা নব্বই ভাগ প্রয়োজনীতা ইংরেজি ভাষাতেই সমাপন হয়। সৈনিকদের প্রশিক্ষনের প্রয়োজনীয়তা গত প্রায় পঁচিশ-তিরিশ যাবতই শতভাগ বাংলাতে হয়। প্রশিক্ষণের সকল পুস্তক অফিসার এবং সকলের জন্য বাংলাতেও অনুবাদ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীতে ভর্তির নিমিত্তে সৈনিকদের ন্যূনতম যোগ্যতা এসএসসি বা তদূর্ধ্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলায় বিতর্ক, রচনা প্রবন্ধ লিখা ইত্যাদি প্রতিযোগিতা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী অনেক কিছুতেই অগ্রণী বা উদাহরণতুল্য ভূমিকা রেখেছেন। বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুরূপ। আশা করি আমাদের এই ক্ষুদ্র নিবন্ধ পাঠককে বা নীতি নির্ধারকগণকে অনুপ্রাণিত করবে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি



 

Show all comments
  • জিল্লুর রহমান ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:১২ পিএম says : 0
    ভালো লাগলো। সুন্দর সাবলীল উপস্থাপন করা হয়েছে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।