Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৭, ১৬ বৈশাখ , ১৪২৪, ২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী।

মেডিক্যাল শিক্ষার মানে ভয়াবহ অবনতি

| প্রকাশের সময় : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আল ফাতাহ মামুন : ছোটবেলায় সবাইকে ‘মাই এইম ইন লাইফ- আমার জীবনের লক্ষ্য’ রচনা পড়তে হয়েছে। অধিকাংশেরই সপ্ন বা লক্ষ্য ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া। তার মধ্যে সবার আগে লক্ষ্য থাকত ডাক্তার হওয়ার। বড় ডাক্তার হয়ে নিজ গ্রামে একটি হাসপাতাল নির্মাণ এবং গরিব রোগীদের ফ্রি চিকিৎসাসেবা প্রদান- এসব ভাবনাও থাকত রচনায়। ছোটবেলার এ পড়া শুধু পাসের জন্যই ছিল সেটা বুঝতে পেরেছি অনার্সে উঠে। ইন্টারে থাকতেও বুঝতে পারেনি। কারণ তখনও পরীক্ষার জন্য ‘আমার জীবনের লক্ষ্য’ রচনাটি পড়তে হয়েছে। আমরা যারা মেডিক্যালে পড়তে পারিনি তাদের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। যারা ডাক্তারি পড়ছেন এবং বিগত বছরগুলোতে পাস করে বেরিয়েছেন তাদের বেলায়ও কি ‘আমার জীবনের লক্ষ্য’ সত্যি হয়ে ধরা দিয়েছে? তারা কি নিজ গ্রামে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করেছেন? করেছেন কি গ্রামের হাড়হাভাতে মানুষের জন্য ফ্রি বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা? হাজার হাজার মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর মধ্যে থেকে প্রতি বছর যদি অন্তত ৫-১০ জন শিক্ষার্থী কাঁচা হাতের লেখা ‘মাই এইম ইন লাইফের’ কথাগুলো বাস্তবায়ন করতেন তবে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে সুনাম কুড়াতো।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বিশ্বে সুনাম কুড়ানোর আগেই নিজ দেশে দুর্নামের ভাগী হতে হলো মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থাকে। গত কয়েক বছর মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি ছিল ওপেন সিক্রেট। তবে বিষয়টি স্বীকার করতে রাজি নয় কর্তৃপক্ষ। প্রথম যখন প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি মোটামুটি প্রমাণ হয়েই গেল তখন এক বন্ধুকে বলেছিলাম- ভাবতেই আঁতকে উঠি, আগামী প্রজন্মকে ডাক্তারি সার্টিফিকেটধারী কতিপয় অযোগ্যদের হাতে ‘প্রশ্ন ফাঁসের’ শিকার হতে হবে। প্রশ্ন ফাঁস করে মেডিক্যালে ভর্তি হওয়াদের কাছে তো আমাকেও যেতে হবে। মমতাময়ী মা, আদরের বোন কিংবা স্ত্রী কেউই রক্ষা পাবে না এদের হাত থেকে। বিশ্বাসই করতে পারছি না, মাত্র কয়েক বছর আগে খেলাচ্ছলে বলা কোনো কথা এতো বড় সত্যে রূপ নিতে যাচ্ছে। প্রয়োজনও মনে করছি না বিশ্বাস করার। যে বিশ্বাস উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির বার্তা দেয় তা কেইবা বিশ্বাস করতে চাইবে। কিন্তু কখনো কখনো না চাওয়া সত্ত্বেও অনেক কিছু বিশ্বাস করতে হয়। মেনে নিতে হয় বাস্তবতা।
গত এক বছর মেডিক্যাল শিক্ষর্থীদের ওপর মাঠ পর্যায়ে গবেষণা করে আইন কমিশন এক প্রতিদেবন প্রকাশ করেছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার দৈনিক ইত্তেফাকসহ জাতীয় দৈনিকগুলো তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। প্রতিদেবনে বলা হয়- মেধার ভিত্তিতে নয়, কেবলমাত্র অর্থের মাধ্যমে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে অযোগ্য শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। এসব কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ভর্তি নীতিমালার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। অনুমিত সংখ্যার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। আর এসব শিক্ষার্থীর ভর্তির যোগ্যতার মাপকাঠিই হচ্ছে কেবল অর্থ প্রদান। ফলে বেশিরভাগ মেডিক্যাল কলেজ প্রকারান্তরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রবণতা ভর্তি প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে গত বছর এই অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে বিশেষ করে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে কিংবা ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন সহজ করে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাপ্তি নিশ্চিত করায় মেডিক্যাল শিক্ষাবস্থার স্বাভাবিক মান হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, মেডিক্যাল কলেজে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের অনেকেই ঠিকমত ক্লাস করেন না। তারা নামকাওয়াস্তে পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন বা পাস করিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তুকি থাকায় শিক্ষা ব্যয় নাগালের মধ্যে থাকে। তাই মেধাবী শিক্ষার্থীরা সেখানে ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষা ব্যয় অযৌক্তিভাবে বেশি। ফলে দরিদ্র মেধাবীরা এই শিক্ষা গ্রহণে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে অনেক অযোগ্য প্রার্থীও ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, নার্স, শয্যা ও রোগীর অভাবে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার মান খুবই করুণ। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বিপরীতে রোগীসহ অন্তত ৫টি শয্যা থাকা আবশ্যক। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে পর্যাপ্ত শয্যা নেই। কিংবা শয্যা থাকলেও নেই রোগী। ফলে ছাত্রছাত্রীদের যথাযথভাবে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ নেই। কোনো কোনো বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে এক্সটার্নাল পরীক্ষক মৌখিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীকে ৩/৪ নম্বর দিতে চাইলেও চাপের মুখে ও নিজের পরীক্ষকের অবস্থান ধরে রাখার জন্য অযোগ্য পরীক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দিতে বাধ্য হন। ফলে মেডিক্যাল শিক্ষার মানের ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে অধিকাংশ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ।
আইন কমিশন মনে করে, সামগ্রিক বিচারে দেশের স্বাস্থ্য সেবার সার্বিক মানোন্নয়নের পথে একাধিক অন্তরায় রয়েছে। স্বাস্থ্য সেবা যাতে কাক্সিক্ষত মান অর্জন করতে পারে সে লক্ষ্যে কমিশন ‘স্বাস্থ্য সেবা’ আইন নামে একটি আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। ওই গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মতবিনিময়সহ প্রথিতযশা অধ্যাপক-চিকিতৎসকদের সাথে একাধিক কর্মশালা পরিচালনা করা হয়। এই গবেষণা কার্যক্রমের আলোকে স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাবলী তুলে ধরা হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে স্বাস্থ্য সেবার মান কাক্সিক্ষত মাত্রা অর্জন করতে পারবে। এ লক্ষ্যে আইন কমিশন অর্ধশত সুপারিশও করেছে। বিদেশি ছাত্র কোটায় দেশি ছাত্র ভর্তি করার প্রচলিত প্রথা বন্ধ, প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের জন্য উন্নত দেশসমূহের ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি নিরীক্ষা করে আরো কার্যকর কৌশল অবলম্বন ও পরীক্ষার পাস নম্বরকে অতি সহজলভ্য করার প্রবণতা বাদ দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি কলেজগুলোর মধ্যে শিক্ষা ব্যয়ের বিরাজমান অস্বাভাবিক ব্যবধান কমিয়ে অযোগ্য শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ সঙ্কুচিত করতে হবে। এছাড়া আরো কিছু বিষয়ে জোর দিলে মেডিল শিক্ষার মান কাক্সিক্ষত মানে ফিরে আসবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
আইনের কমিশনের গবেষণায় উঠে আসা সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যালে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি। কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর ইংরেজি ভাষা জ্ঞান মারাত্মক দুর্বল। ফলে সার্বিকভাবে তাদের শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে ক্লাস গুনে মেডিক্যাল পর্যন্ত আসা সহজ। সহজ মেডিক্যাল সার্টিফিকেট নেওয়াও। কিন্তু মেডিক্যালের এত বড় বড় ইংরেজি বইগুলো আত্মস্থ করার উপায় কী- এ প্রশ্নই এখন এক দল দায় ঠেকা শিক্ষার্থীর কাছে। তারা ভাবছে কোন উপায়ে যদি বইগুলো হজম করা যেতো তবে হয়তো ‘মাই এইম ইন লাইফ’ বাস্তবায়ন হতো। কিন্তু না। তা সম্ভব নয়। তাইতো থিওরি পড়া বাদ দিয়ে রাজনীতি কিংবা অন্য কোন নীতি চর্চায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন তারা। আর বছর শেষে ক্লাস গুনে সার্টিফিকেট অর্জনের সিঁড়ি ভাঙছেন।
পাঠক! ভবিষ্যৎ কিছু ডাক্তারের ভয়াবহ অবস্থা কি, তা অনুধান করতে পারছেন? অপারেশন শেষে পেটের ভেতর ছুড়ি, কাচি, কাপড়ের টুকরা থাকার খবর এখন অল্পস্বল্প শোনা গেলেও দু’এক বছরের মধ্যে এটি নিত্যনৈমিত্তিক খবর হয়ে দাঁড়াবে। পাঠ্য পুস্তক পড়ার যোগ্যতা নেই যাদের (প্রশ্ন ফাঁসে পাস করলে যেমন হয় আর কি), যারা পর্যাপ্ত প্র্যাক্টিকেলের সুযোগ পায়নি, পরীক্ষকের মান ধরে রাখার খাতিরেই যারা পাস করে বের হন- তাদেরকে আর যাই বলা হোক ডাক্তার বলা যাবে না। এতে ডাক্তার শব্দের অপমান হবে। আইন কমিশনের এ প্রতিবেদনের পরও যদি আমাদের মাঝে সচেতনতা তৈরি না হয় তবে আমাদের চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। এমনিতেই আমাদের দেশের একশ্রেণির ডাক্তারদের সেবা নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তার ওপর শিক্ষার্থীদের এই অবস্থা। এ যেন ‘মড়ার ওপর খাঁড়া ঘা’র বাস্তব রূপ দেখছি আমরা।
 লেখক : শিক্ষার্থী, ডিপ্লোমা ইন অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।