Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং নির্বাচনী সমাচার

প্রকাশের সময় : ২১ জানুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ড. আব্দুল হাই তালুকদার : গত ৩০ ডিসেম্বরের পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ ও জনমত লিখব এরূপ প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু চোখের অপারেশনের রেশ না কাটায় তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে আমার এক চোখের গ্লোকোমা ও ছানি অপারেশন করেছি। অপারেশনটি খুবই কষ্টদায়ক ও মারাত্মক ছিল। একুউট গ্লোকোমা। চোখের আলো প্রায় লোপ পেতে বসেছিল। যাহোক আল্লাহর অপার রহমতে সফলভাবে অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। যাইহোক গত ৩০ ডিসেম্বর ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়েছে। ফলাফল যা হবার তাই হয়েছে। মানুষ অনেক আগে থেকেই বলছিল, নির্বাচন একতরফা হবে ও সরকারি দল জোর করে নির্বাচনের ফলাফল তাদের অনুকূলে নিবে। তারা ক্ষমতার স্বাদ একবার পেয়ে গেছে। এখন আর কিছুতেই তা হাতছাড়া করবে না। 

বিরোধীদল এমনিতেই পর্যুদস্ত। নেতা-কর্মীরা ঘরছাড়া, বাড়িছাড়া। তাদেরকে মামলা, হামলা, গ্রেফতার, অত্যাচার নির্যাতনে কাবু করে রাখা হয়েছে। তারা এমনিতেই কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। এমতাবস্থায় তারা প্রতিরোধ গড়তে পারবে না। অসম মাঠে খেলতে গিয়ে তারা সুবিধা করতে পারবে না। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা মাঠ চষে বেড়াবে। অতএব তারা বিজয়ী হতে নানারকম অপকৌশল প্রয়োগ করবে। তবে গণমানুষের আস্থা ও বিশ্বাস প্রচ-ভাবে বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়ার উপর ছিল। তার উপর আস্থার কারণে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা ভোট দিতে পারেনি। চর দখলের মতো কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, জাল ভোট প্রদান, বিরোধীদলের এজেন্টদের পোলিং বুথ থেকে বের করে দেয়া, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অনেক ক্ষেত্রে ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা প্রদান প্রভৃতি অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ পৌর নির্বাচনকে আর একবার প্রহসনে পরিণত করেছে।
ভোটের পর পর সরকারের নেতৃবৃন্দ নির্বাচনে তাদের বিজয় নাকি অবধারিত ছিল বলে আস্ফালন করতে থাকেন। বিএনপি নেত্রী নাকি জ্বালাও-পোড়াও ও অগ্নি সংযোগ করে মানুষের সমর্থন হারিয়েছেন। কিন্তু সরকারি প্রচারণায় মানুষের আস্থা নাই। মানুষ সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকা- ও মনোভাবের প্রচ- বিরোধী। মানুষ নিজের মান-মর্যাদা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। তারা দেখছে কীভাবে সরকার দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে অধিকার হারা ও মর্যাদাহীন করে রেখেছে। অন্য কোন কারণ নাই থাক কেবল ভোটাধিকার হরণের দায়ে মানুষ সরকারকে অপছন্দ করছে। তারা চায় সরকার একটি সুন্দর সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করুক যাতে তারা বিনা বাধায় নিরুপদ্রবে ভোট কেন্দ্রে যেতে ও অবাধে ভোট দিতে পারে।
জ্বালাও পোড়ানোর দায় বিএনপি নেত্রীর উপর একতরফাভাবে না চাপিয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করার আহ্বান আমরা বারবার জানিয়ে যাচ্ছি। বিএনপি নেত্রীও জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন। একটি নিরপেক্ষ তদন্তে সত্যিকার দোষী ব্যক্তির নাম বেরিয়ে আসবে। সম্পদ বিধ্বংসী ও জীবন বিধ্বংসী কর্মকা- যারা করেছে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনলে মানুষ খুশী হবে। আজকের লেখা পৌর নির্বাচন থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা নিয়ে। নির্বাচনের আগে চ্যানেল আইয়ের তৃতীয় মাত্রায় এক অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, অনেকদিন পর জাতীয় নির্বাচনের আমেজে স্থানীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। মানুষ বিরোধীদল ও সরকারি দল উভয়ের কর্মকা- বিচার করে ভোট দিবেন। ধানের শীষ ও নৌকা প্রতীকের সাথে অন্যান্য দলের প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে। মানুষ বিরোধীদল বিহীন যে নির্বাচন ১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে দেখে আসছে তার অবসান হবে। সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষ ও নৌকা প্রতীকের মধ্যে। মানুষ খুব উৎসাহ, উদ্দীপনা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। গ্রামেগঞ্জে উৎসবের আমেজ দেখা দেবে। প্রথম দিকে হয়েছিলও তাই। গ্রামের মানুষের মধ্যে আনন্দ, উৎসাহ ও আগ্রহ দেখে খুশী হয়েছিল। তাছাড়া, এ নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হবে না। সবকটি পৌরসভা যদি বিএনপি পেয়ে গেলেও সরকারের কোন ক্ষতি হতো না। বরং নির্বাচনটি অবাধ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠান করতে পারলে সরকারের সাথে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি অনেকখানি পুনরুদ্ধার হতো। ৫ জানুয়ারির কলঙ্কজনক একপক্ষীয় ও তামশার নির্বাচনে সরকার, দেশ ও নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি যেভাবে ধুলায় মিশে গেছে তার অনেকখানি ফিরে আসতে পারত। মানুষ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুপ্রেরণা লাভ করত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির ন্যায্যতা হ্রাস পেতে পারত। আমরা আশা করেছিলাম, সরকার এবার অন্তত নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ন্যায্যতা প্রমাণ করবে। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে আমরা লক্ষ্য করলাম, আমাদের সমস্ত আঁচ অনুমান মিথ্যা প্রমাণ করে বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হলো। নির্বাচনের পর সরকারি দলের আস্ফালন ও বাকবিত-া দেখে সত্যিই অবাক হতে হয়। গণতন্ত্রের বিকাশের বদলে সংকোচন দেখে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া কোন উপায় নেই। বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চা দেখে ওয়ালিউল্লাহ সাহেবের লাল সালু উপন্যাসের বিখ্যাত উক্তি ‘এ এক খোদার বিশেষ দেশ বলে মনে হয়’। গণতন্ত্রের নতুন ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞা আবিষ্কারে স্তম্বিত ও হতবাক হতে হয়। গণতান্ত্রিক আচার-আচরণ ও কর্মকা-ের লেশমাত্র এ নির্বাচনে দেখা যায়নি। জোর যার মুল্লুক তার নীতির চর্চা পৌর নির্বাচনে দেখা গেছে। আগের রাতে কোথাও কোথাও বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। অনেক জায়গায় ভোটারদের ভোট দিতে হয়নি। ভোটার পৌঁছাবার আগেই ভোট দেয়া হয়ে গেছে। এজেন্ট না থাকায় ইচ্ছামত সিল মেরে বিজয় নিশ্চিত করা হয়েছে। ভোটের ব্যবধান কোথাও কোথাও অবিশ্বাস্য। ধানের শীষের ঘাঁটি যেসব জেলায় সেখানেও সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে মাঠ ফাঁকা করে পরবর্তীতে সিল মেরে বাক্স ভরাট করা হয়েছে। সকাল থেকে কেন্দ্রগুলো কিছুটা শান্ত ছিল। মানুষ অবাধে ভোট দিতে শুরু করে। বেলা গড়ার সাথে সাথে প্রার্থীরা ও কর্মীরা বুঝতে পারে ধানের শীষের বিজয় অবধারিত। যখন তারা বুঝতে পারে পরাজয় অবধারিত তখন কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। নিমিষেই মাঠ ফাঁকা হয়ে যায়। ফাঁকা মাঠে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরানো হয়। মানুষ দেখেছে এবং গণতন্ত্রকে উপহাস করেছে। এভাবে নির্বাচন করতে থাকলে ৪১ সাল কেন কখনোই আওয়ামী লীগ পরাজিত হবে না। তবে এসব কর্মকা-ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে জনগণেরই ঘৃণা ও ক্রোধের শিকার একদিন সরকারি দলকে হতেই হবে। মানুষ তার হারানো গৌরব, অধিকার ও মর্যাদা ফিরে পেতে যেকোন সময় ফুঁসে উঠতে পারে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় নির্বাচনী পরিবেশ কলুষিত করে যেভাবে বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে তা দেখলে অবাক ও বিস্মিত হতে হয়। বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে একথা সঠিক নয়। এত কিছুর পরও বিএনপির কোটি কোটি ভোট পাওয়া, বিএনপি নেত্রীর প্রতি মানুষের অকৃত্তিম ভালোবাসা ও আস্থার প্রকাশ। বিএনপিকে ত্যাগ করলে জাতীয় পার্টির মতো অবস্থা হতো। মানুষ এখনও বিএনপিকে ভালোবাসে। সুযোগ পেলে ও অবাধে ভোট দিতে পারলে বিএনপি এখনও নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও ভীতিহীন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বিএনপি এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল।
আমরা বারবার বলেছি, জনপ্রিয়তা নির্ধারণের চাবিকাঠি হলো অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান। জনগণ অবাধে ভোট দিতে পারলে সত্যিকার জনপ্রিয় দলের অস্তিত্ব বোঝা যায়। হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে দিলে যেমন সাঁতার কাটা যায় না, তেমনি অসম মাঠে খেলাও অসম্ভব। ভোটের আগে থেকেই গণগ্রেফতার শুরু হয়েছে। প্রতিদিন শত শত বিএনপি নেতা কর্মীর গ্রেফতার দলটির নির্বাচনী প্রচারণা দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার বেনামী আসামির তালিকা বিএনপিকে বিপর্যস্ত ও বিপন্ন করে রেখেছে। সবসময় গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছে শত শত সংখ্যক মাঠে থাকা নেতাকর্মী। বাংলাদেশ বর্তমানে পুলিশী রাষ্ট্র বলে অনেকে মনে করেন। পুলিশী বাণিজ্য এখন যার কোন গোপন বিষয় নয়। পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পেতে ঘর ছাড়া, বাড়ি ছাড়া নেতাকর্মীরা অতি গোপনে সামান্যই প্রচার কাজে অংশ নিতে পেরেছে। ফলে বিরোধী দল নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারেনি তেমনি ভোট ডাকাতি, জালিয়াতি, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদান কিছুই ঠেকাতে পারে নাই। ভোট ডাকাতি ঠেকাতে গিয়ে নতুন করে মামলা-হামলার শিকার হতে চায়নি। সে কারণে সংঘর্ষ হয়েছে সরকারি দলের প্রার্থীর সাথে তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী ও কোথায় কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সমর্থকদের সাথে।
অনেকে বলছেন, নির্বাচনে সহিংসতা, মারামারি-হানাহানি, আহত ও নিহত না হওয়াই প্রমাণ করে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। পরিবেশ ও পরিস্থিতি মানুষের যাবতীয় কর্মকা-কে পরিচালিত করে। স্বাধীন মানুষের কর্মকা- নিশ্চিতভাবে বন্দি মানুষের কর্মকা- থেকে পৃথক হতে বাধ্য। বিএনপি নেতাকর্মীরা বলতে গেলে একরকম বন্দি ছিল। মাঠ ছিল অসম। তার অসম মাঠে খেলতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে। প্রবল ক্ষমতাধর সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সাথে তারা লড়তে পারেনি। ফলে জীবন নিয়ে সদা ব্যস্ত ও সদা ভীতি নিয়ে চলতে চলতে তারা ভোট ডাকাতি ঠেকাতে পারে নাই। সমস্ত ইলেকট্রোনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার ভোট ডাকাতি ও জালিয়াতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। সমতল মাঠ থাকলে ও স্বাধীনভাবে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরা কাজ করতে পারলে পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতো। তারা কিছুতেই তাদের নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নিতে দিত না। অসমতল মাঠে নানারকম ভয়ভীতি ও চাপ উপক্ষো করে নেতাকর্মীরা প্রবল ক্ষমতাধর প্রতিপক্ষের মোকাবেলা না করে মাঠ ছেড়ে দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা দেখে লজ্জিত হতে হয়। একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করতে না পারার লজ্জা সকলের। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনাররা কোন বিশেষ দলের প্রতি অনুরাগ বা বিরাগ প্রদর্শন করবেন না এটিই আমাদের সংবিধানের চেতনা। সংবিধানের মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে তাদের কাছে নিরপেক্ষ আচরণ কাম্য। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে তারা শপথ নিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। এখন আর কোন নির্বাচনই হচ্ছে না। প্রশাসন সরকারের উৎকট দলীয়করণের ফলে শক্তিমানদের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করছে। রিটারনিং অফিসারদের অধিকাংশ কর্মকর্তা সরকারী আমলা হওয়ায় তারা সরকারের আজ্ঞাবহ হিসাবে কাজ করেছেন। প্রকাশ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অভয় পেয়ে আচরণ বিধিভঙ করে ভোট কারচুপি ও অনিয়মের মহোৎসব চলেছে। ১২টার মধ্যে বহু কেন্দ্রে ব্যালট পেপার শেষ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় শক্তি এখন সরকারের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। এভাবে নির্বাচন চলতে থাকলে কেয়ামত পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বহাল তবিয়তে টিকে থাকবে।
বাংলাদেশ গণতন্ত্র চর্চার এক বিশেষ মডেলে পরিণত হয়েছে। জনগণের সম্মতি ও সমর্থন ছাড়া গণতন্ত্রের নামে মশকরা করা হচ্ছে। জনগণকে ক্ষমতারোহনের মাপকাঠি না করে প্রশাসনকে মাপকাঠি করার ফলে গণতন্ত্র বহু আগেই নির্বাসিত। মানুষ যে আশা নিয়ে পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল সে আশায় গুঁড়ে বালি। মানুষের ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা ও অভিশাপের দীর্ঘ নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে। মানুষকে ক্ষমতাহীন ও অধিকার হারা করে সরকার তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। নীতি, নৈতিকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দেশ থেকে উধাও।
আমাদের কথা হলো এ দেশের মানুষ প্রগতিশীল চিন্তাচেতনা ধারণ করে। তারা মধ্যযুগীয় কনসেপ্ট জোর যার মুল্লুক তার নীতির ঘোরতর বিরোধী। তারা সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার মধ্যে দিয়ে রাজনীতি চর্চা দেখতে চায়। দু’দলের মধ্যে প্রতিযোগিতার সাথে বন্ধুত্ব কামনা করে। দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সুবচন প্রতিষ্ঠিত হোক সকলের প্রত্যাশা। একপক্ষ অন্যপক্ষকে নিঃশেষ করে বহাল তবিয়তে রাজনীতি করবে দেশের মানুষ তা প্রত্যাশা করে না। আর নিঃশেষ করতে চাইলেও নিঃশেষ করা সম্ভব হবে না। সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। মানুষ আর এরকম প্রহসনের নির্বাচন দেখতে চায় না। একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক। লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বশর্তÑযা সরকার সৃষ্টি করলে মানুষ খুশী হবে। জোর করে আজীবন ক্ষমতায় টিকে থাকার আকাক্সক্ষা শুভ নয়।
গত ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটো বিশাল সমাবেশ করেছে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটায় মানুষ অত্যন্ত খুশী ও ভবিষ্যত রাজনীতি নিয়ে আশান্বিত। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ ৫ তারিখে সমাবেশ থেকে যা বলেছেন তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও শান্তি স্থাপনের ইঙ্গিতবহ। বিএনপি চেয়ারপার্সনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আসুন আমরা শান্তিপূর্ণ রাজনীতিকে এগিয়ে নেই। দেশে নির্বাচন হবে, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। এ নির্বাচনে একটি জীবনও নষ্ট হবে না।” তার বক্তব্যে স্পষ্টত শান্তি প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত রয়েছে। দু’দলের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বর্তমান। এ দ্বন্দ্ব ঘুচাতে হলে সংলাপ আবশ্যক যার আহ্বান বিএনপি থেকে বারবার জানানো হচ্ছে। ইতিহাসে জায়গা পেতে হলে দ্বন্দ্ব সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সংলাপ ও সমঝোতার মধ্যে দিয়ে একটি শান্তির আবহ সৃষ্টি করতে পারলে এ দেশের গণমানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন পাবেন রাজনীতিকরা। আমরা চাই, রাজনীতিকরা আলোচনার টেবিলে বসুন ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখুন। এ কাজে যে দল বা নেতা অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন ইতিহাসে তিনি স্থায়ী আসন লাভ করবেন, এদেশের গণমানুষের সুপ্ত আকাক্সক্ষা পূরণ করবেন।
য় লেখক : প্রফেসর, দর্শন বিভাগ ও সাবেক ডিন, কলা অনুষদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।