Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

বাংলাদেশের সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রসঙ্গ

| প্রকাশের সময় : ১১ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

হোসেন মাহমুদ : ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল। এ দেশের দামাল ছেলেরা এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য এনেছে। বিশে^র বুকে আত্মপ্রকাশ করেছে লাল সবুজ পতাকার দেশ বাংলাদেশ। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের দাগ তখনো শুকায়নি। অফুরান সম্ভাবনার স্বপ্নঘোর সবার চোখে। চলছে দেশ পুনর্গঠনের পালা। কিন্তু নানামুখী সমস্যার কারণে সর্বত্র তখনো সুস্থিরতা আসেনি। এলো ১৯৭৪ সাল। অর্থনীতিতে তখনো গতি সঞ্চার হয়নি। রফতানিতে যেমন স্থবিরতা তেমনি সম্পদের ক্ষেত্রেও শূন্যতার দীর্ঘশ^াস। এ অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার সেই কুখ্যাত উক্তি উদ্গিরণ করলেন- বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি (বাংলাদেশ ইজ এ বটমলেস বাস্কেট)। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ তখন ছিল প্রায় গুরুত্বহীন এক দেশ। তারপর অনেক সময় পেরিয়েছে। সময়ের হাতে হাত রেখে অনেকটা এগিয়েছে বাংলাদেশ। যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে নিজের অসূয়া মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলো, ৪০ বছর পর ২০১৪ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত সে যুক্তরাষ্ট্রেরই রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা তার দেশের সাবেক নেতার এ মন্তব্যকে ভুল বলে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে এক সময় আন্তর্জাতিক শক্তি বলয়ে গুরুত্বহীন বলে গণ্য হওয়া বাংলাদেশ এখন বিশে^র শীর্ষ শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তার প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত। বর্তমান বিশে^র আর কোনো দেশের উপরই বিশ^শক্তিগুলো এমনভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়েনি। বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের এ কাড়াকাড়ি বিস্ময়কর, তবে বাস্তবও বটে। তার কারণ হচ্ছে ভূরাজনীতি। আর হাল আমলের শক্তিমান দেশগুলোর কাছে ভূরাজনীতি হচ্ছে সর্বাধিক অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়েছে। সে সাথে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র বিমোচন, নারী ক্ষমতায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বিশ^ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে জাতিসংঘের আওতায় বাংলাদেশের ব্যাপক মাত্রায় অংশগ্রহণ এবং সংঘাতময় দেশগুলোতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ কন্টিনজেন্টগুলোর কর্মকান্ডের সাফল্য দেশের জন্য বিপুল প্রশংসা ও সম্মান এনে দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা এবং পরিশীলিত ও মানবিক ব্যবহার তাদেরকে সকল শান্তিরক্ষী বাহিনীর মধ্যে অনন্য মর্যাদার অধিকারী করেছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে এ পর্যন্ত শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশ কখনোই সামরিক উচ্চাশা পোষণ করেনি। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের ন্যূনতম যেটুকু সামরিক সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, সেই প্রয়োজনের মধ্যে বাংলাদেশ নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছে, তার বাইরে যায়নি। তাই ভারত-পাকিস্তানের সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের উপর কখনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। আবার নিজ সশস্ত্র বাহিনীকে উপেক্ষা করার পন্থাও অবলম্বন করেনি। তাই বিভিন্ন সময়ে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীকে সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জামে সজ্জিত করার দিকে সব সরকারই যথাযথ দৃষ্টি রেখেছে। এরই সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হচ্ছে গত নভেম্বরে চীন থেকে দু’টি সাবমেরিন ক্রয় ও অতি সম্প্রতি রাশিয়ার নিকট থেকে ৮টি অত্যাধুনিক জঙ্গি বিমান সংগ্রহ। ২০১৬ সালের এপ্রিলে গেøাবাল ফায়ার পাওয়ার পরিবেশিত তথ্যে দেখা যায়, বিশে^ উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তিসম্পন্ন দেশের সংখ্যা ১২৬। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫২তম স্থানে। সামরিক শক্তিতে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ভারত রয়েছে ৪র্থ স্থানে। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ পাকিস্তানের স্থান ১৩তম। বাংলাদেশের অপর প্রতিবেশী মিয়ানমার রয়েছে ৩৩তম স্থানে। আর দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, ভুটান ও মালদ্বীপের মধ্যে সামরিক শক্তির অবস্থানে বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়।
উদীয়মান বিশ^ শক্তি, এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ ও দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম সামরিক শক্তি ভারত সামরিক শক্তিতে একেবারে নি¤œতম পর্যায়ে থাকা বাংলাদেশের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী প্রতিরক্ষা চুক্তি করার জন্য ভীষণ তৎপর হয়ে উঠেছে। অনেকেরই হয়তো মনে আছে যে ১৯৭২ সালে ভারত বাংলাদেশ ২৫ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এটি ছিল শান্তি ও সহযোগিতা চুক্তি, যাতে স্বাক্ষর করেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। পরে এ চুক্তির মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ভারত প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চায়। এ জন্য বেশ কিছুদিন থেকেই চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ৭ থেকে ১০ এপ্রিল ভারত সফর করবেন বলে স্থির হয়েছে। তার সে সফরকালে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে জানা গেছে। এ প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে ভারত বাংলাদেশকে অস্ত্র কেনার জন্য ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেবে। তবে এ ঋণের পুরোটা দিয়েই ভারতীয় অস্ত্র কিনতে হবে। আরো জানা যায় যে, প্রতিরক্ষা চুক্তিতে শুধু অস্ত্র বিক্রিই নয়, এর মধ্যে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও দু’দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রশিক্ষণ জোরদারের বিষয় থাকবে।
হিন্দুস্তান টাইমস-এর খবরে বলা হয়েছে, ‘ভারত এমন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি চাইছে যার আওতায় প্রশিক্ষণ, সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি এবং দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।’ নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে এ খবরে আরও বলা হয়, ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, তবে এখনও চূড়ান্ত হয়নি।’ তথ্যমতে, ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম, মরিশাস ও সিচেলিসের সাথে ভারত এ ধরনের চুক্তি করেছে। এখন বাংলাদেশকেও সে এ চুক্তির আওতায় আনতে চায়। উল্লেখ্য যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিষয় থাকলেও বাংলাদেশ কোনো দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ভারতের আগে থেকেই চিন্তাভাবনা ছিল। এর মধ্যে গত নভেম্বরে চীন থেকে দু’টি সাবমেরিন কেনার ঘটনা হঠাৎ করেই ভারতে বেশ উদ্বেগের সৃষ্টি করে। ভারতের সংশ্লিষ্ট মহল উপলব্ধি করে যে এর ফলে বাংলাদেশে চীনা প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা সাবমেরিন বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় আনার বিষয়টি জোরদার রূপ লাভ করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোজ পারিকরের ঢাকা সফরের ঘটনা ঘটে। এক কথায়, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য দু’টি সাবমেরিন কেনার পরপরই অনেকটা দ্রæততার সঙ্গে মনোহর পারিকরের সফর চূড়ান্ত হয়। ভারতের কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এটাই প্রথম বাংলাদেশ সফর। তার সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন ভারতের সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর উপ প্রধানগণ ও কোস্টগার্ড প্রধান। গত ৩০ নভেম্বর দু’দিনের সফরে তিনি ঢাকায় আসেন। জানা যায়, ঢাকা সফরকালে মনোজ পারিকর বাংলাদেশের সিনিয়র রাজনৈতিক, বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তখনি ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঢাকা-দিল্লি সামরিক চুক্তির বিষয়টি সামনে আসে।
বলা দরকার যে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বিদ্যামান। বাংলাদেশের সামরিক প্রয়োজনের প্রধান অংশই পূরণ করে চীন। বাকি অংশ আসে রাশিয়া, ব্রিটেন ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ থেকে। বিশ্লেষকদের মতে, ‘দু’দেশ ভবিষ্যতে সামরিক সম্পর্ক আরো গভীর করে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ। হার্ডওয়্যার বিনিময় ছাড়াও সহযোগিতা বিস্তৃত করার পথে এগিয়ে চলেছে দুই দেশ। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহায়তা বিনিময়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন উঁচু মাত্রায়। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, পঁচাত্তরের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের গণমুক্তি ফৌজের যে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক তৈরি হয় তা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। চীন থেকে যেসব সামরিক সরঞ্জাম আনা হয় তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও বাংলাদেশে আছে এবং এগুলো কার্যকর। এছাড়া ইউরোপ-আমেরিকা থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল। চীনের ক্ষেত্রে তা নয়।’
বিভিন্ন পর্যায় থেকে ভারতের এই প্রতিরক্ষা চুক্তির ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপের কারণ খতিয়ে দেখা হয়েছে। দৈনিক ইনকিলাবে এ বিষয়ক এক বিশেষ প্রতিবেদনে জাপানের ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার বরাতে বলা হয়, ‘চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন নেয়ার পর বাংলাদেশে সাবমেরিন ঘাঁটি বানাতে হবে এবং বিষয়টি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। দক্ষিণ-এশিয়া ভিত্তিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমসহ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে স¤প্রতি গুঞ্জন উঠেছে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত কয়েকটি চুক্তি এবং তাদের কাছ থেকে সাবমেরিন কেনার পর ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে উদ্বেগ বোধ করেছে ভারত। ওই উদ্বেগ দূর করতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে প্রতিরক্ষা চুক্তির তোড়জোর করছে ভারত। হিন্দুস্তান টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রতিরক্ষা খাতে চীন-বাংলাদেশ নৈকট্য বাড়ছে। এ কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির ব্যাপারে ভারত উঠে পড়ে লেগেছে।’
বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধান শক্তিসমূহের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব নানামাত্রিক। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ চীন আক্রমণের জন্য। চীনের উপর দক্ষিণ থেকে আক্রমণের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান হচ্ছে বঙ্গোপসাগর। তাই, চীনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রণকৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশকে বেছে নেয়ার আর একটি লক্ষ্য হলো, চীনকে সামরিকভাবে মোকাবেলা করতে হলে পরে মার্কিন নৌবহরকে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে নিয়মিত টহল দিতে হবে। আর সে জন্যই বাংলাদেশের নৌবন্দরগুলোর গুরুত্ব আমেরিকার কাছে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর ভারতের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কারণে। প্রথমত জন্মশত্রæ পাকিস্তানের বিপরীতে বিশ^স্ত মিত্র পাওয়া, দ্বিতীয়ত চীনের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষায় ও চীনকে পাল্টা আক্রমণ করায় সহায়তা পাওয়া এবং তৃতীয়ত পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে ভারতীয় ফেডারেশনের মধ্যে ধরে রাখায় নির্ভরযোগ্য বন্ধু পাওয়া। আবার চীনের কাছেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ তার আত্মরক্ষার জন্য। চীন তার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য বঙ্গোপসাগরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের কথা ছিল গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের কাছে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত তিস্তা চুক্তি ঐ সফরকালে স্বাক্ষরিত হওয়ার বিষয় নিশ্চিত না হওয়ায় সফর পিছিয়ে যায়। তারপরে আবারও একই কারণে সফর পিছায়। এবারের সফরেও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কোনো সম্ভাবনার কথা এ পর্যন্ত জানা যায়নি। কোনো কোনো মাধ্যমে গঙ্গা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা হতে পারে আবার নাও হতে পারে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে ভারতীয় গণমাধ্যম ফার্স্টপোস্টের ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়, বাংলাদেশকে চীনের প্রভাব থেকে মুক্ত করাই ভারতের দিক থেকে এপ্রিলে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের মূল বিষয়।
এদিকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের তথ্য মতে, ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পারিকর তার সফরকালে বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রস্তাব করেন। কিন্তু বাংলাদেশ তাতে নাজি না হওয়ায় পররাষ্ট্র সচিব জয়শংকরের সফরের সময় বিষযটিকে সমঝোতা স্মারকের পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়।
জানা যায়, ভারত চায় বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে অস্ত্র কিনুক। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সেনা কর্মকর্তারা ভারত থেকে সমরাস্ত্র কিনতে আগ্রহী নন। কারণ তারা মনে করেন বিদেশ থেকে ভারতের অস্ত্র ক্রয়ের হার এটা প্রমাণ করে যে তাদের খুব কম অস্ত্রই গুণগত মানসম্পন্ন যেটা ক্রয় করা যেতে পারে। মূলত নেপাল এবং মিয়ানমারে সরবরাহকৃত ভারতীয় সমরাস্ত্রের গুণগত মান তেমন একটা ভালো ছিল না। আর চীনের অস্ত্র দামে সস্তা এবং ব্যবহার করা সহজ। তাছাড়া বাংলাদেশের সামরিক কৌশল, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম মূলত চীন নির্ভর। দীর্ঘ প্রায় চার দশকের এই নির্ভরতা রাতারাতি পাল্টে ফেলা সম্ভব নয় বলে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা ভারতকে জানিয়েছেন। আর প্রতিরক্ষার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সামরিক বাহিনীর পরামর্শ নিয়েই চলতে চান।
ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী প্রতিরক্ষা চুক্তি যদি হয় তা ভারতের জন্য যতটা সুবিধাজনক হবে, বাংলাদেশের জন্য ততটা নয়। হিন্দুস্তান টাইমসের ৬ মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যাপক ভারত বিরোধী মনোভাব থাকায় ও বাংলাদেশের প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় এ চুক্তিতে সম্মত হতে দ্বিধায় রয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করা অতটা সহজ নয়। হাসিনাকে ভারতপন্থী নেতা বলে সমালোচনা করছে বিরোধীরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ ভারতকে যতটা দিচ্ছে, তার সিকিও আনতে পারছে না। গত কয়েক বছরে শেখ হাসিনা ভারতের স্বার্থে অনেক বড় বড় পদক্ষেপ নিয়েছেন। সীমান্তে ভারতবিরোধী বিদ্রোহী দমনসহ কানেকটিভিটি চুক্তি করে ভারতকে সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তিতে নয়াদিল্লি স্বাক্ষর করেনি। ২০১১ সালে এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিচুক্তি অনুযায়ী তিস্তা নদীর পানির ফিফটি-ফিফটি শেয়ার চায় বাংলাদেশ।
ভারত সামরিকভাবে বাংলাদেশকে পুরোপুরি তার উপর নির্ভরশীল করে তুলতে চায়। প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে এ ধরনের নির্ভরশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। কিন্তু কোনো আত্মমর্যাদাশালী দেশ এ ধরনের চুক্তি করতে পারে না। দেশ ও জাতীয় স্বার্থ সব কিছুর ঊর্ধ্বে। যে কোনো অবস্থায় তা সমুন্নত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস কাক্সিক্ষত নয়।
 লেখক : সাংবাদিক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।