Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

স্বাধীনতা যুদ্ধ

| প্রকাশের সময় : ১৩ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মা হ মু দু ল হ ক জালীস : মানুষের দাসত্ব, শোষণ-বঞ্চনা আর বৈষম্য-গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার নামই স্বাধীনতা। এটা আল্লাহর মহান নেয়ামত। স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যে সকল অধিকার দিয়ে সৃষ্টি করেছেন সেই অধিকার খর্ব হওয়ার নামই পরাধীনতা। মানবজাতি শুধুমাত্র ভিন্নজাতের উপনিবেশের দ্বারাই পরাধীন হয় না; স্বজাতীয় বা স্বগোত্রীয়দের দ্বারাও মানুষের স্বাধীনতা হরণ হয়। মানুষ যখন মানুষের দ্বারা অধিকার বঞ্চিত হয় তখনই মানুষ পরাধীন হয়। মানুষকে গোলামীর যে জিঞ্জিরে আবদ্ধ করে কিছু মানুষ সে জিঞ্জিরকে ছিন্ন করে স্বকীয়তায় মূর্ত হওয়ার নামই চিরায়ত স্বাধীনতা।
উপমহাদেশের ইতিহাসে বৃটিশ শাসন যেভাবে জনগনের নিকট নাভিশ্বাস হয়ে ওঠে, সেভাবেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান। তাদের নানাবিধ বৈষম্য-জুলুমে পূর্ব পাকিস্তানিদের জনজীবন দুরভিসন্ধি হয়ে পরে। নির্যাতিত জনগণ তাদের শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম শুরু করে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনে মূল্যবান জীবন বিসর্জন দেয়। মাতৃভূমি রাক্ষার জন্য নিজ স্বার্থের জলাঞ্জলি দেয়। কারণ শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের স্বাধীনতাকে বিপন্নও ভূলুন্টিত করে ছিল। মানবতাকে করে ছিল পর্যুদস্ত। লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত করে ছিল নিরীহ দেশবাসীকে। এহেন পরিস্থিতিতে সর্বস্তরের জনগণের মান-সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা একান্ত প্রয়োজন ছিল। এ পরিস্থিতিতে কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন লোক জালেমের পক্ষাবলম্বন করতে পারে না। মাযলুমের সাহায্য করা এবং তাদের পক্ষে কথা বলা- এটাই প্রত্যেক ব্যক্তির বিবেকের দাবি। কিন্তু তারপরও এদেশের একশ্রেণীর আলেম সমাজ কেন পাকিস্তানের মৌন সমর্থন দিয়েছিলেন, এটা একটা বড় প্রশ্ন। এতে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতি হয়েছিল।
স্বাধীনতা যুদ্ধে আলেমদের থেকে যারা জোরালো ভূমিকা রেখেছেন, তাদের নামের আংশিক ফিরিস্তি পেশ করছি। এ দেশকে স্বাধীন করার জন্য যারা লড়াকু সৈনিকের ভূমিকা পালন করেন, তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীর যুদ্ধকালীন সঙ্গী ছিলেন মাওলানা শেখ উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী। এমনিভাবে আলেম মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা আব্দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী। চাঁদপুরের মনপুরা সিনিয়ার মাদরাসার সুপারিন্টেনডেন্ট মাওলানা হাবিবুর রাহমান। সিলেটের মাওলানা আবুল কালাম। কুমিল্লা দেবিদ্বার মাওলানা আবদুর রহমান। হাতিয়া দ্বীপের সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান। চট্টগ্রামের পটিয়া থানার ফাজিলখাঁর হাটের স্বনামধন্য মুহাদ্দিস মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা আবদুস সোবহান। রাঙুনিয়ার মাওলানা আবু ইসহাক ও মাওলানা আবুল কালাম। চন্দঘোনার প্রখ্যাত আলেম মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা দলিলুর রহমান। রানীরহাটের মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা মতিউর রসুল। চট্টলার সাহসী বীর গেরিলা মৌলভী সৈয়দ আহমদ চৌধুরী। পটিয়ার মাওলানা নোমান। ছাগলনাইয়ার দুঃসাহসিক মুক্তিযোদ্ধা মৌলভী মাকসুদ আহমদ ভুঁইয়া। কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের মাওলানা আবদুল মতিন মজুমদার। পটিয়া মাদরাসার শিক্ষক মরহুম আল্লামা দানেশ। মালিবাগ মাদরাসার প্রিন্সিপাল কাজী মুঈতাসিম বিল্লাহ। এছাড়াও হযরত হাফেজ্জি হুজুর রহ.-এর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন মাওলানা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী রহ.। চরমোনাইয়ের পীরের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তার জামাতা মাওলানা ইউসুফ আলি খাঁন। এরা ব্যতীত আরো নাম জানা-অজানা হাজারও আলেম স্বাধীনতার জন্য শরীরের তাজা রক্ত বিসর্জন দিয়েছেন। বর্বর পাকিস্তানিদের মোকাবেলা করেছেন। পান করেছেন শাহাদতের অমিয় সুধা।
যা-ই হোক, বাংলার স্বাধীনতার পিছনে আলেম-ওলামাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারপরও সবাই আলেমদের স্বাধীনতাবিরোধী মনে করার কারণ আমাদের বোধগম্য নয়। ২/৪ জন মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে থাকতে পারে। কিন্তু সব আলেম তো নয়। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার আবদুল জলিলের কথাটি প্রণিধানযোগ্য। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও হাফেজ্জী হুজুরের মতো লোকের শিষ্যত্ব বরণ করলেন কেন?
তখন তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন- হাফেজ্জী হুজুর কখনো রাজাকার ছিলেন না।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রে স্বৈরাচারী শাসকশ্রেণীর নির্দেশে নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলা চালায় পশ্চিম পাকিস্তানপন্থী সেনাবাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানপন্থী মুক্তিপাগল বাঙালি শুরু করে মাতৃভূমি রক্ষার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আর্জিত হয় স্বাধীনতা। সাধের সেই স্বাধীনতা লাভের ৪৭ বছর পরও প্রশ্ন জাগে, আগে ভিন্ন অঞ্চলের মানুষ আমাদের উপর শোষণ-উৎপীড়ন করতো কিন্তু এখন আর ভিন্ন অঞ্চলের কোন মানুষ প্রত্যক্ষভাবে আমাদের উপর খড়গহস্ত হয় না- এই পার্থক্য ছাড়া প্রকৃত শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির স্বাদ কতোটুকু পেয়েছি?



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ