Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৭ মে ২০১৭, ১৩ জ্যৈষ্ঠ , ১৪২৪, ৩০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও অকুপেশনাল থেরাপির ভূমিকা

| প্রকাশের সময় : ১৫ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

বর্তমান সভ্যতা ও সমাজে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্মহার অনেক বেড়ে চলেছে। যে হারে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু জন্ম হার বাড়ছে তা অনেকটাই অস্বাভাবিক। অনেকের প্রশ্ন এই শিশু জন্ম নেয়ার কারণ কি? ঠিক করে কারণ বলা যায় না, তবে এর পিছনে দায়ী কিছু সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এই কারণগুলো এবং অকুপেশনাল থেরাপীর প্রয়োজন নিয়েই এই লেখা।
সম্ভাব্য কারণ
জন্মের আগে
* মায়ের যদি অপুষ্টিজনিত কোন সমস্যা থেকে থাকে। * মায়ের যদি থাইরয়েডজনিত (হাইপার/হাইপো থাইরয়েডিজম)সমস্যা থেকে থাকে। * বাল্য বিবাহ, অধিক বয়সে বিবাহ ও বাচ্চা নেয়া। * মায়ের জীবনযাত্রা যেমন: ধূমপান, অত্যাধিক মদ্যপান, ড্রাগস নেয়া, জর্দা খাওয়া ইত্যাদি। * বাচ্চা মায়ের পেটে থাকাকালীন পেটে গুরুতর আঘাত পাওয়া। * মা যদি ডিপ্রেশনে ভুগে থাকেন অথবা কোন কারণে অত্যাধিক মানসিক চাপের মধ্য থাকেন ইত্যাদি। জন্মের সময় * বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কান্না না করা (হাইপোক্সিক ইশকেমিক এনসেফালোপেথী/পেরিনেটাল এসফেক্সিয়া) * কম ওজনের বাচ্চা জন্ম নেয়া। * প্রিম্যাচিউর চাইল্ড (৩৭ সপ্তাহের আগে জন্ম নেয়া)
* উলটো প্রসব (ব্রিচ ডেলিভারী) * ফরসেপ ডেলিভারী। * গলায় আম্বেলিকাল কর্ড জড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদি
জন্মের পরবর্তী সময় * বøু বেবি বা জন্ডিস * খিঁচুনিজনিত কারণে। * হাইড্রোসেফালাস (মাথায় সিএসএফ জমে মাথার আকৃতি বেড়ে যাওয়া)/মাইক্রোসেফালাস (মাথার আকৃতি ছোট হওয়া। * মাথায় আঘাত পাওয়া/পক্ষাঘাত * টিউমার বা অস্বাভাবিক মাংসÐিজনিত কারণে ইত্যাদি।
জিনগত কারণ
ট্রাইসোমি ২১ নামক ক্রোমোজোমের আধিক্য
এইগুলি সম্ভাব্য কিছু কারণ মাত্র। এছাড়াও আরও নানা কারণে শিশুর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হতে পারে। আরো জানার জন্য লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা যাচ্ছে।
কি কি লক্ষণ দেখা গেলে বোঝা যাবে শিশুটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন? * ডেভেলপমেন্টা ডিলে মানে সঠিক বয়সে ঘাড় শক্ত না হওয়া, সঠিক সময়ে বসতে না পারা, দাঁড়াতে না পারা, হাঁটা চলাফেরা করতে না পারা। বাচ্চার ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোন জানার জন্য নিকটস্ত কোন হাসপাতলে অথবা লেখকের সাথে যোগাযোগ করুন। * ঝুনঝুনি বা কোন শব্দের আওয়াজে না তাকানো * নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেয়া * ঠিকমত বাবিøং (বা-বা, মা-মা শব্দ) না করা। * ২.৫ বছর বয়সেও কোন বাক্য ঘটন করে না পারা। * অক্ষর পড়তে না পারা, লিখতে না পারা। * সবসময় অস্থিরতা প্রদর্শন করা, এক জায়গায় স্থির হয়ে না বসা, দোড়াদোড়ি করা অত্যাধিক। * জিনিসপত্র এলোমেলো করা, ছুঁড়ে ফেলে দেয়া। * কোন আওয়াজ হলেই কেঁদে দেয়া কান চেপে ধরা। * জামা-কাপড় পরতে না চাওয়া, চুল কাঁটতে না চাওয়া, নখ কাটতে না চাওয়া (অনুভূতির সমস্যা) * গোল গোল করে ঘুরা বা কোন বস্তুকে বারবার গোল গোল করে ঘুরানো। * চোখের উপরিভাগ দিয়ে দেখা * চলতে চলতে আচমকা পড়ে যাওয়া। উপরোক্ত লক্ষণগুলি দ্বারা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু চিহ্নিত করা যায়। কোন কোন শিশুর ক্ষেত্রে অনেক অল্প বয়সেই লক্ষণগুলি দেখা যেতে পারে আবার কোন কোন বাচ্চার একটু পরে দেখা যেতে পারে।
অকুপেশনাল থেরাপী কি? এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে অকুপেশনাল থেরাপীর ভূমিকা কি?
অকুপেশনাল থেরাপি চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক একটি শাখা। যার মাধ্যমে একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরিয়ে আনা যায়। যখন কোন মানুষ বা শিশু তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন অকুপেশনাল থেরাপীর মাধ্যমে তাকে পূর্বের ন্যায় অথবা সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মোপযোগী করে তোলা যায়। একটি শিশু উপরে বর্ণিত নানা কারণে তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারাতে পারে কিন্তু অকুপেশনাল থেরাপিস্ট পুনর্বাসন (রিহাবিলেটেশন) করার মাধ্যমে তাকে করে তুলতে পারে কর্মক্ষম।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও অকুপেশনাল থেরাপী
শিশুরা শেখার জন্য খেলে না, খেলতে খেলতে শিখে। আর এই শেখার জন্যই একটি শিশুর শারীরিক বিভিন্ন তন্ত (কম্পনেন্ট) ও মস্তিষ্কের সমন্বয় সাধন প্রয়োজন। এই সমন্বয় সাধনের মাধ্যমেই শিশু শিখতে পারে এবং তা মস্তিস্কে স্টোর হয়ে থাকে যা শিশুকে পরবর্তী শিখনে সাহায্য করে। একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট শিশুর মস্তিষ্কের এই ক্ষমতাই কাজে লাগিয়ে থাকেন যাকে বলে “নিউরোপ্লাস্টিসিটি”। যখন কোন কারণে শিশুর মস্তিষ্কের কোন অংশ কাজ না করে অথবা মস্তিষ্কের কোন অংশের কোষ বা কোষগুলি নষ্ট হয়ে যায় তখন একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট শিশুর মস্তিষ্কের কর্মক্ষম কোষগুলোকে কাজে লাগিয়ে শিশুকে দিয়ে সেই কাজটি করাতে চেষ্টা করে থাকেন এই প্রক্রিয়াই নিউরোপ্লাস্টিসিটি। আর এই কাজটি করাতে দরকার হয় বিশেষ কিছু এক্টিভিটি বা গেমপ্ল্যান যা শিশুর সার্বিক বৃদ্ধি ও বিভিন্ন কিছু শিখতে সাহায্য করে থাকে।
যেমন : এডিএইচডি শিশু বা অত্যাধিক অস্থির শিশু হয়ত সব জিনিস ছুঁড়ে মারে, একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এই আচরণটিকে ফাংসনালভাবে ব্যবহার করে থাকেন ডার্ট নিক্ষেপ বা বোলিং করানোর মাধ্যমে। এতে করে শিশুটির মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং ব্যবহারেও পরিবর্তন দেখা যায়।
অনেক সময় অটিজম আক্রান্ত শিশু চুল কাটতে বা নখ কাটতে দিতে চায় না। ভয় পায়। বাবা-মা বেশিরভাগ সময় শিশু ঘুমিয়ে থাকলে নখ ও চুল কাটেন। অথবা অনেক শিশু দাঁত ব্রাশ করতে চায় না, ভয় পায়, কান্নাকাটি করে। চুল কাঁটতে গেলে কাঁচির নিচে বসতে চায় না, স্থির হয়ে বসে না কোথাও। এইসব অনুভূতির (সেন্সরি) নানা সমস্যার সমাধান করে থাকেন একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট। আবার অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায় নিজ হাতে খেতে পারে না, লিখতে পারে না এইসব সমস্যার ক্ষেত্রেও একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট নানাভাবে শিশুটিকে কর্মক্ষম করে তোলেন।
যেমন : সেরেব্রাল পালসি আক্রান্ত শিশু হয়ত নিজ হাতে খেতে পারছে না। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এসেসমেন্ট করে থাকেন যাতে কারণটা বের করা যায়। হয়ত শিশুটির হাতের শক্তি কম, অথবা বসতে পারছে না, অথবা হয়ত শিশুটির খাওয়ার চামচটি উপযোগী নয়, এইসব ক্ষেত্রে শিশুটির জন্য স্পেশাল চেয়ার থেকে শুরু করে চামচ মডিফিকেশন পর্যন্ত করে থাকেন একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট যাতে করে শিশুটি নিজের কাজ নিজে করতে পারে। তাই বিশেষ শিশুদের জন্য অকুপেশনাল থেরাপির ভূমিকা অপরিসীম। আপনার সন্তান কিংবা আপনার আশেপাশের কারোর সন্তানের যদি এই ধরনের সমস্যা দেখা যায় তাহলে একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্টের সাথে যোগাযোগ করুন। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট আপনার বাচ্চার সমস্যার ধরন নির্ধারণ করে বাচ্চার জন্য উপযোগী এবং দরকারি চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করবেন
তারিকুল ইসলাম সজীব
ক্লিনিকাল অকুপেশনাল থেরাপিষ্ট
ইনচার্জ, ডিপার্টমেন্ট অফ অকুপেশনাল থেরাপি
ইন্সটিটিউট অফ অটিজম এন্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ
০১৭১১৯৪৯৪০০, ংধলরননড়ঃ@মসধরষ.পড়স

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।