Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ আগস্ট ২০১৭, ৩ ভাদ্র, ১৪২৪, ২৪ যিলকদ ১৪৩৮ হিজরী

অপরাধ ও অর্থ পাচারে বিদেশীরা

অবৈধ বসবাসকারীদের পরিসংখ্যান নেই

| প্রকাশের সময় : ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:৩১ পিএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশে অবৈধভাবে বিদেশীদের বসবাস আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বারিধারাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এদের বসবাস। এদের মধ্যে ভারতীয়র সংখ্যাই বেশী। বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে ঘাম ঝরিয়ে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন। প্রবাসীদের সেই কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় এক তৃতীয়াংশ নিয়ে যাচ্ছে এসব অবৈধ বসবাসকারীরা। শুধু তাই নয়, তারা আমাদের চাকরির বাজারে বাড়াচ্ছে বেকারত্ব। সেই সাথে জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। এটিএম মেশিন থেকে কার্ড জালিয়াতি, প্রতারণা, মাদক ব্যবসার মতো কাজেও জড়িয়ে পড়ছে তারা। এসব বিদেশী কোথায় অবস্থান করছে তারও কোন ডাটা নেই সরকারের কাছে। কেউ জানেন না এসব বিদেশীদের প্রকৃত সংখ্যা। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বৈধ বিদেশী সাড়ে ১৬ হাজার আর অবৈধ ১২ লাখের বেশী। এরা অনুমতি ছাড়াই বছরের পর বছর অবস্থান করছে বাংলাদেশে। অপরাধে জড়ানোর পাশাপাশি তারা অবৈধভাবে আয় করে সে অর্থ পাঠাচ্ছে স্বদেশে। ফাঁকি দিচ্ছে কর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত কারিগরী জ্ঞানের অনুপস্থিতিতে দেশে দিন দিন বাড়ছে অবৈধ বিদেশী শ্রমিকের সংখ্যা। গার্মেন্টস খাতে প্রডাকশন ম্যানেজার, মার্চেন্ডাইজার, সিনিয়র সেলাই অপারেটর, কাটিং মাস্টার, ডিজাইনার এবং ওয়াশিং এক্সপার্টের মতো শীর্ষ পদে কাজ করছে অধিকাংশ বিদেশী শ্রমিক। এ ছাড়া বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার স্টেশন, আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, ফ্যাশন হাউজ, খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফোন কোম্পানি, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, নানা ধরনের পার্লার, এমনকি শোরুমের কর্মচারী হিসেবেও কাজ করছে অনেক বিদেশী। অবৈধ বিদেশীদের অধিকাংশই আবার ভারতীয়। এ ছাড়া রয়েছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ফিলিপিন্স, শ্রীলঙ্কার পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকার নাগরিকও। এর বাইরেও অবৈধভাবে অবস্থান করছে আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা’র (আইএলও) হিসেবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ছয় কোটিতে পৌঁছানোর কথা। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০১২ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের মধ্যে কাজ পান মাত্র সাত লাখ মানুষ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত অর্থাৎ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যারা শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন, তারাও আছেন।
এই যখন বাংলাদেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের চিত্র, তখন ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’র মত, বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে কাজ করে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করছে বিদেশীরা। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে- ভারতের বৈদেশিক রেমিটেন্স আয়ের পঞ্চম উৎস উন্নয়নশীল এই বাংলাদেশ।
এ তথ্যটি আমাদের সার্বিক কর্মসংস্থানের উপর কতটা হুমকিস্বরূপ তা পরিসংখ্যানেই অনুমেয়। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে যে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করেন কিংবা আমাদের পোশাক শ্রমিকদের হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের বিনিময়ে যে পোশাক তৈরি হয়ে বিদেশে রফতানি হচ্ছে তার বিপরীতে আসা অর্থ অনায়াসেই ভারতে নিয়ে যাচ্ছে ভারতীয়রা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত বছরে বিদেশী শ্রমিকের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়েছে। যারা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বেতন ভাতা গ্রহণ করছে। আর ২০১৫ সালের হিসাবে বাংলাদেশে রেমিটেন্স আসছে ১৫.৩১ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা।
জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যখন ভারতীয় আধিপত্য ঠেকানোর জন্য তাদের নিয়োগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে সেখানে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের চাকরিতে ভারতীয়দের আধিপত্য দিন দিন বেড়ে চলছে। এর পরই রয়েছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ আফ্রিকা, ইউরোপ-আমেরিকার ৫৫টি দেশের নাগরিক।
বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমতি নিয়ে দেশে কাজ করেন ১৩ হাজার বিদেশী কর্মী। আর এনজিও ব্যুরোর অনুমতি নিয়ে কাজ করা বিদেশী কর্মীর সংখ্যা ৫০০। সব মিলিয়ে সাড়ে ১৬ হাজার বিদেশী কর্মী সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশে বৈধভাবে কাজ করছেন। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা বহুগুণ বেশি।
বাংলাদেশে আসলে কতসংখ্যক বিদেশী নাগরিক কাজ করেন, তার সঠিক তথ্য সরকারের কোনো বিভাগের হাতেই নেই। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় পাঁচ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করেন। তারা তাদের দেশে এক বছরে ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সমান। বাংলাদেশ ভারতে পঞ্চম রেমিট্যান্স প্রদানকারী দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাই সহজেই অনুমান করা যায়, বিনিয়োগ বোর্ড থেকে যেসব ভারতীয় কর্মী ওয়ার্ক পারমিট নিয়েছেন, তার বাইরে বহুগুণ বেশি রয়েছেন, যারা অবৈধভাবে বাংলাদেশে আছেন। আর তাদের অর্জিত অর্থ অবৈধ পথে হুন্ডির মাধ্যমেই পাচার করা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে ঠিক কত বিদেশী নাগরিক কাজ করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কতজন বিদেশী নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করছে তার কোনো সঠিক সংখ্যা আমাদের কাছে নেই। তিনি বলেন, অনেক বিদেশী নাগরিক পর্যটক ভিসা নিয়ে এসে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। তারা আয় করছে, কিন্তু আয়কর পরিশোধ করছে না। বিদেশীরা ঠিক কী পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে নজিবুর রহমান বলেন, এ সংখ্যা অনেক বড় হবে।
বাংলাদেশ তৈরী পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সূত্রে জানা যায়, সমিতিগুলোর পক্ষ থেকে সদস্যদের কাছে একাধিকবার চিঠি দেয়া হলেও তাদের কারখানায় কর্মরত বিদেশীদের তালিকা দেয়ার ক্ষেত্রে কারখানা মালিকদের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। পোশাক খাতের প্রায় সাত হাজার কারখানার মধ্যে হাজার খানেক প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ সমিতিতে তালিকা জমা দিলেও তাতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশীর নাম আসেনি।
বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিুকুর রহমান ইনকিলাবকে জানান, গার্মেন্টস খাতে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজারের মতো বিদেশী কর্মরত আছে। এখাতে তারা মোট কত টাকা উপার্জন করছে তার হিসেব দেয়া মুশকিল। তবে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতে কর্মরত বিদেশীদের একটি ডাটাবেস তৈরীর কাজ চলছে। আগামী এপ্রিলের মধ্যে এটি শেষ হবে বলে আশা করছি। তখন এর প্রকৃত হিসাব জানান যাবে।
বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশীদের সঠিক সংখ্যা সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছেই নেই জানিয়ে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, অনেক সময় বায়ারদের ইচ্ছাতেই বিদেশীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে হয়। আবার অনেক সময় উপযুক্ত দেশী নাগরিক না পাওয়ায় কারখানার মালিকেরা বিদেশীদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। দেশে উপযুক্ত জনশক্তির মারাত্মক সঙ্কট আছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাতেই রয়েছে বড় ধরনের গলদ। যোগ্য ব্যক্তি তৈরির পরিবর্তে এ শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষিতের হার বাড়াচ্ছে। কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা গেলে এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হলে বিদেশী নাগরিকদের নিয়োগ দেয়ার প্রবণতা কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন সালাম মুর্শেদী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এ দেশে কর্মরত বিদেশীদের বেশির ভাগই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে কর্মসূচি বাস্তবায়ন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসব বিদেশী। বেতন-ভাতা হিসেবে তাদের একজন যা পায় তা দিয়ে সমপদে তিন থেকে ১০ জন বাংলাদেশী নাগরিককে পদায়ন করা সম্ভব হলেও অনেক উদ্যোক্তার কাছে এটি একরকম ফ্যাশন বা স্ট্যাটাস। আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশাকে প্রাধান্য দিতে কিংবা যোগ্য লোকের অভাবেও কেউ কেউ বিদেশীদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন বলে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছেÑ উচ্চ বেতনে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত এসব বিদেশী অনেক ক্ষেত্রে তৈরী পোশাক শিল্প খাতে অসন্তোষ সৃষ্টিসহ বহু অপরাধের সাথে যুক্ত। নামকরা বহু তৈরী পোশাক কারখানা ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের কাছে বিক্রি করে দেয়ার ক্ষেত্রে এদের হাত আছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে কতসংখ্যক বিদেশী নাগরিক অনুমতি নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করছেন জানতে চাইলে এনজিও ব্যুরোর পরিচালক (যুগ্ম সচিব) কে এম আবদুস সালাম জানান, ৫ শ’র মতো বিদেশী নাগরিক আমাদের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে কাজ করছেন।
প্রকৃতপক্ষে কত বিদেশী দেশে আছেন তা কোনো সংস্থাই জানে না। গত ২৮ জানুয়ারি বিনিয়োগ বোর্ড, এনজিও ব্যুরো ও বেপজাকে দেয়া এক চিঠিতে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের তালিকা পাঠাতে অনুরোধ করেছে এনবিআর। বিষয়টি ‘অতি জরুরি’ উল্লেখ করা হলেও এমন তথ্য কত দিনে পাঠাতে হবে, চিঠিতে তা উল্লেখ করা হয়নি।
বিনিয়োগ বোর্ড গত সাত বছর ধরে নতুন ওয়ার্ক পারমিট প্রদান করছে। ২০১৫ সালের প্রথম নয় মাসে এসেছে ১ হাজার ৫শ’ ৭৪জন বিদেশী শ্রমিক এবং এই সময়ের মধ্যে ২ হাজার ১শ’ ৬৭ জন শ্রমিকের ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন করা হয়েছে। অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন কর্তৃপক্ষ এবং পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন বিভাগ ওয়ার্ক পারমিট প্রদান করে থাকে।
বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশে বর্তমানে অন্তত ১২ লাখ বিদেশী নাগরিক রয়েছেনে, যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। বিদেশীদের কর্মসংস্থানের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে তৈরী পোশাক শিল্প খাত। কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল, ওভেন ও নিটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি, স্যুয়েটার ফ্যাক্টরি, বায়িং হাউজ, মার্চেন্ডাইজিং কোম্পানি প্রভৃতিতে কাজ করছেন প্রায় ১০ লাখ বিদেশী।
বিদেশীরা শুধু দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানেই সংকট সৃষ্টি করছেন না, একই সঙ্গে তাঁরা দেশের প্রচলিত আইন উপেক্ষা করে রাজস্বও ফাঁকি দিচ্ছেন। বর্তমান আইনে বিদেশীদের অর্জিত আয়ের ৩০ শতাংশ কর দেয়ার নিয়ম রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশী কোনো প্রতিষ্ঠান অবৈধ কিংবা ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া বিদেশীদের নিয়োগ দিলে ওই কম্পানির প্রদেয় আয়করের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বা কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান আছে। তবে এ জরিমানা কাউকে কখনো করা হয়েছে কি না তা কেউ জানাতে পারেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ নিয়ম মানছেন না বিদেশীরা।
বিদেশী নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য ভিসা দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা দেশে কতদিন থাকছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছেÑ সেসব দেখার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। কোনো বিদেশী নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করতে চাইলে তাকে ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিনিয়োগ বোর্ড থেকে। কর্মক্ষেত্রে তার সুযোগ-সুবিধা দেখার দায়িত্ব শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের। আর এ দেশে কাজ করে বিদেশী যে অর্থ উপার্জন করে তা থেকে আয়কর আদায় করার দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)।
জানা গেছে, মূলত গুলশান, বনানী, উত্তরার মতো অভিজাত এলাকাগুলোকে বিদেশীরা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিচ্ছে। গত বছরের শেষের দিকে রাজধানীর গুলশান ও রংপুরে দুইজন বিদেশী নাগরিক হত্যাকা-ের ঘটনায় দেশে অবস্থানরত বিদেশীদের তালিকা তৈরির একাধিক উদ্যোগ নেয়া হলেও তার কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। অবৈধভাবে বসবাসকারী এসব বিদেশীদের বেশিরভাগই ক্রেডিটকার্ড জালিয়াতি, আদম পাচার, জাল ডলার ব্যবসা, মাদক পাচারের মতো অপরাধে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় জড়িত সন্দেহজনক প্রতারক চক্রের সঙ্গে বিদেশী চক্রের জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে চলে আসায় খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে ঢাকায় বসবাসরত বিদেশী অপরাধী চক্রের সদস্যদের।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিভিন্ন অপরাধে দেশের কয়েকটি কারাগারে সাজা খাটছে প্রায় ৫শ’ বিদেশী। এর বাইরে, সাজা শেষ হওয়া প্রায় হাজারখানেক বিদেশীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে গিয়ে জটিলতায় পড়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে আসেন ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের নাগরিকরা। এরপর তারা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করে ভিসার মেয়াদ শেষের আগেই চলে যান। নতুন করে আবার ভ্রমণ ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এসব বিদেশী কর্মীর বেতন পরিশোধ করে রাজস্বমুক্ত বিভিন্ন খাত থেকে। বিদেশী কর্মীরা ডলার করে টাকা নিয়ে যান নিজের দেশে।
জানা গেছে, সারা দেশে আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি সায়েন্স ও এনিম্যাল হাসব্যান্ড্রি পড়ানো হয়। একেকটি বিভাগে গড়ে ১৫০ জন করে আট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী প্রতিবছর চাকরির বাজারে ঢোকেন। তাঁদের কেউ কেউ দেশের বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। কিন্তু ওই সব প্রতিষ্ঠানের উঁচু পদে অনেক বেশি বেতন দিয়ে দেশের বাইরে থেকে লোক আনা হয়। বাংলাদেশী যারাওবা চাকরি পান, তারা অনেক কম বেতনে চাকরি করেন।
ইসলাম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আফতাব ফিডে বহু বিদেশী চাকরি করেন। জানা গেছে, এদের বেতন মাসে তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা। এদের একজন ফিলিপাইনের নাগরিক জন্ডিলা বাইয়ান। তিনি ফিলিপাইনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনিম্যাল হাসব্যান্ড্রি থেকে মাস্টার্স করেছেন। তিনি আফতাব ফিডের চিফ নিউট্রিশনিস্টের দায়িত্বে রয়েছেন; প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বেতন পান। এ প্রতিষ্ঠানে বয় নামের আরেক ফিলিপিনো পুষ্টিবিদ কাজ করেন উঁচু বেতনে। অথচ এখানে যেসব দেশি কর্মী এনিম্যাল হাসব্যান্ড্রি থেকে মাস্টার্স করে পুষ্টিবিদ হিসেবে কর্মরত আছেন, তাদের বেতন গড়ে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে।
ড. জোয়ার্দার নামে একজন ভারতীয় কনসালট্যান্ট বা পরামর্শক প্রতি মাসে বাংলাদেশে আসেন। বিভিন্ন পোল্ট্রি খাদ্য ও মুরগি উৎ্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরামর্শ দেয়ার জন্য তাঁকে আনা হয়। তিনি কাজ করেন কাজী ফার্মস, প্যারাগন পোল্ট্রি ফার্ম, নারিশ ও সিপির মতো প্রতিষ্ঠানে। প্রতি মাসে একেকটি প্রতিষ্ঠান তাঁকে তিন লাখ থেকে ছয় লাখ টাকা দিয়ে থাকে। ড. জোয়ার্দার এর মতো অনেক বিদেশী পরামর্শক বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ নিয়ে যান ডলার করে।

 


Show all comments
  • Jamal ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ৫:২১ এএম says : 1
    sorker ki agulo dekhe na ?
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।