Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০১৭, ১৪ চৈত্র, ১৪২৩, ২৮ জামাদিউস সানী ১৪৩৮ হিজরী।

পশ্চিম জোনের ২১ জেলায় গ্রাহকদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেনি

ওজোপাডিকো’র এক যুগ

| প্রকাশের সময় : ২১ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

নাছিম উল আলম : দেশের পশ্চিম জোনের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ নিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তির কোন শেষ নেই। লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ ঘাটতি না থাকলেও এ অঞ্চলের ছোট-বড় অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকা ইতোমধ্যে নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রায়ই অনেক ৩৩ কেভী সাবস্টেশন ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকছে নানা কারিগরি ত্রæটির কারণে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন করাসহ গ্রাহকদের উন্নত সেবা প্রদানের কথা বলে পিডিবি’র আওতায় রেখে ২০০২ সালে ‘ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানী-ওজোপাডিকো’ গঠন করে সরকার। প্রথম দিকে পিডিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রবল বিরোধিতায় কোম্পানী গঠন প্রক্রিয়াসহ-এর কার্যক্রম শুরু বিলম্বিত হয়। তবে কোন কর্মীকে চাকরিচ্যুত না করাসহ বেতন-ভাতা ও আনুসাঙ্গিক সুবিধাদি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবি দাওয়া মেনেই ২০০৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে ওজোপাডিকো তার বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে।
কিন্তু গত একযুগেও সে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেনি। বরং দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি আর সিস্টেম লসের পরিমাণ হ্রাসসহ প্রায় শতভাগ বিল আদায় লক্ষ্য অর্জন হলেও গ্রাহক সেবারমান ক্রমশ তলানীতে ঠেকেছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। এছাড়া কর্মচারীদের যে ইউনিয়নের জিম্মিদশা থেকে বিদ্যুৎ বিভাগকে রক্ষার জন্য এ কোম্পানী গঠন করা হয়েছিল, তার আরো অবনতি ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ২১ জেলার প্রায় সব এলাকাতেই এখনো কয়েক যুগের পুরনো জরাজীর্ণ প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কিলোমিটার হাইটেনশন ও লোটেনশন লাইন কোম্পানীটির প্রায় পৌনে ১০ লাখ গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। বরিশাল ও খুলনা বিভাগসহ বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চল নিয়ে গঠিত কোম্পানীটির ২১ জেলায় যে ১ হাজার ৭৩০ কিলোমিটারের মত ৩৩ হাজার ভোল্টের লাইন রয়েছে তার অবস্থাও খুব ভাল নয়। খোদ বরিশাল বিভাগীয় সদরে আকাশে মেঘ জমলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে এখন প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানী থেকে ৩৩ কেভী লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ গ্রহণ করে ওজোপাডিকো তার ৬৭টি ৩৩/১১ কেভী সাবস্টেশনের মাধ্যমে ১১ হাজার ভোল্টের লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে এ অঞ্চলের ২১ জেলা ও বিভাগীয় সদর ছাড়াও ২০ উপজেলাতে। এসব এলাকায় ১ হাজার ৫৪০ এমভিএ ক্ষমতার ৩৩ কেভী সাবস্টেশন ছাড়াও আরো ১১টি ৩৩/০.৪ কেভী ট্রান্সফর্মার থেকে সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এছাড়াও প্রায় সোয়া ৬ হাজার ১১/০.৪ কেভি ট্রান্সফর্মারের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ পৌছে দেয়া হলেও এসব সরঞ্জামের প্রায় ৮০ ভাগই লোডসীমায় রয়েছে। অবশিষ্ট ২০ ভাগ ওভারলোডেড হয়ে আছে। আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে প্রায় শতভাগ ট্রান্সফর্মারই ওভারলোডে চলে যাবার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল মহল।
সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী পশ্চিমজোনের ২১ জেলায় সান্ধ্যপীক আওয়ারে প্রায় ১ হাজার ২৯০ মেগাওয়াট ও অফপীক আওয়ারে ৯৫১ মেগাওয়াট চাহিদার মধ্যে ওজোপাডিকো তার গ্রাহকদের যথাক্রমে ৫৩২ মেগাওয়াট ৪৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিতরণ করে থাকে। ২ হাজার ১০৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে কোম্পানিটি প্রায় ১০ লাখ আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তবে কোম্পানি গঠনের পরে পশ্চিমজোনে সিস্টেমলস প্রায় ২৫ ভাগ থেকে ইতোমধ্যে ১০ ভাগের নিচে হ্রাস করা সম্ভব হলেও গ্রাহকদের কাঁধে বিদ্যুতের বাড়তি দরও সেবার নিম্নমান ভর করেছে। ইতোপূর্বে সিস্টেম লসের অন্তত ৬০ভাগই ছিল চুরি। গত জানুয়ারীতে কোম্পানীটির সিস্টেম লস ছিল ৯.৬৫% বলে জানা গেছে।
কিন্তু সিস্টেম লসের নামে চুরি বাহুলাংশে হ্রাস করা সম্ভব হলেও গত একযুগেরও বেশী সময় ধরে চলা এ কোম্পানীটি গ্রাহক সেবায় কোন সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেনি। নড়বড়ে বিতরণ লাইনসহ ওভারলোডেড ট্রান্সফর্মারের সাথে গ্রাহক সেবা(?) কেন্দ্রগুলোর অবস্থ্া খুবই করুন। এসব কথিত সেবা কেন্দ্রে গ্রাহকদের নাজেহালের পরিমাণই বেশী। বেশিরভাগ সেবা কেন্দ্রেই প্রয়োজনীয় জনবল নেই। কোম্পনীটির আওতায় ২১ জেলা ও ২০ উপজেলায় ঐধরনের সেবা কেন্দ্রের সংখ্যা ১০৬টি হলেও ইতোপূর্বে যেখানে ২৪ ঘণ্টাই সার্বক্ষণিক অভিযোগ কেন্দ্রগুলোতে লোকজন থাকত, কোম্পানী গঠনের পরে তা সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সীমিত করা হয়েছে। এর পরে প্রতিটি বিতরণ বিভাগের জন্য একটি করে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ খোলা থাকার কথা বলা হলেও মধ্যরাতে সেখান থেকে কোন গ্রাহকের সেবা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। পুরো একটি বিতরণ বিভাগের ১০-১২ হাজার গ্রাহকের জন্য একটি মাত্র সার্ভিস সেন্টার থেকে গ্রাহকদের অভিযোগের সুরাহা করা দুরুহ হয়ে পড়ছে। উপরন্তু এসব সেবাকেন্দ্র ও ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে যানবাহনের অভাব প্রকট। কোম্পানী গঠনের দীর্ঘদিন পরে ১০টি যানবাহন কেনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আরো কিছু যানবাহন কেনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন ওজোপাডিকোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (কারিগরি)।
গত অর্থ বছরে কোম্পানিটি ১৭ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করলেও বর্ধিত বেতন-ভাতা প্রদানসহ বকেয়া গ্রাচুইটি প্রদানের কারণে চলতি অর্থ বছরে এর অর্থনৈতিক অবস্থা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের শেষে ওজোপাডিকো’র লোকশানের পরিমাণ শতাধিক কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। পিডিবি’র চেয়ে এ কোম্পানীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পরিমাণ যথেষ্ট বেশী হলেও সরকারী কর্মচারীদের পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরে ওজোডিকোর জন্য প্রায় ৬০ ভাগ বর্ধিত বেতন-ভাতা মঞ্জুর করেছে জ্বালানি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। ফলে চলতি অর্থ বছরে লোকশানের পরিমাণ শত কোটি টাকায় পৌঁছার আশঙ্কার মধ্যেই বিদ্যুতের দাম আবারো বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে কোম্পানিটি।
তবে সব কিছুর পরেও গ্রাহক সেবার মান উন্নতির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের মধ্যে আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি পুরনো বিদ্যুৎ লাইন ও বিভিন্ন স্থাপনা পুনর্বাসনসহ আধুনিকায়নের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোম্পানিটির আওতাধীন ২১ জেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়নে ২টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের আওতায় ৪৪৪ কিলোমিটার নতুন ১১ কেভী ও ০.৪ কেভি লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ৭০ কিলোমিটার ৩৩ কেভী নতুন লাইন নির্মাণ ছাড়াও ১শ’ কিলোরমিটার লাইন পুনর্বাসন করা হবে। ২৬টি ৩৩/১১ কেভী ও ২ হাজার ১শ’টি ১১/০.৪ কেভি নতুন বিতরণ ট্রান্সফর্মার স্থাপন করা হচ্ছে। একই সাথে ৩০ হাজার নতুন বিদ্যুৎ খুঁটি স্থাপন, ৩টি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণ ও ১১টি অনুরূপ পুরনো সাবস্টেশন পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে প্রকল্পের আওতায়। তবে আগামী অর্থ বছরের মধ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হলেও তা ২০১৯-এর ডিসেম্বরের আগে সম্পন্ন হবার সম্ভাবনা নেই। এছাড়াও প্রায় ১ হাজার ২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে আরো একটি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ওজোপাডিকো’র বিতরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে।
এসব বিষয়ে গতকাল ওজোডিকো’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে তার ল্যান্ডফোন ও সেলফোনে যোগাযোগের বহু চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ