Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

চুক্তি সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে

| প্রকাশের সময় : ২৫ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

তৈমূর আলম খন্দকার : মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা অনস্কীকার্য। আমেরিকার বৈরিতার বিরুদ্ধে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কর্তৃক বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে আশ্রয়, স্বীকৃতি প্রদান এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের প্রতি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের আহŸান, অধিকন্তু মিত্রবাহিনীর ব্যানারে বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণা প্রভৃতি অবশ্যই স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
আগরতলা মামলার ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে তবে তাদেরকে (যারা দেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা করেছিলেন) সাধুবাদ এ জন্য যে, দেশটি স্বাধীন হওয়ার প্রয়োজন ছিল এ কারণে যে (১) ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হয়ে পাঞ্জাবিদের গোলামি, স্বেচ্ছাচারিতা, শাসন, শোষণ থেকে মুক্তি এবং (২) অন্যদিকে ১২০০ মাইল দূরত্বে থেকে দুটি দেশ একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত থাকা বাস্তবতাবহিভর্‚ত। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারতের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও তারা যে অসাম্প্রদায়িক তা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় উসকানিতে ভারতে যত সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে, যত মুসলমান খুন হয়েছে পৃথিবীতে আর কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। জাতিগত বিরোধ বহু রাষ্ট্রে হলেও ধর্ম নিয়ে বিরোধ ও দাঙ্গা ভারতেই সবচেয়ে বেশি সংঘটিত হয়েছে, যার পেছনে ছিল ভারত গুরুদের ইন্ধন।
ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেও সাম্প্রদায়িক এবং উসকানিদাতা। ট্রাম্প ও পুতিন যেমন মুসলমানদের বিরুদ্ধে সোচ্চার তেমনি মোদিও তার নির্বাচনী বক্তব্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের লেলিয়ে দিয়েছেন। ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছে আন্তরিকভাবেই এবং সাহায্য-সহযোগিতাও ছিল অফুরন্ত, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। বাংলাদেশের ভূখÐ দখল করার উদ্দেশ্য হয়তো ভারতের ছিল না। কারণ বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ, এ দেশে সমস্যা অনেক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও জনসংখ্যার চাহিদা মেটানো দায় ভারত নিতে চায়নি। তবে ভ‚খÐ দখল না করলেও সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন এবং বাংলাদেশের ওপর সাংস্কৃতিক/অর্থনৈতিক প্রভুত্ব কায়েম করতে ভারত সফল হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানকে দুর্বল করার জন্যই ভারত মুক্তিযুদ্ধে সার্বিক সহায়তা দিয়েছে। বর্বর পাকিস্তানিদের নির্বুদ্ধিতা এবং বাংলাদেশের জনগণের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত ও বাস্তবায়িত করেছে, ভারতের সহযোগিতা যাহাই থাকুক না কেন?
পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নিপীড়নের কারণে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছে, অন্যদিকে পাকিস্তানিদের করেছে প্রত্যাখ্যান। মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এটাই ছিল মূল কারণ। সম্প্রতি ভারতের এক মন্ত্রী পার্লামেন্টে বলেছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করা ভারতের ভুল ছিল। ভারতীয় মন্ত্রীর এ কথাও সম্পূর্ণ ভুল। ভারত সাহায্য করাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হয়েছে, কিন্তু ভারত নীরব থাকলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হতো, হয়তো সময় লাগত কিছু বেশি। কারণ শোষণ, অত্যাচার, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ছাড়া ১২০০ মাইল দূর থেকে উড়ে এসে একটি দেশ শাসন-শোষণ করা অসম্ভব, যা নির্বোধ পাকিস্তানিরা বুঝতে সক্ষম হয়নি। তাদের যদি শুভ বুদ্ধির উদয় হতো তবে ১৯৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে জনগণের রায় তারা মেনে নিত, কিন্তু তাদের নিবুদ্ধিতার কারণেই সব বুমেরাং হয়ে গেছে।
ভারত বাংলাদেশের ভ‚খÐ দখল না করলেও দখলদারিত্বের ফায়দা নেয়ার জন্য পূর্ব থেকেই ছিল সচেষ্ট। স্বাধীনতার পরপরই পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র ট্রাকে ট্রাকে বোঝাই করে ভারতে নিয়ে গেছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান থেকে লন্ডন হয়ে ঢাকা ফিরে বক্তৃতায় বলেছেন, “আমি যে দিন বলব সেদিনই ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ থেকে চলে যাবে।” এ কথার পেছনে কোনো রহস্য নিশ্চয়ই লুকিয়ে ছিল। কারণ ভারতের দখলদারিত্ব এ দেশের জনগণের কাম্য ছিল না।
পার্শ্ববর্তী বৃহৎ রাষ্ট্র দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ছাড়া বাকি তিন দিক থেকে ভারত বাংলাদেশের ভ‚খÐ ঘিরে রেখেছে। এমতাবস্থায়, ভারতের বন্ধুত্ব বাংলাদেশের কাম্য এ কথা অস্বীকার করার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ মনস্তাত্তি¡কভাবেই ভারতবিরোধী। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলায় বা ফুটবলে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সমর্থক বাংলাদেশে আছে, কিন্তু ভারতের কোনো সমর্থক পাওয়া যায় না, এর মূল কারণ ভারতের আগ্রাসী আচরণ।
নরেন্দ্র মোদির ঘোরতর সমর্থক মাধব সদাশিব গোলওয়াকার তার বইয়ে লিখেছিলেন, “আমাদের জাতিসত্তাকে সংজ্ঞায়িত করতে হিন্দুস্তানের অ-হিন্দু লোকদের অবশ্যই হিন্দু সংস্কৃতি ও ভাষা গ্রহণ করতে হবে, হিন্দু ধর্ম অধ্যায়ন ও এর প্রতি ভয় এবং শ্রদ্ধা রাখতে হবে। কেউ হিন্দু জাতি ও সংস্কৃতি ব্যতীত আর কিছুরই প্রশংসা করতে পারবে না। এক কথায় তাদের হিন্দু জাতির অধীনস্থ হয়ে থাকতে হবে। তারা অন্যথায় কোনো সুযোগ বা অগ্রাধিকার, দাবি করার অধিকার এমনকি নাগরিক অধিকারও পাবে না।” হিন্দুত্ববাদের কট্টর বার্তা দেয়ার কারণেই আদিত্যনাথকে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে।
ভারতের উত্তর প্রদেশে মুসলিম অধ্যুষিত ও বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনপদ দেওবন্দের নাম ‘দেব ভ্রন্দ’ করার দাবি জানিয়েছেন রাজ্যের নবনির্বাচিত কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি বিধায়ক কুনওয়ার ব্রিজেশ সিং। বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ আসন থেকে জয়ী হয়ে এলাকাটির নাম পরিবর্তনের তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন। দেওবন্দ কেন্দ্রটি উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলায় অবস্থিত, যেখানে মোট জনসংখ্যার ৬৫ ভাগই মুসলিম।
তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক ভারতে নিয়মিত সাম্প্রদায়িক আচরণ সেখানের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে স্বাধীন দেশের নাগরিকের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। সে বিষয়ে বাংলাদেশ কোনো দিনই প্রতিবাদ করতে পারেনি, যেমনটি করেনি রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ পুনরায় ভারতের সাথে চুক্তি করতে যাচ্ছে। কিন্তু কি চুক্তি করছে তা এখনো জনগণের নিকট স্পষ্ট নয়। এ সম্পর্কে ভারতীয় সাংবাদিক ও বিশ্লেষক সুবীর ভৌমিক বিবিসিকে বলেছেন, “সামরিক ক্ষেত্রে আরো বাড়তি যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ এসব ব্যাপারে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন। এটা মাথায় রেখেই এ ধরনের একটা ডিফেন্স কো-অপারেশন প্যাক্ট ভারত করতে চাইছে, বিশেষ করে নর্থ-ইস্টার্ন রিজিয়নে তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য।” তবে প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেছেন, “যখন ভিজিট হবে, তখনই আপনারা জানবেন যে কী কী চুক্তি হলো।” তিনি আরো বলেছেন, “বেশ কিছু সংখ্যক এমওইউ হবে, চুক্তি না।” সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা থাকায় সার্বিক বিচারে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য খুবই স্পর্শকাতর বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জামিল ডি. আহসান। তার মতে, প্রতিটি দেশেরই সামরিক নীতি থাকে। এগুলো নিজস্ব এবং গোপনীয় বিষয়। তাই প্রতিরক্ষা বিষয়টি বা প্রতিরক্ষা চুক্তি যেমন স্পর্শকাতর, তেমনি ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কটাও স্পর্শকাতর।
এ সম্পর্কে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি বা এমওইউর সম্ভাবনা সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি সই হয়েছিল, সে চুক্তি নিয়েও অনেক বিতর্ক ছিল। চুক্তির ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, চুক্তিতে সই করা পক্ষদ্বয় তৃতীয় কোনো পক্ষকে পরস্পরের প্রতি সশস্ত্র সংঘাতে সহায়তা দেয়া থেকে বিরত থাকবে। যদি কোনো পক্ষ আক্রান্ত হয় বা আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে, তবে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তাৎক্ষণিকভাবে সংলাপে বসবে এবং পরস্পরের দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখবে। পরবর্তী সময়ে চুক্তিটির মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর ভারতের অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রাখা হয়েছে বিধায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
বাংলাদেশের জনগণ প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে লড়াই করে বেঁচে আছে। অধিকন্তু ২৪ বছরের ব্যবধানে ২টি পরাশক্তির (ব্রিটিশ ও পাকিস্তান) সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের জনগণ খেয়ে না খেয়ে স্বাধীন-স্বার্বভৌমভাবে বাঁচতে চায়। চুক্তি হবে না এমওইউ (গবসড় ড়ভ ঁহফবৎংঃধহফরহম) হবে এবং এ সম্পর্কে জানার অধিকার অবশ্যই এ দেশবাসীর রয়েছে। কী নিয়ে চুক্তি হবে বা চুক্তির শর্ত কী হচ্ছে এ নিয়ে বড় রাজনৈতিক দল চুক্তির খসড়া প্রকাশের দাবি জানালেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এক এক সময় এক এক কথা বলা হচ্ছে, যা জনগণ সহজভাবে মেনে নেয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতে যাচ্ছেন যার প্রধান ইস্যু বিভিন্ন বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর, প্রতিরক্ষা বিষয়ে চুক্তি হবে এমনটাই জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। এমন কি পূর্বের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রধানমন্ত্রীকে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখা দরকার যে, ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা নিরামিশ ভোজী। তাই তাদের মাথা অনেক শীতল, এ শীতল মাথাওয়ালা যারা চানৈক্য পÐিতের উত্তরসূরি, তাই তাদের সাথে চুক্তি অনেক ভেবেচিন্তে করতে হবে, যদি ক্ষমতায় অধিক দিন থাকার পরিবর্তে দেশের স্বার্বভৌমিকতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। বিষয়টি স্পর্শকাতর, তাই সাধু সাবধান।
লেখক : কলামিস্ট ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।