Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

কসোভোকে সহায়তা করুন

| প্রকাশের সময় : ২৫ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

সরদার সিরাজ
গত ২৭ ফেব্রæয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার বৈঠকে রিপাবলিক অব কসোভোকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রæয়ারি স্বাধীনতা ঘোষণা করে কসোভো। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এদেশটিকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ ১১৩টি দেশ এবং ওআইসির ৫৭ দেশের মধ্যে ৩৬টি দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে জানা গেছে। কসোভো স্বাধীনতা লাভের পর প্রায় এক দশক পূর্ণ হতে চললেও রাশিয়া এবং তার মিত্রদেশগুলো এখনো স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যেও এখনো ২১টি দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলাদেশও এই কাতারে ছিল! সবেমাত্র স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কবে হবে তা বলা কঠিন। অথচ আমরা নিজেরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে মহান স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তাই যে কোনো দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন জানানো, সহায়তা করা এবং স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সর্বোপরি আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের লোক। কসোভোও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। তাই স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথেই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। এটা জাতিগতভাবে লজ্জার ও চরম দুঃখের বিষয়। অথচ পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদান স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথেই অমুসলিম দেশগুলো স্বীকৃতি দিয়েছে। এই দেশ দুটি মুসলিম দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে। তেমনি কসোভো অমুসলিম দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে। কিন্তু তাকে স্বীকৃতি দিতে বিলম্ব হচ্ছে কেন? মুসলমান বলে? আর মুসলমানরাই বা কেন উক্ত মুসলিম দেশটিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না?
কসোভো স্বাধীন হয়েছে যুগো¯øাভিয়া হতে। ইউরোপে অবস্থিত এই দেশটি ইতিহাসখ্যাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে বিশ্ব মিত্রশক্তি ও অক্ষ শক্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অক্ষ শক্তির নেতৃত্ব দেয় হিটলার আর মুসোলিনি। তাতে শরিক হয় জাপান। প্রায় গোটা বিশ্ব এই শক্তির করতলগত হয়। তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশসহ বহু দেশ গঠন করে মিত্র শক্তি। কিন্তু এই দুই জোটের বাইরে শান্তিকামী দেশগুলো নিয়ে একটি জোট গঠিত হয়। যার নাম জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম। এই জোট গঠনে নেতৃত্ব দেন যুগো¯øাভিয়ার মার্শাল টিটু, মিসরের জামিল নাসের ও ভারতের জওহর লাল নেহেরু। কালপরিক্রমায় অক্ষ আর মিত্র এখন নেই। যুদ্ধে হিটলারের পরাজয়ের পর মিত্রশক্তির বিলুপ্তি ঘটে এবং দেশ তিনটি বিজয়ী শক্তির পদাবনত হয়। বিশেষ করে আমেরিকার। মিত্রশক্তি পরে সমাজতন্ত্র আর গঠনতন্ত্র বলয়ে বিভক্ত হয়ে আমেরিকার নেতৃত্বে গঠিত হয় ন্যাটো আর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে ওয়ার্শ জোট। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে খান খান হয়ে যাওয়া এবং সমাজতন্ত্র প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পর এই জোটেরও বিলুপ্তি ঘটে। ন্যাটো এখনো আছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প বলেছেন, ‘ন্যাটোর বিশাল ব্যয় আমেরিকা আর একা বহন করতে পারবে না। আমেরিকা নিজের অর্থ ব্যয় করে অন্যের নিরাপত্তা বহন করতে পারবে না।’ এ অবস্থায় ন্যাটো টিকে থাকবে কিনা তা নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছে। কারণ, এর বিশাল ব্যয় নির্বাহ করার ক্ষমতা অন্য শরিক দেশগুলোর নেই। অবশ্য মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউরোপ সফরে গিয়ে বলেছেন, ‘আমরা ন্যাটোতে আছি। ভবিষ্যতেও থাকব।’ কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের প্রধান কর্তৃপক্ষ নন। প্রধান কর্তৃপক্ষ হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি না বলেছেন। এ অবস্থায় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম এখনো আছে। তবে খুব পাওয়ারফুল নয়। তাই জোটের সিদ্ধান্ত খুব একটা কার্যকর হয় না। যাক সেসব কথা। আসল কথা হচ্ছে, শান্তিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনকারী যুগো¯øাভিয়া গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে আবার সর্বাধিক আলোচিত হয়।
তবে সেটা শান্তির নয়, অশান্তির। জাতিগত দ্ব›দ্ব-হানাহানি ভয়াবহ রূপ নেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিমরা সংখ্যালঘু মুসলিমদের নিধন শুরু করে। সেই সাথে জাতিগত দ্ব›দ্বও। ফলে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এক পর্যায়ে বলকান কসাই বলে খ্যাত কমিউনিস্ট নেতা মিলোসেভিচ ১৯৮৭ সালে কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হন এবং ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯০ সালেও বহুদলীয় নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হন। এরপর জাতিগত দ্ব›েদ্ব ১৯৯১ সালে ¯েøাভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া প্রদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু মিলোসেভিচ ¯েøাভেনিয়া আক্রমণ করে। এ অবস্থায় স্বাধীনতা ঘোষণাকারী দেশ দুটিকে ইউরোপীয় কমিশন স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ ক্রোয়েশিয়ায় শান্তি রক্ষা বাহিনী মোতায়েন করে। এ অবস্থায় ১৯৯২ সালে মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ বসনিয়া- হারজেগোভিনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ফলে শুরু হয়ে যায় সেখানে জাতিগত হানাহানি। তাতে ক্রোয়েট আর্মিরা সার্বিয়ানদের সমর্থন করে। শুরু হয় মুসলিম নিধন। যা দেড় বছরের অধিক অব্যাহত থাকে। এই সময়ে কয়েক লাখ মুসলিম নিহত-আহত হন। হাজার হাজার মুসলিম মা-বোন ইজ্জত হারান।
অসংখ্য মুসলমান প্রাণভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। নভেম্বর, ১৯৯৪ সালে ডেটন শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বসনিয়ার যুদ্ধ শেষ হয়। বসনিয়া-হারজেগোভিনিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। ফলে মূল যুগো¯øাভিয়া সার্বিয়া হিসেবে রয়ে যায়। কিন্তু সার্বিয়ার কর্তৃপক্ষ ১৯৯৯ সালের প্রথম দিকে মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ-কসোভোয় সেনা অভিযান চালায়। অভিযানে লক্ষাধিক মুসলিম নিহত হন। এই বর্বরতা বন্ধ করার লক্ষ্যে ন্যাটো বিমান হামলা চালায়। জাতিসংঘও শান্তি রক্ষা বাহিনী মোতায়েন করে। বসনিয়া-হারজেগোভিনিয়া ও কসোভোয় গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২৭ মে, ১৯৯৯ প্রেসিডেন্ট মিলোসেভিচ ও জেনারেল রাধুভান কারাদজিসহ ১৬০ জনকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করে। মিলোশেভিচের বিরুদ্ধে একটি নয়, তিনটি সংঘাতে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ ছিল। কসভোয়, বসনিয়া-হার্জেগোভিনিয়া আর ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধের সময়। ২০০৬ সালের ১১ মার্চ ¯েøাবোদান মিলোশেভিচকে তার কারাকক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সাবেক ইয়ুগো¯øাভিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জাতিসংঘ যুদ্ধাপরাধ আদালতে অভিযুক্ত হয়েছিল দেশটির ১৬০ জনের বেশি ব্যক্তি। সূত্র : বিবিসি বাংলা, ইতিহাসের সাক্ষী ফিচার, ১৫ মার্চ ’১৭। এভাবে ন্যাম প্রতিষ্ঠার অন্যতম নেতা মার্শাল টিটোর যুগো¯øাভিয়া রক্তে রঞ্জিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গণহত্যা হিসেবে বিশ্বব্যাপী ঘৃণিত হয়। এ ছাড়া বৃহৎ দেশটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এ অবস্থায় গণঅভ্যুত্থানে মিলোসেভিচের পতন ঘটে এবং তিনি সপরিবারে দেশ থেকে পালিয়ে যান। মধ্যপন্থি সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতা ভোই¯øাভি কস্তুনিসা প্রেসিডেন্ট হন। স্মরণীয় যে, ১৯৮১ সালে যুগো¯øাভিয়ার অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের ন্যায় কসোভোকেও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৮৯ সালে তা বাতিল করা হয়। এ অবস্থায় ২২ মার্চ ১৯৯৮ সালে কসোভোয় পার্লামেন্টের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে মুসলিমরা বিজয়ী হন। কিন্তু বেলগ্রেড সে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে এবং ১৯৯৯ সালের প্রথম দিকে সেনা অভিযান চালায়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কসোভোর স্বাধীনতার জন্য সুপারিশ করে। কিন্তু যুগো¯øাভিয়ার প্রেসিডেন্ট কস্তুনিসাও বলেন, কসোভো যুগো¯øাভিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনও স্বাধীনতা প্রত্যাখ্যান করেন। এ অবস্থায় অসংখ্য মানুষের শহীদানের বিনিময়ে কসোভো ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রæয়ারি পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী কসোভো দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত, রাজধানীÑ ষটিনা, স্থলবেষ্টিত দেশটির মোট আয়তন-১০,৮৮৭ বর্গকিলোমিটার, অফিসিয়াল ভাষা-আলবেনীয় ও সার্বিয়ান, বর্তমানে প্রেসিডেন্ট-হাসিম যাসি ও প্রধানমন্ত্রী-ইশা মুস্তফা। মোট জনসংখ্যা খুব পরিবর্তনশীল। যেমনÑ ২০১৬ সালে ছিল-১৯,০৭,৫৯২ জন। বর্তমানে ১৮,০৭,৩০৯ জন, তন্মধ্যে পুরুষ-৫১.৫% আর নারী ৪৮.৫%, জন্মহার প্রতি হাজারে ১৭.০৯ জন। জনসংখ্যার ৯০% মুসলমান। তারা আলবেনিয়ার বংশোদ্ভ‚ত। দেশটির প্রধান অর্থনীতি-পর্যটন ও ওয়াইন। স্বাধীনতার প্রায় এক দশক হতে চলেছে। তবুও এখনো বহু দেশ সে স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি। অথচ দক্ষিণ সুদান এবং পূর্ব তিমুরকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি দেশটি মুসলিম অধ্যুষিত বলে। স্মরণীয় যে, আরও কয়েকটি অঞ্চল রয়েছে মুসলিম অধ্যুষিত। যেমন ভারতের কাশ্মীর, রাশিয়ার চেচনিয়া ও দাগেস্থান এবং চীনের সিনজিয়াং ও ফিলিস্তিন। এই অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ স্বাধীনতার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিচ্ছেন রাজপথে। কিন্তু স্বাধীনতা পাচ্ছেন না। বিশ্ববাসী তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না তারা মুসলিম বলে। এমনকি মুসলিম দেশগুলোরও এক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা নেই। যা লজ্জার বিষয়। যা হোক, যেহেতু বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাই বাকি দেশগুলোরও উচিত অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়া এবং দেশটির শান্তি ও উন্নতিতে সার্বিক সহায়তা করা। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর। এটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
sardarsiraj1955@gmail.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।