Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

স্বাধীনতার ৪৬ বছর এবং প্রত্যাশা

| প্রকাশের সময় : ২৫ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

হোসেন মাহমুদ
বিশে^র সকল দেশের ইতিহাসেই বিশেষ কিছু দিন থাকে যেগুলো তাদের কাছে গর্বের, আনন্দের, উৎসবের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস সেই দিন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র জনগণের উপর। জানা যায়, সে মুহূর্তে তথা ২৬ মার্চের সূচনা লগ্নে পূর্ব ব্যবস্থা অনুযায়ী এক বিশ^স্ত ব্যক্তির কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা প্রেরণ করেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। তথ্য মতে, সে ঘোষণা চট্টগ্রামে পৌঁছে যায় ও প্রচারিত হয় জনগণের মধ্যে। শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশের স¦াধীনতা যুদ্ধ। সৈনিক, তরুণ, যুবক, শ্রমিক জীবনের স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অবশেষে আসে চূড়ান্ত বিজয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরাজয় মেনে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত এক সাদামাটা অনুষ্ঠানে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের প্রধান লে. জে. জগজিত সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় শাখার প্রধান লে. জে. এ এ কে নিয়াজি। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে বিশে^র বুকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য শুরু হয় নতুন যুগের।
তারপর পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো বছর। ঘটেছে অসংখ্য ঘটনা। এবার ২০১৭ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৬ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ভূখন্ড হিসেবে এ দেশ যা ছিল তাই আছে, কিন্তু সেই বাংলাদেশ আর নেই। আজকের ন্যূনতম ষাট বা তদুর্ধ্ব বয়সের প্রতিটি সচেতন মানুষের কাছেই, ব্যক্তির কাছেই দেশের এ পরিবর্তন সুস্পষ্ট। কোথায় ছিল আর কোথায় এসেছে বাংলাদেশ! একদিকে চোখ ধাঁধানো উন্নতি-অগ্রগতির প্রাবল্য আরেকদিকে না পাওয়ার বেদনা আর বঞ্চনার হাহাকার। একদিকে স্ফীত হয়ে উঠছে সুবিধাপ্রাপ্ত একটি সর্বগ্রাসী গোষ্ঠি আরেকদিকে বেড়ে উঠছে সম্বলহীন ছিন্নমূল মানুষ। এদেশে গণতন্ত্র বিলুপ্ত। সরকারের বিরোধী দলকে রাস্তায় নামতে দেয়া হয় না। বিরোধী নেতারা কে কোন মামলায় কবে জেলে যাবেন, কতদিন জেলে থাকবেন তা নির্ধারিত হয় বিশেষ ইঙ্গিতে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বা কথিত বন্দুক যুদ্ধে মানুষ হত্যা প্রথায় পরিণত হয়েছে এদেশে। গুম হয়ে যাচ্ছে মানুষ। যাদের হঠাৎ তুলে নেয়া হচ্ছে তাদের লাশ মিলছে। অনেকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তাদের আর সন্ধান মিলছে না। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। যে জঙ্গি নামধারী হামলা করতে গিয়ে নিহত হয়েছে বলা হচ্ছে তার পরিবার বলছে তাকে আগেই ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সাগর-রুনি, তনু, মিতু হত্যার আসামীরা ধরা পড়ে না, কিনারা হয় না হত্যা রহস্যের। ইলিয়াসের সন্তান সন্ধান পায় না তার বাবার। শেয়ার বাজার, ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়, উদ্ধার না হলেও কোনো অসুবিধা হয় না। ভবিষ্যত নিয়ে হতাশ মলিন মুখ লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার তরুণের সামনে জ¦ালিয়ে দেয়া হচ্ছে উন্নয়নের চোখ ধাঁধানো আলো, কিন্তু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই তাদের। বেকারত্ব তাদের জীবনী শক্তি হ্রাস করে দিচ্ছে। এ বাংলাদেশ স্বল্পসংখ্যক কিছু মানুষের আনন্দময় বাংলাদেশ যেখানে মানবতা, মূল্যবোধ প্রায় বিলীন। বয়সীরা সে বাংলাদেশের সাথে এ বাংলাদেশকে মেলাতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যান।
নিজের দেশকে কে না ভালোবাসে? দেশকে ভালোবাসে না এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার। আসলে দেশের যারা অধিবাসী বা নাগরিক, তারা সবাই দেশকে ভালোবাসে। এখানে ধনী-গরিব কোনো বিষয় নয়। অর্থ-সম্পদ কারো আছে কারো নেই। কারো বেশি আছে, কারো কম আছে। কিন্তু দেশের প্রতি ভালোবাসা সবারই এক রকম। দেশের উন্নতি হলে দেশবাসীর সবারই উন্নতি, কোনো ক্ষতি হলে সবারই ক্ষতি। দেশের মানুষ যদি বিদেশ থেকে পুরস্কার পায়, সম্মান লাভ করে তা দেশের গর্ব, দেশের মানুষের গর্ব। আমাদের টাইগাররা যখন ক্রিকেটের ওয়ান ডে বা টি-টুয়েন্টিতে জয় লাভ করে বা শত তম টেস্টে জয়ী হয়ে ইতিহাস রচনা করে সারাদেশ তখন আনন্দে ভাসে। মনে হয়, আমাদের মাথাটা অনেকখানি উঁচু হয়ে গেছে। তারা যখন হেরে যাওয়ার দুর্ভাগ্য বরণ করে তখন সবার মন খারাপ হয়ে যায়, যেন অসময়ে বাংলাদেশের আকাশে ঘনকালো মেঘ জমে। দেশের ভালোতে আনন্দ, খারাপ হলে মনে কষ্টÑ এই হচ্ছে দেশের প্রতি ভালোবাসা।
এই ভালোবাসাই দেশের মানুষকে স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সবার জানা, ১৯৪৭ সালের আগে আমাদের আজকের বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান মিলিয়ে ছিল এক অখন্ড দেশ। উত্তর-পশ্চিমে পেশোয়ার থেকে পূর্ব-দক্ষিণে টেকনাফ পর্যন্ত ছিল একই ভূখন্ড। বাস্তব পরিস্থিতির কারণে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি গঠনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তার পরিণতিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত হয় মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। কিন্তু, উপমহাদেশের মুসলমানদের এ কঠোর সংগ্রামের ফসল পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সিকি শতকও স্থায়ী হতে পারেনি। কারণ, শুরু থেকেই পাকিস্তানি শাসকরা দেশের পূর্ব অংশ বা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের সাথে অন্যায্য আচরণ শুরু করে। তারা এদেশে বাংলা ভাষার অবমাননা করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু প্রচলনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২-র ফেব্রæয়ারিতে ভাষা শহীদদের আত্মদানের বিনিময়ে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। এভাবে বাংলা ভাষার বদলে উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার অশুভ ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয় এদেশের সর্বস্তরের মানুষ। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের পরাজয় থেকে পাকিস্তানি শাসকরা শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তারা বাঙালিদের শোষণ, তাদের সাথে বৈষম্য, বঞ্চনা অব্যাহত রাখে। তার বিরুদ্ধে এ দেশের মানুষ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য অবসানের দাবিতে, সম উন্নয়নের দাবিতে, গণতন্ত্র চালুর দাবিতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সোচ্চার হয়ে ওঠেন। সে সব দাবি না মেনে দমননীতি জোরদার হওয়ায় জনমনে অসন্তোষ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। সাহসী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার লাভের আন্দোলন। সরকারের দমন নীতি আরো কঠোর হয়। এক পর্যায়ে এ আন্দোলন পরিণত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই বিশে^র স্বাধীনতার লড়াইগুলোর শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এত অল্প সময়ে এত মৃত্যু, এত ধ্বংস, এত নিষ্ঠুরতা আর কোথাও দেখা যায়নি, এত অল্প সময়ে বিশে^ আর কোনো দেশ লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জনও করেনি। মূলত পাকিস্তানি শাসকরা নিজেদের স্বার্থের বাইরে অন্য কারো কথা বিবেচনা করতে প্রস্তুত ছিল না। তাই ১৯৪৭ সাল থেকে যারাই পাকিস্তানের ক্ষমতায় এসেছেন তারা কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের কখনো আপন ভাবতে পারেননি। দেশের এ অংশ ছিল তাদের শোষণের ক্ষেত্র । চব্বিশ বছর ধরে তা অব্যাহত ছিল। এর পরিণতিতে দেখা গেছে সকল উন্নয়নের প্রায় সবাই হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে গেছে অনুন্নত। এখানে কোনো উল্লেখযোগ্য শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কৃষিকাজে উন্নতির ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি, প্রশাসনের শীর্ষ পদে বাঙালি ছিল না, সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের নেয়া হতো খুব কম, বাঙালি সেনা অফিসারদের পদোন্নতি হতো না, সরকারী চাকুরিতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য করা হতো, বৈদেশিক সাহায্যের বেশিরভাগই ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন কাজে।
এ সবের বিরুদ্ধে সারাদেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। বাঙালিদের মধ্যে ধূমায়িত হচ্ছিল প্রচন্ড ক্ষোভ। সকল অন্যায় ও বৈষম্যঅবসান, সে সাথে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাঙালিদের আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দেশে সাধারণ নির্বাচন দেয়। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ঐ নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী হয় এ দেশের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থনপ্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ। বস্তুত আওয়ামী লীগ সেদিন এদেশের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার পতাকাবাহী দলে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনকারী আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তথা বাঙালিদের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা ছেড়ে দিতে পাকিস্তানের শাসকরা রাজি ছিল না। কুচক্রী আমলারা ও সেনাবাহিনী একজোট হয়ে গ্রহণ করে অশুভ পরিকল্পনা। এর মধ্য দিয়ে তারা পাকিস্তানের ভাঙ্গনের পথ নিশ্চিত করে। নিয়মানুযায়ী বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে রক্তের নেশায় মেতে ওঠে তারা। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনার আড়ালে এ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করে তারা। তারপর নীলনকশা অনুযায়ী ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় তাদের বাঙালি হত্যাকাÐ শুরু হয়। পাকিস্তানিরা কী ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে তা সুস্পষ্টভাবে বোঝা কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু তারা যে অশুভ ষড়যন্ত্র করছে তা বাঙালি নেতৃবৃন্দ আঁচ করতে পেরেছিলেন। যাহোক, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আকস্মিক হামলার মুখে স্বল্প শক্তি নিয়ে রাজধানীর দু’ একটি জায়গায় ব্যর্থ প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করে ছাত্র-জনতা। কিন্তু প্রবল বন্যা¯্রােতের সামনে যেমন মুহূর্তে ভেসে যায় খড়কুটো সেদিন অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত পাকিস্তানি সৈন্যদের সামনে হাতে গোণা কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী-তরুণের প্রতিরোধও কয়েক মিনিটের বেশি টিকতে পারেনি। অন্যদিকে সামান্য অস্ত্র নিয়ে লড়াইয়ে নিয়োজিত হন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কিছু পুলিশ ও পিলখানার ইপিআর সদস্যরা। তারাও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। এভাবেই শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশের মুক্তির যুদ্ধ।
পাকিস্তানি সৈন্যদের হামলা শুরুর পর এ দেশের ছাত্র-যুবকরা বসে থাকেনি। হাজার হাজার তরুণ ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। পাশাপাশি এ দেশে থাকা বাঙালি সৈন্য, ইপিআর ও পুলিশ সদস্যরাও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এছাড়া আনসার, মুজাহিদ বাহিনীর কিছু সদস্য, সৈন্য-ইপিআর-পুলিশ বাহিনীর কিছু অবসরপ্রাপ্ত সদস্যও দেশমাতৃকার টানে সেদিন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। একদিকে নিয়মিত সৈন্য, অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের অংশগ্রহণের ফলে মুক্তিযুদ্ধের প্রচন্ডতা বাড়তে থাকে। সে সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তি-নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গড়ে ওঠে। যেমন টাঙ্গাইলে কাদেরিয়া বাহিনী, মাগুরায় আকবর বাহিনী, গোপালগঞ্জে হেমায়েত বাহিনী ইত্যাদি। দেশকে পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত করার জন্য জীবন-মরণ লড়াইয়ে লিপ্ত হয় সবাই। তাদের আক্রমণে ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা। সেদিন পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনী এবং তাদের সহায়তাকারী রাজাকার-আলবদর-আল শামস বাহিনীর নির্বিচার হত্যা ও ধ্বংসের মুখেও এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাত্মক সমর্থন প্রদান করে। কে এগিয়ে আসেনি সেদিন সূর্যসৈনিক মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে? ক্ষেতের কৃষক, নৌকার মাঝি, মাছধরা জেলে, ঘরের বধূ, সহায়-সম্বলহীনা নারীরা তাদের সাহায্য করেছে। সেদিনের ভীতি, শঙ্কা কবলিত নানা শ্রেণির মানুষ যে যেভাবে পেরেছে গভীর মায়া-মমতায় তাদের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন মাকেও সেদিন দেখা গেছে যিনি অনেক কষ্টে পরিবারের রাতের ক্ষুন্নিবৃত্তির একমাত্র আয়োজন ক’খানা মাত্র রুটি হাসিমুখে সন্তানসম ক্ষুধার্ত মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার জন্য তুলে দিয়েছেন। রাতের নিশুতি প্রহরে আকস্মিকভাবে এসে উপস্থিত হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তার আদরে পালিত একমাত্র মোরগটি জবাই করে ভাত তুলে দিয়েছেন।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রের তিনটি আদর্শিক ভিত্তি ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম।’ এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে এ তিনটিই হচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আদর্শিক ভিত্তি। কিন্তু পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বা সংবিধানের কোথাও এ তিন আদর্শকে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি বলে উল্লেখ করা হয়নি। এটা ঠিক যে সেদিনের বিদ্যমান পরিবেশ-পরিস্থিতিতে এ তিন আদর্শ কাগজে-কলমেই ছিল। দেশের মানুষ বা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এটা তেমন প্রচারিত হয়নি। সেদিন সে সুযোগও ছিল না। কিন্তু আইনত এ তিন আদর্শ বাস্তবায়নের জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদেরা এজন্যই তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তারা সেদিন সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা জানতেন না যা ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে গ্রহণ করা হয়।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করেছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে। সে রাতে ঢাকা পরিণত হয়েছিল লাশের নগরীতে। পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এলাকা ও হিন্দু অধ্যুষিত ঠাটারি বাজারে চলেছিল নির্বিচার গণহত্যা। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পূর্ব পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। যাহোক, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এসে আওয়ামী লীগ সরকার ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে গৃহীত প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। এর ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাকান্ডের কদর্য দিনটি ইতিহাসে পরিণত হল। সে সাথে দিবসটি আন্তর্জাতিক ভাবে পালনের ব্যাপারেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে ও জাতিসংঘের কাছে এ বিষয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করেছে।
ধ্বংস ও মৃত্যু, আগুনের লেলিহান শিখা, প্রিয়জনের লাশ পিছনে রেখে, শত্রæ হননের দুর্দম শপথ বুকে নিয়ে বাংলাদেশের তরুণ-যুবকরা সেদিন বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, দুর্গম, দূর পথ পাড়ি দিয়ে, দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে পৌঁছেছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতে। স্বল্পকালীন গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশের সীমান্তে অবস্থান নিয়ে এবং অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নিয়োজিত হয়েছিল দুঃসাহসী লড়াইয়ে। তারা ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল অস্তমিত স্বাধীনতার সূর্যকে। বিশ^ সেদিন অবাক বিস্ময়ে দেখেছিল, এ দেশের অকুতোভয় তরুণরা কীভাবে বুকের রক্ত দিয়ে শোধ করেছিল দেশমাতৃকার ঋণ। আত্মত্যাগ ও লড়াইয়ের মাধ্যমে তারা আমাদেরকে এ দেশ উপহার দিয়েছে। তার মধ্য দিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে যে এ দেশের মানুষ গোলামিকে সহ্য করে না, কারো চোখের ইশারায় চলে না। আমাদের শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা যে জন্য তাদের জীবন দিয়েছেন, অতুলনীয় ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আমরা যেন সে কথা ভুলে না যাই। তারা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রচনা করেছেন অপরিসীম গর্ব ও গৌরবের ইতিহাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের সে ত্যাগ থেকে অনুপ্রাণিত হবে, শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করবে, সকল মানুষের জন্য নিশ্চিত করবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার- এটাই স্বাধীনতা দিবসের প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক
h_mahmudbd@yahoo.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।