Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

শুধু একটি শব্দ ওঠে সর্বনাশা বুক কাঁপানো মন্ত্র শুনি- ভালোবাসা।

| প্রকাশের সময় : ২৬ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আহমদ মমতাজ

চট্টগ্রাম : প্রতিরোধ যুদ্ধের পূর্বাপর কয়েকটি খন্ডচিত্র
একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী বর্বরোচিত গণহত্যায় মেতে ওঠে। সবচেয়ে নৃশংস হামলার ঘটনা সংঘটিত হয় ঢাকায়। সেনানিবাস থেকে ট্যাংকসহ বিভিন্ন মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, ইপিআর ও পুলিশের নিরস্ত্র ও অপ্রস্তুত বাঙালি সদস্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গণহত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও বাঙালি মেয়েদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। আকস্মিক এই হামলায় বাঙালিরা হতভম্ব হলেও তাদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়নি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে নির্দেশনা ছিল “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রæর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে, সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার না পারি, তোমারা বন্ধ করে দেবে।”
সেই নির্দেশনাকে বুকে ধারণ করে বাঙালি ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতা এবং সেই সাথে বাঙালি সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, আনসার, ইপিআর ও পুলিশের সদস্যরা যৎসামান্য অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গ্রামবাসী-শহরবাসী নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে, সর্বস্ব উজাড় করে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সহযোগিতা করেন।
১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতেই চট্টগ্রামের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেখানে পয়লা মার্চ থেকে ধর্মঘট শুরু হয়। মিছিলে চট্টগ্রাম শহর ও বিভিন্ন থানা পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে হরতাল পালিত হয়। চট্টগ্রাম শহরে ৩-৪ ও ৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে অবাঙালিরা দলবদ্ধভাবে বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ও দাঙ্গা শুরু করে। চট্টগ্রামে সেসময় কয়েক হাজার অবাঙালি বসবাস করত, যারা সাতচল্লিশের পর ভারতে থেকে এসে শহরের হালিশহর, জাউতলা, ওয়ারলেস কলোনি, শেরশাহ কলোনি, ফিরোজ শাহ কলোনি, আমিন জুট মিল, চট্টগ্রাম বন্দর কলোনি, ইস্পাহানি কলোনি, আমবাগান ও খুলসী-সরদারনগরে বসবাস করত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় এসব অবাঙালি বিহারি পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেও অস্ত্র ধারণ করে। মার্চের শুরু থেকে বিহারিরা বাঙালিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা চালায় এবং নয় মাসব্যাপী হাজার হাজার বাঙালিকে হতাহত করে।
২৫ মার্চ রাতে ঢাকার সাথে সাথে চট্টগ্রামে অবস্থানরত পাকিস্তানি বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গভীর রাতে সেনানিবাসে বাঙালি সৈন্যদের ওপর আক্রমণ চালায়। ইবিআরসির অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার বাঙালি সৈন্য শহীদ হন। অনেকে বন্দি হন, বাকিরা পালিয়ে বিভিন্ন দিকে চলে যান ও প্রতিরোধ যুদ্ধে যোগ দেন।
২৬ মার্চ দ্বিপ্রহরে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ-সম্পাদক এম.এ. হান্নান বেতারের মাধ্যমে প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন।
২৬ মার্চ থেকে বিভিন্ন দল চট্টগ্রাম বেতার চালু করেন এবং অনুষ্ঠান প্রচার ও ভাষণ দেন। পরদিন ২৭ মার্চ বেতারে এসে ভাষণ প্রদান করেন মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি একবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ইংরেজিতে স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ৩০ মার্চ পাকিস্তান বাহিনীর বিমান আক্রমণে বিধ্বস্ত হয় কালুরঘাট বেতার ভবন। আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর চট্টগ্রামের সংগ্রামী মানুষের পাশাপাশি চট্টগ্রামের ইপিআর ও আর্মি স্থানীয় ভিত্তিতে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার মেসেজটি চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য জহুর আহমদ চৌধুরী সাইক্লোস্টাইল কপি করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের মাঝে বিতরণ করেন। বার্তাটি মাইকে প্রচার করা হয়। এর একটা কপি সলিমপুর ওয়্যারলেস স্টেশনে, বিভিন্ন-মাধ্যমে মেসেজটি দেশে-বিদেশে প্রচারিত হয়। মে মাসের প্রথম পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে বাঙালিরা প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। চট্টগ্রাম শহরে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত। ঢাকা থেকে বিমানে আসা কমান্ডো বাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র, কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে আসা ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের সাপোর্ট এবং সমুদ্রে অবস্থিত পাকিস্তানি যুদ্ধহাজাজ থেকে অবিরাম গোলাবর্ষণের মুখে প্রতিরোধ যোদ্ধারা বেশি দিন অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি। হালিশহর ইপিআর ঘাঁটি ও কোর্ট হিলসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হাতছাড়া হয়ে যায়। বাঙালি আর্মি-ইপিআর স্বীমান্তবর্তী রামগড়ে ঘাঁটি স্থাপন করে।
প্রতিরোধ যুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা সংঘটিত হয়। ২৫ মার্চ বিকালে খবর পাওয়া যায় যে, কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের সৈন্যরা চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা হয়েছে। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তক্রমে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন (বর্তমানে মন্ত্রী) তার এলাকা মীরসরাইতে আসেন ও শুভপুর ব্রিজ ধ্বংস করতে নির্দেশ দেন। রাতেই জনতা ব্রিজে অগ্নিসংযোগ করে। পরদিন ২৬ মার্চ দুপুরের দিকে পাক সেনাবাহিনী এসে উপস্থিত হয় ও ব্রিজ মেরামত করে। ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফির নেতৃত্বাধীন বাহিনী এগিয়ে যায় চট্টগ্রামের দিকে। ব্রিজ পাহারায় কয়েকজন সৈন্য রেখে যায়। রাস্তায় ছিল প্রতিবন্ধকতা, গাছ কেটে ও অকেজো গাড়ি ফেলে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়। হাটে-বাজারে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিল। মীরসরাইর বড়তাকিয়ায় থামতে হয় হানাদার বাহিনীকে। সে সময় একজন প্রতিরোধকারী হাতের দা নিয়ে সৈন্যভর্তি ট্রাকে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিনি। এই প্রতিরোধকারীর নাম আবুল কাসেম, পেশায় রিকশাচালক, মঘাদিয়া ইউনিয়নের মহানন্দাবাদ গ্রাম নিবাসী পিতৃহীন ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। প্রতিরোধ যুদ্ধে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রথম শহীদ তিনি। পাকিস্তানি বাহিনীর এই দলটি কুমিরায় প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ও বহুসংখ্যক হতাহত হয়। এই বাহিনী চট্টগ্রামে পৌঁছে যায়।
মুক্তিযুদ্ধ পরিণত হয়েছিল জনযুদ্ধে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষ বাঙালির এই মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করে। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে। মুজিবনগরে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুক্র হয় চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ। এতদিন যা ছিল প্রতিরোধ যুদ্ধ, তা-ই রূপ লাভ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য স্থাপন করা হয় যুব শিবির। প্রধানত বেসামরিক ও চট্টগ্রামের স্থানীয় সংগঠকদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে গড়ে উঠেছিল এই যুব শিবির। ত্রিপুরায় হরিণায় এই যুব শিবিরে চট্টগ্রাম থেকে দলে দলে তরুণ যুবকরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে জমায়েত হচ্ছিল। মুজিবনগর সরকার গঠনেরও আগে চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং গ্রহণ শুরু করে। তারপর গ্রæপ কমান্ডারদের অধীনে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান নেয়। গেরিলা আক্রমণ শুরু করে। ক্রমে ভারতের বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্পে চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘমেয়াদী সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বামপন্থী রাজনৈতিক দলের তত্ত¡াবধানে চালু হয় আরো কিছু প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। ভারতে না গিয়েও চট্টগ্রাম শহরের অভ্যন্তরে থেকে মৌলভী সৈয়দ আহমদ নিজস্ব একটি গ্রæপ নিয়ে পুরো নয় মাস গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যান। চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় লোকদের তত্ত¡াবধানে গড়ে ওঠে শেল্টার।
প্রতিরোধ যুদ্ধের পর বাঙালিরা সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে। গেরিলা বাহিনীর একের পর এক আক্রমণে দিশেহারা হয়ে যায় পাকিস্তানি হানাদাররা। আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে পরিচালিত হয় অপারেশন্স জ্যাকপট। নৌকমান্ডোদের সফল অভিযানের পর পাক ভারত অঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়। সূচনা হয় পাক ভারত যুদ্ধের। ভারত বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে ঢুকে পড়ে চট্টগ্রামে। ৬ ডিসেম্বর ফেনী শত্রæমুক্ত হয়। এরপর যৌথ বাহিনী শুভপুর সেতু ও ফেনী নদী অতিক্রম করে চট্টগ্রামের দিকে এগিয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণ করেন জেনারেল নিয়াজী, আর ১৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসের ঘোষিত ১নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টারে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পদমর্যাদায় ১৬১ জন কর্মকর্তাসহ ৮,৬১৮ জন পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। এই সার্কিট হাউসে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে। বহু বাঙালি নারী-পুরুষ নির্যাতনের শিকার হন। সেখানেই পাকিস্তানি সেনাদের চরম পরাজয়ের আনুষ্ঠানিতা সম্পন্ন হয়। নয় মাসের ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, দুঃখ, দুর্দশা ও প্রিয়জন হারানোর বেদনা ভুলে বাঙালি জাতি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে এক অনাবিল আনন্দে মেতে ওঠে।
লেখক : গবেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।