Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

বিশ্বের সঙ্গে বহুমুখী বিনিয়োগে বাংলাদেশ

| প্রকাশের সময় : ২৬ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আবুল কাসেম হায়দার : বিশ্বের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ছে। একই সঙ্গে এককেন্দ্রিক অর্থব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র ইউরোপীয় জোটের যে আধিপত্য ছিল। সা¤প্রতিক সময়ে সেখানে চীন, রাশিয়া, জাপান এবং ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার আরো কয়েকটি দেশ ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে। আমদানি-রফতানি এবং রেমিটেন্স, প্রকল্প সহায়তায় বৈদেশিক ঋণ, অনুদান, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণসহ সবকিছুতেই রয়েছে এ প্রবণতা। সা¤প্রতিক সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সফরের পর তা আরো পরিষ্কার হয়েছে। অন্যদিকে গত কয়েক বছরে অর্থনীতির আকারও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট, গত দুই বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে ১৪ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকারে বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪তম।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক হলে ইতিবাচক। তবে সফরকারী দেশগুলোর সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়ন জরুরি। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি খাতে সম্পৃক্ততা বাড়ছে। বিশেষ করে চীনের প্রেসিডেন্ট বিশাল আকারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন। এছাড়াও বিপুল অংকের ঋণের প্রতিশ্রæতি রয়েছে। এই প্রতিশ্রæতি কতটা বাস্তবায়ন হয়, তা দেখার বিষয়। কারণ জাপানের প্রেসিডেন্ট এসে যে বিনিয়োগের প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন, তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। তার মতে, অর্থনীতিতে নেতিবাচক দিক রয়েছে। সা¤প্রতিক সময়ে রেমিটেন্স উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের রেমিটেন্স আহরণের দিক থেকে তৃতীয় সর্বোচ্চ দেশ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়াও রফতানি আয় এবং বিনিয়োগেও দেশটির একক অবদান রয়েছে। তবে সা¤প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিটেন্স ও বিনিয়োগ কমছে। বিপরীতে সা¤প্রতিক সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং ১৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। এছাড়াও সা¤প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশকে ৩ বিলিয়ন ডলার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের খাতে ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং শিশুদের জন্য পুষ্টি খাতে ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ। তবে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক অবদান রয়েছে। কারণ বিশ্বব্যাংকের যে সংস্থা থেকে দরিদ্র দেশগুলোকে সহজে ঋণ দেয় তার নাম ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বা আইডিএ। এ বড় প্রকল্পের ৪টি বড় দাতা দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং জাপান।
এছাড়া গত বছর বাংলাদেশ সফর করেন জাপানের প্রেসিডেন্ট শিনজো আবে। এ সফরে বাংলাদেশকে ৬ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়। অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরে বাংলাদেশকে ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়। একই সঙ্গে ভারতীয় কোম্পানি আদানি ৮ বিলিয়ন ডলার এবং রিলায়েন্স ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রæতি দিয়েছিল। এছাড়াও দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে রাশিয়া। রূপপুরে এ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে দুই ধাপে ১৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দেবে দেশটি। আরো কয়েকটি প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে দেশটি।
জানা গেছে, বিশ্বের যে কোনো দেশের অর্থনীতিকে মূল্যায়নের মাপকাঠি হলো জিডিপি। দুটি পদ্ধতিতে জিডিপির আকার মূল্যায়ন করা হয়। এগুলো হলোÑ চলতি মূল্যের ভিত্তিতে (বেইজ অন কারেন্ট প্রাইস) এবং ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (বেইজ অন পারসেজ পাওয়ার)। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে দেশের জিডিপি ২০৫ বিলিয়ন ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। আর অর্থনীতির যে অংশ বিদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তার আকার ১০৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আমদানি ৪২ বিলিয়ন ডলার, রফতানি ৩৪ বিলিয়ন, রেমিটেন্স ১৫ বিলিয়ন, এফডিআই ২ দশমিক ২৩ বিলিয়ন, বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ ৭ বিলিয়ন ডলার, গত অর্থবছরে প্রকল্প সহায়তায় বিদেশি ঋণ ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন, অনুদান দশমিক ৫৪ বিলিয়ন এবং শেয়ারবাজারের মাধ্যমে পোর্টফোলিওতে বিদেশি বিনিয়োগ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে এনজিও ব্যুরো এবং বেপজার মাধ্যমে কিছুটা বিনিয়োগ এসেছে।
এদিকে বিশ্বের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অর্থনীতির আকারও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস ডাটাবেইস অনুসারে বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৪তম। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে তা ৩৩তম। প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৫ সালে চলতি বাজারমূল্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ২০৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে জিডিপির আকার ৫৭২ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। প্রথম অবস্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ১৮ হাজার ১২৪ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের জিডিপি ১১ হাজার ২১১ বিলিয়ন ডলার।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রæত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ছে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশে অব্যাহত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বাজেট সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্প ঋণ ও অনুদান দুটিই বাড়ছে। তিনি বলেন, আগামীতে এ সহায়তার পরিমাণ আরো বাড়বে।
যে সকল বিষয় গুরুত্ব দেয়া দরকার :
১) বিদেশি বিনিয়োগ দ্রæত আমাদের দেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে আরো ভালো ভালো বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব আসবে। তবে বিদেশি বিনিয়োগ শর্ত বড়ই জটিল। শর্তসমূহ অধিকাংশ ঋণ দাতা দেশসমূহের পক্ষে। কিছুদিন পূর্বে প্রতিবেশী বন্ধু দেশ ভারত ২০০ কোটি টাকার শর্ত আমাদের কাবু করে ফেলেছে। এবারো চীন ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের শর্তসমূহ দেখা দরকার। এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী ও বিনিয়োগ গ্রহণকারী উভয়ের যুক্তিতর্কে উপর নির্ভর করে বিনিয়োগে লাভের অংশকে বেশি পাবে। দক্ষতার সঙ্গে আলোচনা না করতে পারলে আমাদের ক্ষতি বিনিয়োগ ও লাভ সহজে আসবে না। সুদের হারও একটি বড় বিষয়। বিশ্বব্যাংক যে হারে সুদে আমাদের ঋণ দেয়, সরাসরি দেশসমূহ যারা বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসে, তাদের সুদের হার বিশ্ব ব্যাংক থেকে অনেক বেশি। দক্ষতার সঙ্গে দর কষাকষি করতে না পারলে আমরা লাভবান হতে পারব না।
২) আমাদের আমলাদের আরো বেশি দক্ষ হতে হবে। দক্ষতার জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা। আমাদের আমলাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে। সরকারকে বিশেষ কর্মসূচি নিয়ে কতক আমলাদের দ্রæত ট্রেনিং করিয়ে আনতে হবে। এই জন্য অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি জন্য ট্রেনিং-এর বিকল্প নেই। এই কাজটি যত দ্রæত করা যাবেÑ ততোই মঙ্গল।
৩) আমাদের দেশে যা বেশি মেধাবী তাদের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। দেশে উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, পরিশ্রমী না পাওয়ার কারণে অধিক মেধাবীগণ দেশে ফিরে আসছে না। যেমন দরুন আমাদের বিসিএস পাস করা আমলাদের মধ্যে অতি মেধাবী সংখ্যা খুবই কম। মেধাবীগণ এই সামান্য বেতন, খারাপ কর্মপরিবেশে কাজ করতে আগ্রহী নয়। তাই মেধাবীগণ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। সরকারকে এই বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে রাজনীতিতে ও মেধাবী মুখ খুব কম দেখা যাচ্ছে। মেধাবী আমলাকে পরিচালনা করতে হলে মেধাবী রাজনীতিবিদ প্রয়োজন। কম শিক্ষিত, মেধাহীন ব্যক্তিগণ রাজনীতি আসার কারণে মেধাবী আমলাগণ কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা না থাকলে মেধাবী ছাত্রছাত্রী বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কর্মক্ষত্রে আসতে পারবে না। মেধা সংগ্রহের ক্ষেত্রে রাজনীতি বাদ দিতে হবে। দলমত নির্বিশেষে মেধাবীদের বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার নিরপেক্ষ সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। বিসিএস পরীক্ষা স্বচ্ছহত্যার সঙ্গে না হলে ভালো মেধাবী চরিত্রবান আমলা সংগ্রহ করা যাবে না।
৪) দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি খুবই সুখবর। তবে এই ক্ষেত্রে দুর্নীতি মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কয়েক দিন পূর্বে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল ৩৯টি প্রকল্পে যে সকল অনিয়ম, দুর্নীতি পেয়েছে তা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু এই সকল তদন্ত প্রতিবেদনের প্রতি মন্ত্রণালয়গুলো কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাই প্রকল্পগুলো বিলম্বিত হচ্ছে, ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তাই দুর্নীতিমুক্ত বিনিয়োগ সকল শর্তের মধ্যে প্রথমে রাখা প্রয়োজন। দুর্নীতি, অনিয়ম করা যাবে না। যে দুর্নীতি, অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য করবে তার বিরুদ্ধে দ্রæত ব্যবস্থা গ্রহণের নিয়ম কার্যকর থাকতে হবে। আইনের সুশাসন কায়েম করতে হবে। আইনকে এই ক্ষেত্রে একেবারে তার গতিতে চলার বা কার্যকর করার সুযোগ দিতে হবে। আইনের শাসন কায়েম না করতে পরলে বিদেশি বিনিয়োগ এসেও দেশের মানুষের কল্যাণ হবে না। দেশ উন্নত হবে। দেশকে ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে দুর্নীতিকে এখনই ‘না’ বলতে হবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার গতি বৃদ্ধি : ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার গতি বৃৃদ্ধি বর্তমান সরকারের “রূপকল্প ২০২১” বাস্তবায়নের কাজ দ্রæত এগিয়ে চলেছে। ২০২১ সালে আমরা উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উন্নত দেশ। এই রূপকল্প পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বিগত বছরে জাতিসংঘের বার্তা অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশ। আমাদের দেশে এখন অর্থনৈতিক আইটি বিপ্লব চলতে শুরু হয়েছে। শিল্প-বানিজ্য, সমাজ-সংস্কৃতি, সেবামূলক খাতসমূহে বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে। বিগত অর্থবছরে আমাদের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বর্তমান অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের টার্গেট ৭ শতাংশের অধিক ধরা হয়েছে।
সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে না সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্প বাস্তবায়নের কাজ। এ রূপকল্পের লক্ষ্য অর্জনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত নীতিকৌশল না থাকাটাই এ ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। এমন মতামত উঠে এসেছে মুঠোফোন অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএর ‘এশিয়ায় ডিজিটাল সমাজ নির্মাণ’ শীর্ষক এক গবেষণায়। এতে বাংলাদেশসহ সাতটি দেশের ডিজিটাল সমাজ গঠনে প্রণীত রূপকল্প ও তা বাস্তবায়নের তুলনামূলক অগ্রগতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত অন্য দেশগুলো হলো জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান। দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ডিজিটাল সমাজ নির্মাণে সাতটি দেশের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিশ্লেষণ করা হয়েছে গবেষণায়। প্রথম বিষয়টি হলো রূপকল্পের লক্ষ্যগুলো কতটুকু বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য। দ্বিতীয়টি হলো বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় এসব লক্ষ্যের প্রাসঙ্গিকতা। বাংলাদেশ সম্পর্কে জিএসএমএর গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প যখন প্রকাশ করা হয় তখন তা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর ২০১৬-২০২০ সাল মেয়াদি সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হলেও লক্ষ্য অর্জনে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন করা হয়নি। বিশেষ করে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়নে নেয়া অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের মূল্যায়ন করা হয়েছে জিএসএমএর গবেষণায়। এতে এটুআই সম্পর্কে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগের উন্নয়ন ও ডিজিটাল কার্যক্রমের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে এই প্রকল্প খুব বেশি সফলতা পায়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা, বেসরকারি খাতের কম অংশীদারত্ব এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণ এ তিনটি বিষয়কে এটুআইয়ের সাফল্যের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়। তবে জিএসএমএর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে এটুআইয়ের জনপ্রেক্ষিত বিশেষজ্ঞ নাইমুজ্জামান মুক্তা ‘এটুআই সব সময় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সরকার ছাড়াও দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হয়। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এটুআই পরপর তিনবার আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের পুরস্কারও পেয়েছে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়া কাজ করলে এটি সম্ভব হতো না।’ গবেষণায় বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল সমাজব্যবস্থার সুবিধা দেয়ার কথা বলা হলেও কীভাবে ও কত সময়ের মধ্যে তা নিশ্চিত করা হবে, সেটি পরিকল্পনায় উল্লেখ নেই। এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, দেশটির পাঁচ বছরমেয়াদি ডিজিটাল অর্থনীতি পরিকল্পনায় লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আবার জাপানের ডিজিটাল রূপকল্প লক্ষ্য অর্জন ও অগ্রগতি মূল্যায়নে বেশকিছু সংখ্যাগত প্রধান পারদর্শিতা সূচক (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) রাখা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপকল্প এমন সময়ভিত্তিক লক্ষ্য অর্জন ও মূল্যায়নের সূচক নেই।
ডিজিটাল সমাজ তৈরিতে কোন দেশ কতটুকু এগিয়েছে, তা তুলে ধরে দেশভিত্তিক ‘কান্ট্রি ইনডেক্সও’ তৈরি করেছে জিএসএমএ। এই সূচকে ৩৩ পয়েন্ট নিয়ে সাতটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আছে ষষ্ঠ স্থানে। ২৭ পয়েন্ট নিয়ে সবার নিচে পাকিস্তান। আর ৭৩ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে অস্ট্রেলিয়া। ইন্টারনেট সংযোগের প্রাপ্যতা বা কানেকটিভিটির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে গবেষণায়। এতে বলা হয়, বর্তমানে এ দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৩০ শতাংশ ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছেন। এর মধ্যে ২৯ শতাংশ মুঠোফোনভিত্তিক ও মাত্র ১ শতাংশ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট সংযোগ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৩৩। এর পেছনে থাকা পাকিস্তানের স্কোর ২৩। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, দেশটিতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এখনো সহজলভ্য না হওয়ায় তা ডিজিটাল সমাজের প্রকৃত সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে পারছে না। ফাইবার অপটিকের দুর্বল অবকাঠামো, সব জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না থাকা, মুঠোফোনভিত্তিক বিভিন্ন সেবায় তরঙ্গের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টি ইন্টারনেট সংযোগে এ দেশের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে ইন্টারনেটভিত্তিক ই-সরকার সেবা প্রাপ্তিতে শহর ও গ্রাম অঞ্চলের বৈষম্যের বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, শহর এলাকায় কম্পিউটার ও স্মার্টফোনের ব্যবহার বেশি হওয়ায় ই-সেবা প্রাপ্তিতেও তাঁরা এগিয়ে আছেন। উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার টার্গেটে সরকার আইটি খাতে বেশ নজর দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়কে প্রযুক্তি খাতে উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন। উপদেষ্টার যোগ্য নেতৃত্বে আইটি খাত এগিয়ে চলেছে। বর্তমান সরকারের প্রাণপণ চেষ্টায় প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে আইটি সেবা সার্ভিস চালু করা হয়েছে। যার ফলে ক্রমে ক্রমে কম্পিউটার ব্যবহার বেশ বেড়েছে। গ্রামের অলিগলিতে ইন্টারনেটের ব্যবহার, কম্পিউটারের ব্যবহার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল ব্যবহার বাংলাদেশে দ্রæততার সঙ্গে বেড়ে চলেছে। প্রায় ১৫ কোটি মানুষ বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহার করছে। মোবাইল ব্যাংকিং এখন একটি নতুন সংযোজন। অর্থনৈতিক বিবেচনায় আইটি ব্যবহার অতি জরুরি হয়ে পড়েছে।
জরুরি যে সকল পদক্ষেপ নেয়া দরকার :
১. ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে বেশকিছু সমস্যা আমাদের সামনে এসেছে। এই সকল সমস্যাকে দ্রæত সমাধান করতে হবে। এই সকল সমস্যার মধ্যে প্রধান সমস্যা হচ্ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা। ডিজিটাল বাংলাদেশ রুপকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনেক মন্ত্রণালয়, সংস্থা জড়িত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়সহ অনেক মন্ত্রণালয় ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব অর্পিত। কিন্তু এই সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় হীনতা বেশ রয়েছে। তাকে কমিয়ে আনতে হবে। ঘন ঘন বৈঠক করে সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে। অসমাপ্ত কাজসমূহ দ্রæত সময়ের মধ্যে করার জন্য তাগিদ দিতে হবে। একজনকে এই বিষয়ে গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে। তা না হলে নিদির্ষ্ট সময়ের মধ্যে আমরা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব না।
২. আইটি সংক্রান্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত বেশ পিছিয়ে রয়েছে। বেসরকারি খাত সফটওয়্যার তৈরি ও রপ্তানি করছে। তাতে কিছু বৈদেশিক অর্জিত হচ্ছে। তাও বেশ কম। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ব্যাপারে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর করার জন্য সরকারের অনেক করণীয় রয়েছে। আইটি সিটি তৈরির কাজও বেশ ধীরে চলেছে। ভ‚মি অধিকরণ হয়েছে। স্থায়ী ্ইমারত তৈরির কাজ এখনো শুরু করা সম্ভব হয়নি। তা দ্রæত তৈরি করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বণ্টন করে এই খাতে বিনিয়োগ এগিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
৩. সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ করার জন্য প্রকল্পসমূহ বিভিন্ন খাতে, ভিন্ন ভিন্নভাবে নিয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের ধারাবাহিকতা তেমন নেই। একটি মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে সকল কাজের সমন্বয় সাধন করতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার গ্রামে গ্রামে আইটি সেন্টার স্থাপন করে গ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে আইটি সেবা দেয়ার চেষ্টা করছে। তাতে ফল ও পাওয়া যাচ্ছে। আগামীতে আইটিসহ লভ্য, কম খরচে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারলে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হবে। সরকার রুপকল্প ২০২১ কে বাস্তবায়নের জন্য নানাবিদ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। বাস্তবায়নের কাজও অনেক... এগিয়ে চলেছে। কিন্তু বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান সঙ্গে সার্বিক লেয়াজু রেখে একত্রে... প্রকল্পসমূহের কাজকে এগিয়ে নেয়ার গতি অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। বিচ্ছিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা ঠিক হবে। তথ্য মতে দেখা যাচ্ছে বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন কিছু প্রকল্প নেয়ার কারণে মূল সুরের বাঁশি তেমন আওয়াজ করতে পারছে না।
৪. সরকারের বলিষ্ঠ, দৃঢ়, উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প দ্রæত বাস্তবায়নের পথকে প্রশস্ত করবে। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী ডিজিটাল বাংলাদেশ করা ছাড়া কোনো বিকল্প পথ আমাদের সামনে নেই। যেহেতু দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের স্বল্পতাও রয়েছে। তাই গ্যাস, বিদ্যুৎ ভিত্তিক শিল্প স্থাপন জটিল, সময়ক্ষেপণমূলক। সহজ ও কম খরচে আইটি ব্যবসা আমাদের দেশের জন্য লাভজনক। এই জন্য এখানে আমাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. অষ্টম শ্রেণী পাসের পর ছাত্রছাত্রীদেরকে আইটি খাতে উৎসাহিত করতে হবে। প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে ভকেশনাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউট স্থাপনের মাধ্যমে আইটি শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে পর্যাপ্তসংখ্যক যুবক-যুবতী আইটিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারে। দেশে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য এই শিক্ষা বেশ কাজে লাগবে। এসএসসি পরীক্ষা পাস বা তার সমমানের পরীক্ষা পাসকৃত ছাত্রছাত্রীদেরকে আইটি খাতের এই শিক্ষা প্রদান করার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. আমাদের সরকারি ও বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়সমূহে কম্পিউটার সায়েন্স বা আইটি শিক্ষার উপর অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। সকল বিশ^বিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির কোটা ঠিক করে দিয়ে তা বাস্তবায়নে তদারকি করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়সমূহে সিএসই কোর্স প্রেকটিকেল ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। আর কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে এই খাতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে।
চীন বাংলা সম্পর্ক নতুন মাত্রায় : ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম চীন সফর করে আওয়ামীলীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ঠিক একই বছর ১৯৫৬ সালে চীনের প্রধানমন্ত্রী ১০ দিনের সফরে পাকিস্তান সফর করেন। তাই চীনের সঙ্গে আমাদের সর্ম্পক বহুদিনের। চীন আমাদের পরম বন্ধু হিসেবে সবসময় আমাদের সাথে রয়েছে।
চীনে আমাদের রফতানি মাত্র ৯০০ মিলিয়ন ডলার। আমাদের আমদানি ১০-১১ বিলিয়ন ডলার। বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে চীনের সঙ্গে। চীনের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য অনেক বড়। তৈরি পোশাক শিল্পের যে আমদানি প্রয়োজন তা আমাদের দেশের পুরো রফতানি চীনে করলেও বাণিজ্য ঘাটতি মিটাইবে না। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পে শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা লাভ করলে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ১৪ অক্টোবর’১৬ ১২ ঘণ্টার সফরে বাংলাদেশে আসেন। শি জিন পিং তার বক্তব্যে বলেন, চীন ও বাংলাদেশের সফরে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। ২০১৭ সাল হলো চীন ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বের বছর। আমাদের এই দুই দেশ ভালো প্রতিবেশী ও বন্ধু। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর উক্ত কথাগুলো চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন। বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে ২৭টি ঋণ ও কাঠামো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। যেসব শর্তে এইসব চুক্তি হয়েছে সেগুলো হচ্ছে : বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বøু ইকোনমি, বিসিআইএমসি, সড়ক ও সেতু, রেলওয়ে, বিদ্যুৎ, মেরিটাইম, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প উন্নয়ন, সামর্থ্য বৃদ্ধি ও সিল্ক উন্নয়ন। বেসরকারিখাতে ১৩ বিলিয়নের ১৩টি বাণিজ্যিক চুক্তিস্বাক্ষর হয়েছে। দুই নেতা ৬টি প্রকল্প উদ্বোধন করেন।
সফরের এক অংশে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে চীনের পক্ষ থেকে ভ‚-রাজনীতিতে চীনের সমর্থনের জন্য বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া অনুরোধ করেন। অবশ্য চীনের সঙ্গে বিএনপি সম্পর্ক অনেক পুরাতন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মূলত চীনের সাথে সম্পর্ক গোড়া পত্তন করেন।
বৈঠকের পর ২৩ দফা যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ মনে করে, এই উদ্যোগ ২০২১ সালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত করার জন্য বেশ সহায়ক হবে।
সারা বিশ্ব আজ চীনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। চীন বিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলেছে। পশ্চিমা দেশসমূহ চীনের উন্নতিতে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে। চীন তাই তাদের জন্য একটি চিন্তার কারণ। কিন্তু চীন আমাদের উন্নয়নের বন্ধু। আমাদের চলার পথের সাথী। বিগত কয়েক বছর ধরে চীনের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশ। ১৯৮০ সালে চীন ও ভারত উভয়ের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৩০০ ডলার। বর্তমানে চীনের মাথাপিছু আয় ৬ হাজার ডলার। আর ভারতের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ডলার। এই সকল সূচকে চীন অনেক অনেক এগিয়ে। আর এই সাফল্য বিশ্বের অনেক দেশকে বেশ চাপের মুখে রেখেছে। চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক সফর। ইতিহাসে তা মাইলফলক হিসেবে চিহ্রিত খাকবে। বাংলাদেশ সবসময় এক চীন নীতির বিশ্বাসী। এই বিশ্বাসের কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার আলোচনায় বলেছেন।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ. অবকাঠামো, শিল্প, বিদ্যুৎ জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগীয় ঐকমত্যে পৌঁছেছে। আমাদের ও চীনের মধ্যেকার সুসর্ম্পক ধীরে ধীরে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি পণ্য শুল্কমুক্ত দেয়ায় চীনে রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রফতানি ১৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যাহা ২০১২ সালে ছিল মাত্র ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। চীনে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করার জন্য আগ্রহী। প্রতি বছর বিভিন্ন পর্যায়ে চীনে ২০০ ছাত্রছাত্রী বৃত্তি নিয়ে লেখাপড়া করতে যাচ্ছে। এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলে বৃত্তির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। ছাত্রছাত্রীদের চীনে গিয়ে লেখাপড়া শেখার আগ্রহ বাড়বে। তাতে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সহজ হবে।
এই সময়ের পূর্ব থেকে বাংলাদেশ চীন বিমান চলাচল সহজ হয়েছে। প্রচুর চীনা ব্যবসায়ী সহজে বাংলাদেশে আসতে পারছে। চীনা প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গি ছিল ৮৬ জন। এই বিশাল ব্যবসায়ী সফরসঙ্গি থাকার কারণে আমাদের মধ্যে আলাদা আলোচনা অনেক হয়েছে। ব্যবসার বিনিয়োগ দরজা সহজে খোলছে। ইতোমধ্যে ১৩টি ব্যবসায়িক ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এই চুক্তিগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়া আমাদের বড় কাজ। এই ঋণ চুক্তি যত সহজে বাস্তবায়ন করা হবে, ততই আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে। আমাদের বৈদেশিক নীতি হচ্ছে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব। কারো সঙ্গে শত্রæতা নয়। অন্যদিকে চীনের ‘এক চীন’ নীতিকে আমরা সকল দিক থেকে সমর্থন করায় চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত এগিয়ে রয়েছে।
আমাদের রফতানি পণ্যে ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সহজে চীনে যে সকল দ্রব্য আমরা রফতানি করতে পারি তা হবে আমাদের জন্য সুখবর। তৈরি পোশাক শিল্পে চীনে রফতানিতে প্রবেশ করার চেষ্টা সবচেয়ে বেশি করার প্রয়োজন। চীনের বিশাল মার্কেটে সামান্য একটু অংশ আমরা লাভ করতে পারলে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি নেমে আসবে শূন্যে। এই খাতকে আমাদের প্রথম ও প্রধান খাত হিসেবে টার্গেট করা প্রয়োজন।
লেখক : সাবেক সহসভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমএ, বিজেএমইএ, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।