Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৮ জুন ২০১৭, ১৪ আষাঢ়, ১৪২৪, ০৩ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী

ইসলামের দৃষ্টিতে কবি ও কবিতা এবং সাহিত্য চর্চা

| প্রকাশের সময় : ৩০ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

পথ নির্দেশ
আফতাব হোসেন হৃদয় খান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) আরো বর্ণনা করেন- ‘মহানবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন তোমরা কাফির, মুশরিকদের নিন্দা করে কাব্য লড়াইয়ে নেমে পড়। তীরের ফলার চেয়েও তা তাদেরকে বেশি আহত করবে’। ইবনে রাওয়াহাকে পাঠানো হল সম্পূর্ণ মুগ্ধ হতে পারলেন না নবী করিম (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কা’ব বিন মালিককেও পাঠানো হলো অবশেষে যখন হাস্সান এলেন, বললেন, ‘সবশেষে তোমরা ওকে পাঠালে’। ওতো লেজের আঘাতে সংহারকারী তেজোদীপ্ত সিংহ শাবক’। কথা শুনে হাস্সান (রা.) আনন্দে জিভ নাড়তে নাড়তে বললেন, সেই মহান সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্যবাণী সহকারে পাঠিয়েছেন। এ জিভ দিয়ে তাদের চামড়া ছুলে ফেলার মতো গাত্রদাহ সৃষ্টি করেই ছাড়ব।
এ দিন থেকেই আনসারদের মধ্যে তিনজন ইসলামী কবি হাস্সান বিন সাবিত, কা’ব বিন মালিক এবং আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা কাফিরদের বিরুদ্ধে কাব্য লড়াইয়ে নেমে পড়লেন। একবার রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দীর্ঘ সফরে বের হয়েছেন। জনমানবহীন প্রান্তরে মরুপথে উটের পিঠে অবস্থান করছেন। রাতও হয়েছে বেশ, বললেন হাস্সান কোথায়? হযরত হাস্সান (রা.) এগিয়ে এলেন, বললেন ইয়া রাসূলুল্লাহ এইতো আমি। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন আমাদের কিছু ‘হুদা’ শুনাওতো, শুরু করলেন কবি। ওদিকে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন দিয়ে শুনছেন এবং উট চলছে অধিকতর ক্ষিপ্রতায়। উটের দ্রæত চলার কারণে মনে হচ্ছে হাওদা যেন পেছন দিকে ভেঙে পড়ে যাবে। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাস্সানকে থামতে বললেন: আর মন্তব্য করলেন, কবিতাকে এ জন্যই বলা হয় বিদ্যুতের চেয়ে দ্রæত গতিসম্পন্ন এবং এর আঘাত শেলের আঘাতের চেয়েও ক্ষিপ্র ও ভয়ানক। রাসূল (সা.)-এর উৎসাহ ও প্রেরণায় সাহাবীদের মধ্যে যাদের কাব্য চর্চার প্রতিভা ছিল তারা প্রায় সকলেই কাব্য চর্চা করতেন। সাহাবী কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- হাস্সান বিন সাবিত (রা.) কা’ব বিন মালিক (রা.) আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.) আলী ইবনে আবু তালিব, আবু বকর সিদ্দিক (রা.) উমর ফারুক (রা.), লবীদ বিন রাবিয়াহ (রা.), কাৎব ইবনে যুহাযের (রা.) আব্বাস বিন মিরদাস (রা.) যুহায়ের বিন জুনাব (রা.) সুহায়েম (রা.) ও আবু লায়লা (রা.) প্রমুখ।
রাসূলে আরাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবী কবিদের মধ্যে থেকে কবি হাস্সান বিন সাবিতকে সভা কবির মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাকে বলা হতো শায়েরুর রাসূল বা রাসূলের কবি। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায় কবি হাস্সান বিন সাবিত কবিতা আবৃত্তি শুরু করলে কবিকে উৎসাহিত করার জন্য কখনো কখনো নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবাইকে শুনিয়ে বলতেন ‘হাস্সানের জিভ যতদিন রাসূলের পক্ষ হয়ে কবিতার বাণী শুনিয়ে যাবে, ততদিন তার সাথে জিব্রাইল (আলাইহিস সালাম) থাকবেন। কবিতা লেখার পুরস্কার হিসাবে কবি হাস্সান বিন সাবিত (রা.) জীবিত অবস্থায় জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। হাস্সান বিন সাবিতের কবিতা শুনে রাসূলে আরাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘোষণা দিয়েছিলেন- ‘হে হাস্সান আল্লাহর কাছ থেকে তোমার জন্য পুরস্কার রয়েছে জান্নাত।’ কাব্যে অশ্লীলতা বর্জনের ব্যাপারে আল্লাহ নবীর কঠোর নির্দেশ ছিল। তিনি বলেছেন ‘ইসলাম গ্রহণের পরও যে অশ্লীল কবিতা ছাড়তে পারলো না, সে যেন তার জিভটাই নষ্ট করে ফেললো।’ রাসূল মাকবুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন ‘কারো পেট বা হৃদয় যদি পুঁজপূর্ণ হয়ে পচে যায়, তবুও সেই পেট বা হৃদয় অশ্লীল কবিতার চেয়ে উত্তম।’ প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরবারে একবার কবিদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনাক্রমে জাহেলী যুগের অশ্লীল কবিতার জনক ইমরাউল কায়েসের প্রসঙ্গ এলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সম্পর্কে বললেন দুনিয়ায় তিনি খ্যাতনামা হলেও আখিরাতে তার নাম নেবার কেউ থাকবে না। কবিদের যে বাহিনী জাহান্নামের দিকে যাবে সে থাকবে তার পতাকাবাহী।
কবি ও কবিতা সর্ম্পকে রাসূলে আরবী (সা.)-এর মনোমুগ্ধকর চিত্তাকর্ষক, সুনিপুণ মূল্যায়ন আজকের শ্রেষ্ঠ কাব্য সমালোচকদের মন্তব্যকেও হার মানায়। তিনি বলেছেনÑনিশ্চয়ই কবিতা হচ্ছে সুসংবদ্ধ কথামালা, কাজেই যে কবিতা সত্য আশ্রিত সে কবিতা সুন্দর। আর যে কবিতা সত্য বিবর্জিত সে কবিতার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। উট থামাতে পারে তার সুকরুণ ক্রন্দন। কিন্তু আরবরা থামাতে পারে না তাদের কবিতার সুর। নিশ্চয়ই কবিতা বিদ্যুতের চেয়ে দ্রæতগতি সম্পন্ন এবং তীরের ফলার চেয়েও ক্ষিপ্র ও ভয়ানক। আরবদের সুসংবদ্ধ কথা হলো তাদের কবিতা। কবিতার ভাষায় কিছু চাইলে তারা মন ভরে দান করে। তাদের ক্রোধের আগুন নিভিয়ে ফেলে কাব্যের অন্তঃসলিল প্রবাহ। সাহিত্যের আসরে কবিতাই হলো তাদের মনকাড়া শ্রেষ্ঠ উপহার।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।