Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

প্রফেসর আসকার ইবনে শাইখ এবং তাঁর জীবন ভাবনা

প্রকাশের সময় : ৩০ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:৪৪ পিএম, ২৯ মার্চ, ২০১৭

মাহমুদ ইউসুফ
দেশের আলোকিত মানুষদের মধ্যে অনন্য মর্যাদায় অভিসিক্ত আসকার ইবনে শাইখ। প্রায় সত্তর বছর যাবত আলো ছড়িয়েছেন তরুণ সমাজ, বুদ্ধিজীবীদের মাঝে। সংস্কৃতির জগতে তাঁর তুল্য আরেক জন মানুষ এদেশের মাটিতে বিরল। বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁর কলমের গতি ছিলো অপ্রতিরুদ্ধ।
বাংলার মূলধারার নাট্যকাশে বৃষ্টি নামে ড. শাইখের হাত ধরে। তাঁর লক্ষ্য ছিলো বাংলা নাটকের বিশ^রূপ দেয়া। বাংলার জনগোষ্ঠীর কৃষ্টির উন্নয়নই ছিলো তাঁর সৃষ্টিকর্মের লক্ষ্য। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের নাট্যপ্রবাহে যারা প্রাণ ও বেগ সঞ্চার করে অগ্রগতির পথে চালিত করছেন ড. শাইখ তাদের মধ্যে প্রধান কুশীলব। এনামুল করিম বলেন, Askar Ibne Shaikh is the most profile of the younger generation of dramatists.-… He is far the most popular of our play wrights. (Bengali Literature in East Pakistan. Written by Mr. Enamul Karim and revised by Dr. Syed Sajjad Hussain and Mr. Serajul Islam Choudhury. The information Department, Government East Pakistan, EPGP 62/63, Page 14 )
ড. শাইখ ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। অধ্যাপনা করতেন পরিসংখ্যান বিষয়ে। কিন্তু তাঁর প্রাণ ছিলো শিল্প সংস্কৃতিকেন্দ্রিক। কেবল তাই নয় ধর্মদর্শন, সাহিত্য, ইতিহাসের অলিগলি ছিলো তাঁর নখদর্পণে। প্রাচ্য পাশ্চাত্যের উত্থান পতন, মানব সভ্যতার ইতিহাস, ইতিহাসের রূপ-রূপান্তর তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে ধরা দিয়েছে মূর্তভাবে। ক্রুসেডের ইতিবৃত্ত গ্রন্থটি অধ্যয়নে গবেষকমাত্র ড. শাইখের জ্ঞানের গভীরতা উপলব্ধি করবেন। মুসলিম আমলে বাংলার শাসনকর্তা তাঁর আর একটি ইতিহাস সংক্রান্ত কিতাব। কালো রাত তারার ফুল ঐতিহাসিক গল্পের সঙ্কলন। প্রাচীন বাংলার উদ্ভব কথা, বাংলায় ইসলাম, স্বাধীন সুলতানী বাঙ্গালার কথকতা পাঠকের দোরগোঁড়ায় আজও পৌঁছেনি।
জাতির জাতীয় প্রয়োজেনই তিনি নাট্যকর্মে সম্পৃক্ত হন। কখনও নিজেকে জাহির করার জন্য নয়। সাহিত্যিক ও গবেষক আবদুন্ নূর বলেন, আসকার ইবনে শাইখ নিভৃত নাট্যচারী। নাটক মঞ্চায়নের পর ওঁকে আমি কদাচিৎ মঞ্চে আসতে দেখেছি। তিনি নাটকের হলে দূরের চেয়ারে বসেই তাঁর মঞ্চস্থ নাটক দেখতেন। নাট্য রচয়িতা হলে উপস্থিত সে কথা তিনি দর্শকদের জানাতে চাইতেন না। দর্শকদের ভাব-অনুভাব তিনি পশ্চাতে থেকেই পর্যালোচনা করতেন। নাটক শেষ হওয়ার পরপরই অন্যান্য দর্শকের সাথে সারি মিলিয়ে তিনি হল থেকে বেরিয়ে যেতেন। নিভৃতে। নাট্য প্রযোজকদের অনেকেই জানত আসকার ইবনে শাইখের মঞ্চে না আসার অনিচ্ছা রয়েছে। তা সত্তে¡ও ওরা বহু অনুরোধ করে মঞ্চে নিয়ে আসত। মঞ্চে দাঁড়ালে তিনি অবশ্যই নম্র কণ্ঠে উজার করে তাঁর মনের প্রশংসা বার্তা কুশলীদের প্রদান করতেন। তাঁর কথা শুনতে শুনতে তবু ভাবতাম, কেন তাঁর কণ্ঠে প্রচ্ছন্ন অনীহা নিহিত রয়েছে! (দৈনিক ইত্তেফাক; ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫)
অনুবাদক, ইতিহাসকার, গীতিকার, প্রবন্ধকার, শিশু সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর কমবেশি পরিচিতি থাকলেও নাট্যকার পরিচয়ই মুখ্য। এ উপাধিতেই তিনি দেশে বিদেশে পরিচিত। নাটকই তাঁকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর নাটক সংখ্যা প্রায় দেড়শ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম নাট্যকার তিনি। কিন্তু তাঁর নাট্যকর্মের যথাযথ মূল্যায়ন আজও হয়নি। এর কারণ একটাই। যেটি হলো তিনি যে, তাওহিদে বিশ^াসী, জাতীয় বুদ্ধিজীবী। জীবনাদর্শে তিনি মুসলিম এবং ননসেক্যুলার। ইনসানে কামেল বা পরিপূর্ণ মানুষ।
মানবরচিত মতাদর্শ তথা ধর্মনিরপেক্ষতার বাইরে থাকার কারণেই তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। তরুণ সমাজ ও ছাত্র-ছাত্রীদের অন্ধকারে রাখা হচ্ছে তাঁর অবদান ও কীর্তি সম্পর্কে। একাডেমিক পাঠ্যসূচিভুক্ত হয়নি তাঁর সাহিত্যকর্ম। বাম-রাম-ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের একটাই ভয়, যদি ড. শাইখকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে উদীয়মান তরুণ সমাজের মধ্যে মূলধারার তাহযিব তামাদ্দুন তথা ইসলামি সংস্কৃতির নবজাগরণ ঘটতে বাধ্য।
জীবন যৌবনের কোনো একসময় তিনি তথাকথিত প্রগতিশীল নাস্তিক্যবাদী বা কমিউনিজম আদর্শের প্রতি ঝুঁকে ছিলেন। সেই মতাদর্শে অটুট থাকলে তিনি হতেন আজ বাংলার শেক্সপিয়ার বা হেনরিক ইবসেন বা জর্জ বার্নাড শ। সারা বিশ^বাসী তাঁকে নিয়ে করত মাতামাতি। এটা আমাদের দৃঢ় বিশ^াস। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সর্বত্রই তিনি পেতেন মহামানবের খেতাব।
জীবনযাত্রার এ দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার জীবন-কথার কিছু কথার ১৪তম পর্বে লিখেছেন, ‘মানুষের মুক্তিবিধানের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার প্রতি আমার কিছুটা দুর্বলতা ছিলো। কিন্তু এদেশে ইসলামের প্রচলিত রূপের প্রতি ও জনসাধারণের গভীর বিশ^াসের প্রেক্ষাপটে ধর্মবিরোধী, বিশেষ করে ইসলাম বিরোধী, মার্কসীয় আদর্শ এখানে কতটুকু গ্রহণীয় হবে, এই-ই ছিলো আমার দ্বিধাগ্রস্ত ভাবনা। অতঃপর কিছুটা অবহিত হলাম যখন ইসলামের নবিজি স. প্রদর্শিত বিপ্লবমুখী জীবনবিধানের বিষয়ে। তখন সকল দ্বিধা দূর হয়ে গেল। বিশ^াস জন্মাল, সর্বরকম দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মুক্তি সনদ রূপে ইসলাম আমাদের জীবনাদর্শ হতে পারে। কিন্তু এই মুক্তিসনদের রূপায়ন যে কঠিনতম কাজ। এত অশিক্ষা-অজ্ঞানতা, এত ব্যাপক দারিদ্র্য ও অন্ধ বিশ^াস। এত বিভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে ইসলামকে মুক্ত করে সমাজ-দেশে পুনপ্রতিষ্ঠিত করা। ...’ (আসকার রচনাবলি ৭, পৃ ৩০৪-৩০৫)।
এই বয়ান থেকেই তাঁর জীবনের ঠিকানা, লক্ষ্যস্থল, কর্মপরিধি, লাইফস্টাইল, অধ্যাপনা, সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে ধারণা নেয়া সম্ভব। সহকর্মী সহযোদ্ধাদের সাথে এখানেই তাঁর বিরোধ, অসামাঞ্জস্যতা। সহকর্মীরা নিয়োজিত নারী ও প্রকৃতি বন্দনায়। আর তিনি মুখরিত ইসলাম ও মুসলিম চেতনা নিয়ে। সহযোদ্ধারা ইউরোপীয় মরিচিকার বেড়াজালে ঘূর্ণায়মান। আর ড. শাইখ তখন মহানবি স. ও তাঁর আদর্শ-রীতিনীতি বাস্তবায়নে তৎপর। একজন কুরআনের অনুসারী, অন্যরা পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা বা ভোগবাদিতায় আচ্ছন্ন। উভয় গ্রæপের তফাত এখানেই।
ড. শাইখ একজন ব্যক্তিমাত্র বা লেখকমাত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি ইনস্টিটিউশন। একটি স্বার্থক, গণমুখী প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি তিনি একক হাতে সম্পন্ন করেছেন। যুগে যুগে পৃথিবীতে আসে পথপ্রদর্শক, দিশারী, কান্ডারী। ড. শাইখও এমনি একজন। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দিকাল যাবত তিনি জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তার পাÐিত্য, জ্ঞানের প্রখরতা, ক্ষুরধার লেখনীতে সমৃদ্ধ হয়েছে এদেশের মাটি ও মানুষ। শিক্ষা, অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্যে পশ্চাতপদ এ জনপদে সাংস্কৃতির রেনেসাঁ সৃষ্টি করেছেন ড. শাইখ। যার প্রকৃত নাম ড. এম ওবায়দুল্লাহ। সত্যসন্ধানী, মানবতাবাদী, অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী ড. শাইখ রাষ্ট্রীয় স্বার্থে, জাতীয় প্রয়োজনে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক মহলকে একতার মঞ্চে সংঘবদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। স্বগৃহে নাট্য একাডেমি এ উদ্দেশ্যেই স্থাপিত হয়। কিন্তু প্রতিপক্ষ মতলববাজদের কাছ থেকে শুধুই পেয়েছেন বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, অবহেলা। এই দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়েই ইন্তেকাল করেন ১৮ মে ২০০৯। জন্মগ্রহণ করেছিলেন ৩০ মার্চ ১৯২৫। গ্রাম মাইজহাট, ইউনিয়ন বোকাইনগর, উপজেলা গৌরিপুর, জেলা ময়মনসিংহ।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।