Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

হঠাৎ উগ্রবাদের তৎপরতা কি ধোঁকাবাজি রাজনীতিরই ফসল?

প্রকাশের সময় : ৩০ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:৪৩ পিএম, ২৯ মার্চ, ২০১৭

মুহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন
মাকড়াসার বাচ্চারা পৃথিবীর আলো দেখার পূর্বেই নিজের জন্মধাত্রী মাকে খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে অতঃপর খোলস ছেড়ে বের হয়। তদ্রæপ মধ্যযুগে মুসলমানের প্রতিষ্ঠিত স্পেন, কায়রো, কার্ডোভার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইউরোপীয় ছাত্ররা ইউরোপ নবজাগরণ বা রেঁনেসা আনায়ন করার পর শিক্ষক মুসলমানদেরকে বিনাশ করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয় এবং ১৯১৭ সালের মধ্যে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্র গ্রাস করে। ষোড়শ শতকে ইউরোপীয়রা বঙ্গোপসাগরের উপক‚লে এসে দেখতো এখানকার প্রতিটি উপক‚লীয় বন্দরে মুসলমানদের আধিপত্য। এমতাবস্থায় তারা প্রথমেই হিন্দুস্থানের বর্ণহিন্দুদের সাথে আঁতাত করে বাংলা বিহার উড়িষ্যা দখল করে ১৭৫৭ সালে এবং দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজকে হত্যা করে শিখÐী মীর জাফরকে ক্ষমতাসীন করে। একটু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে ক্রসেডার রাজা ফার্ডিনাল্ড ও রানী ইসাবেলার যৌথ আক্রমণের মাধ্যমে পিতৃঘাতি স্পেনের মুসলিম শাসকের পতনের ফলে মুসলিম বিশ্বের পতন এবং সা¤্রাজ্যবাদী ক্রসেডার পাশ্চাত্যের উত্থান শুরু হয়।
১৪৯২ সালে মুসলিম স্পেনের পতন ও খ্রিস্টান ফার্ডিনাড-ইসাবেলার উত্থানের পরই পর্তুগিজের নাবিকগণ দিগি¦জয়ে বের হয়। খ্রিস্টান রাজকীয় সহায়তায় কলম্বাস পৌঁছাচ্ছে আমেরিকায়, ভাস্কো দা গামা পৌঁছাচ্ছে ভারতের কালিঘাট বন্দরে। ভাস্কো দা গামাকে দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বীপদেশ মাদাগাস্কার থেকে পথ দেখিয়ে ভারতে আনেন একজন মুসলিম ব্যবসায়ী। ইউরোপীয়রা পৃথিবীর যে বন্দরে পৌঁছেছে সে বন্দরেই দেখেছে মুসলমানদের প্রতিপত্তি মানবিক আচরণ। এরূপ দর্শনে তারা মুসলমানদেরকে নিজেদের ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসাবে সাব্যস্ত করে। মাকড়সার বাচ্চাদের মতোই মুসলমানদের লেবাসধারী মুনাফেক মুশরেক ক্ষমতালিপ্সুরা বিশ্বজুড়ে মানুষের মর্যাদা ও মানবাধিকার হরণ করে চলেছে। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, কাশ্মীর, বার্মা ও শ্যাম দেশে (থাইল্যান্ড) মুসলমানদের করুণ পরিণতি ভোগ করছে। আইএস, তালেবান, হুজী, জেএমবিসহ নানা নামে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। মুসলমানরা মজলুম মানুষের অধিকার সমমর্যাদায় বিশ্বাসী। বিশ্বজুড়ে যে সমস্ত রাষ্ট্র অস্ত্রতৈরী ও বিক্রী করে তাদেরই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জঙ্গি বা সন্ত্রাসীর ইন্ধনদাতা অথবা সক্রিয়ভাবে অপরাধ সংঘটিত করে মুসলমানদের ঘাড়ে দায়-দায়িত্ব চাপাচ্ছে। এদিকে তারা অস্ত্র বিক্রি করছে অন্যদিকে আল্লাহতালার প্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ তেল-গ্যাসসহ মূল্যবান সম্পদ লুটে নেয়াই তাদের উদ্দেশ্য।
একথা বলা যায় যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের উপর কর্তৃত্ব বজায়ের পাশাপাশি তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষা প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার লক্ষ্যে জঙ্গি কার্যক্রমের দায় দায়িত্ব মুসলমানদের কাঁধে চাপানের অপপ্রচার যারা শান্তি ও মানবতার দুষমন তাদের পক্ষ নেয়ায় পবিত্র কোরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে মুসলমান দাবি করতে পারে কিনা তা মহান আল্লাহ্পাকই জানেন। ভারতবর্ষের দখলদার ব্রিটিশরা মানবিক বিপর্যয়, সামাজিক সম্পত্তি ধ্বংস করেও যখন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হলো তখন ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধিয়ে ব্যাপক গণহত্যা করায়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেলদের পরামর্শ আর মুসলিম লীগের বিশ্বাস ঘাতকতায় হায়দ্রাবাদ স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের মালিক হওয়ার পরও ১ বছর ২৯ দিন পর ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর “নেহেরু ডকট্রিন” অনুযায়ী “অপারেশন পলো” নামে পুলিশ অ্যাকশনের আড়ালে বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়দারাবাদের উপর। হিন্দুস্তানি বাহিনী মেতে ওঠে নারকীয় গণহত্যায়। লাখ লাখ মানুষ গণহত্যায় প্রাণ হারায় হিন্দুস্তানি বাহিনীর হাতে। ধর্ষিত হয় লক্ষাধিক নারী।
খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনের মাধ্যমে হায়দারাবাদকে বিভীষিকার মধ্যে নিক্ষেপ করে উত্তোলিত হয় হিন্দুস্তানের পতাকা। হিন্দুস্তান অতিদ্রæত হায়দারাবদকে খÐ-বিখÐ করে মিশিয়ে দেয় তার বিভিন্ন রাজ্যের সাথে। বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে যায় হায়দারাবাদের অস্তিত্ব। ঠিক যেমনটি ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মিসর, ইয়েমেন, আরকান রোহিঙ্গা, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, কাশ্মীরসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বেলায় জাতিসংঘের সনদের কোনো গুরুত্ব নাই। চলছে গণহত্যা, গণধর্ষণ, হত্যা-খুন, অপহরণ ও বেসামরিক নাগরিক হত্যা। আল্লাহ্ পাকের ঘর মসজিদুল হারামাইনের খাদেম সৌদি বাদশাসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে গণহত্যা ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যখন জরুরি তখন তারা আল্লাহ্ পাকের দুষমনদের মিথ্যাচারের পক্ষে সমর্থন যোগাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন “নেহেরু ডকট্রিন” স্বীকারে হঠাৎ করে জোরেসোরে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড, ঢাকা, সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চল আকস্মিকভাবেই উগ্রবাদের উত্থানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মেধাবী ছাত্ররা হারিয়ে যাচ্ছে বা অপহরণ হচ্ছে। মসজিদের ইমাম সাহেবদের কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী খোৎবা পাঠও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অনেক ইমাম সাহেবকে জোরপূর্বক বাদ দেয়া হচ্ছে কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় অজ্ঞকর্মকর্তা তাঁদের ডেকে নিয়ে অপদস্থ করছে। গ্রিকমূর্তি সুপ্রিমকোর্টের সামনে বসিয়ে ন্যায়বিচারের বাণী শোনানো হচ্ছে। যা স্পেন, হায়দারাবাদ, ফিলিস্তিন, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া, ইয়ামেন, মিসরের জনগণের দুর্দশার চিত্র ভেসে উঠতে শুরু করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যে মানসম্পন্ন ঐ সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উগ্রজঙ্গিবাদের ক্ষেত্র হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
১৬ কোটি মানুষের সিংহভাগ এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দেশের উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন, নাগরিক ও মানবিক অধিকার মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম। যা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছে দেশপ্রেমিক জনতা। আগামী ৭ এপ্রিল হিন্দুস্তান সরকারের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ দিনের সফরে যাওয়ার কথা। এ সফরকেন্দ্রিক হিন্দুস্তানের সংবাদপত্রের প্রতিরক্ষা চুক্তির সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পরই বাংলাদেশের জনগণের মাঝে অত্যন্ত ঠাÐা মাথায় জঙ্গি আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ, মাদক মহাজনদের আইনের আওতায় আনার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা আদর্শিক প্রতিপক্ষদের গণগ্রেফতার চলছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের মাঠে-ময়দানে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। যখন প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা তখন কার স্বার্থে জাতিকে দ্বিধা-বিভক্ত করা হচ্ছে এটাই প্রশ্ন? আজকে দেশপ্রেমিক গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও বিচার বিভাগকে এসব বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। হিন্দুস্তানের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমে গেছে। দ্বিতীয় গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার সুযোগ তারা চায়। এছাড়াও আরো অভিন্ন সমস্যা হিন্দুস্তান সৃষ্টি করে রেখেছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই তার প্রতিবেশীদের নাগরিকদের সীমান্ত রক্ষী দিয়ে গুলি করে হত্যার নজির নেই। কিন্তু হিন্দুস্তান বীরদর্পে এটা করে চলেছে। সীমান্ত এলাকায় মাদক তৈরী করে বাংলাদেশে বাজারজাত করছে। হিন্দুস্তানি টিভি চ্যানেলগুলোর আত্মঘাতিমূলক ছবি প্রদর্শন করা। দেশের শিল্প কল-কারখানা বন্ধের নানা চক্রান্তের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানকালে এবং গ্রেপ্তারের আগে এসব বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা উচিৎ।
কারো দূরদৃষ্টির অভাব, অথবা অন্ধআনুগত্যের কারণে হায়দারাবাদের মতো ভাগ্য বরণ করতে হলে যারা আজ জনগণের জানমাল ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার উপর গুরুত্ব না দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গ্রেফতার করে বাহবা নিচ্ছেন তাদের জন্য যেমন দুর্ভোগ রয়েছে, তেমনি গোলামি জিঞ্জির তাদেরকেই বেকায়দায় ফেলবে। আর যারা দেশপ্রেমিক রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত তাদের মনে রাখতে হবে দিল্লির সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি মানেই সার্বভৌম বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা। হিন্দুস্তানের শাসক আর গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমের বিপক্ষে। সে দেশের জনগণ আমাদের বন্ধু হলেও স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হলে তারাও আমাদের সাথে ভালো আচরণ করবে এ আশা করা ভুল হবে। জাতিসংঘ তখনও নীরব থাকবে। তাই আমাদের প্রতিরক্ষার কৌশল সম্পর্কে তাদের অবাধ জানা বা আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের সেখান থেকে প্রশিক্ষণের পরিবেশ সৃষ্টি করলে মাকড়সার বাচ্চার জন্মদাতা মায়ের মতোই অবস্থা হবে।
এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে বিশ্বাসীদের সুদৃঢ় ঐক্য হতে হবে। রাজনৈতিক কর্মীদের ভীত্তিহীন মামলায় গ্রেফতার বন্ধ করা অপহরণকৃতদের উদ্ধার এবং অপহরণকারীদের আইনের আওতায় এনে তাদের উদ্দেশ্য অবহিত ও চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা। সকল রজনৈতিক দলকে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া অথবা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে থাকা সকলের সমাবেশ বন্ধ করা। শাসকদের পরোক্ষ মদদে উগ্ররাজনীতি বন্ধে পেশাদারীত্বের পরিচয় দেয়া। মুসলিম জাতীয়তাবাদই কেবল বিশ্বে শান্তি ও মানবাধিকার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। যেমন হিন্দুস্তানসহ বিভিন্ন অমুসলিম রাষ্ট্রে মাওবাদসহ বিভিন্ন হামলাকে তারা জঙ্গি হিসাবে চিহ্নিত করে না। কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্রে বিভিন্ন হামলাকে জঙ্গি হিসাবে চিহ্নিত করার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে এমনটি দাবি করা কি ভুল হবে? আজকে সময় মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভেদ দূর করে রাজনৈতিক ধোঁকা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে ঐক্যবদ্ধ হতে সক্ষম হলে গণহত্যা ও দখলদারিত্বের নামে জঙ্গিবাদের মদদ বন্ধ হয়ে যাবে।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশন (বামসাএ)



 

Show all comments
  • jafor ৫ এপ্রিল, ২০১৭, ১০:৪০ এএম says : 0
    I don't support any defense treaty with India.Please stop drama with Bangladeshi People .
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।