Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৪ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

অপ্রতিরোধ্য পলিথিন

পুরান ঢাকার কেমিকেল কারখানা সরানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও পলিথিন কারখানা সরানোর তৎপরতা নেই : ৪ শতাধিক কারখানায় দেদারছে তৈরী হচ্ছে : নেপথ্যে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী : ঢাকার ড্রে

| প্রকাশের সময় : ২ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

নূরুল ইসলাম : পুরান ঢাকা থেকে কেমিকেল কারখানা সরানোর উদ্যোগ নেয়া হলে নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানা সরানোর কোন তৎপরতা নেই। শুধুমাত্র পুরান ঢাকায় ৪ শতাধিক অবৈধ কারখানায় দেদারছে উৎপাদন হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন। স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পলিথিনের তৈরি সব ধরনের ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার, বিপণন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ হলে অবাধে চলছে এর ব্যবহার। রাজধানীসহ সারাদেশেই পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার আশংকাজনক হারে বেড়ে গেছে। পলিথিনের কারণে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। বর্ষা এলে এর ভয়াবহতা আরও বেড়ে যায়। তখন ড্রেন উপচে পানিতে সয়লাব হয়ে যায় রাজধানীর রাস্তাগুলো। তখন পথচারীদের ভোগান্তির সীমা ছাড়িয়ে যায়। যানজটের ভোগান্তিও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। দামে সস্তা, সহজলভ্য ও ব্যবহারের সুবিধার কারণে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই পলিথিন ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কাঁচাবাজার, মাছ-গোশত, বিপণিবিতান, অভিজাত শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, মুদি দোকান, ফুটপাত- সর্বত্রই পণ্য বহনে ব্যবহৃত হচ্ছে পলিথিন ব্যাগ। খুচরা বিক্রেতারা জানান, আগে পলিথিন রাখঢাক করে ব্যবহার করতেন তারা। কারণ, পুলিশ পলিথিন পেলে ধরে নিয়ে যেতো। এখন আর সেই অবস্থা নেই। এখন প্রকাশ্যেই পলিথিন বিক্রি ও ব্যবহার করা যায়। গত বছরও পাটের ব্যাগ ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছিল পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতে সেই উদ্যোগ চুপসে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরও পলিথিনের বিষয়ে উদাসীন। মাঝে মধ্যে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হলেও তা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। সব মিলে পলিথিন দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (পবা) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বর্তমানে শুধু রাজধানীতেই প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেয়া হয়। আর একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। পলিথিনের এ চাহিদা মেটাচ্ছে পুরান ঢাকার লালবাগ, রহমতগঞ্জ, সোয়ারিঘাট, দেবিদাসঘাট, ইসলামবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে চার শতাধিক অবৈধ পলিথিন তৈরির কারখানা। আর স্থানীয় থানা পুলিশ, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদেরকে মোটা অংকের মাসোয়ারার বিনিময়ে নিষিদ্ধ এ পলিথিন তৈরির পর ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে রাজধানীসহ সারা দেশে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকার অবৈধ কারখানাগুলোর সিংহভাগই গড়ে উঠেছে জরাজীর্ণ আবাসিক ভবন কিংবা বাসাবাড়িতে। এসব কারখানার বেশিরভাগই চলছে অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ দিয়ে। এতে করে সরকার এ দুটি খাত থেকেও প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবহারের পর পলিথিন যেখানে সেখানে ফেলে দেয়ায় উর্বরতা হারাচ্ছে মাটি। ব্যবহার করা পলিথিন ড্রেন বা নর্দমায় পড়ে ড্রেনের ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ছে। এই ড্রেনের ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার দশা রাজধানীর প্রতিটি এলাকা। বর্ষা এলে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কিন্তু এ ব্যাপারে যারা আইনের প্রয়োগ করবে সেই পরিবেশ অধিদফতরের তৎপরতাও তেমন একটা দেখা যায় না। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বরাবরই তাদের জনবল সঙ্কটের দোহাই ছাড়াও পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের অসহযোগিতার অভিযোগ করে থাকেন।
অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সরোয়ার ইমতিয়াজ হাশমি বলেন, পলিথিন উৎপাদনে প্রভাবশালীরা জড়িত বলে অভিযানে গেলে বাধা আসে। অভিযান পরিচালনার জন্য পুলিশ কিংবা র‌্যাব সদস্য চেয়ে রিকুইজিশন দিলেও পাওয়া যায় না। তিনি জানান, অবৈধ কারখানা বন্ধের জন্য অনেকবার অভিযান চালানো হয়েছে। অনেক মেশিন জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু অভিযানের পর আবার একই স্থানে কারখানা গড়ে উঠেছে। পুরান ঢাকার উর্দু রোডের এক বাসিন্দা জানান, উর্দু রোড ছাড়াও চকবাজার ও আজগর লেনে ১৫/২০টি পলিথিন কারখানা আছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা হাজী সাব্বির হোসেন। আর কামালবাগে ২০টি পলিথিন কারখানা নিয়ন্ত্রণ করেন একই দলের স্থানীয় নেতা শেখ আমির হোসেন। স্থানীয়রা জানান, প্রতিটি অবৈধ কারখানা থেকে মাসে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের নামে ৩০ থেকে ৫০ হাজার এবং পুলিশের জন্য ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা তোলেন শেখ আমির হোসেন।
অবৈধ পলিথিন কারখানা সবচেয়ে বেশি আছে পুরান ঢাকার দেবিদাস ঘাট লেনে। একটি এলাকায় আছে শতাধিক কারখানা। এছাড়া রহমতগঞ্জ, ডাইলপট্টি, জোড়া খাম্বার মোড়ে কমপক্ষে ২৫টি অবৈধ পলিথিন কারখানা আছে। জানা গেছে, ৬০/৩ চাঁদনিঘাটে দুটি কারখানার মালিক শামীম ও মোশারফ। একই এলাকার জোড়া খাম্বার মোড়ে আরেকটি কারখানার মালিক হাশেম। স্থানীয়রা জানান, এসব অবৈধ কারখানা নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তিনি আওয়ামী লেিগর এক শীর্ষ নেতার ভাগ্নে। জানা গেছে, পুরান ঢাকার কারাখানাগুলোতে উৎপাদিত হাজার হাজার বস্তা পলিথিন রাতের অন্ধকারে ট্রাকে ভরে ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়। সপ্তাহের বুধবার সবচেয়ে বেশি পলিথিন ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়। রাত ১২টার পর থেকে ট্রাকে পলিথিনের বস্তা লোড করা হলেও পুলিশ এ বিষয়ে কিছুই জানে না বলে জানায়। যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশকে মাসোহারা দিয়েই মালামাল লোড করা হয়। সে কারণেই পুলিশ সবকিছু জেনেও না জানার ভান করে।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালে ২০ মাইক্রনের নিচে ও ২০০৮ সালে ৫০ মাইক্রনের নিচে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে সরকার। সংশোধিত আইনে অবৈধ পলিথিন উৎপাদনকারীকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদÐ এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া পলিথিন বাজারজাতে ৬ মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের কোনো প্রয়োগ নেই।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ