Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

স্বাধীনতা দিবসের সাক্ষী ও প্রজন্মের ভাবনা

| প্রকাশের সময় : ৩ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

অনেক আশায় বুক বাঁধা বাঙালিদের জন্য ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম আর শেষটা এক ছিল না। পূর্ব বাংলার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, নদনদীকে রক্তে ভাসাতে ভাসাতে ‘রক্তঝরা মার্চ’ নাম নিয়ে মার্চ হয়ে রইলো ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে চুক্তি, ২১ মার্চে জিন্নাহর রেসকোর্সের ভাষণ, অপারেশন সার্চ লাইট, ২৫ মার্চের গণহত্যার পর আসে আমাদের সেই ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবস। ৪৬তম এই স্বাধীনতা দিবসে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং বই পড়ে, গল্প শুনে স্বাধীনতা দিবসের সাথে পরিচিতদের ভাবনা তুলে ধরেছেন মনির হোসেন শিমুল


ডা. লায়লা পারভীন বানু
ভিসি, গণ বিশ্ববিদ্যালয়
‘২৫ মার্চের কালরাতের কোনো প্রভাব রাজশাহী শহরে না পরলেও আমরা ঢাকার সব খবর পেয়ে যাই। স্বাধীনতা ঘোষণার সাথে সাথেই রাজশাহীর সকল সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যরা সেনানিবাসে অবস্থানরত পাকিস্তানী বাহিনীকে ঘেরাও করে ফেলে। বন্ধ করে দেওয়া হয় পাকবাহিনীর সকল রসদ সাপ্লাই। আর রাজশাহীবাসী নিজেদের সর্বস্ব নিয়ে এগিয়ে আসে মুক্তিবাহিনীর সহায়তায়’ বলছিলেন ১৯৭১ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. লায়লা পারভীন বানু। ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত রাজশাহী ছিল মুক্তিবাহিনীর হাতে। ১৪ এপ্রিল নদীপথে শহরে এসে নির্বিচারে হত্যা চালাতে থেকে পাকবাহিনী। পুলিশ ইন্সপেক্টর বাবাসহ পরিবারের অনেক সদস্যদের হারিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়া এই নারী মনে করেন, দেশ স্বাধীন হবে কিন্তু সেখানে কোনো গণতন্ত্র থাকবে নাÑ এমন ধারণা নিয়ে কোনো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরাই জীবন বাজি রেখে শত্রæর বিরুদ্ধে লড়াই করেন না। পতাকা, ভূখÐ ও স্বাধীনতা পেলেও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, ইতিহাসকে মুছে ফেলার জন্য অপশক্তিগুলোর অনবরত প্রচেষ্টা না থামানো গেলে স্বাধীনতার স্বপ্ন ও চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতাকে আপন মনে ধারন করার জন্য সঠিক ইতিহাসের অধ্যয়ন নিশ্চিত করতে হবে দেশের শাসকগোষ্ঠীকেই। নিজ নিজ দায়িত্ব আমাদের সবাইকে পালন করতে হবে সঠিকভাবে। তাহলেই শত বছর পরেও কেউ বঙ্গবন্ধু কে ভুলে যাবে না।

 

প্রফেসর ড. মাহমুদ শাহ্ কোরেশী
একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমী
১৯৭১ সালের ৮ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র, লেখক, সাংবাদিক-সংষ্কৃতি কর্মীদের নিয়ে গঠিত ‘শিল্পী-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের প্রতিরোধ সংঘ’-এর সমন্বয়ক ছিলেন একুশে পদক প্রাপ্ত ও তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই কিংবদন্তী শিক্ষক। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ মার্চ লালদীঘি ময়দানে একটি সমাবেশ আয়োজন করে এই সংঘ। বক্তৃতার পর ছিল নাট্যাভিনয় ও সঙ্গীত পরিবেশনা। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বি. এ. সিদ্দিকী সদ্যনিযুক্ত গভর্নর টিক্কা খানের শপথ গ্রহণ করাতে অস্বীকৃতি জানানোর ওপর ভিত্তি করে ছিল নাটকটি। “আবহাওয়া বুঝতে পেরে আমরা মূলত তখন স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত ঘটনের কাজ শুরু করি। সেবার মার্চের পুরো মাসটাই ছিল রক্তাপ্লুত। প্রতিদিন কম বেশি মানুষ খুন হচ্ছিলো পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে। বাঙালিদের থেকে প্রতিক্রিয়া ছিল সীমিত পর্যায়ে। সেনানিবাস ঘিরে ক্যাম্পাস পাহারা দিতে ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় রাঙ্গামাটি থেকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একটি দল আসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুরু হলো সবাই মিলে একসাথে কাজ করা। আমার দায়িত্ব ছিল পুরোরাতের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিচালনা করা।” পরবর্তীতে কলকাতায় গিয়ে ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি গড়ায়। ছদ্মানামে ভারতীয় পাসপোর্ট করিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কাজ করতে ছুটে যান ড. কোরেশী।
দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রামের পরের এই বাংলাদেশ আজ অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েও হয়তো আক্ষরিক অর্থে মুক্তি সংগ্রামের মর্মকথা ‘অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি’ পেয়েছে। তবে সব ধরনের অন্যায়-অবিচার, বৈষম্য থেকে মানুষের মুক্তির জন্য এই বাংলাকে আরো অনেকটা পথ হাঁটতে হবে বলে মনে করেন ফ্রান্স সরকার কর্তৃক চারটি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রাপ্ত একমাত্র এই বাঙ্গালী। নতুন প্রজন্ম একাত্তরের চেতনায় প্রিয় বাংলাদেশকে কাক্সিক্ষত স্বপ্নচূড়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন বাংলা একাডেমীর সাবেক এই মহাপরিচালক।

 


শাহ্পরাণ প্রবাল
শেষবর্ষ, এমবিবিএস, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ
আমরা জন্মগ্রহণ করেছি স্বাধীন দেশের নাগরিকের সৌভাগ্য নিয়ে। বই পড়ে অথবা কোনো মুক্তিযোদ্ধার মুখে গল্প শুনেই জেনেছি ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সকল সংগ্রামের কথা। মুক্তিযুদ্ধের গান শুনে আন্দোলিত হয়েছি। শিখিছে ঐক্যবদ্ধতার শক্তি। বুঝেছি কেমন নেতা হলে, অনুপস্থিতি সত্তে¡ও তাঁর একটি আদেশে সমগ্র জাতি সর্বস্ব নিয়ে যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন পতাকা পেতে পারে। গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহ্পরাণ প্রবাল জানান, সেই সব সংগ্রামের ভাবনা, অনুপ্রেরণা ও চেতনা ধারণ করেই আগামীদিনের মুক্তিসেনার নাগরিক হতে হবে আমাদের এই প্রজন্মকে। দেশের এগিয়ে চলার সাথে সাথে বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাসের সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে সারা বিশ্বের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে।
“স্বাধীনতার ৪৬ বছরে এসে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের স্বপ্নের শেষ নেই। মানুষ স্বপ্নের সমান বড়। আমরা স্বপ্ন দেখি বিশ্বের প্রথম সারির দেশের কাতারে দাঁড়িয়ে মাথা উচু করে বিশ্ববাসীকে আমাদের গল্প শুনানোর। ভাষা আন্দোলনের গল্প, ২৫ মার্চের গণহত্যার গল্প, স্বাধীনতার গল্প, দেশের জন্য জীবন দেওয়া বীরদের গল্প, এবং আমদের সামনে এগিয়ে চলার গল্প” বলেন এই ভবিষ্যৎ ডাক্তার।
অশুভ শক্তির সব চক্রান্ত থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশের মুক্তির জন্য ফেসবুকের স্ট্যাটাসের বাহিরে প্রয়োগ করতে হবে আমাদের সত্যিকারের দেশপ্রেমকে। ভালোবাসতে হবে দেশের প্রতিটি মানুষকে। দেশের ভালো সময়ে সাথে থেকে যেমন অনুপ্রেয়না দিতে হবে, নিজের সর্বস্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে খারাপ সময়ের মোকাবেলায়।

 

নীহারিকা ইসলাম
৩য় সেমিস্টার, ফার্মেসি বিভাগ
আমাদের সবার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বসবাস। তবুও লাখো মানুষের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার গল্প শুনে আজ অবাক হয়ে নিজের আশেপাশে তাকাই। দেখি কিভাবে ব্যক্তিস্বার্থ ও রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে বঙ্গবন্ধুসহ মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। আজ স্বার্থের জন্য আমরা ইতিহাস পাল্টে ফেলছি, ভুলে যাচ্ছি যে, মুক্তিযোদ্ধারা স্বার্থের ঊর্ধ্বে। আক্ষেপের সাথে কথাগুলো বলে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী নীহারিকা ইসলাম আরো যোগ করেন, পত্রিকায় মাঝে মাঝে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের অসহায় অবস্থা দেখলে মনে হয়, দেশের আকাশে চিরভাস্বর স্বাধীনতার সূর্যের আলোতে লাল সবুজের যে পতাকা দৃশ্যমান হয়, তা প্রাপ্তিতে তাঁদের যে বিশাল অবদান রয়েছে, তা হয়তো তাঁরা জানেন না। জানেন না সমাজ ও দেশের দায়িত্ববানেরা। জানলে ৪৬ বছরের এই বাংলাদেশকে হয়তো আমরা আরো অনেক ভালো অবস্থানে দেখতে পেতাম। তাই আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার প্রয়োজন যে, আমরা কী করতে পেরেছি, কী পারিনি, মুক্তিযুদ্ধে এত আত্মদান ও ত্যাগ-তিতিক্ষার পেছনে আমাদের যে স্বপ্ন ও লক্ষ্য ছিল, সেসব কতটা পূরণ হয়েছে, কতটা হয়নি, মুক্তি সংগ্রামের মর্মকথা কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, কতটা হয়নি।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে যেভাবে জাতীয় স্বাতন্ত্র্য বিপর্যস্ত হচ্ছে, ভোগ-বিলাস ও নৈতিক অবক্ষয়ের বাতাবরণে আমাদের মেরুদÐ যেভাবে জীর্ণ হচ্ছে, তাতে স্বাধীনতার লক্ষ্যগুলো সব নাগরিকের আবার পুনঃপাঠ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সচেতন না হলে আমাদের স্বাধীনতার আনন্দ-অনুষ্ঠান অর্থবহ হবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। আত্মসমালোচনা, আত্মোপলব্ধি ও কর্তব্য নির্ধারণের দায়িত্ব পালন আমাদের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে পারে। এই ব্যাপারে সময়ের দাবি পূরণে আমরা এগিয়ে আসতে পারি কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।