Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭, ০৯ কার্তিক ১৪২৪, ০৩ সফর ১৪৩৯ হিজরী

জঙ্গি ইস্যুর শেষ কোথায়?

| প্রকাশের সময় : ৫ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

জি. কে. সাদিক : হলি আর্টিজানে ও শোলাকিয়াতে ঘৃণ্য জঙ্গি হামলার পর দেশব্যাপী জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ তৎপরতার কারণে সরকার পক্ষ থেকে বলা হলো যে, সরকার জঙ্গিবাদ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে জঙ্গি মোকাবিলায় বেশ সফলতা লাভ করেছে। দেশে আর বড় ধরনের জঙ্গি নেই বলেও শোনা গেল। কিন্তু মুফতি হান্নানের রায় হওয়ার পর থেকে যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে দেশে বড় ধরনের অশুভ শক্তির আক্রমণ সামনে রয়েছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে যে, জঙ্গিরা বারবার কৌশল পাল্টাচ্ছে যার কারণে তাদের দমন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
১৯৯৬ সালের পর থেকে দেশে ক্রমেই জঙ্গিদের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু সে সময় থেকে এদের বিষয়ে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। গুরুত্ব না দেয়ার পেছনে একটা বড় ধরনের কারণ রয়েছে। তাহলো যে, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেশ-জাতির স্বার্থের চাইতে বড় হলো দলের স্বার্থ ও ব্যক্তির স্বার্থরক্ষা করা। এই স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে এরা বিরোধী দল নিয়ে শঙ্কিত থাকে। সেই ভয় দূর করার জন্য এরা দমন-পীড়ন চালাতেই ব্যস্ত। যার ফলে জঙ্গি সংগঠনগুলো তাদের কর্যক্রম চালানোর সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছে। সরকার পক্ষের এমন উদাসীনতার মাশুল গুনতে হচ্ছে এখন গোটা জাতিকে।
আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের মৃত্যুদÐ হওয়ার পরে জঙ্গি সংগঠনগুলো কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অরাজকতার সুবাদে এরা আবার সংগঠিত হয়ে উঠে। আগের চাইতেও অনেক শক্তিশালী হয়ে এরা আবার তাদের সন্ত্রাসী কর্যক্রম চালাচ্ছে। তারপরও সরকার পক্ষের হুঁশ ফিরেনি। যখন যেখানে যে কোনো হামলা বা আক্রমণ হয়েছে তখনই বিনা তদন্তে নির্দ্বিধায় সরকার দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এটা বিএনপির মদদে জামায়াত করেছে। সরকার বারবার অপবাদ দিয়ে যে পাপ করেছে তার মাশুল দিতে হচ্ছে আজ। অক্ষমতাকে ঢাকার জন্য অন্যের কাঁধে দোষ চাপিয়ে বাঁচা যায় কিন্তু পরের পরিণাম হয় খুব খারাপ। যার প্রমাণ দেশবাসী দেখছে।
ক্ষমতার লোভে ভিন্নমতের রাজনৈতিক দলগুলোর উপর নিপীড়নে ব্যস্ত আর অন্যদিকে ভয়ঙ্কর সব জঙ্গি সংগঠনগুলো হয়েছে সংগঠিত। দেশের পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, সাধারণ জনগণের জান-মালের নিরাপত্তাতো নেই, নেই কোনো বিদেশি অতিথিদের জীবনে নিরাপত্তা। সরকার দলের এমপি-মন্ত্রিদের কাফনের কাপড়সহ চিঠি পাঠিয়ে হুমকি দিলে নিরাপত্তা কতটা থাকে তার প্রমাণ এমপি লিটন হত্যার মধ্য দিয়ে হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের চলছে চরম ইমেজ সংকট।
একের পর এক সিরিয়ালি হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে জঙ্গিরা, চিঠি পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যন্ত নিরাপদে নেই। দেশে নিরাপত্তার কেমন হয়েছে তার চিত্র শোলাকিয়া হামলায় প্রমাণ হয়ে গেছে। গত ৭ জুলাই ২০১৬ শোলাকিয়াতে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালিয়ে ৯ জন পুলিশ সদস্যকে কুপিয়েছে জঙ্গিরা। একজন পুলিশ সদস্য জীবন বাঁচাতে দৌড়িয়ে আশ্রয় নেয় মসজিদের টয়লেটে সেখানেও তার রক্ষা হয়নি। কতটা ভয়ঙ্কর হলে ও নিরাপত্তাহীন হলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে তা কল্পনা করাও কঠিন। ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টায় পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ইব্রাহিম মোল্লাকে কুপিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এখনো সেই ঘটনার কোনো মূল হোতা চিহ্নিত হয়নি। মাঝে মাঝে মনে হয় ‘বাংলা কী তবে আফগান হয়ে গেল?’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে তারা জঙ্গি দমনে খুব সফলভাবে কাজ করছে। কিন্তু সম্প্রতি যে জঙ্গি হামলাগুলো হচ্ছে তাতে আর সফলতার কথাটা ধোপে টিকে না। বিমানবন্দর এলাকাতে, র‌্যাব ক্যাম্পে, ব্যার-পুলিশের তল্লাশি চৌকি পর্যন্ত যেখানে নিরাপদ নয় সেখনে সফলতার বুলি আউড়ানো বোকামি ছাড়া কিছুই না।
গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। সে অভিযান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। সেখানে অভিযানে ৩ নারী জঙ্গি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক হয় এবং একজন পুরুষ জঙ্গি গুলিতে নিহত হয়। পুলিশের সূত্রে জানা যায় যে, পুলিশ তাদের দরজায় নক করলে জঙ্গিরা পুলিশ সদস্যদের উপর ছুরিকাঘাত করে এবং মরিচের গুঁড়া নিক্ষেপ করে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। জঙ্গিদের ছুরির আঘাতে ৫ পুলিশ সদস্য আহত হয়। পুলিশের উপর ছুরি দিয়ে আঘাত করে ও মরিচ গুঁড়া মেরে পালাতে গেলে পুলিশ গুলি ছুড়ে। আবার ১১ সেপ্টেম্বরের দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকাতে লিখা হয়েছে যে, পুলিশ তাদের আটক করতে দরজায় নক করলে তারা পুলিশের উপরে মরিচ গুঁড়া মারে এবং বাসার ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটায়। তখন পুলিশও গুলি ছুড়ে। এখানে কোনটা সত্য পুলিশের উপর গুলি ছুড়ে তারা পালাতে গেলে গুলি ছুড়ে নাকি ভিতরে বিস্ফোরণ ঘটালে গুলি ছুড়ে? ছুরি আর মরিচ গুঁড়ার বিপরীতে গুলি ছুড়া কতটা সক্ষমতার কাজ হতে পারে? পুলিশের তথ্য মতে জঙ্গিরা পাল্টা গুলি ছুড়েনি তাহলে পুলিশ কীভাবে গুলি ছুড়ে?
আটক তিন নারী জঙ্গিদের কাছ থেকে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেল? তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে কেনো পরবর্তী জঙ্গি হামলাগুলো ঠেকানো গেল না কেন? নাকি তাদের কাছ থেকে কোন তথ্যই আসেনি। জঙ্গিদের ধরে তাদের আইনের আওতায় এনে রিমান্ড মঞ্জুর করে তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে মূল হোতাকে না ধরে কেন ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হচ্ছে? অপরাধী যেই হোক তার আইনের আশ্রয় ও আত্মপক্ষ সমর্থন করার অধিকার আছে। বিচার হওয়ার আগেই বা অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই কি পুলিশ বাহিনী কাউকে হত্যা করার ক্ষমতা রাখে? কিন্তু সম্প্রতি এমনভাবে একের পর এক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মিলছে যা থেকে মনে হচ্ছে সারা দেশেই যেন জঙ্গি ছেয়ে গেছে। বৈদেশিক আগ্রাসনের শিকার হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশ্বের কাছে দেশের ইমেজ খোয়ানো হচ্ছে। দেশের পরিস্থিতি যদি এমনই হয় তাহলে এটা সরকারের কোনো সফলতা নয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতিই এর জন্য দায়ী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। আমি শতভাগ নিশ্চিত আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট সক্ষম জঙ্গি দমনে। তবে কেন এমন জঙ্গি হামলা? এর পেছনে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার কারণও থাকতে পারে।
জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে জঙ্গিদের মেরে ফেলা হচ্ছে। কেন তাদেরকে কৌশলে আটক করে তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে মূল হোতাকে ধরা হচ্ছে না? জঙ্গিদের অস্ত্র, অর্থ প্রশিক্ষণ কোথা থেকে আসছে তা কেন বের করা হচ্ছে না? মাদারীপুরে রিপন চক্রবর্তী হত্যার সময় আটক হয় উত্তরার ফাহিম। আটক ফাহিম থানায় সাংবাদিক ও পুলিশের সামনে এমন অসংলগ্ন আচরণ করে তা দেখে মনে হয় সে যেন আটককৃত ভীতু হরিণ। তার আচরণ ছিল যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ। তাকে আদালত ১০ দিনের রিমান্ড দিয়ে পুলিশ হেফাজতে পাঠালে প্রথম দিনেই ক্রসফায়ারে তাকে হত্যা করা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে পুলিশ এতটাই অক্ষম যে তাদের হেফাজতে একজন আসামির নিরাপত্তা দিতে পারে না?
আমরা এ অবস্থা থেকে উত্তরণ চাই। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকলকে উদ্যোগী হতে হবে।
ষ লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।