Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৭, ১৪ বৈশাখ , ১৪২৪, ২৯ রজব ১৪৩৮ হিজরী।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উষ্ণ হচ্ছে সউদী আরবের সম্পর্ক

আইএসবিরোধী লড়াইয়ে সহযোগিতা জোরদার

| প্রকাশের সময় : ৬ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ভয়েস অব আমেরিকা : সউদী আরব বলেছে, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা জোরদার করছে। চাপের মুখে পড়েই রিয়াদ এ ব্যবস্থা নিলেও এটা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সউদী আরবের সম্পর্ক উষ্ণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যাপারে সউদী উদ্বেগের অংশীদার।
সউদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর গত মাসে ওয়াশিংটন সফরকালে আইএসের বিরুদ্ধে তার দেশের ভূমিকার কথা বলেন। তার মার্কিন প্রতিপক্ষ রেক্স টিলারসনের পাশাপাশি বক্তৃতার সময় জুবেইর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরই সিরিয়ার উপর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যায় বিমান হামলা চালিয়ে রিয়াদ মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে তার দায়িত্ব পালন জোরদার করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর বলেছে, ২০১৪ সালের আগস্টে আইএসবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট সিরিয়ায় ৭,৪৮০ বার বিমান হামলা চালিয়েছে। প্রতিরক্ষা দফতর বলে, মার্কিন জঙ্গি বিমানগুলো এ সব হামলার মধ্যে ৩৭১ দফা হামলা চালিয়েছে, বাকি সব হামলা চালিয়েছে জোটভুক্ত অন্য ১১টি দেশঃ অস্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, ব্রিটেন, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জর্দান, নেদারল্যান্ড, সউদী আরব, তুরস্ক ও ইউএই।
অ-সামরিক উদ্যোগ
রিয়াদ আইএসের কর্মকাÐ পরিচালনা ও যোদ্ধা নিয়োগে সউদী অর্থায়ন বন্ধের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। ২০১৬ সালে ওয়াশিংটনে সউদী দূতাবাসের ওয়েবসাইটে পোস্ট করা এক ফ্যাক্টশিটে বলা হয়, আইএসকে নির্মূল করার জন্য ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি জোট ‘আইএসআইএল অর্থায়ন প্রতিরোধ গ্রæপ’-এর তিন কো-চেয়ারের মধ্যে রিয়াদ একজন। অন্য দু’দেশ হল যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালি।
সউদী ফ্যাক্টশিটে আইএসবিরোধী অন্য যে সব পদক্ষেপের কথা আছে তার মধ্যে রয়েছে ২০১৫ সাল থেকে ২৮০০ সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার এবং আইএসকে অপযশগ্রস্ত করতে সরকারী ইমামদের মাধ্যমে আগ্রাসী গণশিক্ষা প্রচারণা চালানো। ২২ মার্চ ওয়াশিংটনে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতাকালে টিলারসন আইএসবিরোধী জোটে সউদী সাহায্যের কথা স্বীকার করে বলেন, আইএস ও অন্যান্য উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী গ্রæপগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশেষ করে সউদী আরব ও মিসরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সউদী আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উপর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব প্রদানের একটি কারণ হতে পারে সউদী আরব আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করার আগে আইএসের উত্থানে সহায়তা করার জন্য দেশটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সমালোচকরা বলেন, ওয়াহাবিবাদ নামে ইসলামের যে কঠোর রূপটি সউদী রাজপরিবার ঐতিহাসিকভাবে অনুসরণ করে আসছে তা আইএসকে সমর্থন যুগিয়েছে। তারা আরো বলেন, যে অল্পসংখ্যক সউদী টাকা দিয়ে আইএসকে সমর্থন করেছে তাদের বিরুদ্ধে রিয়াদ যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি।
ওয়াশিংটনে ভয়েস অব আমেরিকার আফগান সার্ভিসের সাথে এক সাক্ষাতকারে আফগানিস্তান, ইরাক ও জাতিসংঘে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জালমে খলিলজাদ বলেন, সউদীরা বিভিন্ন কারণে উগ্রপন্থী গ্রæপগুলোকে সমর্থন করেছে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তারা এটা স্বীকারও করে।
এসএআইএস-জনস হপকিনস-এ পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক আব্বাস কাদিম মনে করেন, সউদী আরব তার ভাবমর্যাদা পরিষ্কার করতে চায়। ভয়েস অব আমেরিকা পারসিয়ান সার্ভিসকে একপৃথক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, আইএসের বিরুদ্ধে সউদী আরবের লড়াই তারা যে এই অশুভ শক্তির জন্মের সাথে জড়িত ছিল সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার চেষ্টার অংশ।
সউদী কর্মকর্তারা এ ধরনের সমালোচনাকে অন্যায্য আখ্যায়িত করে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের প্রমাণ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে ইসলামী জঙ্গি দমনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
খলিলজাদ বলেন, সউদী বাদশাহ ও উপ-যুবরাজ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে তারা সুন্নী উগ্রপন্থীদের তাদের প্রতি হুমকি বলে গণ্য করেন। তিনি বলেন, তারা আধুনিকতাকে গ্রহণ করছেন এবং উগ্রপন্থী গ্রæপগুলোর কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে চাইছেন।
আঞ্চলিক বিরোধ
কাদিম বলেন, আরেকটি ঘটনা মার্কিন নেতৃত্বাধীন আইএসবিরোধী জোটকে রিয়াদের জোর সমর্থন দেয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে সউদী আরবের সুন্নী সেনাবাহিনী সুন্নী আইএস জঙ্গি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক লড়াইয়ে ইরান সমর্থিত শিয়া জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তিনি বলেন, সউদীরা এখন সিরিয়া ছাড়াও আরো কয়েকটি ফ্রন্টে লড়াইয়ে লিপ্ত। তার একটি হচ্ছে ইয়েমেন, আরেকটি হচ্ছে বাহরাইন।
২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে সউদী নেতৃত্বাধীন একটি জোট ইয়েমেনে যুদ্ধ করছে। তারা রাজধানী সানাসহ উত্তর ইয়েমেন নিয়ন্ত্রণকারী ইরান সমর্থিত শিয়া হুছি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাচ্ছে ও নৌবাহিনী ব্যবহার করছে। এ যুদ্ধে হাজার হাজার লোক নিহত হয়েছে। রিয়াদ বাহরাইনের সংখ্যালঘু সুন্নী শাসকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের সহিংস গণঅভ্যুত্থান দমনে সাহায্য করতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) বাহিনীর অংশ হিসেবে ২০১১ সালে সেখানে শত শত স্থল সেনা পাঠায়। জিসিসি বাহিনী এখনো বাহরাইনে আছে।
২৩ মার্চ টিলারসনের পাশাপাশি বক্তৃতায় জুবেইর বলেন, রিয়াদ সব সময় এ জোটের সম্প্রসারণের পথ সন্ধান করেছে। কাদিম বলেন, জুবেইর এর মধ্য দিয়ে একটি বার্তা প্রেরণ করেছেন।
নয়া মার্কিন প্রশাসন
ট্রাম্প প্রশাসন তাদের প্রথ দু’মাসে কয়েকবার সউদী নেতাদের সাথে উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করেছে। তারা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় শীতল হয়ে আনা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ইঙ্গিত দিয়েছে। ওবামা সউদী আরবের আঞ্চলিক শত্রæ ইরানের সাথে সংলাপ চালিয়ে ও পারমাণবিক চুক্তি করে রিয়াদকে ক্ষুব্ধ করে তোলেন।
খলিলজাদ বলেন, ইরানের প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর মনোভাব সউদী আরবের সাথে মার্কিন সহযোগিতার পথ উন্মোচন করেছে। তিনি বলেন, এ প্রশাসনের মধ্যে ভীতি আছে যে ইরান ক্রমেই বেশীমাত্রায় আধিপত্যবাদী হয়ে উঠছে, তারা মিলিশিয়া গ্রæপগুলোকে সমর্থন করে এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল করছে এবং ক্ষমতা শূন্যতা সৃষ্টির সুযোগ বৃদ্ধি করছে যার ফলে সন্ত্রাস জন্ম নিতে পারে। সুতরাং এ অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্র সউদী আরব ও এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ যেমন ইসরাইলের প্রতি সমর্থন জোরদার করছে।
তবে ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের আমেরিকান সাংবাদিক ও বিশ্লেষক টমাস লিপম্যানের মতে, সউদী-মার্কিন উষ্ণ হতে থাকা সম্পর্ক সন্ত্রাস মোকাবেলা বিষয়ে সকল মতপার্থক্য দূর করতে পারেনি। তিনি ভয়েস অব আমেরিকা পারসিয়ান সার্ভিসকে বলেন, কোন গ্রæপ ভয়ঙ্কর জঙ্গি এবং কোন গ্রæপ স্রেফ ভালোর জন্য লড়াই করছে এ ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সাথে এক নয়।
বেলজিয়ামভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রæপের ফেব্রæয়ারি মাসের রিপোর্টে বলা হয়, ইয়েমেনে সউদী নেতৃত্বাধীন জোট আল কায়দার ইয়েমেন শাখা আল কায়দা ইন দি আরাবিয়ান পেনিনসুলার (একিউএপি) যোদ্ধাদের সাথে সম্পৃক্ত অথবা ন্যূনতমভাবে তাদের দিকে চোখ বন্ধ করে রেখেছে যতক্ষণ তারা তাদের অভিন্ন শত্রæ হুছিদের ওপর হামলায় সাহায্য করছে। ওয়াশিংটন একিউএপিকে সন্ত্রাসী গ্রæপ বলে গণ্য করে। সউদী আরবের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গত মাসে বলেন, বিভিন্ন প্রতিপক্ষ গ্রæপের হামলায় একিউএপি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
লিপম্যান বলেন, কয়েক প্রজন্ম ধরেই আমেরিকানরা জিজ্ঞেস করে আসছে যে সউদী আরবের মত একটি দেশের সাথে অংশীদারিত্বের মূল্য কী যাদের সামাজিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ আমাদের এত বিরোধী! আর সব সময়েই এর জবাব ছিল একইÑ তাদের কিছু আছে যা আমাদের প্রয়োজন আর আমাদের কিছু আছে যা তাদের প্রয়োজন। এটা হচ্ছে লেনদেন গত অংশীদারিত্ব এবং যতদিন আল-সউদ পরিবার ক্ষমতায় থাকবে ততদিন তা অব্যাহত থাকবে।

 

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর