Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৭, ১৪ বৈশাখ , ১৪২৪, ২৯ রজব ১৪৩৮ হিজরী।

কালো মেয়ে

| প্রকাশের সময় : ২২ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

হাসি ইকবাল

মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গোনা দাদিমা মৃত্যুভয়ে যতটা না শঙ্কিত ছিল তার চেয়ে বেশি শঙ্কিত ছিল আমার গায়ের রঙ নিয়ে। উঠতি বয়স পর্যন্ত গায়ের রঙ এমন কালো থাকলে আমাকে কে বিয়ে করবে? আমার তো ভালো বিয়ে হবে না। বিয়ে দিতে গেলে তার ছেলে মানে আমার আব্বুর অনেক টাকা খরচ হবে, মানে যৌতুক ছাড়া নিশ্চয়ই আমার বিয়ে হবে না। দাদিমা আজ বেঁচে নেই কিন্তু আমার গায়ের রঙ নিয়ে তার ভাবনা যে একেবারেই অমূলক ছিল না তা এখন হাড়ে-মজ্জায় টের পাচ্ছি।
আমি রামিসা আলম। আমার গায়ের রঙ নাকি তীব্র কালো। বন্ধুদের ভাষায়, প্রচ্ছন্ন কালো কিংবা অমাবস্যার রাতের মতো কালো। চাচি, মামিরা বলে চাঁদ গিলে খাওয়া অন্ধকার রাতের মতোই নাকি কালো আমি। তবে নানি বলে ভিন্ন কথা, আমি নাকি জেনেটিকালি কালো কারণ আমার ফুফুরা কালো, আমার বাবা কালো, আমার চাচারাও অনেক কালো। কালো বংশে আম্মুকে বিয়ে দেয়ার কারণে বংশ পরম্পরায় সবাই কালো হিসাবে জন্ম নিয়েছি। আমার সাত বছরের ছোটভাইটি রাজন, তার গায়ের রঙ আম্মুর গায়ের রঙের মতই টকটকে উজ্জ্বল। তাই হয়তো আম্মু-আব্বু আমার চেয়ে রাজনকে অনেকটাই বেশি ভালোবাসে। নানি-খালারা বলে, ছেলেমানুষ নাকি সোনার আংটি! আর সোনার আংটি নাকি বাঁকাও ভালো। রাজনের না হয়ে যদি আমার গায়ের রঙটা ফর্সা হতো তাহলে কি এমন কোন দোষ হতো?
দাদিমা আজ বেঁচে নেই কিন্তু বেঁচে আছে আমার গায়ের রঙের শঙ্কটা। কারণ দাদিমার মেজ মেয়ে মানে আমার মেজ ফুফির বিয়ে দিতে অনেক দেরি হয়েছিল শুধুমাত্র গায়ের রঙ কালো বলে। তাকে নাকি শ’খানিক পাত্র পক্ষ দেখেও পছন্দ করেনি তারপর ফুফির বিয়ে হয়েছিল যার সাথে তার আগের বউ মরে গিয়েছিল। আর ছোট ফুফি কলেজের প্রফেসর হওয়া সত্তে¡ও তার বিয়ে হয়েছে সামান্য এক সরকারি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর সাথে।
মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম আমার। তা সত্তে¡ও জন্মের পর থেকেই আম্মু আমাকে এমন কোন দামি ক্রিম, আর প্রসাধনী নেই যা ব্যবহার করাতে ভুল করেননি গায়ের রঙকে সাদা করার জন্য। শুধু কি তাই? মুলতানি মাটি, কাঁচা হলুদ, দুধের সর, মুসুর ডাল বাটা এমনকি বিড়ালের বিষ্ঠা পর্যন্ত আমাকে মাখানো হয়েছে তবু আমি এতটুকু সাদা হইনি। আমার গায়ের রঙটা বোধহয় অনেকটা কয়লা ধুলে ময়লা যায়নার মতোই। তাই ঘষে মেজেও গায়ের রঙ বদলানো যায়নি। তবে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে সেটা হলো দামি প্রসাধনী আর মেকআপে আমাকে নাকি খানিকটা সুন্দর দেখায়। কারণটা হলো আমার ডাগর ডাগর দুটো চোখ আর বাঁশির মতো নাক। কিছুটা তেলকালো চেহারায় এই চোখ আর নাকের গঠনে মুগ্ধ হয়ে কেউ কেউ সামান্য ভদ্রতা করে আমাকে আর কালো বলে না, বলে শ্যামা মেয়ে। তবে সত্যি বলছি, আমি কিন্তু মোটেও শ্যামা বা শ্যামলা মেয়ের মধ্যে পড়ি না। আমি কালো মেয়ে। মেন্ডেলের বংশগতির সূত্র মানলে আমার গায়ের রঙ ফিনোটাইপ কালোই হবে।
টিভি, পত্রিকা আর অনলাইনে প্রতিদিন কতই না বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। কালো থেকে সাদা হবার হাজারো ক্রিম এখন বাজারে। ফেয়ার এন্ড লাভলী নামক ক্রিমের বিজ্ঞাপনের পাঁচ কোটি টাকার চ্যালেঞ্জ কিংবা দামি পার্লারের ঘষামাজা কোনটাই আমার জেনিটিক্যালি কালোকে কালো থেকে সাদা বানাতে পারেনি। আমি এখন ভার্সিটিতে পড়ি। শুধু আমি একা নই, রোজী, মৌসুমী আরো কয়েকজন মেয়েবন্ধু কালো। তবে তারা আমার মতো কালো নয়। আমি নাকি একটু বেশি কালো। সুতারাং আমি যতই দামি প্রসাধনী মাখি না কেন আমি নাকি আর কালো থেকে ফর্সা হবো না। মা-খালার মতো আদর কিংবা তাচ্ছিল্য করে অনেকেই আমাকে কাল্টি বলে ডাকে। তারপরও বন্ধু মহলে আমার কালো রঙকে ফর্সা বানানোর নিরন্তর চেষ্টা চলে। আমি যে কালো সেটা মনে করিয়ে দেবার মতো বন্ধুর অভাব হয় না। আমার বন্ধু থেকে শুরু করে আম্মুর বন্ধুরা এমনকি কোন অনুষ্ঠান কিংবা কোনো বিয়ে বাড়িতে গেলেও আত্মীয়-স্বজনরা বিউটি টিপস দিতে ভোলেন না।
ভার্সিটিতে আমার মেয়েবন্ধু, ছেলেবন্ধুর অভাব নেই। কারণ আমি ছাত্রী হিসেবে অনেক ভালো। পাশাপাশি গানও করি। খুব সুন্দর ছবি আঁকি, ভালো আবৃত্তি করি। অনেকে বলে আমি নাকি গুছিয়ে চমৎকারভাবে কথাও বলি। গান, কবিতা আবৃত্তি, উপস্থাপনা আর ছবি আঁকার উপরে আমার শ’খানেক পুরস্কারও আছে। স্যার, ম্যাডামরা আমাকে আদর করে বøাক ডায়মন্ড বলে ডাকে। বন্ধুরা আমার প্রতিভাকে ভালোবাসে, ভালোবাসে আমার ভালো ছাত্রত্বকে কিন্তু আমাকে কোনো পুরুষ প্রেমিকা হিসেবে ভালোবাসে না। এমনকি কেউ কোনদিন প্রেমের অফার পর্যন্ত দেয়নি। তাই তো মেয়েবন্ধুর মতোই আমার ছেলেবন্ধু আছে কিন্তু নেই কোনো প্রেমিকপুরুষ। বান্ধবীরা যখন প্রেম করে তখন মাঝে মধ্যে আমার ঈর্ষা হয় কিন্তু কি করবো? আমি যে কালো, কে আমাকে পছন্দ করবে! মাঝে মাঝে হাজারো মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচ‚ড়া গাছটির মতোই নিষ্প্রভ একা লাগে নিজেকে।
আব্বু-আম্মু ইদানীং বেশ চিন্তিত আমাকে নিয়ে। কারণ আমার পড়াশোনা শেষের দিকে। এখন ভালো বিয়ে দিতে না পারলে পরে নাকি সমস্যা হবে। তাছাড়া চাকরির বাজার যা, ভালো পড়াশোনা করেই যে একটা চাকরি জোটাতে পারবো তারই বা কি নিশ্চয়তা আছে? মামা-মামিরা আব্বু-আম্মুকে বোঝায়।
সেদিন এক পাত্রপক্ষ এসেছিল আমাকে দেখতে। পাত্রের মা আমাকে দেখার পর কিছু না খেয়েই চলে গেছেন আলোচনা করা তো দূরের কথা। আম্মু-আমাকে অনেক বকা দিয়েছে পাত্রপক্ষ চলে যাওয়ার পর। আর আব্বু মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘চিন্তুা করিস না মা, দেখবি তোকে একদিন পাত্রপক্ষ এসে সেধে নিয়ে যাবে। তোর কোয়ালিটি আছে। অনেক গুণ আছে, তোর গুণের কাছে তোর গায়ের রঙ একদিন নিশ্চয়ই হেরে যাবে।’
মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয় নিজেকে নিয়ে। ইস! ভালো ছাত্রী আর ভালো কোয়ালিটি না থেকে যদি গায়ের রঙটাই ভালো হতো? কি দোষ হতো? চকচকে দামি গহনা আর উজ্জ্বল পোশাকে নাকি আমাকে আরো বেমানান লাগে। দাপুটে নিয়ন আলোয় হোঁচট খায় আমার ছাইরঙা শরীর। সবাই বলে, আগে দর্শনধারী তারপর গুণবিচারী। সত্যিই তাই। বিয়ের বাজারে প্রতিভাবান পাত্রীর কোন মূল্যই নেই, মূল্য রূপের আর মেয়ে হিসেবে কতটা সংসারী তার। এই ডিজিটাল যুগে এসেও কালো মেয়েকে ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দিতে গেলে কত ভাবনায় কাহিল হতে হয় একটা পরিবারকে সেটা আমি টের পাচ্ছি। তাই আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, না, আপাতত বিয়ে নয়। আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। কারো অনুগ্রহ আর অনুকম্পা নিয়ে আমি বাঁচতে চাই না।’
সবার বোধকরি সময় বদলায়। একসময় আমারও সময় বদলালো। একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি পেয়ে গেলাম। বেতনও ভালো। সব মিলিয়ে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। প্রতিদিন নিয়ম মাফিক অফিসে যাই। ইদানীং অনেকেই আমার গায়ে পড়ে কথা বলে। আমি বুঝতে পেরেছি পৃথিবীতে শক্তভাবে বেঁচে থাকার আর একটি অবলম্বন হলো প্রতিষ্ঠিত হওয়া। প্রতিদিনই দুই একটি বিয়েরও প্রস্তাব আসে কিন্তু আমি আর ওপথে পা মাড়াই না। অফিসেও অনেক অবিবাহিত, বিবাহিতরা লাঞ্চে, ব্রেকফাস্টে ডাকে বিভিন্ন হোটেল-রেস্টুরেন্টে। মন চাইলে দুই একজনের সাথেও যাই। কিন্তু বুঝতে বাকি থাকে না কোনটা ভদ্র আহŸান আর কোনটা অভদ্র।
অফিসে যাওয়া আসার ফাঁকে প্রায়ই একটি ছেলে আমাকে লক্ষ্য করে। মাঝে মাঝে আমি বিরক্ত হই। হঠাৎ একদিন ছেলেটি আমার মুখোমুখি হয়। আমাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আমি হতবাক হয়ে যাই। শেষ বিকেলের পাহাড় ছুঁয়ে আসা দমকা হাওয়ার শিহরণ জেগে ওঠে আমার কালো চামড়ায়। আমি ঘেমে ঘেমে একাকার। আমি কালো মেয়ে তাই বলে কুয়াশাচ্ছন্ন বিমূর্ত উপলব্ধির অস্পষ্ট ভাষা বুঝবো না তা কি করে হয়? আজ যে জীবনের অনুভ‚তি অন্যরকম। জানি না একে প্রেম বলে কিনা কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল।
নাহ! দিন দিন অফিস যাওয়া আসার ফাঁকে ছেলেটার দাঁড়িয়ে থাকা বিরক্তিই লাগছে। ঘটনাটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। কখনো আন্দোলিত করছে। সে কি আমাকে ভালোবাসে? নাকি ভালোবাসা নিয়ে খেলতে চায়? মাঝে মাঝে ভাবি বকা দিবো কিন্তু ওর করুণ চোখের দিকে তাকালে কেমন যেন মায়া লেগে যায়। স্বার্থের লাভ লোকসানের দিকে না তাকিয়ে আবারো মুখোমুখি হই তার।
সে এক ঝটকায় আমার হাত ধরে ফেলে, তারপর বলে, ‘কালো মেয়ে, আমি তোমার কাজল কালো চোখে হারিয়ে গেছি। আর কোন কথা নয় আমি তোমাকে বিয়ে করবো আজই।’
আমি হতবাক হয়ে বললাম, ‘মানে?’
সে বললো, ‘বড় অবেলায় পেলাম তোমাকে। হারিয়ে যেতে দেবো না। অনেকদিন থেকে তোমার মতো কালো মেয়ে খুঁজছিলাম বিয়ে করবো বলে। কারণ আমি যে সাদার নোংরা কাঁদা গায়ে মেখে বেড়াচ্ছি। সেটা হতে মুক্ত হতে চাই।’
চোখের কোণে অগোচরে পানি চলে এলো। সত্যি তোমাকে ভালোবাসি কথাটা হাল্কাভাবে নেয়া উচিত নয়। তার কাছেই জেনেছি, টকটকে ফর্সা নারীর কাছে ধোঁকা খেয়েছে সে। তাই সে কালো মেয়েকে জীবনসঙ্গী করতে চায়। তার কাছে আরো জেনেছি সে বিদেশফেরত একজন ইঞ্জিনিয়ার।
সে বললো, ‘সত্যিকারের ভালোবাসার বড়ই অভাব পৃথিবীতে। কিন্তু আমার মনে হয় তুমি সেই কষ্টি পাথর যার ছোঁয়াতে আমি শুধরে নেবো আগামী জীবন। আর আমাদের চলার পথ হবে সুখময়।’
তারপর ওর মা ও পরিবারের আরো কয়েকজন এলো আমাকে দেখতে। ছেলের পছন্দকে কেউ তিরস্কার করতে পারলো না। মনে হলো এখনো প্রগতিশীল মানুষ আছে, যাদের চিন্তুা চেতনা গায়ের রঙকে নিয়ে কাজ করে না। মানুষের আসল রঙ থাকে মনে, মানে দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাই তো আমি আমার কোয়ালিটির কাছে পুষিয়ে দিয়েছি আমার কালত্ব। মনে হলো হাজার বছরের বয়ে বেড়ানো মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেলাম। মনের অজান্তে কখন যে তার হাতটি ধরেছি বুঝে উঠতে পারিনি।

 


Show all comments
  • Shahin ৭ এপ্রিল, ২০১৭, ২:৩৯ পিএম says : 0
    nice !!! very nice your history , I hope you will enjoy your life as because of you have discovered a fantastic man . Allah will help you . thanks
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।