Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে বাম্পারফলন বিঘা প্রতি ২৫-৩০ হাজার টাকা লাভ

চিংড়ি চাষের এলাকায় এখন তরমুজের ছড়াছড়ি

| প্রকাশের সময় : ৮ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আবু হেনা মুক্তি : চিংড়ি চাষের এলাকায় এখন তরমুজের ছড়াছড়ি। মাত্র ক’বছর আগেই এখানে বিলের পর বিল শুধু মাছের ঘের দেখা যেত। আর সেখানেই তরমুজের বাম্পারফলন আকাশ কুসুম কল্পনার মতো। বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে এবার তরমুজের বাম্পারফলনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। গুতবছর চৈত্রের শুরু থেকে দফায় দফায় ঝড়-বৃষ্টির কারণে চাষিরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এবার ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সেই সমস্যা নেই। তবে গাছের মাঝামাঝি বয়সে যে ছিটেফোটা বৃষ্টির প্রয়োজন ছিল তা না হওয়ায় কৃষকদের সেচ খাতে সামান্য কিছু অতিরিক্ত পুঁজি ব্যয় হয়েছে। তবে গত সপ্তাহে দু’দিন রাতের বেলায় সামান্য বৃষ্টিপাত তরমুজ চাষিদের জন্য সোনায় সোহাগা হয়েছে। কিন্তু চাষিদের আর বৃষ্টিপাত কাম্য নয় আগামী কিছুদিন। আবহাওয়া আর ১৫ দিন অনুক‚লে থাকলে তরমুজ চাষে গত একযুগের রেকর্ড সৃষ্টি হবে বলে কৃষিবিদরা আশা করছেন।
সূত্রমতে, এ বছর কেবল ৫০ শতাংশ তরমুজ আগাম তোলা হয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশ তরমুজ মাঠে রয়েছে। কৃষকের দু’ চোখ জুড়ে এ তরমুজকে ঘিরে হাজারও স্বপ্নের তন্তু জালে যেন নিরাশার ছন্দপতন না হয় তা নিয়ে কৃষি সংশ্লিষ্টদেরও উৎকণ্ঠা কাটছে না। তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে শুধুই আকুতি সিডর বা আইলার মত কোনো দুর্যোগ না হয়। ভয়ঙ্কর কোনো কাল বৈশাখী ঝড় যেন ছোবল না মারে। কেননা সিডর আইলা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন প্রাকৃতিক বাগদা পোনার সঙ্কট সহ নানা কারণে চিংড়ি চাষিরা অনেকেই হাত গুটিয়ে পেশা পরিবর্তন করে আবার ফিরে এসেছিল তরমুজ চাষে। গত ৪-৫ বছর ধরে কৃষকরা আমন ধানের শেষে তরমুজ চাষে বিশেষ সফলতা পেয়ে আসছিল। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে বৃহত্তর খুলনার উপক‚লীয় অঞ্চলের মানুষ আবার যে কৃষিতে ফিরে আসছে তা নিঃসন্দেহে কৃষি বিপ্লবেরই ইঙ্গিত বহন করে।
সূত্রমতে, বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের শস্য ভান্ডার নামে খ্যাত অঞ্চলগুলোতে এবারও তরমুজের বাম্পার ফলন এর আশা করছে কৃষকরা। চাষিদের মুখে তাই উচ্ছ¡াসের হাসি। বিঘা প্রতি ৫-৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে চাষিরা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছে অন্যান্য বছর গুলোতে। এবার আশা আরো বেশি। এ অঞ্চলের তরমুজ রফতানি হয় খুলনার বাইরে কুয়াকাটা, যশোর, বেনাপোল, ঢাকা, চট্রগ্রাম, ফেনী, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন ব্যবসা কেন্দ্রিক এলাকায়। তবে আগামীতে সম্ভাবনাময় এ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত দুর্যোগ মোকাবেলা করার মত টেকনিক অবলম্বন করবে বলে জানিয়েছে এলাকাস্থ সংশ্লিষ্ট চাষিরা।
দৃুৃর্যোগপ্রবণ উপকূলের শস্যভাÐার নামে খ্যাত এ অঞ্চলে এবারও তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে এবং তা শেষ পর্যন্ত চাষিদের মুখে হাসি ফুটাবে বলে আশা করছে কৃষকরা। খুলনার দাকোপ উপজেলার বাজুয়া, কৈলাশগঞ্জ, লাউডোব এলাকা ঘুরে চাষিদের সাথে আলাপ করে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বর্তমান মৌসুমে তরমুজ বিক্রি করে আশানরূপ মুনাফা অর্জিত হবে বলে চাষি পরিবারে নিরাশার মধ্যেও বইছে কিছুটা তৃপ্তির খুশি। যদিও মৌসুমের মাঝ পথে অনাবৃষ্টির কারণে পর্যাপ্ত পানির সঙ্কটে ফসল উৎপাদন কিছুটা ব্যহত হয়। তথাপি বিঘা প্রতি ৫-৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে চাষীরা ২২-২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে সক্ষম হবেন বলে কৃষকরা এ আশা করছে। স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় মালামাল পরিবহন খরচ অনেকটা বেশি হয়। এছাড়াও আছে চাঁদাবাজদের উৎপাত। পরিবহন ব্যবস্থায় প্রতিক‚ল পরিবেশের কারণে চাষিরা তাদের উৎপাদিত তরমুজ সরাসরি পাইকারদের হাতে তুলে দিতে না পারায় কাক্সিক্ষত মাত্রায় মুনাফা অর্জন সম্ভব হয় না। গরমের মৌসুমে এলাকায় দেখা দেয় তীব্র পানি সঙ্কট। কৃষকদের মতে সম্ভবনাময় এখাতকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে মিষ্টি পানি ধরে রাখার সুব্যবস্থা সৃষ্টি করা অপরিহার্য। সাথে চাষিদের মাঝে সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের দাবি জানিয়েছেন চাষিরা। যদিও স্থানীয় পর্যায়ে এনজিও ব্র্যাক ব্যাংক কিছু ঋণ প্রদান করছে কিন্তু চাহিদার বিপরীতে সেটা নিতান্তই অপ্রতুল। সাতক্ষীরার এলাকার তরমুজ চাষি তুষার গাইন ৩ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করে বিক্রয় মৌসুমে বিঘা প্রতি ২৫ হাজার টাকা করে লাভবান হয়েছে বলে জানা যায়। বাগেরহাটের তরমুজ চাষি সাধুরাম সরদার ৬ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করে অনুরুপ লাভবান হয়েছে বলে ইনকিলাবকে জানায়। লাউডোব গ্রামের আমিন খন্দকার ১০ বিঘা জমিতে ৪৭ হাজার টাকা ব্যয় করে বর্তমান মৌসুমে ২ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা, পশ্চিম বাজুয়ার চাঁদপাড়া এলাকার তরমুজ চাষি সুপদ রায় জানায় সে ৬ বিঘা জমিতে ৪২ হাজার টাকা ব্যয় করে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকার, বেড়েরখাল থেকে তরমুজ চাষী অনিমেষ মন্ডল জানায় সে ৩ বিঘা জমিতে ২০ হাজার টাকা ব্যয় করে ১ লক্ষ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছে বলে জানা যায়। অপর দিকে বাজুয়া কাঁকড়াবুনিয়া ও কচা এলাকার তরমুজ চাষী সাবেক ইউপি সদস্য দীনবন্ধু মÐল জানায়, তাদের জমি একটু নিচু হওয়ায় পানি জমে তরমুজ গাছের ব্যাপক ক্ষতি সহ ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। যার ফলে উক্ত এলাকার চাষিরা মূলধন ঘরে তুলতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। হরিণটানার এলাকার বিভূতি স্যার দেড় বিঘায় বিক্রয় করেছে ৩৮ হাজার টাকায়। অনুরূপ লভ্যাংশের কথা স্বীকার করেছেন ওই অঞ্চলের অন্যান্য চাষিরাও। দাকোপের বাজুয়া অঞ্চলের উৎপাদিত তরমুজ যাচ্ছে খুলনা, ঢাকা, বরিশাল সহ দেশের ছোট বড় বিভিন্ন মোকামে। প্রতিদিন শত শত নৌকা ও ট্রলার এসে ভিড় জমে উপজেলার পোদ্দারগঞ্জ ও বাজুয়া গেট, বাজুয়া চড়ারবাঁধ সংলগ্ন এলাকায়। তরমুজ বিক্রির এই মৌসুমে পরিবহন খাতে স্থানীয় পর্যায়ে একটি বড় অংশ জনবল শ্রম বিক্রি করে তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে। পাশাপাশি ইঞ্জিন চালিত ভ্যান ঠেলাগাড়ি চালকরাও আছে জমজমাট ব্যবসার মাঝে। এ ব্যাপারে দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সাথে আলাপ করে জানা যায় ওই পোল্ডারের ৫টি ইউনিয়নে ১৩২৬ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষাবাদ করা হয়। উল্লেখিত সমস্যা গুলি নিরসন করলে তরমুজ চাষে এ অঞ্চলের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সব মিলিয়ে বলা যায় মৌসুমের এই সময়টাই তরমুজ বিক্রি কেন্দ্র করে দাকোপের জনবলের একটি বড় অংশের মাঝে দেখা যায় কর্মচাঞ্চল্য। সংশ্লিষ্ট চাষিরা এ খাতে বড় অংকের পুঁজি বিনিয়োগের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও বেসরকারী সাহায্য সংস্থা গুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এলাকাস্থ ভুক্তভোগী চাষিরা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ