Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৮ জুন ২০১৭, ১৪ আষাঢ়, ১৪২৪, ০৩ শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী

কৃষকের স্বার্থকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন সম্ভব নয়

| প্রকাশের সময় : ১২ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ড. শেখ সালাহ্উদ্দিন আহ্মেদ : হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর পরেও ন্যায্য দাম পাচ্ছে না কৃষকরা। কারন ফসল বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠানোই তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। আর এ দাম না পাওয়ার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণই দায়ী বলে ধারণা করছেন সংশ্লি­ষ্টরা।
আমরা মনে করি, যদি বাংলাদেশের কৃষকের স্বার্থ রক্ষা না হয় তবে তার সার্বিক ফলাফল কোনোভাবেই ইতিবাচক হওয় সম্ভব নয়। ফলে বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোকে যেমন আমলে নিতে হবে, এর পাশাপাশি এবারের সংলাপে উঠে আসা বিষয়গুলোকে যথার্থভাবে পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপও গ্রহণ করা জরুরি।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কৃষক তার মেধা ও শ্রম দিয়ে উৎপাদন করে দেশের সামগ্রিক গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কৃষকের অধিকার খর্ব হলে তার চেয়ে পরিতাপের আর কিছু হতে পারে না। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কৃষকদের সমস্যাগুলো সমাধান না করলে দেশের সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এবারের সংলাপে বক্তারা বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সাথে যখন কৃষক আদালত গঠনের দাবিও জানিয়েছেন, আমরা মনে করি, এই বিষয়টি নিয়েও সরকারকে ভেবে দেখতে হবে।
এটা বলাই বাহুল্য যে, অনেক সময়ে দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে নানা বিষয়েই এমন বাস্তবতা তৈরি হয়, যার ফলে কৃষকের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যা বিভিন্ন সময়ের পত্রপত্রিকাতেও এসেছে। এমনকি বাম্পার ফলনের পরেও কৃষকের লাভ করা তো দূরের কথা উৎপাদন খরচই উঠে আসে না। অথচ কৃষকেরা ঋণ গ্রহণসহ নানা প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে উৎপাদন করে, তার পরেও যদি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা মনে করি এই ধরনের যে কোনো বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে সরকারকে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা সমীচীন, যেন কৃষকেরা বিপর্যস্ত পরিস্থিতিকে মোকবেলা করে আবারো ফসল উৎপাদনে নেমে পড়তে পারে।
অনেক কৃষক চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ফসলে বিনিয়োগ করায় বাধ্যতামূলকভাবে লোকসান দিয়ে হলেও ধান বিক্রি করে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে তাদের। এ ছাড়া সার ও বীজের দাম বেশি হওয়ায় তারা উৎপাদন খরচের সাথে ধানের বাজার মূল্যের সমন্বয় করতে পারছে না। বিশেষ করে সরকারিভাবে ধান-চাল ক্রয় না হওয়ায় দালাল ফড়িয়া ও চাতাল মালিকদের কাছে কৃষকেরা জিম্মি হয়ে পড়েছে। তারা নিজেদের ইচ্ছে মতো দামে ধান ক্রয় করছে। ফলে বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের। দেশের অর্থনীতির মেরুদÐ হিসেবে বিবেচিত কৃষকরা যেভাবে ধান চাষ করে বঞ্চিত হচ্ছে তাতে কৃষকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তাই ভর্তুকি দিয়ে হলেও কৃষকদের বাঁচাতে হবে। কৃষক না বাঁচলে দেশের অর্থনীতিকেও বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।
কৃষি খাত এদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় জোগানদার। দেশের কৃষকরা নানা প্রতিক‚লতা, প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ করছে। বহু কষ্টে ফসল ফলালেও কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। এমনিতেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সিংহভাগ কৃষক। এর মধ্যে যদি তারা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পায় তাহলে তাদের মেরুদÐটা পুরোপরি ভেঙে যাবে। কৃষি ও কৃষক যদি বিপন্ন-বিপর্যস্ত হয় তাহলে দেশের সামগ্রিক ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে তা নতুন করে বলা নিষ্প্রয়োজন।
একদিকে খাদ্যদ্রব্যের বাজার ঊর্ধ্বগতি অন্যদিকে ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। অধিকাংশ কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল বিশেষ করে ধান, গম, পাট ও আলুর নায্য মূল্য পায় না। এরও মূল কারণ সেই সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটই সম্পূর্ণ বাজার ব্যবস্থাকে গ্রাস করে রাখে। কৃষকরা দিন রাত পরিশ্রম করে মাঠে ফসল ফলায়। কৃষকের উন্নতি মানে দেশের উন্নতি। তাই যে দেশ কৃষিতে যত উন্নত সেই দেশ তত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। অথচ কৃষক সমাজ আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।
দেশের কৃষি ও কৃষক আজ চরম অবহেলার শিকার। কৃষকরা খাদ্যশস্য উৎপাদন করে সারাদেশের মানুষের জন্য খাদ্যের সংস্থান করে থাকে। অথচ সেই কৃষক প্রতিবছর খাদ্য উৎপাদন করে লোকসানের শিকার হচ্ছে। আমার মতে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর ধান চালের এমন মূল্য নির্ধারণ করতে হবে যাতে করে কৃষক তার ন্যায্যমূল্য পায়।
একটি বিষয় স্পষ্ট করে বুঝতে হবে, শুধু কৃষিতে ভর্তুকি, সার, বীজ সরবরাহ করলেই হবে না, একই সঙ্গে কৃষিপণ্য বিশেষ করে ধান চালের উপযুক্ত মূল্য যেন কৃষক পায় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কৃষক কৃষিকাজ করে যে খাদ্যশস্য উৎপাদন করে তা থেকে যদি সে লাভবান হয় তাহলেই কৃষি উৎপাদন বাড়বে। কৃষিকাজ করে কৃষক যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে কৃষি উৎপাদন তথা খাদ্যশস্য উৎপাদন কমবে। খাদ্যশস্য উৎপাদন কমলে দেশ খাদ্যের উপর আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। একপর্যায়ে দেশে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিবে। তাই দেশে যথাযথ খাদ্যের সংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে হবে। আর তাদের বাঁচাতে হলে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে এবং এ ভর্তুকি যাতে প্রকৃত কৃষক পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও কৃষকের স্বার্থরক্ষা করতে না পারলে ক্রমাগতভাবে কৃষিখাতে যে ধস নেমে আসবে যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষি খাতকে বাদ দিয়ে বা কৃষকের স্বার্থকে উপেক্ষিত করে কোনোক্রমেই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ষ লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।