Inqilab Logo

সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ০৪ যিলহজ ১৪৪৩ হিজরী

বিশ্বময় ইসলাম : মুজ্বিযা, কারামাত ও যাদুর পার্থক্য নির্ণয়

| প্রকাশের সময় : ১৩ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মাওলানা মুফতি মোহাম্মাদ তাহির মাসউদ
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
১০. যাদুকর নবী হওয়ার দাবী করলে তার যাদু বিলুপ্ত হবে। নবুওয়্যাতের দাবী না করলে তার ভেল্কিবাজী চলতে থাকে। আল্লাহ তা’য়ালা কোন ভেল্কিবাজকে নবীদের মু’জিযাহর মত কাজ দ্বারা ভেল্কিবাজী করার ক্ষমতা দেননি। এ প্রসঙ্গে (ক) মুহাক্কিক উলামাদের একদল যাদু ও মু’জিযাহর মধ্যে পার্থক্য করেছেন এভাবে যে মু’জিযাহর মধ্যে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা হয় যাদুতে চ্যালেঞ্জ করা হয় না। আর মিথ্যা নবুওয়্যাতের দাবীদার ব্যক্তির হাতে মু’জিযাহ প্রকাশ পাওয়া সম্ভব নয়। এটাও আল্লাহ পাকের রীতি। উদ্দেশ্য হল, নবুওয়্যাতের সুমহান মর্যাদা ও পদের গÐিতে কোন মিথ্যাবাদীর অনুপ্রবেশ যেন না ঘটে। (রুহুল মাআনী-১/৩৩৯) (খ) একথা স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় যে, যদি কোন ব্যক্তি নবুওয়্যাতের মিথ্যা দাবী করে তাহলে আল্লাহর পক্ষ হতে এ সম্ভব নয় যে, তিনি উক্ত ব্যক্তির হাতে মুজিযাহর মত কোন অস্বাভাবিক কর্মের বিকাশ ঘটাবেন। যাতে সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণ না ঘটে। (তাফসীরে কাবীর-১/৬২৭) (গ) আল্লাহ তা’য়ালা কোন মিথ্যাবাদীর হাতে মু’জিযাহতুল্য কিছু প্রকাশ করে রিসালাতের মিথ্যা দাবীতে তাকে সত্যায়ন করতে পারেন না, যাতে করে হক বাতিলের সাথে, সত্যবাদী মিথ্যাবাদীর সাথে একাকার হয়ে না যায়। (হাশিয়া শাইখ যাদাহ-২/১৯৫) ১১. নবীর উপরও যাদু করতে পারে। নবীর উপরও যাদু ক্রিয়া করতে ও প্রভাব ফেলতে পারে।
কেননা যাদু তো গুপ্ত কার্যকরণের আছর। আর কোন কার্যকরণের প্রভাবে প্রভাবিত হওয়া নবীর পদ ও শানের প্রতিবন্ধক নয়। নবী করিম (স:) এর উপর ইয়াহুদী কর্র্তৃক যাদু করা, তাঁর উপর যাদুর আছর প্রকাশ পাওয়া, ওহীর মাধ্যমে তাঁকে এ বিষয়ে অবহিতকরণ, যাদুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিনষ্ট করার নীতি-পদ্ধতি অবহিতকরণ ইত্যাদি বিষয় বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে বিবৃত হয়েছে। যাদুকরদের যাদুর দ্বারা প্রথম পর্যায় মুসা (আ:)-এর প্রভাবিত ও ভীত হওয়ার বর্ণনা কোরআন মাজীদে বিদ্যমান। যেমন (ক) রাসূল (স:)কে ইয়াহুদী কর্তৃক যাদু করার ঘটনাটি হযরত আয়েশা (রা:) এর বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসের সহীহ বুখারী-২/৮৫৮ তে পরিবেশিত হয়েছে। (খ) (সূরা ত্বাহা-৬৬-৬৮) ১২. যাদুতে কোন কুফুরী বা শেরেকী কাজ বা কথা অবলম্বন করা হয়ে থাকলে যেমন জিনের নিকট সাহায্য কামনা করা, সাহায্যের জন্য তাদের আহŸান করা, জিনের পূজা বা সিজদা করা, নক্ষত্রসমূহকে স্বয়ং ক্রীয়াশীল (সৃষ্টি জগতে পরিবর্তন-পরিবর্ধনের ক্ষমতা সম্পন্ন) বিশ্বাস করা ইত্যাদি উক্ত যাদু কুফর ও হারাম এবং যাদুকর কাফির। ১৩. তাবীজ ভরা ও তাবীজ ব্যবহার করাতে যদি শয়তানের সাহায্য কামনা করা হয়ে থাকে, শয়তানের নিকট আবেদন-নিবেদেন করা হয়ে থাকে তবে তাও শিরক। উলামা কিরাম এ ব্যাপারে একমত যে, সপ্ত সিতারাকে বা অন্য নক্ষত্রকে আহŸান করা, তাদের নিকট আবেদন-নিবেদন করা, তাদের উদ্দেশ্যে মানানসই পোশাক, সীল, আংটি, চিহ্ন ইত্যাদি ব্যবহার ও অবলম্বন করা বা উল্লেখিত কর্মজাতীয় কোন কাজ করা কুফরী। এটি শিরকের সব চেয়ে বড় দ্বার। কাজেই তা রোধ করা বরং মূলোৎপাটন করা একান্ত কর্তব্য। (আকীদায়ে ত্বহাভিয়্যাহ মাআশ শরহে-৫০৫) বিস্তারিত জানার জন্য দেখা যেতে পারে তাফসীরে কাবীর-১/৬১৯) ১৪. যাদু ও তাবীজে ব্যবহৃত শব্দাবলী যদি দ্ব্যর্থবোধক বা অস্পষ্ট হয় যার পরিষ্কার অর্থ বোধগম্য না হয় তবে এতে শয়তানের নিকট সাহায্য কামনার সম্ভাবনা থাকায় এটিও হারাম ও নিষিদ্ধ। কেননা যে সকল বাক্যের অর্থ বুঝা যায় না বা সরল পরিচিত নয়, তা না বলা উচিত। কেননা তাতে গুপ্ত-লুপ্ত শিরক থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। (আকীদায়ে ত্বহাভিয়্যাহ মাআশরহে-৫০৫) ১৫. তাবীজ লিখন ও গড়নে যদি বৈধ বিষয়ের অবলম্বন করা হয় কিন্তু উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হয় অবৈধ তবে তাও হারাম ও অবৈধ হবে। কেননা খারাপ উদ্দেশ্য বা ক্ষতি সাধনের জন্য যাদু করার নিন্দা জ্ঞাপন করে কোরআন মাজীদে উল্লেখ করা হয়েছে যে (তাদের ঘৃণ্য কাজের একটি নমুনা হল) তারা উক্ত ফেরেস্তাদ্বয়ের নিকট হতে এমন বিষয় শিক্ষা লাভ করা যার দ্বারা স্বামী-স্ত্রীতে বিচ্ছেদ ও ব্যবধান রচনা করা যায়। (আল বাকারা-১০২) ১৬. বৈধ উদ্দেশ্যে বৈধ পদ্ধতিতে যদি আমলের মাধ্যমে তাবীজ ইত্যাদি কাজে লাগানো যায় তবে তা বৈধ ও জায়িয। এ প্রসঙ্গে (ক) হযরত আমর বিন শুআইব তার পিতা, তিনি তার দাদা হতে রেওয়ায়েত করেন, রাসূলুল্লাহ (স:) বলেছেন তোমাদের মধ্য হতে কেউ যদি স্বপ্নে কিছু দেখে ভয় পায় তবে যেন সে নি¤েœর দু’আটি পাঠ করে। বিসমিল্লাহি আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি সিন গাজাবিহি ওয়া ছুইইকাবিহি এর পর যদি তারা উপস্থিত হয় তবে কোন ক্ষতি করতে পারবে না। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা:) তার প্রাপ্তবয়স্ক সান্তানকে দু’আটি শিখাতেন। আর লিখন বস্তুতে লিখে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের গলায় ঝুলিয়ে দিতেন। (মেশকাতুল মাসাবীহ-১/২১৭) (খ) বিপদগ্রস্ত ও রোগাক্রান্ত ব্যক্তির জন্য কিতাবুল্লাহর কিছু অংশ অথবা আল্লাহর যিকর পবিত্র বা মুবাহ কালিতে লিখে তা ধৌতকরত তার পানি পান করানো জায়েয। ইমাম আহমাদ প্রমুখ এ ব্যাপারে প্রমাণ পেশ করেছেন। (ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়্যাহ-১৯/৬৪) (গ) (গলায়) তাবীজ ধারণ করা, ঝাড়ফুঁক দেয়া, হস্ত দ্বারা মসহে করে দেয়া, জায়েয কী না এ ব্যাপারে উভয় পক্ষেই হাদীস ও আছার আছে, জায়েয হওয়ার দিকটাই অধিকতর সঠিক ও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। উল্লেখ্য যে, মাসয়ালাটি আকাইদের তুলনায় ফিকাহের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যশীল। (শরহুল মাকাসিদ-৩/৩৩৪) (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্য ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়্যাহ-১৯/৬৪-৬৫, মিরকাত-/৩১৮-৩২১, ফাতহুল বারী-১০/১৯৫) ১৭. কোরআন করিমে বাবেল শহরে দুজন ফেরেস্তা হারুত-মারুতের অবতরণ এবং যাদু শিখানোর বিষয় বিবৃত হয়েছে। তাদের মানুষের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছিল। তারা জনগণকে যাদু শিক্ষা দিতেন যাতে মানুষ যাদু সম্পর্কে মূল তথ্য অবগত হয়ে তা হতে আত্মরক্ষা করতে পারে।
এ জন্যই তারা যাদু শিক্ষা দেয়ার পূর্বে অঙ্গীকার গ্রহণ করতেন যেন সঠিক ব্যবহার ও মূল উদ্দেশ্য ঠিক রাখে। অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে যাদু শেখার পর যদি তার ভুল ও অনুচিত ব্যবহার করে তবে তা সে তার নিজ দায়িত্বেই করবে। যাদু শেখার পর তাদের কেউ কাফির বা ফাসিক হয়ে থাকলে ফেরেস্তা সে জন্য আদৌ দায়ী নন। বাহ্যত (ক) (জনগণ শয়তানের শেখানো বিষয় অনুসরণ করার সাথে সাথে ঐ বিষয়ের অনুসরণ করত যা বাবেলের দুই ফেরেস্তা হারুত-মারুতের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল। তারা উভয়ে কাউকে যাদু শিক্ষা দিতেন না, যতক্ষণ না তারা বলে দিতেন যে আমাদের অস্তিত্ব ও অবতরণ পরীক্ষার উপাদান। আল্লাহ তা’য়ালা উভয় ফেরেস্তার মূল পরিচয় ও অবস্থা বিস্তারিতভাবে বলে দিয়েছিলেন। কাজেই সে দু ফেরেস্তা যাদু অনুযায়ী কাজ করতে কঠিন নিষেধাজ্ঞার পর যাদু শেখাতেন এ কথাটাই তারা ইন্নামা নাহনু ফিতনাহ (আমরা পরীক্ষার উপাদান) বলে প্রকাশ করেছেন। এখানে ফিতনা বলে ঐ সাধনা বুঝানো হয়েছে যার দ্বারা অনুগত ও অবাধ্য পৃথক হয়ে যায়। (তাফসীরে কাবীর-১/৬৩২)।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন